সুতা-ছেঁড়া-ঘুড়ি-৫ম-পর্ব
উপন্যাস,  তাহমিনা খাতুন,  সাহিত্য

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (৫ম পর্ব)

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (৫ম পর্ব)

তাহমিনা খাতুন

 

আট.
নুরুল ইসলামের তিনটি ছেলেমেয়ে। বড়ো ছেলে আতিকুল ইসলাম বটতলা হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। লেখাপড়ায় যেমন মনোযোগী তেমনি বাপের মতো সেবামূলক কাজের প্রতি বেশ আগ্রহ। কারও কোনো বিপদের কথা শুনলে সাহায্যের জন্য ছুটে যায়।
বেশ কিছু দিন ধরে চল্লিশ/বিয়াল্লিশ বছর বয়সের মানসিক রোগগ্রস্থ এক নারী মধ্যপাড়ার নুরুল ইসলামের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলে বলে ‘সুন্দরী’। বাড়ি কোথায়, বাপ মা আছে কিনা কিছুই বলতে পারে না। সারা দিন আপন মনে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকে চেয়ে-চিন্তে খাবার খায়। রাতে নুরুল ইসলামের ঘরের ভিতরের বারান্দায় এসে শুয়ে থাকে। কখনও কখনও কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। নুরুল ইসলামের স্ত্রী সালেহা বেগম দয়াপরবশ হয়ে তাকে কিছু বিছানাপত্র দিয়েছেন ঘুমানোর জন্য। মাঝে মাঝে তাকে ডেকে খাবারও দেন।

শ্রাবণ মাস। দিন দশেক ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি কখনও মুষলধারে। নূরপুরের দক্ষিণের ময়না নদীর পানির কূল উপচে দু’পাশ প্লাবিত করেই ক্ষান্ত হয়নি; গ্রামের পাশের নুড়ি বিছানো রাস্তা উপচিয়ে নূরপুরের উত্তরের কড়ই খালি বিলের পানির সাথে একাকার হয়ে গেছে। বর্ষার ঢলে বন্যা শুরু হয়েছে। ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। গ্রামের দক্ষিণ আর পূর্বপাড়ার গরীব মানুষগুলোর দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। সবার ঘর-বাড়িতেই বন্যার পানি উঠেছে। হাঁস-মুরগি-গোরু-ছাগল নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ চরমে। চরম দরিদ্র পরিবারগুলোর অনেকের নিচু ঘরে বর্ষার পানি ঢুকে ঘরের ভিতরের ঘুমানোর বাঁশের মাচান পর্যন্ত ডুবে গেছে। অনেকে অন্য গ্রামে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পূর্বপাড়ার কয়েকটি পরিবার মধ্যপাড়ার কাজি বাড়ি এবং খোন্দকার বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দুই পরিবারকেই অনেকের দুই বেলার খাবারের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন দীপ্তিদের দেবতা

গত কয়দিন বৃষ্টি হলেও মাঝেমধ্যে রোদের দেখা মিলেছে। গত শেষ রাত থেকে এমন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙে পড়বে। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস। বৃষ্টির ছাঁটে সুন্দরীর বিছানা বালিশ ভিজে যাচ্ছে।
এই দুর্যোগে নুরুল ইসলামের স্ত্রী সালেহা সুন্দরীকে ঘরের ভিতর আসতে বলার জন্য দরজা খুললেন। কিন্তু বারান্দায় সুন্দরী নাই! এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে পাগলিটা কোথায় গেল, ভেবে পেলেন না। কয়েক বার সুন্দরীর নাম ধরে ডাকলেন, সাড়া পেলেন না। গতকাল রাতে মেয়েটি ঘুমানোর জন্য এসেছিল কিনা সেটাও জানেন না। একটু বেলা বাড়লে বৃষ্টি কমে এল। সালেহা বড়ো ছেলে আতিকুলকে ডেকে বললেন,
“দেখ তো বাপ, পাগলি মেয়েটা কোথায় গেল, এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে।”

নূরপুরের দক্ষিণ প্রান্ত ধরে বছর খানেক আগে পাবনা-নগর বাড়ি হাইওয়ে তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। রাস্তা উঁচু করার জন্য রাস্তার পাশ ঘেঁষে মাটি কাটা শুরু করেছে হাইওয়ে নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। ফলে হাইওয়ের পাশেই তৈরি হয়েছে ছোটো বড়ো আকৃতির খাল। এলাকার লোকজন খালগুলোর নাম দিয়েছে নয়ানজুলী।
আতিকুল পরনের লুঙ্গিটাকে মালকোঁচা মেরে ছাতা মাথায় দিয়ে হালট ধরে সুন্দরীর খোঁজে বের হলো। কয়েকদিনের প্রচণ্ড বৃষ্টি হালটের অবস্থা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বহু কষ্টে ইট-সুরকি বিছানো হাইওয়েতে উঠল আতিকুল। আশেপাশে দেখে পূব দিক ধরে এগোতে লাগল। হাইওয়ের ডান পাশে কয়েকটি বাড়ি-ঘর, কাঁচা মাটির ঘরে শনের ছাউনি দেওয়া কয়েকটি দোকান। রাস্তার পাশের মইনুদ্দীন ব্যাপারীর বাঁশের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল সে। উঠানে দাঁড়িয়ে মঈনুদ্দিনের বড়ো ছেলে শোয়েবকে ডাকল। শোয়েব আতিকুলের সমবয়সী। দুজনে একই স্কুলে পড়ে। শোয়েব বেড়িয়ে এলে আতিকুল জিজ্ঞেস করল,
“নাস্তা খেয়েছিস?”
শোয়েব হাঁ সূচক মাথা নাড়াল।

আরও পড়ুন খোয়ার

আতিকুল বলল,
“তাহলে চল একটু আমার সাথে। তুই তো সুন্দরী পাগলীকে চিনিস। ও তো আমাদের বারান্দায়ই ঘুমাত। কাল রাতে ও আর আসেনি। অবশ্য মাঝেমাঝে পাগলিটা আসে না। কাল রাতে এত দুর্যোগ গেছে, তাই মা বললেন সুন্দরীর একটু খবর নিতে।”
শোয়েব ঘর থেকে একটা ফতুয়া এনে গায়ে দিতে দিতেই আতিকুলের পিছন পিছন চলল। হাইওয়ে ধরে এগোতে লাগল দুজনে। আশেপাশের কয়েকটা বাড়িতেও খোঁজ করল। কেউই কোনো সন্ধান দিতে পারল না। প্রায় ঘন্টাখানেক খুঁজে যখন ফিরে আসছে, হঠাৎ শোয়েবের নজর পড়ল পাশের বড়ো নয়ান জুলিটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই দাঁড়িয়ে পড়ল শোয়েব। অস্ফুটে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল ও। শোয়েবের পাশাপাশি হাঁটতে থাকা আতিকুল বলে উঠল,
“কি রে, কি হলো?”
কথা না বলে পাশের নয়ানজুলির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল শোয়েব। কানায় কানায় ভরা নয়ানজুলির কোনায় ভাসছে অভাগী সুন্দরীর মৃত দেহটা।

নয়.
জবা কুসুম মোমিনাকে জোর করে হালিমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে অসহায় হালিমা প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না, তার কি করা উচিত। তবে একটা বিষয় সে পরিষ্কার বুঝতে বুঝতে পেরেছে, তা হল তার আর মেয়েটার জীবন নিয়ে জবা কুসুম যে খেলা শুরু করেছে, তা থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলবে না। কাজেই তাকেও শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়কে রুখে দেওয়ার শক্তি অর্জন করতে হবে।

জলিল মিয়ার বাড়িটি মূল পাড়া থেকে খানিকটা দূরে। চার চালা বড়ো টিনের ঘরটার চার দিকেই আম জাম কাঁঠাল লিচুর বিশাল বিশাল গাছ ঝাঁকড়া ডাল পালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছপালা ছাড়িয়ে খানিকটা দূরে ফাঁকা জায়গায় বাঁশের চাটাইয়ের ঢাকনা দেওয়া চারদিকে সিমেন্টের ঢালাই দেওয়া একটা পাত কুয়া। এই কুয়ার পানি হালিমার দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটানো ছাড়াও পাড়ার অন্যদেরও প্রয়োজন মিটায়।

আরও পড়ুন তবুও ভালোবাসলাম

জবা কুসুম ঘুমন্ত মোমিনাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ কাঁদলো হালিমা। তারপর চোখের পানি মুছে ঘরের কোণে দাঁড় করানো মোটা বাঁশের লাঠিটা শক্ত হাতে ধরে কুয়া পাড়ের গোসল করার জল চৌকিটার উপর বসে বসে চিন্তা করতে থাকল সে। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার যোগাড় করেছে। বসে বসে চিন্তা করতে লাগল কীভাবে জবা কুসুমের খপ্পর থেকে শিশু কন্যাকে উদ্ধার করবে।
জলচৌকিটার উপর সারা রাত জেগে বসে রইল হালিমা। সাথে জেগে থাকল রাত জাগা পাখি, বুনো পেঁচা, মাঝে মাঝে ছুটে গেল বুনো খরগোশ। দূরে শোনা গেল শিয়ালের হুক্কাহুয়া। রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। সারা রাত পাত কুয়ার পারে বসে কাটিয়েছে সে। একটা চিন্তাই কুরে কুরে খেয়েছে, বাচ্চাটাকে কখন নিজের বুকে ফিরে পাবে।
একটু পরে গ্রামের মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এল।
আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম (নিদ্রার চেয়ে নামাজ উত্তম)।

আরও খানিকটা সময় অপেক্ষা করল পুরোপুরি সকাল হওয়ার জন্য। এরপর ত্রস্ত হরিণীর মতো ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। পাশের গ্রাম নন্দী গ্রামে জবা কুসুমের শ্বশুর বাড়ি। বিয়ের পর মোমিনার জন্মের আগে দুই একবার জবা কুসুমের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গেছে। তখন গোরুর গাড়ি অথবা নৌকায় গিয়েছিল নন্দী গ্রামে। তারপরও হালিমা নন্দী গ্রামের রাস্তা চিনতে ভুল করেনি।
মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন আগুন কিংবা পানিতে ঝাঁপ দিতেও দ্বিধা করে না।
বুকের মানিককে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে জবা কুসুম। রাতের অন্ধকারে অজানা বিপদের আশঙ্কায় ঘরের বাইরে পা দেয়নি। ভোরের আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথেই কোনো কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে শিশুকন্যাকে ফিরে পাওয়ার আশায় ঘরের বাইরে পা রেখেছে।
শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে ছুটে চলল হালিমা। হালের গোরু, লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে গ্রামের কৃষক সবে মাঠে বের হয়েছে। এত সকালে একজন কূল বধুকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যেতে দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইল তারা।

আরও পড়ুন ভাঙা গড়ার টান

জবা কুসুমের ঘরের দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতে দিতে জবা কুসুমকে ডাকতে লাগল হালিমা।
“বু’জান দরজা খোলেন। আমার বাচ্চাকে ফেরত দেন দয়া করে। আমার বাচ্চাকে ফেরত না নিয়ে আমি আপনার দরজা থেকে ফেরত যাব না কিছুতেই।”
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আর হালিমার কান্না কাটিতে ঘুম ভেঙে গেল জালাল মিয়ার। চোখ ডলতে ডলতে উঠে এসে দরজা খুলে অবাক হলেন।
“কি ব্যাপার হালিমা? তুমি এত সকালে? কাঁদছো কেন? কি হয়েছে?”
ততক্ষণে জবা কুসুমও জালাল মিয়ার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হালিমা ছুটে গিয়ে জবা কুসুমের দুই হাত জড়িয়ে ধরল।
“বু’জান আমার বাচ্চাকে ফেরত দেন। ও এখনও বুকের দুধ খায়। আপনার দুটি পায়ে পড়ি এতটা নিষ্ঠুর হবেন না। আমার মেয়েটাকে দিয়ে দেন।”
জালাল মিয়া জবা কুসুমকে বলল,
“তুমি না বললে, মোমিনাকে আজ রাতে তোমার কাছে রাখার জন্য নিয়ে এসেছ? এখন কি শুনছি এসব? তুমি এতটা অমানুষ হতে পারলে কি করে? একটা দুধের শিশুকে নিয়ে খেলা শুরু করেছো?”
বলে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত মোমিনাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন জালাল মিয়া। মোমিনাকে হালিমার কোলে তুলে দিলেন। জবা কুসুম অপরাধীর ভঙ্গিতে বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন সুরেন বাবু

হালিমা এগিয়ে গেল তার দিকে। বলল,
“বু’জান আমার ঘরের চাবিটা দেন। না হলে তো বাচ্চাকে নিয়ে আমি ঘরে ঢুকতে পারব না।”
জালাল মিয়া এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার ঘরে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে এসেছে? তুমি তাহলে সারা রাত কোথায় ছিলে?”
“ভাই জান, আমি পাত কুয়ার পারে বসে ছিলাম সারা রাত। ভোর হতেই আপনার বাড়িতে ছুটে এসেছি।”
জালাল মিয়া জবা কুসুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন,
“তুমি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারলে কি করে? বাচ্চা একটা মেয়ে, মাত্র তিন দিন আগে স্বামীকে হারিয়েছে। তোমার চেয়ে বয়সে কত ছোটো। তোমার একমাত্র ভাইয়ের স্ত্রী। আমি ভাবতে পারছি না। এত ছোটো মনের স্ত্রীকে নিয়ে আমি সংসার করছি। তার দুধের শিশুকে কেড়ে এনেছ! আজ তোমার বাচ্চাকে কেউ কেড়ে নিলে তোমার কেমন লাগত? এক্ষুনি হালিমার ঘরের চাবি দাও। আর কোনো দিন যেন তুমি হালিমার বাড়ির আঙ্গিনায় পা না দাও। এই তোমাকে শেষ বারের মতো বলে রাখলাম।”
কোনো কথা না বলে কোমরে গোঁজা চাবির গোছা বের করে জালাল মিয়ার হাতে তুলে দিল। জালাল মিয়া নিজের গারোয়ান মঙ্গলকে ডেকে বললেন, মোমিনাসহ হালিমাকে তার বাড়ি পৌঁছে দিতে।

আরও পড়ুন সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি-   
১ম পর্ব
২য় পর্ব 
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ম পর্ব
১১তম পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (৫ম পর্ব)

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১লা মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!