-
কপিশ নয়ন (২য় পর্ব)
কপিশ নয়ন (২য় পর্ব) আবু জাফর খান তিন. মজহাব চৌধুরী ওরফে মজু মামা উচ্চ বংশীয় মানুষ। পুরুষ পরম্পরায় তাঁদের আভিজাত্য যেমন ছিল, ধন সম্পদেরও কমতি ছিল না। তাঁর বাবা ব্রিটিশ এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের আমলে পদস্থ পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি ছিলেন কর্মনিষ্ঠ অতি সজ্জন। উদারহস্ত এই পুলিশ কর্মকর্তা দু’হাতে দুঃস্থ মানুষদের দান করতেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অতি সুখের সংসার ছিল তাঁর। ছেলে-মেয়েরা অতিশয় মেধাবী। মজহাব চৌধুরী পাকিস্তান আমলে ম্যাট্রিকুলেশনে রাজশাহী বোর্ডে প্রথম হন। তিনি ইংরেজি বিষয়ে ছিলেন তুখোড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরজিতে অনার্স এবং মাস্টার্স করেন। তাঁর মতো একজন মানুষের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও তিনি হয়ে যান ভবঘুরে ধরনের এক…
-
কপিশ নয়ন (১ম পর্ব)
কপিশ নয়ন (১ম পর্ব) আবু জাফর খান এক. আব্দুর রহিত ব্যাপারী দিঘির পুব পাড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর পাড়ের একখণ্ড জমির দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নানা প্রলোভন দেখিয়েও আজ অবধি মালিককে রাজি করাতে পারেনি। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে নানারূপ কুটিল ফাঁদ পেতেও জমিটি হাতানো সম্ভব হয়নি। সব রকম ফন্দি-ফিকির ব্যর্থ হয়েছে। রহিত ব্যাপারীর মনের কোমল জায়গায় কাঁটার মতো কী যেন খচ করে বেঁধে। ছিয়াত্তর ঊর্ধ্ব এই লোকটির লালসা সীমাহীন। এত করেও এত পেয়েও ভিখিরির মনটি রয়ে গেছে। তারই বা দোষ কী। এ যে পরম্পরাগত প্রবৃত্তি। আব্দুর রহিত ব্যাপারী বাবা কাপড়ের পুঁটলিতে টাকা বেঁধে মাল কেনাবেচার টুকটাক ব্যবসা করত। সেই দিয়ে ১৯৪৭…
-
জোছনা মাখা আলো (শেষ পর্ব)
জোছনা মাখা আলো (শেষ পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল হক সাহেবের পিছনে পিছনে পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে লম্বা বারান্দা। বারান্দায় ডান দিকে পর পর দুটো কামরা। তালা দেয়া। তারপর রান্না ঘর। রান্না ঘরের সামনে ডাইনিং। বাম দিক পুরোটা গ্রিল দিয়ে আটকানো। বেশ বড় উঠোন এবং তারপর বিভিন্ন জাতের ফলজ গাছ। আছে বিভিন্ন জাতের ফুল গাছ। এটা একটা সৌখিন রুচিশীল শিক্ষিত ভদ্রলোকের বাড়ি এতে কোন সন্দেহ নেই। দু’ভাই একে অপরের দিকে তাকায়। আলো বুঝতে পারছে, এ রকম পরিবেশ দেখে মনে খটকা লাগছে দু’ভাইয়ের মনে। —কি, বিশ্বাস হচ্ছে না গ্রামে এ রকম একটা বাড়ি থাকতে পারে? এটা আমার…
-
জোছনা মাখা আলো (৩য় পর্ব)
জোছনা মাখা আলো (৩য় পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল —আরও দুঃখের কথা শুনবেন? —বাবার পরিচিত অনেকেই সেদিন বুকে আশা বেঁধে গিয়েছিলেন এই ভেবে, তাদেরই পরিচিত স্বজন ব্যক্তিবর্গ যাচাই-বাছাই বোর্ডে আছেন। এবার নাম তালিকাভুক্ত হবেই। অনেকে আবার আপসোস করে বললেন এত দিনে কেন নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। কথা শুনলাম। বয়সে ছোট ছিলাম তো অতশত বুঝে উঠতে পারিনি। এখন বুঝি কিসে কি হয়। —বলেন কি? —ঠিকই তাই। পরে শুনেছিলাম ২০০৪ সালে যে তালিকা করা হয়েছিল তাতে বাবার নাম আছে তাই তার নাম বাদ পরেছে। বেশ কিছু দিন পর বুঝতে পারলাম এখানে অন্য খেলা ছিলো। —২০০৪ সালের তালিকা নিয়ে চেষ্টা করেননি? —করিনি আবার।…
-
জোছনা মাখা আলো (২য় পর্ব)
জোছনা মাখা আলো (২য় পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল একটা জিনিস শামিমের চোখে পড়ে ঘরে ঢুকতেই তা হলো, সামনে দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর একটা ছবি টাঙানো এবং তার পাশে একটু নিচে পাঁচজনের একটা গ্রুপ ছবি। তাদের হাতে যুদ্ধকালীন ব্যবহৃত অস্ত্র। কি সুন্দর উজ্জ্বল সাহসী যুবক। এক নজরে শামিম সব দেখে নিয়েছে। ভেতরে হয়ত আরো দু’তিনটি ঘর বা রুম থাকতে পারে। সব মিলে রুচি সম্পন্ন ভদ্র লোকের বাসগৃহ। গ্রামে এ রকম পরিবেশ খুব কমই চোখে পড়ে। দুজন দুটো চেয়ারে বসে পড়ে। ডান দিকে দরজা দিয়ে মুরুব্বি ভেতরে গেলেন। হয়ত তিনি তার মেয়ের অনুমতি নিয়ে ফিরে আসবেন। প্রায় পনের মিনিট পর গায়ের পোশাক…
-
মরিচপোড়া (শেষ পর্ব)
মরিচপোড়া (শেষ পর্ব) সাইফুর রহমান পরদিন সকাল দশটা নাগাদ ময়েজ শেখের বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড। ভূত- তাড়ানি দেখতে জমায়েত হয়েছে প্রায় শ-খানেক লোক। ময়েজ শেখ যে ঘরটায় থাকেন সেই ঘরের বারান্দার চাল ঘেঁষে বিশাল এক নারিকেল গাছ আকাশ ছুঁয়েছে। সেই গাছের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা মিতুজা। একটু দূরে শীতল পাটির উপর জায়নামাজ বিছিয়ে বসেছেন হেকমত কবিরাজ । তার সামনে টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র-একটা বড় কাঁচের বোতল, সরিষার তেল, ধুতরাপাতা, ঝাঁটা, গামছা, ধূপ ও তিনটা রক্তরঙা লম্বা লম্বা শুকনা মরিচ। ছোট একটা মালসায় ধরানো হয়েছে আগুন। জায়নামাজে বসে বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলেন হেকমত কবিরাজ। উপস্থিত মানুষজনদের উদ্দেশ করে তিনি বললেন- আপনাদের…
-
মরিচপোড়া (২য় পর্ব)
মরিচপোড়া (২য় পর্ব) সাইফুর রহমান সন্ধ্যার পরপরই তোমার মা বসলেন ইলিশ মাছ ভাজতে। মাছের সে কী সুগন্ধ। মনে হয় আধমাইল দূর থেকেও সেই মাছের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মাছ তো নয় যেন ননির চাপ কেটে ভাজা হচ্ছে কড়াইয়ে। ইলিশ মাছের গন্ধে ভুরভুর করতে লাগল চারপাশ। সমস্ত বাড়ি ক্রমশ হয়ে উঠল ইলিশময়। তোমার মা নিজেকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারলেন না। এক টুকরো, দু টুকরো করে এক সময় সম্পূর্ণ মাছটিই খেয়ে ফেললেন। কাঁসার বড় থালাটিতে পড়ে রইল শুধু ল্যাজ আর ছোট ছোট দু-এক টুকরো মাছ। হঠাৎ তোমার মায়ের খেয়াল হলো, সর্বনাশ হয়ে গেছে। কোন ফাঁকে তিনি মাছগুলো সব খেয়ে নিয়েছেন বুঝতেও…
-
পাথরে শৈবাল খেলে
পাথরে শৈবাল খেলে খলিফা আশরাফ সিদ্দিকের সাথে দেখা হল বই মেলাতে। বিনতির ভার্সিটিমেট সে। কিন্তু বিনতি সেই সিদ্দিক আর এই সিদ্দিককে মেলাতে পারছে না কিছুতেই। এ যেন অন্য কোন সিদ্দিক। ক্লিন সেভ, জিন্স প্যান্টের সাথে লাল টি সার্ট, চোখে শোভন রিমলেস ফ্রেমের চশমা, ঘাড় অবধি ঝাঁকড়া চুল, একেবারে নিখুঁত পরিপাটি আধুনিক। দারুণ স্মার্ট। সাথে সুন্দরী এক শেতাঙ্গিনী। স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কিনছে। অথচ সে যখন ভার্সিটিতে ফিজিক্সে প্রথম ভর্তি হয়, তখন সবাই ওকে ‘ক্ষাত সিদ্দিক’ বলতো। ওর কথাবার্তা আচরণেও ছিলো প্রচুর গ্রাম্যতা। খুব ধার্মিক ছিল সিদ্দিক। পরকালে অবধারিত ফজিলতের জন্য জীবনে কোনদিন দাড়ি কাটেনি সে। সব সময় মাথায়…
-
সোনালী সকাল (শেষ পর্ব)
সোনালী সকাল (শেষ পর্ব) মোহাম্মাদ শাহ্ আলম এদিকে রবি স্যান্ডেল নিয়ে পথে বের হল। কিন্তু যে পথে বসে মুচিরা জুতো মেরামত করেন, সে পথে তাদের গ্রামের অনেকেই আসা যাওয়া করে। দুশ্চিন্তায় রবির মুখটা হঠাৎ নিস্প্রভ হয়ে গেল। কারণ যেখানে সে জুতাগুলো সারাতে নিয়ে যাবে সেখান থেকে তাদের বাড়ি বেশি দূর নয়। এমন কি সে পথে দিনে দশ বার তাদের বাড়ির প্রত্যেককে যেতে আসতে হয়। আজ তার নির্ঘাত ধরা পরতে হবে। তাই সে পথে এসে দ্রুত তার বেশভূষা পরিবর্তন করল। দু’মিনিটের মধ্যে গন্তব্য স্থলে পৌছে গেল রবি। একজন বলল, _বাবু এদিকে আনুন, খুব ভালো করে সেরে দেব। এটা বলার পর…
-
স্বপ্ন গোধূলি (শেষ পর্ব)
স্বপ্ন গোধূলি (শেষ পর্ব) আবু জাফর খান পাঁচ. ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে মাস ছয়েক হলো মিস অরুশি চৌধুরী মৃত্যুর প্রহর গুণছে। দিন যায়, রাত আসে। একেকটি রাতকে তার কাছে বড় বেশি প্রলম্বিত মনে হয়। রাত কিছুতেই ফুরায় না। যেন থমকে দাঁড়িয়ে থাকে, এগোয়ই না। প্রত্যূষে পুবাকাশ যখন আরক্ত আভা ছড়ায়, ভীষণ ভালো লাগে তার। কারা কর্তৃপক্ষ অরুশিকে জানিয়েছে, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে। অরুশি জানে, উচ্চতর আদালত ফাঁসির আদেশ অনুমোদন করলে অনুমোদনের তারিখ থেকে একুশতম দিন থেকে আটাশতম দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ইতোমধ্যে ষোলোদিন পেরিয়ে গেছে। তার মানে পৃথিবীর আলো বাতাসে…





























