লালু-শেষ-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

লালু (শেষ পর্ব)

লালু (শেষ পর্ব)
এ কে আজাদ দুলাল

 

এবার সবাই নড়ে-চড়ে বসলো। কি এমন নিয়ত। পলি হঠাৎ চেয়ে দেখে তার স্বামী পাশে নেই। কিন্তু কেন? ও তো বলে যায়। একটু আগে গিয়েছিল তখন বলে গিয়েছিল। শ্বাশুড়ি মা যা বলবেন সেটা কি ওর কোন জমে থাকা মানসিক যন্ত্রণা? বুদ্ধিমতী স্ত্রী পলি তা বুঝতে পেরেছে, তাই চুপচাপ শাশুড়ির কথা শুনে যাচ্ছে।

__তোমাদের বাবার নিয়তের কথা শুনে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এমন একটা নিয়ত যা থেকে পেছন ফেরার কোন সুযোগ নেই। আমি যে মা। মা হয়ে কেমন করে অনুমতি দেই। কিন্তু উপায় ছিল না।
__বাবার কি এমন নিয়ত ছিল যে আপনি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন, জানতে চাইল বড় বৌ পলি।
__বৌমা, সেটাই তো আমি সারাজীবন বয়ে চলেছি। আজ তা বলে হালকা হতে চাই। আর বড় খোকাকে তার মানসিক কষ্ট হতে মুক্তি পাক। লালুর বয়স তখন সাত-আট বছর হবে। মাসখানেক পর কোরবানী ইদ। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর নিরালয় আমাকে ডেকে বলো, একটা কথা আছে। বললাম বলো।
__কথাটা শুনে তুমি রাজী হবে না কিন্তু আমি যে সেই আট বছর আগে নিয়ত করে রেখেছি।
চিন্তায় পড়ে গেলাম। কি এমন নিয়ত করে রেখেছে আট বছর পর মনে হলো। একটু শ্লেষ সুরে বললাম,

__কি তোমার নিয়ত আগে শুন? ভণিতা রেখে আসল কথা বলো।
__শোন। লালু যখন জন্ম নেয়, ওকে দেখেই মনে মনে নিয়ত বেধে ফেলাম। লালুকে দিয়ে ঘর-সংসারের কোন কাজকর্ম করাবো না।
__বেশ তো ভাল, তা এখন করতে চাও?

__হুজুর বলেছেন মায়া-মমতা দিয়ে নিজ হাতে লালন-পালন করে সেই পশু কোরবানী দিলে অনেক বেশি সওয়াব।

 

আরও পড়ুন গল্প ওরা তেরোজন

 

__তোমরা বিশ্বাস করো, সেই দিন লালুকে কোরবানী দেয়ার কথা আমার কানে ঢোকা মাত্র মনে হলো, আমার কলিজায় কে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কোন জবাব না দিয়ে বিছানায় শুয়ে সারা রাত ধরে কেঁদেছি। মনে হলো আমার বড় খোকা আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লালু তো একটা বোবা জন্তু। কিন্তু ওর অনুভূতি আছে। আমি মা হয়ে অনুভব করতাম। কেন যেন মনে হতো ও আমার একটা সন্তান। বড় খোকার কি হবে। একজন তো আল্লাহর নামে কোরবানী হবে কিন্তু আমার বড় খোকা? বৌমা, তোমরা দু’জন আর আমার মেয়ে ছোটন তোমরা তো মা হয়েছে। বলো, কি তোমাদের জবাব?

সবাই চেয়ে দেখে তিনজনই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

__আমি না এখন কাঁদতে ভুলে গেছি। আমাদের তিন ভাই আর দুই বোনের নিয়ে সুখে শান্তিতে চলছিল সংসার। বাবা গৃহস্থ মানুষ ছিলেন। বড় ভাইয়ের বয়স তখন বার-তের বছর। আর ছোট ভাইয়ের বয়স বছর দেড়েক। বাবার বয়স চল্লিশের মত হবে। সত্তরের নির্বাচন। সারা দেশে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। আমার অর্ধশিক্ষিত বাবা সারা দিন নৌকা নিয়ে হইচই করে রাতে বাড়িতে ফিরতেন। এ নিয়ে বাবার সাথে মার মনোমালিন্য হতো। নির্বাচন হলো। বাবার নৌকা জিতল। কি যে খুশি! আমাদের সবাইকে নিয়ে আনন্দ মিছিল করেছিল। আমাদের এলাকায় বেশ কিছু মুসলিম লীগ, জামায়াত ইসলামী দলের সমর্থক লোকজন ছিল। তারা বিষয়টি ভাল চোখে দেখেনি। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। বাবা শুধু তার অসহায় পরিবারের কথা ভেবে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি। কিন্তু তাই বলে ঘরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন, তাই কি হয়? গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করতে শুরু করলেন।

 

আরও পড়ুন গল্প মামৃত্যু

 

কত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি। কি তরতাজা যুবক। মা ওদের জড়িয়ে ধরে কত কেঁদেছে। কোন মার বুকের ধন। তাদের কিন্তু মা চিনতো না। মা তো মা’ই। সকল মায়ের হৃদয় একই মমতা দিয়ে তৈরি। পার্থক্য মানুষ তার উপলব্ধি দিয়ে অনুভব করে। কিন্তু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে অশনি সংকেত। ভাবতেই পারি নি আমরা অকালে পিতৃহারা হবো। আর আমাদের মা অল্প বয়সে বিধবা হবে। রাজাকারের  রাতের আঁধারে বাবাকে ধরে নিয়ে গ্রাম থেকে তিন মাইল দূরে একটা খালের ধারে হত্যা করে ফেলে রেখোছিল। বাবার সাথে আরো অনেকে ছিল। আমাদের দুর্দিন গেছে। কিন্তু শত বাধা বিপত্তির মধ্যে থেকেও আমাদের পরিবার বঙ্গবন্ধুকে ভুলেনি। দেখেছি মুহুর্ত্বের মধ্যে মত বদলিয়ে অন্য পার্টিতে যোগদান। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর এলাকার রাজাকাররা জেগে উঠলো আর তাদের সাথে যোগ দিল সুবিধাবাদী একশ্রেণি লোভী পাতি নেতা।

__মেজ বৌমা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া মেয়ে। সে আমাকে ইতিহাস বলেছে। তার মুখে শুনেছি বঙ্গবন্ধুর হত্যা। ছোট রাসেলকে বাঁচতে দেয়নি।
আম্মা আপনি এত ইতিহাস কেমন করে জানলেন?
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললেন,
__মা-রে। কিছু ঘটনা তো আমাদের জীবনে ঘটেছে। আর বাকী তো দেখে আসছি। দেখ দেখি লালুর কথা বলতে কত ইতিহাস বললাম।
__আম্মা। আপনি জীবন্ত ইতিহাস। আপনার মত করে কেউ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেনি। শুধু ফায়দা লুটতে চায়, এখনও লুটে চলেছে। জামাই হাসান আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললো।

__আর একটা গোপন কথা আজ আমার দুই বৌ মা এবং এক মাত্র জামাইকে বলছি। তোমাদের শ্বশুর সাহেবকে আগেই বলে রেখেছিলাম আমার ছেলে-মেয়ের আজীবন স্বাধীনতা বিরোধী কোন পরিবারের ঘরে বিয়ে হবে না।
তিনি কথা রেখেছেন এবং সে ক্ষেত্রে আমার জয় হয়েছে।

 

আরও পড়ুন অশরীরী আত্মা

 

__যাইহোক, তারপর আর কি করবো। নিয়ত তো করেছে আট বছর আগে। এখন লালুর সঠিক বয়স। অসীম শক্তির অধিকারী। নিখুত শরীর। পরিবারের ভালবাসায় বড় হয়েছিল। বেয়াড়াপনা করলেও বড় খোকার জন্য লালুর গায়ে আঁচর পড়তে পারে নি। তার চাল-চলন ছিল বাদশাই। সব রকম খাবার তার পছন্দ হতো না। কত ঘটনা বড় খোকা আর লালুকে নিয়ে। কতকাল হয়ে গেল। সবাই ভুলে গেছে কিন্তু আমার বড় খোকা এতদিনেও ভুলে থাকতে পারেনি। সে তো বাবা। তাই ছেলে-মেয়েদের বঞ্চিত করতে চায়নি বলেই এবার রাজী হয়েছে। তোমাদের বাবা যে দুঃখ পাননি, তা নয়। ধর্মের খাতিরে মেনে নিতে হয়েছিল।

 

রাত ধীরে ধীরে গাঢ় অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চারিদিকে নিস্তবদ্ধতা বিরাজ করছে। এ বাড়ির আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা লালু নামে একটা পশুর ভালবাসার কথা মনোযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছে। আর কিশোর বয়সের ভালোবাসা অবুঝ বোবা পশুর আত্মার সাথে নিজের আত্মাকে এক করে নিচ্ছে।

 

আরও পড়ুন লালু গল্পের
১ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

লালু (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষাপাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!