খলিফা আশরাফ জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিপরীত করতলে, কালানলে অহর্নিশ, অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ; গল্পগ্রন্থ: বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি, অগ্নিঝড়া একাত্তুর, একাত্তরের মোমেনা, পাথরে শৈবাল খেলে; ছড়াগ্ৰন্থ: ভুতুড়ে হাওয়া, কাটুশ-কুটুশ। তিনি  ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

  • অন্ধকারে-জ্বলে-দীপশিখা-২য়-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (২য় পর্ব)

    অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (২য় পর্ব) খলিফা আশরাফ   পরদিন সকালেই জজ কোর্টে ছুটলো শকুর আলি। মাস দেড়েক পরে কোর্ট থেকে মতিন মেম্বারের নামে DNA টেস্টের জন্য সমন জারি হল, সিভিল সার্জনকে দুই মাসে মধ্যে DNA টেস্টের রিপোর্ট দাখিল করতে নির্দেশ দিলো কোর্ট। কোর্টের সমন এলাকায় একেবারে হৈচৈ ফেলে দিলো। অনেক দিনের পুরনো প্রায় মৃত বিষয় আবার আলোচনার প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ালো। মতিন মিয়া মুখে এটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলেও মনের কছে সঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তিনি চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে শহরের সবচেয়ে বড় উকিলের কাছে গেলেন। তাঁর পরামর্শেই urgent fee দিয়ে আর্জির নকল তুললেন। উকিল সাহেব মনোযোগ দিয়ে আর্জিটা পড়লেন। তারপর…

  • অন্ধকারে-জ্বলে-দীপশিখা-১ম-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (১ম পর্ব)

    অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (১ম পর্ব) খলিফা আশরাফ   তার নাম শুকুর আলি। দশাসই শরীর। ছয় ফুটের মতো লম্বা। মেধহীন পেটা শরীর। প্রচণ্ড শক্তি গায়ে। ২৭/২৮ বছর বয়স। নিতান্তই গরীব। নাজিরগঞ্জ বাজারে পাটের কুটিতে কুলির কাজ করে সে। তাদের কাজ হচ্ছে পাটের বেল কুটি থেকে নৌকায় তুলে দেয়া। এক একটা বেলের ওজন তিন মণ সাড়ে তিন মণ। বহনকৃত বেল গুনে মজুরী। এ সব ভারী বেল অনায়াসে বহন করে সে। অন্য কুলিদের মাঝেমধ্যেই জিরিয়ে নিতে হয়, কিন্তু শুকুর আলি একটানা কাজ করে। কোন কুলি তাৎক্ষণিক কোন সমস্যায় পড়লে তার কাজটাও করে দেয় সে। সবাই ভালোবাসে তাকে। তার সহমর্মিতা আর শারীরিক শক্তির কারণেই…

  • দূরবর্তী-তুমি-একাত্তর
    কবিতা,  খলিফা আশরাফ,  সাহিত্য

    দূরবর্তী তুমি একাত্তর

    দূরবর্তী তুমি একাত্তর খলিফা আশরাফ তোমাকে এখন আর ছুঁতেই পারি না একাত্তর আমার নাগাল থেকে ক্রমাগত দূরবর্তী তুমি শপথের পাঠ ভুলে আজ আমি হয়েছি পাতক লজ্জায় অতি সংকুচিত কত আর উচ্চতায় যেতে পারি আমি? বামনের হাত আমার পারে না স্পন্দিত-স্পর্শ করতে বিপুল অবয়ব তোমার কেবলই ফিরে আসি ব্যর্থতার গ্লানিতে ভেসে ভেসে, আমার অস্তিত্বের সাথে প্রাণময় বাঁধা আছো তুমি সেই কবে থেকে তোমার মুক্তিলগ্নে অগ্নিঝরা রণাঙ্গন হতে, তখন স্থির প্রতিজ্ঞায় প্রত্যেয়ী কথা ছিলো স্বাধীনতা-স্বাদ আদিগন্ত প্রতিঘরে পৌঁছে দেবো সোনার বাংলার প্রশান্ত সৌরভ সহাস্য বিলাবো চৌদিকে, ধানের মৌ মৌ ঘ্রানে জুড়াবে কিষাণের প্রাণ সৌভাগ্যের অমল হাসি উৎকীর্ণ হবে শ্রমিকের ঠোঁটে মেহনতি মানুষের…

  • চাইনি-এমন-স্বদেশ
    কবিতা,  খলিফা আশরাফ,  সাহিত্য

    চাইনি এমন স্বদেশ

    চাইনি এমন স্বদেশ খলিফা আশরাফ   চাইনি কষ্ট-দগ্ধ এমন স্বদেশ আমি রক্তে ভেজা তপ্ত জন্মভূমি পাপাচারীর চাকায় পিষ্ট ধর্ষিত শান্তি অনাবিল ঘাতকের উন্মত্ততা খণ্ডিত শবদেহের নিলাজ মিছিল, চাইনি এমন দেশ সাধের আবাস তপ্ত উনুন গনগনে লাভা দুর্বহ পোড়ায়, ঝরায় নিত্য খুন যেখানে ঘাতক দুর্জন কর্তা অধিশ্বর তাদের নির্দেশে ওঠা-নামা করে বৈরী সময়-স্বর, চাইনি এমন দেশ সবিশেষ মিথ্যার কারুকাজ সত্য নির্বাসনে, অসত্যই চালায় তক্ততাজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গলিত-গন্ধ বিষবাস্প ছড়ায় অষ্ট প্রহর কাটে দুঃসহ যাতনায়, চাইনি এমন দেশ যেখানে মৃত্যু অঝোর ধারায় নামে দিবস মধ্যযামে যেখানে অসুর বেসুরে সুরের ভনিতা করে করতালি আর অশেষ সমাদরে যেখানে পাদ্রী পুরোহিত ভিক্ষু মৌলানা নির্বিকারে…

  • এখানে-স্নিগ্ধ-সকাল
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    এখানে স্নিগ্ধ সকাল

    এখানে স্নিগ্ধ সকাল খলিফা আশরাফ   লোকটার নাম শ্রী হরিদাস চন্দ্র হালদার। সবাই তাকে হারে হলদার বলেই ডাকে। তাতে সে কিছু মনে করে না। গরীবদের মনে করতে নেই, সবকিছু মেনে নিতে হয়। মৎস্য আহরণ বিক্রয়ই তার পেশা, জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। খুব ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা চলে গেলেন। ভিটেমাটি ছাড়া যে সামান্য জমি আছে, তাতে ২/৩ মাসের খোরাক হয়। তাতে বছর চলে না। বাধ্য হয়েই পৈতৃক মাছ বেচা পেশাতেই যুক্ত হতে হল তাকে। হরিদাস দীর্ঘাঙ্গ, পেটা শরীর। বেশ পৌরুষদীপ্ত। কিন্তু হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে এক সময়ের ফর্সা রং জলে ভিজে, বৃষ্টিতে পুড়ে এখন তামাটে, আগের ঔজ্বল্য আর…

  • পাথরে-শৈবাল-খেলে
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    পাথরে শৈবাল খেলে

    পাথরে শৈবাল খেলে খলিফা আশরাফ   সিদ্দিকের সাথে দেখা হল বই মেলাতে। বিনতির ভার্সিটিমেট সে। কিন্তু বিনতি সেই সিদ্দিক আর এই সিদ্দিককে মেলাতে পারছে না কিছুতেই। এ যেন অন্য কোন সিদ্দিক। ক্লিন সেভ, জিন্স প্যান্টের সাথে লাল টি সার্ট, চোখে শোভন রিমলেস ফ্রেমের চশমা, ঘাড় অবধি ঝাঁকড়া চুল, একেবারে নিখুঁত পরিপাটি আধুনিক। দারুণ স্মার্ট। সাথে সুন্দরী এক শেতাঙ্গিনী। স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কিনছে। অথচ সে যখন ভার্সিটিতে ফিজিক্সে প্রথম ভর্তি হয়, তখন সবাই ওকে ‘ক্ষাত সিদ্দিক’ বলতো। ওর কথাবার্তা আচরণেও ছিলো প্রচুর গ্রাম্যতা। খুব ধার্মিক ছিল সিদ্দিক। পরকালে অবধারিত ফজিলতের জন্য জীবনে কোনদিন দাড়ি কাটেনি সে। সব সময় মাথায়…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-শেষ-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (শেষ পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (শেষ পর্ব) খলিফা আশরাফ   অনিকের অসুস্থতার মধ্যেই মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়ে গেলো। রেকর্ড নম্বর পেয়ে অনিমা ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কিছুদিনের মধ্যেই ভার্সিটির ডাক পেলো শিক্ষকতার জন্য। যোগদান করলো সে। কিন্তু এই অর্জনে তাঁর কোন উচ্ছ্বাস নেই, বরং সারাক্ষণ অন্তর্দহনে পুড়ছিলো অনিমা। তার সঙ্গে আর এক সহপাঠী, যে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছে, অনিক থাকলে সেই-ই আসতো সেখানে। প্রতি মুহূর্তে অনিকের শূন্যতা কুরে কুরে খায় তাকে। বাবা বারবার বিয়ের কথা বললেও উচ্চতর ডিগ্রীর অজুহাতে এড়িয়ে যায় সে। সে ভালো করেই জানে, তাঁর হৃদয়ে অনিকের জন্য যে জায়গা, অন্য কাউকে দিয়েই তা পূর্ণ হবে না। হয়তো আজীবন এই শুন্যতাই বয়ে বেড়াতে…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-৩য়-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (৩য় পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (৩য় পর্ব) খলিফা আশরাফ   সেদিন লাইব্রেরীতে বসে নোট করছিলো অনিমা। হঠাৎ অনিক এসে পাশে বসলো। অবিন্যস্ত চুল, উসকোখুসকো চেহারা, পারিপাট্যহীন পোশাক, কেমন যেন অচেনা লাগছে তাকে। চোখে মুখে অযাচিত অস্থিরতা। তার দিকে তাকিয়ে অনিক বললো, “তুমি কি আমাকে একটু সময় দিতে পারো অনিমা?’ তার কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ছে। বই খাতা বন্ধ করলো অনিমা। ‘বলো’। “এখানে নয় অনিমা, চলো গাছের ছায়ায় বসি।’ অনিমার বাম হাতটা ধরল অনিক। এমন অস্থির অগোছালো অনিককে আগে কখনো দেখেনি সে। ওকে এমন দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিলো তার। অনিমা উঠে দাঁড়ালো। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, “চলো’। অপেক্ষাকৃত একটু নির্জন জায়গায় বসলো তারা। কিছুক্ষণ…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-২য়-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব) খলিফা আশরাফ   চিঠিটা পড়ে অনেক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো অনিমা। হায়রে ভালোবাসা! সেও যে তিলে তিলে কখন অনিকের নিবিড় ভালবাসায় বাঁধা পড়েছে, তাই-ই কি সে বলতে পেরেছে? অনিকের ভালোবাসা প্রতিটি প্রহর তাকে জড়িয়েছে অচ্ছেদ্য করে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেনি অনিমা। অতীত তাকে বারবার টেনে ধরেছে, বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও সেই অতীত দুর্লঙ্ঘ পাহাড় হয়ে দণ্ডায়মান। কি করে বলবে সে, ‘একাত্তরের নভেম্বরের এক রাতে, যখন তার মায়ের গর্ভে মাত্র তিন মাস বয়স তার, তার বাবাকে বেঁধে তার সন্মুখেই এক পাঞ্জাবী পাকি অফিসার মাকে ধর্ষণ করেছিলো। সে রাতেই মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পেটের সন্তানের দোহাই…

  • রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-১ম-পর্ব
    খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (১ম পর্ব)

    রোদেলা দুপুর কাঁদে (১ম পর্ব) খলিফা আশরাফ   বিকেলের কফি হাতে বারান্দায় বসেছে অনিমা। সপ্তাহ দুয়েক আগে PhD সেরে আবার ভার্সিটিতে যোগদান করেছে সে। বাসায় দূর সম্পর্কের এক খালা আর একটা ছোট কাজের মেয়ে থাকে তার সঙ্গে। ভার্সিটির একই বিল্ডিংয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষক থাকেন। অনিমা থাকে তিন তলায়। কোলাহলমুক্ত ছিমছাম এলাকা। বিকেলে বারান্দায় বসে কফি খেতে বেশ ভালোই লাগে। হঠাৎ একটা ইগড গাড়ি এসে নিচে দাঁড়ালো। ড্রাইভার ত্বরিত দরজা খুলে দিতেই একজন সৌমশ্রী প্রোঢ় ভদ্রলোক নামলেন। অনিমা জানে, তার কোন গেস্ট আসার কথা নয়। কফিতে চুমুক দিলো সে। কিন্তু বেল বাজছে তার ফ্লাটেই। এগিয়ে গেলো অনিমা। কাজের মেয়েটা দরজা খুলে…

error: Content is protected !!