নিঃশব্দে-নীড়ে-ফেরা-।।-১০ম-পর্ব
উপন্যাস

নিঃশব্দে নীড়ে ফেরা ।। ১০ম পর্ব ।। ধারাবাহিক উপন্যাস ।। এ কে আজাদ দুলাল

নিঃশব্দে নীড়ে ফেরা ।। ১০ম পর্ব

  • এ কে আজাদ দুলাল

ক্লান্ত মন ও শরীরে অল্প সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে যায় দু’জন। মাঝ রাতে স্বপ্ন দেখে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় রাকার। মনিকাকে ডেকে তোলে। মনিকা ভয় পেয়ে যায়। ঘুম ভাঙতেই দেখে রাকা তার বিছানায় বসে আছে। মুখখানি কেমন যেন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। কাছে গিয়ে জানতে চায় খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি-না।
রাকা কিছু সময় চুপ থেকে স্বপ্নের ঘটনা খুলে বলে। আজ রাতে সেই মহিলাকে স্বপ্নে দেখেছে। পরনে আগের মতো হালকা সবুজ জমিনে খয়েরি রঙের পাড়ের শাড়ি এবং গায়ে খয়েরি রঙের ব্লাউজ। আজকে তার আচরণ ভিন্ন। আজ রাকাকে বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে। রাকা গভীরে তার বুকে মাথা রাখে। গভীর মমতায় তাকে আদর করছে কিন্তু আজও তার চেহারা দেখতে পায়নি রাকা। তার মাথায় হাত রেখে আর্শীবাদ করে। মনিকার দৃঢ় বিশ্বাস তারা ঠিক জায়গায় এসেছে।

রাত তখন তিনটা বাজে আর দু’ঘণ্টা পর সকাল হবে। সাতটার ভেতরে নাশতার টেবিলে ডাক পড়বে এটা নিশ্চিত। ঘুম ভাঙার পর রাকা গোসল করার প্রস্তুতি নেয়। গতকাল গোসল করা হয়নি। আজকে তার পোশাক হবে স্বপ্নে দেখা মহিলার অনুরূপ পোশাক। সে আসার সময় এক সেট পোশাক সঙ্গে করে এনেছে। গোসল সেরে বের হয়। মনিকা গোসলে ঢোকে। কমপক্ষে বিশ মিনিটের মতো সময় লাগবে মনিকার। এর ফাঁকে রাকা তার নির্ধারিত শাড়ি ব্লাউজ পরে ফ্যানে চুল শুকনোর চেষ্টা করছে। মনিকা গোসলখানা হতে বের হয়ে ভূত দেখার চমকে ওঠে।
— আরে রাকা, এটা কী পোশাক পরেছে? নাশতায় সাধারণ পোশাক পরতে।
— মনিকাদি, সবই রহস্য।
রাকার কথা শুনে মনিকা হাসে। বিষয়টি বুঝতে বাকি রইল না রাতের স্বপ্নের কথা। বুদ্ধিমতী মেয়েটি।

আরও পড়ুন বড় বাবা

সাড়ে আটটার দিকে মর্জিনা নাশতার টেবিলে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিয়ে গেল। দুজন সোজা নাশতার টেবিলে গিয়ে দেখে আরও চারজন নতুন অতিথি। রাকা ঢুকতে তার ওপর নজর পরে এ বাড়ির একমাত্র মেয়ের আলিফার। সে কাকে দেখছে। শুধু সে একা নয়, টেবিলে যারা আছে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারা কাকে দেখছে। মানুষের চেহারা এতটা মিল হতে পারে। আলিফার মাথার ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার মা ঠিক এ ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। আলিফা বেশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
— বসুন। নতুন জায়গায় ঠিক মতো ঘুম হয়েছে তো? আমি এ বাড়ির তিন ভাইয়ের ছোটো বোন। পাশে আমার স্বামী, তার পাশে ছোটো ভাই এবং তার স্ত্রী । বাকি সবার সাথে তো গতরাতে পরিচিত হয়েছেন। মফস্বল শহর তো, আসতে ঘণ্টা খানেক সময় লাগে। আপনাদের পরিচয়…
— অবশ্যই। রাকার দিকে তাকায় মনিকা। রাকা এর ফাঁকে সবার চেহারা খুব ভালো করে দেখে নিয়েছে। এই মুহূর্তে তার বাবার চেহারা ভেসে ওঠে। এদের সাথে তার বাবার চেহারা এত মিল কেন। এরা কারা। মাসুদ ভাই কী এসব জেনেশুনে এখানে পাঠিয়েছেন।
— আমার নাম রাকা। রাকা আহমেদ। জন্ম বিদেশে। বাবার চাকরিসূত্রে বিদেশে বেশি সময় কাটাতে হয়েছে। বাবা বর্তমান অবসরে। বারিধারায় নিজেদের ফ্ল্যাট। বড়ো দু’ভাই। তারা বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। তারা কখনোই বাংলাদেশে আসেননি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াই। মাতৃভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। ইনি হলেন আমার দিদি মনিকা। নামকরা এনজিও কর্ণধার। আমরা বেড়াতে খুব পছন্দ করি বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প তো বটেই। সুযোগ পেলে গ্রামবাংলার পোশাক শাড়ি পরতে ভালো লাগে।
— শুধু কী তাই? আলিফা রাকার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে।
এ বার মনিকা মুখ খোলে।

আরও পড়ুন পরাজিত নাবিক

— যদি অনুমতি দেন বিষয়টি আমি পরিস্কার করতে পারি। কারণ রাকা অনেক কিছু জানেন না। বলতে পারেন ওর পরিবার হতে অনেক কিছু জানানো হয়নি। বেশ কিছু দিন ধরে একই ধরনের স্বপ্ন দেখে আসছে। গতকাল রাতে অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছে। সেই পোশাক আজ পরেছে। কেন পরেছে রাকা ভালে জানেন।
— বলেন কী! সবাই আশ্চর্য হয়ে যায়। এটা কীসের ইঙ্গিত।
নাশতা শেষ করে ড্রইং রুমে গিয়ে বসে। সবাই চুপচাপ। প্রসঙ্গটা আগে কে ওঠাবে। ইতোমধ্যে কফি-চা মর্জিনা রেখে যায় ছোট্ট টেবিলে। রাকার কফিতে অভ্যস্ত। সে কফির পটটা হাতে তুলে নেয়।
মনিকাই প্রথমে কিছু বলার অনুমতি চায়।
— রাকার বাবা স্বপ্নের বিষয়টি জানার পর বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ডা. মাসুদ স্যারের পরামর্শ চায়। আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন, ডা. মাসুদের বাবা ছিলেন রাকার বাবার কলেজ জীবনের বন্ধু। পঁচাত্তরের মানসিক চাপে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তাঁর সহধর্মিণী কাছে আমি বেশ কিছু তথ্য জেনেছি। বলতে পারেন শেকড়ের সন্ধানে।
ছোটো ছেলের স্ত্রী পালটা প্রশ্ন করে,
— তাহলে আমাদের এখানে কেন? আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
আলিফার মনের ভেতরে খটকা লাগছে। রাকা নামের মেয়েটি কে। তার মা এবং রাকার চেহারা একই আদলে। মাকে মেজো ভাবি দেখেছে, কিন্তু ছোটো বউ দেখেনি। মেজো ভাবিসহ দু’ভাই চুপচাপ কেন। তাদের মা এই রঙের শাড়ি-ব্লাউজ পরতেন। এ নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক কথা কাটাকাটি হয়েছে। কিন্তু মাকে কোনো রকমে বুঝানো যায়নি। অতীতের কথা মনে পড়তেই আলিফার মন খারাপ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন লালু

— রাকা, আপনি কেন আজ এ ধরনের শাড়ি-ব্লাউজ পরেছেন?
রাকা কিছু সময় মাথা নিচু করে ভাবতে থাকে।
— দুঃখিত। যেদিন মহিলাকে স্বপ্নে দেখি, তাকে স্মরণে রাখার জন্য শাড়ি-ব্লাউজ পরে থাকি। গত রাতে দেখেছি তাই…
— বাড়িতে যখন শাড়ি পরতেন, তখন আপনার বাবা কিছু বলতেন না?
উৎসুক হয়ে জানতে চায় ছোটো বউ।
— না। কিছু বলতেন না। শুধু একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। জানেন, বাবা আমাকে মা বলে ডেকে থাকেন। এ নিয়ে আমার উর্দুভাষী মম ব্যঙ্গ করতেন। বাবা পাত্তা দিতেন না। অনুগ্রহ করে আপনারা আমাকে রাকা আর তুমি বলে ডাকতে পারেন।

আলিফা বুদ্ধিমতী এবং স্নেহময়ী মহিলা। বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন আলিফা। কেন যেন রাকার প্রতি আর্কষণ বেড়ে যাচ্ছে। এটা কী রক্তের টানে। মেজো ছেলে রাশিদ আহমেদ প্রথম দর্শনে নিজের আবেগকে সংযত রেখে যৎসামান্য কথা বলেছেন। আর ছোটো ছেলে পড়ছেন গোলক ধাঁধায়। অন্য দিকে মেজো বউ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সব রকমের আয়োজন করে যাচ্ছেন। রাকার মনটা খারাপ। গত রাতের স্বপ্ন তাকে আরও আবেগী করে তুলেছে। স্বপ্নটা ছিল ভিন্নতর। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে অনেক সময় কেঁদেছিলেন। মনে হলো তার বুকের ভেতরে পাহাড়সম বেদনা।

আরও পড়ুন একটি মিষ্টি স্বপ্ন

আচ্ছা, স্বপ্নের ঘটনা এদের বললে কী এরা বিশ্বাস করবেন। কিন্তু মনিকাদি এখানে আনার কারণ এখনো কিছু বলেননি। এমনকি মাসুদ ভাইও তেমন কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন, বাংলাদেশ দেখতে ইচ্ছে করে না? যে দেশের সোনার ছেলেরা নিজের বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছে, সেই দেশের গ্রামগুলো কেমন জানতে ইচ্ছে করে না? পথে নামলে পেয়ে যাবে তোমার স্বপ্নে দেখা রাজরানিকে। তোমার সঙ্গী হবেন একজন সাহসী মহিলা। যে কোনো বিপদ-আপদ মোকাবিলা করার সাহস ও ক্ষমতা তার আছে।
আলিফা স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করছে।
— তোমরা যখন আমাদের বাড়িতে পা রাখো, তখনই আমার মেজো ভাই মোবাইল জানায় এবং আসতে বলে।
এখানে একটা কথা গোপন রাখে। সেটা হলো রাকাকে দেখে তার মনে খটকা লাগে। মেজো ভাইয়ের অনুমান যে মিথ্যে নয়; রাকাকে দেখার পর নিশ্চিত হয়েছে।
— এখানে আসার কারণ পরিষ্কার করতে পারো, রাকা।
— আমি কিছু বলতে পারি যদি অনুগ্রহ করে অনুমতি দেন। মনিকা বলে।
— অবশ্যই।
— এখানে মানে এই বাড়িতে এনেছি আপনাদের পরিচিত ডা. মাসুদের মা-র অনুরোধে। তিনি আমাকে বলেছিলেন রাকাকে নিয়ে ফুলঝুড়িতে যেতে পারো। এর বেশি কিছু বলেননি।
— তাহলে সেই রাজরানিকে দেখার জন্য সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে রানির দেশে আগমন?
জোরে শব্দ করে হেসে উঠে আলিফা। পলকহীনভাবে আলিফার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে রাকা।
— দারুণ। আপনার হাসিতে মুক্ত ঝরছে, আর দেখতে রাকার দেখা রাজরানির মতো।
— ঠাট্টা করছেন?
— একদম না।
রাকার পলকহীনভাবে তাকিয়ে আছে।

আরও পড়ুন আড়ালের চোখ

— এই মেয়ে কী দেখছ?
— আপনাকে। আমার বাবা আপনার মতো করে হাসেন। সব সময় নয়। আপনার সামনের দাঁতগুলো যেভাবে বের হয়ে আসে, আমার বাবার দাঁতগুলোও। তাছাড়া…
— তাছাড়া কী?
— না। আজ থাক।
রাকাকে নিয়ে বের হয়ে যায়। একে একে সবগুলো ঘর দেখানো হলো রাকা আর মনিকাকে। এর পিছনের কিছু ইতিহাস বলে। তাদের বাবা এবং ভাই-বোনদের বড়ো হওয়ার গল্প। কিন্তু সবার কথা বললেও বড়ো ভাইয়ের কথা এখন পর্যন্ত কেউ মুখে উচ্চারণ করেনি। অতি পুরাতন একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় সবাই। পুরোনো আমলের দরজায় ঝুলছে মরচে পরা মাঝারি ধরনের তালা।
— এই ঘর সম্পর্ক বাবা তেমন কিছু বলে যাননি। শুধু একটা কাগজে লেখে গেছেন, যদি কেউ কোনো দিন এই ঘরটির খোঁজ-খবর নেয়, তাহলে সেটা তার হবে। মালিকের অপেক্ষায় আছে এই ঘরটি।
— তাহলে তো রহস্যময়।
— বলতে পারো মনিকা। চলো ভেতরে যাওয়া যাক।
ঘরটি টিনের তৈরি। যেটাকে গ্রামবাংলায় বলা হয় চারচালা টিনের ঘর। চারদিকে টিনের বেড়া পুরাতন হয়ে গেছে। ঘরে ডুকতে একটা ভ্যাঁভসা গন্ধ এসে নাকের ভেতরে ঢোকে। মনে হলো অনেক দিন খোলা হয় না। রাকা অজান্তে আলিফার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আলিফা টের পেয়েছে। তার শরীর বিদ্যুৎ চমকানো মতো শিউরে ওঠে। রাকার শরীরে শিহরণ জাগে। এটা কী রক্তের টান। দু’জন চোখাচোখি হয় কিছু সময়।
— আপনাকে কী বলে ডাকব?
চালাক মহিলা এত তাড়াতাড়ি ধরা দিবে না।
— ম্যাডাম বলতে পারো।
রাকা মন খারাপ করল কি-না বুঝা গেল না। এই ঘরের পিছনে যে ইতিহাস আছে তা দুপুর খাবারের পর বলা যাবে।
মনিকা-রাকা একটা বিষয় লক্ষ্য করছে, শুধু এই মহিলা একাই কথা বলে যাচ্ছেন। এরা সবাই ভদ্র এবং মার্জিত। দুপুরে খাবার পর একটু বিশ্রাম, তারপর বিকেলে এই ঘরে বসে চা।

আরও পড়ুন নিঃশব্দে নীড়ে ফেরা-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১১শ পর্ব
১২শ পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

নিঃশব্দে নীড়ে ফেরা ।। ১০ম পর্ব

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল একজন কবি ও কথাসাহিত্যিক। তিনি নিয়মিত 'আমাদের সুজানগর' ওয়েব ম্যাগাজিনে লেখালেখি করেন। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা, তুমি রবে নীরবে, এক কিশোরীর প্রেম, ভোরের কৃষ্ণকলি; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষা; কবিতাগ্রন্থ: জোছনায় রেখে যায় আলো। তিনি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মানিকহাট ইউনিয়নের বোনকোলা গ্রামে তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস একই উপজেলার হাটখালি ইউনিয়নের নুরুদ্দিনপুর গ্রামে।

error: Content is protected !!