খলিফা আশরাফ জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিপরীত করতলে, কালানলে অহর্নিশ, অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ; গল্পগ্রন্থ: বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি, অগ্নিঝড়া একাত্তুর, একাত্তরের মোমেনা, পাথরে শৈবাল খেলে; ছড়াগ্ৰন্থ: ভুতুড়ে হাওয়া, কাটুশ-কুটুশ।তিনি  ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

  • এখানে-স্নিগ্ধ-সকাল
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    এখানে স্নিগ্ধ সকাল

    এখানে স্নিগ্ধ সকাল খলিফা আশরাফ   লোকটার নাম শ্রী হরিদাস চন্দ্র হালদার। সবাই তাকে হারে হলদার বলেই ডাকে। তাতে সে কিছু মনে করে না। গরীবদের মনে করতে নেই, সবকিছু মেনে নিতে হয়। মৎস্য আহরণ বিক্রয়ই তার পেশা, জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। খুব ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা চলে গেলেন। ভিটেমাটি ছাড়া যে সামান্য জমি আছে, তাতে ২/৩ মাসের খোরাক হয়। তাতে বছর চলে না। বাধ্য হয়েই পৈতৃক মাছ বেচা পেশাতেই যুক্ত হতে হল তাকে। হরিদাস দীর্ঘাঙ্গ, পেটা শরীর। বেশ পৌরুষদীপ্ত। কিন্তু হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে এক সময়ের ফর্সা রং জলে ভিজে, বৃষ্টিতে পুড়ে এখন তামাটে, আগের ঔজ্বল্য আর…

  • পাথরে-শৈবাল-খেলে
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    পাথরে শৈবাল খেলে

    পাথরে শৈবাল খেলে খলিফা আশরাফ   সিদ্দিকের সাথে দেখা হল বই মেলাতে। বিনতির ভার্সিটিমেট সে। কিন্তু বিনতি সেই সিদ্দিক আর এই সিদ্দিককে মেলাতে পারছে না কিছুতেই। এ যেন অন্য কোন সিদ্দিক। ক্লিন সেভ, জিন্স প্যান্টের সাথে লাল টি সার্ট, চোখে শোভন রিমলেস ফ্রেমের চশমা, ঘাড় অবধি ঝাঁকড়া চুল, একেবারে নিখুঁত পরিপাটি আধুনিক। দারুণ স্মার্ট। সাথে সুন্দরী এক শেতাঙ্গিনী। স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কিনছে। অথচ সে যখন ভার্সিটিতে ফিজিক্সে প্রথম ভর্তি হয়, তখন সবাই ওকে ‘ক্ষাত সিদ্দিক’ বলতো। ওর কথাবার্তা আচরণেও ছিলো প্রচুর গ্রাম্যতা। খুব ধার্মিক ছিল সিদ্দিক। পরকালে অবধারিত ফজিলতের জন্য জীবনে কোনদিন দাড়ি কাটেনি সে। সব সময় মাথায়…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-শেষ-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (শেষ পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (শেষ পর্ব) খলিফা আশরাফ   অনিকের অসুস্থতার মধ্যেই মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়ে গেলো। রেকর্ড নম্বর পেয়ে অনিমা ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কিছুদিনের মধ্যেই ভার্সিটির ডাক পেলো শিক্ষকতার জন্য। যোগদান করলো সে। কিন্তু এই অর্জনে তাঁর কোন উচ্ছ্বাস নেই, বরং সারাক্ষণ অন্তর্দহনে পুড়ছিলো অনিমা। তার সঙ্গে আর এক সহপাঠী, যে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছে, অনিক থাকলে সেই-ই আসতো সেখানে। প্রতি মুহূর্তে অনিকের শূন্যতা কুরে কুরে খায় তাকে। বাবা বারবার বিয়ের কথা বললেও উচ্চতর ডিগ্রীর অজুহাতে এড়িয়ে যায় সে। সে ভালো করেই জানে, তাঁর হৃদয়ে অনিকের জন্য যে জায়গা, অন্য কাউকে দিয়েই তা পূর্ণ হবে না। হয়তো আজীবন এই শুন্যতাই বয়ে বেড়াতে…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-৩য়-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (৩য় পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (৩য় পর্ব) খলিফা আশরাফ   সেদিন লাইব্রেরীতে বসে নোট করছিলো অনিমা। হঠাৎ অনিক এসে পাশে বসলো। অবিন্যস্ত চুল, উসকোখুসকো চেহারা, পারিপাট্যহীন পোশাক, কেমন যেন অচেনা লাগছে তাকে। চোখে মুখে অযাচিত অস্থিরতা। তার দিকে তাকিয়ে অনিক বললো, “তুমি কি আমাকে একটু সময় দিতে পারো অনিমা?’ তার কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ছে। বই খাতা বন্ধ করলো অনিমা। ‘বলো’। “এখানে নয় অনিমা, চলো গাছের ছায়ায় বসি।’ অনিমার বাম হাতটা ধরল অনিক। এমন অস্থির অগোছালো অনিককে আগে কখনো দেখেনি সে। ওকে এমন দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিলো তার। অনিমা উঠে দাঁড়ালো। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, “চলো’। অপেক্ষাকৃত একটু নির্জন জায়গায় বসলো তারা। কিছুক্ষণ…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-২য়-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব) খলিফা আশরাফ   চিঠিটা পড়ে অনেক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো অনিমা। হায়রে ভালোবাসা! সেও যে তিলে তিলে কখন অনিকের নিবিড় ভালবাসায় বাঁধা পড়েছে, তাই-ই কি সে বলতে পেরেছে? অনিকের ভালোবাসা প্রতিটি প্রহর তাকে জড়িয়েছে অচ্ছেদ্য করে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেনি অনিমা। অতীত তাকে বারবার টেনে ধরেছে, বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও সেই অতীত দুর্লঙ্ঘ পাহাড় হয়ে দণ্ডায়মান। কি করে বলবে সে, ‘একাত্তরের নভেম্বরের এক রাতে, যখন তার মায়ের গর্ভে মাত্র তিন মাস বয়স তার, তার বাবাকে বেঁধে তার সন্মুখেই এক পাঞ্জাবী পাকি অফিসার মাকে ধর্ষণ করেছিলো। সে রাতেই মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পেটের সন্তানের দোহাই…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-১ম-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (১ম পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (১ম পর্ব) খলিফা আশরাফ   বিকেলের কফি হাতে বারান্দায় বসেছে অনিমা। সপ্তাহ দুয়েক আগে PhD সেরে আবার ভার্সিটিতে যোগদান করেছে সে। বাসায় দূর সম্পর্কের এক খালা আর একটা ছোট কাজের মেয়ে থাকে তার সঙ্গে। ভার্সিটির একই বিল্ডিংয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষক থাকেন। অনিমা থাকে তিন তলায়। কোলাহলমুক্ত ছিমছাম এলাকা। বিকেলে বারান্দায় বসে কফি খেতে বেশ ভালোই লাগে। হঠাৎ একটা ইগড গাড়ি এসে নিচে দাঁড়ালো। ড্রাইভার ত্বরিত দরজা খুলে দিতেই একজন সৌমশ্রী প্রোঢ় ভদ্রলোক নামলেন। অনিমা জানে, তার কোন গেস্ট আসার কথা নয়। কফিতে চুমুক দিলো সে। কিন্তু বেল বাজছে তার ফ্লাটেই। এগিয়ে গেলো অনিমা। কাজের মেয়েটা দরজা খুলে…

  • একজন-অনন্যা
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    একজন অনন্যা

    একজন অনন্যা খলিফা আশরাফ   মেয়েটার নাম অনন্যা। দারুণ চটপটে, সপ্রতিভ। কথা বলা যে একটা শিল্প, তা সে ভালো করেই জানে। একসময় চুটিয়ে মঞ্চনাটক করতো, গান গাইতো, আবৃত্তিতেও পারঙ্গমতা আছে তার। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই বিস্তর বর্ধন। এইসব করতে করতেই কখন যেন লগ্নটা হাতছাড়া হয়ে গেছে, বিয়ে করাটা আর হয়ে ওঠেনি। আমার ধারনা অবশ্য ভিন্ন। হৃদয় তন্ত্রীর তার একবার ছিড়ে গেলে তা আর সহজে জোড়া লাগানো যায় না। সবচেয়ে দুর্বহ ভালোবাসার আঘাত। অনেকে সে আঘাত সইতেও পারে না। মতিচ্ছন্ন, বেপথু হয়, কেউবা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আবার কেউ সব যন্ত্রনা হজম করে নীলকণ্ঠ হয়। ভেতরটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়, কিন্তু বাইরে…

  • মুক্তিযোদ্ধার-মৃত্যু-নেই
    কবিতা,  খলিফা আশরাফ,  সাহিত্য

    মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু নেই, একাত্তুরের অব্যর্থ-ট্রিগার

    মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু নেই খলিফা আশরাফ   কিছু কিছু তারুণ্যের মৃত্যু নেই কোন, বাড়ে না বয়স জীবনকে অকম্পিত যে ধরেছে অগ্নিশিখায় নিশ্চিত মৃত্যু মুখে দাঁড়িয়েছে সটান অনড় অকুতোভয় দিয়েছে পাল্লা সিংহের সাথে আঙ্গুলের ফলায় তুলেছে হায়েনার চোখ তাকে আর মৃত্যুভয়ে যাবে না দমানো বিনাশের আদ্যপান্ত বিলক্ষণ জানা আছে তার, মনে রেখো, জীবনকে জিতেছে সে মরনের মাঝে একাত্তুরের রণাঙ্গনে যে খেলেছে অজস্র মৃত্যুখেলা বেয়োনেটের অগ্রভাগে বেঁধেছে যে পরমায়ু সুতো গ্রেনেডের ছত্রিশ টুকরো আকণ্ঠ নিয়েছে তুলে স্টেনগানের ফুটোয় ফুটোয় দিয়েছে ফুঁৎকার মর্টারের গোলার সাথে করেছে দোস্তি আমরণ যমদূতের কণ্ঠ চেপে লক্ষ লাশের মাঝে অকুতোভয় দীপ্র হাতে উড়িয়েছে বিজয় কেতন মরনের কথা তারে শুনিওনা…

  • বিষণ্ন-বাসন্তী-বাংলা
    কবিতা,  খলিফা আশরাফ,  সাহিত্য

    বিষণ্ন বাসন্তী বাংলা

    বিষণ্ন বাসন্তী বাংলা খলিফা আশরাফ   তোমাকে পসরা সাজিয়ে তুখোড় দোকানীর মতো বানিয়ে মূলধন আজকাল চলছে ব্যবসা চুটিয়ে, ময়দানে মাঠে পরিপাটি আলোচনা টেবিলে কিম্বা ধুমায়িত চায়ের কাপে তোমার মুখে ঠোঁট রেখে ফুটাচ্ছে খই হামেশাই কুশলী কারিগর সব। হায়রে বাংলাদেশ এখন তোমাকে নিয়ে বাহারী প্রদর্শনী, গিলে করা পাঞ্জাবী পাট করা চাদর আর শোভন চশমার কাঁচে অহরহ তোমার বাসন্তী ছবি উৎকীর্ণ করে কপট দেশপ্রেমের জোয়ার বয়ে যায়, অনায়াসে কেউ কেউ তোমার দেহে মৌরসি পাট্টার কায়েমী দখল জাহির করে, আবার কেউবা তোমার জন্ম-লগ্নে ধাত্রীর অধিকারে দুর্লঙ্ঘ স্বত্ত্বের কথা বলে, অতঃপর সেই সব দুরাচারী ব্যবসায়ী সব সুবর্ণ কাসকেটে অপরূপ সাজিয়ে তোমায় নিলামের বাজারে উঠায়,…

  • এসেছি-স্বাধীনতা-সাথে-করে
    কবিতা,  খলিফা আশরাফ,  সাহিত্য

    এসেছি স্বাধীনতা সাথে করে, তখন মানুষ মানুষ ছিলো না

    এসেছি স্বাধীনতা সাথে করে খলিফা আশরাফ   আদিগন্ত প্লাবিত রক্তজল মাড়িয়ে  তুমি যখন দাঁড়ালে সন্মুখে,  তখন তোমার প্রদীপ্ত চোখে  কনকোজ্জ্বল আনন্দ-জ্যোতি খেলা করছে,  স্থির অচঞ্চল তুমি গভীর প্রত্যয়ে,   তোমার হাতে মুখে সমস্ত শরীরে রক্তের আলপনা  সার্টে, লুঙ্গিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লালের জমাট কারুণ্য,  মাংস ভেদ করা গুলির ক্ষত চিহ্ন তোমার দক্ষিণ বাহুতে  আরক্ত কানের ছেঁড়া লতিটা অসহায় দুলছে উত্তাল হাওয়ায়,  তোমার দু’পা বেয়ে তখনও রক্তের ঝর্ণা-ধারা,  অথচ কি আশ্চর্য  রক্তস্নাত মুখে তখনও তুমি অবলীলায় হাসছো অমলিন।   তোমার শরীরে হাজার বছরের সৌরভময় পলিমাটির ঘ্রণ  শর্ষে ফুলের সুবর্ণ রেনু দ্যুতি ছড়াচ্ছে চোখের পাতায়  প্রশস্ত কপালে শ্যামল বাংলার অপার নিসর্গঅটুট প্রোজ্জ্বল,  তোমার রক্ত-ক্লিষ্ট…

error: Content is protected !!