-
শরতের মেঘ (শেষ পর্ব)
শরতের মেঘ (শেষ পর্ব) শাহানাজ মিজান অনলের বাবা চশমা ঠিক করে চোখে পরতে পরতে সুদীপকে প্রশ্ন করলেন, — সে ঠিক কী বলতে চাইছে? সুদীপ বাধ্য হয়েই বলতে শুরু করল, — অনল, তুমি হয়তো জানো না, আমি তোমার সুদীপা বউদির ছোটো ভাই। বিশ্বাস করো, শুভ্রা কখনো তোমার ভালোবাসার সাথে বেইমানি করেনি। আর তোমাকেও ইচ্ছাকৃত দোষারোপ করেনি। আজ থেকে চার মাস আগে, হঠাৎ শুভ্রা অসুস্থ হয়ে গেলে, হাসপাতালে নেওয়ার পর আমরা জানতে পারি, শুভ্রা ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত, লাস্ট স্টেজ। ডাক্তার তার সময় বেধে দিলেন, সে এই পৃথিবীতে মাত্র ছয় মাসের অতিথি। তখন থেকেই শুভ্রা তোমার জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য তোমাকে মিথ্যে…
-
শরতের মেঘ (১ম পর্ব)
শরতের মেঘ (১ম পর্ব) শাহানাজ মিজান দু’চোখের পাতা এমনি এমনিই বন্ধ করে ছিলাম কিছুক্ষণ। ভাবলাম, ঘুম আসবে কিন্তু ওরাও পালিয়েছে। হয়তো চিরদিনের জন্য আসবে বলে ছুটি নিয়েছে আজ। জানালা খুলে আকাশের দিকে তাকালাম, ঝিরিঝিরি বাতাসে সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠল একবার। সীমাহীন আকাশের এক চিলতে জায়গা জুড়ে বসে থাকা চাঁদটাকে বড়ো খুশি খুশি মনে হচ্ছে, সে ঝিকিমিকি জোৎস্নার ফুল ফুটিয়ে তারাদের নিয়ে খুশিতে মেতে উঠেছে। শরতের থোকা থোকা সাদা মেঘমালা, চাঁদের খুশিকে হিংসে করছে বোধহয়। সেও মুচকি মুচকি হেসে, নীলাভ পাখা মেলে উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে দূর-বহুদূর। চোখের সীমানায় যতদূর দেখা যায়, আমি ততদূর চেয়ে চেয়ে দেখলাম শুধু। কি যেন…
-
উপেক্ষিত
উপেক্ষিত শফিক নহোর আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় চলে আসি, আমার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। তিন মাস ‘মৌসুমী গার্মেন্টস’-এ কর্মরত ছিলাম সহকারী অপারেটর হিসাবে। অনেক মেয়ে আমার সঙ্গে সস্তা প্রেমের আবদার করত, আমি এসব বুঝি না বলে এড়িয়ে যেতাম। কেউ-কেউ আমাকে একটু ভিন্ন নজরে দেখত। অনেক-ই সন্দেহ করত আমি তৃতীয় লিঙ্গের কেউ কি না, আমি প্রচণ্ড লজ্জা পেতাম। পরের মাসে আমার ফলাফল প্রকাশ হলো; আমি রাজশাহী বিভাগে ১১তম। সারা বাড়িতে আনন্দের ঢেউ। আবেগ আপ্লুত হই, আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে। আমি আগামী দিনের স্বপ্নের বীজ বপন করি। কিন্তু তা থেকে যায় আমার কল্পনার ভিন্ন জগতে। তবুও স্বপ্ন দেখি। একদিন এ সমাজে মাথা…
-
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (শেষ পর্ব)
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (শেষ পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল এত সময় ধরে ফাহির কাহিনি শুনে যাচ্ছিলেন। এবার মুখ খুললেন। – আচ্ছা, কী কারণে বিচ্ছেদ হলেন তা বললেন না? – যদি অনুমতি এবং সময় দেন তাহলে বলতে কোনো দ্বিধা করব না। – শুনব। বলুন। আজ অন্তত একজন মানুষ পেয়েছে তাকে তো বলা যাবে। যেসব কারণে সুজিতের সাথে ঘর করা হয়নি তার মধ্যে ছিল মাত্র উনিশ বছর বয়সে দৈহিক মিলন এবং সন্তান জন্ম না দেওয়া। এটাই তো জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে না। কিন্তু আমি কখনো চিন্তা করে দেখেনি যে আমি কোন পরিবাবে, কোন পরিবেশ জন্ম নিয়েছি। ভাবনাটা ছিল বিপরীত মেরুর। –…
-
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (২য় পর্ব)
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (২য় পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল সুজিত রায়হান আশ্চর্য হয়ে শুনে যাচ্ছে সেই উনিশ বছর বয়সি চঞ্চল মেধাবী তরুণীকে। তার ইচ্ছের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ডির্ভোস দিয়েছিল। আজ তার এই পরিণতি কেন। সে যদি নিজে না বলে তবে বলার অনুরোধ করবে না। কারণ এটা তার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। হয়তো ফাহিমিদা ফাহি মনে করবে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে। তাকে অপেক্ষা করতে হলো না। ফাহি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, – যদি অনুমতি দেন, বলতে চাই। আপনাকে বলে শেষ বেলায় যদি কিছুটা শান্তি পাই। যদিও আপনার সঙ্গে শুধুই বিয়ে হয়েছিল কিন্তু কোনো দৈহিক মিলন হয়নি। আমাদের সমাজে বিয়ে স্বামী-স্ত্রীর…
-
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (১ম পর্ব)
শেষ বিকেলের ঝরা ফুল (১ম পর্ব) এ কে আজাদ দুলাল এই মাত্র ফাল্গুনের শেষ বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। রাজধানী শহর ঢাকার বাইরে গাজীপুরে অবস্থিত একটা দামি রিসোর্টে আয়োজিত একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছেন সুজিত রায়হান। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক। বলতে গেলে পঁচিশ বছর চাকুরি মেয়াদ শেষ হতেই স্বইচ্ছায় অবসরে গিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন একটা খ্যাতমানা আন্তর্জাতিক এনজিওতে। একটু নিরিবিলি এবং একাকি থাকতে পছন্দ করেন। জীবনকে একটা নিয়মে বেঁধে নিয়েছেন। শখ বইপড়া এবং ভ্রমণ। নিজ জন্মভূমিতে কোথায় কী আছে তা দেখে বেড়ানো আর বইপড়া। নতুন লেখকদের বই পড়তে বেশি আগ্রহী। একটু আগে অতিথিদের সাথে খাওয়া শেষ করেছেন। খাওয়া…
-
কাকভোর
কাকভোর ♦ শফিক নহোর সকালে ঘুম থেকে উঠেই বউয়ের সঙ্গে একদফা ঝগড়া হয়ে গেল। বউ হাজারটা অভিযোগ তুলেছে; আমি খারাপ, আমি তাকে কিছুই দেইনি কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলছে। রান্না ঘরে এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছে। কাজের মেয়েটি আজ আসেনি। সকালের নাস্তা বানানোর দায়িত্ব তার। নাশতার টেবিলে বসে যেই মুখে খাবার দিয়েছি, বুঝলাম এখন বমি করলে কান্নার আওয়াজ বেড়ে যাবে। প্রতিদিন একই খাবার বার বার খেতে ভালো লাগে না। আমি মধুমাখা কণ্ঠে জানতে চাইলাম, “রাতের খাবার কিছু নেই? ওভেন থেকে আমাকে গরম করে দাও। তুমিও আমার সঙ্গে বসে যেতে পারতে দুজন এক সঙ্গে নাশতা করতাম। শোভাকে নিয়ে একসঙ্গে যেতাম।” “এতো দরদ দেখাতে হবে না।…
-
ফাগুনের গল্প
ফাগুনের গল্প ♦ শফিক নহোর আজ বিকেলটা শুরু হলো ঠাণ্ডা পানির চা দিয়ে। নতুন প্রযুক্তি; প্রথমে আমি নিজেই থ মেরে গেলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই অদিতি ফোন দিয়ে বলল, “তুমি এখনও চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছ। আমি বাসা থেকে বের হয়েছি। তুমি দ্রুত কাজি অফিসে চলে আসো।” টুংটাং শব্দে শেষের কথাগুলো টেপরেকর্ডারে ফিতা পেঁচিয়ে গেলে যেমন শোনায় ঠিক তেমন। লাইটার হাতে নিয়ে কি যেন বলতে চেয়ে ভুলে গেলাম। দোকানি বেনসন সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মামা ত্রিশ টাকা হয়েছে। মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতেই একটা চকলেট ধরিয়ে দিল।” সকালে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছে অদিতি, সে জানে আমার কোনো হাত খরচ নেই।…
-
লেখকের মুক্তিযুদ্ধ (শেষ পর্ব)
লেখকের মুক্তিযুদ্ধ (শেষ পর্ব) সাইফুর রহমান হেনরিয়েট কবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, — আরেকটা কবিতা হয়ে যাক। কবির আবৃত্তি করতে শুরু করল, “তোমাকে চোখের মধ্যে রেখে কাঁদি, আমার দু’চোখে তুমি বিগলিত ঠান্ডা হিম, তুমি কাঁদছ, দু’চোখের একান্ত ভেতরে গলে যাচ্ছে কালো আঁখিতারা, গলে গলে একটি গাছের মতো সবুজ, তোমার মতোন করুণ হয়ে যাচ্ছে অশ্রুমালা তুমি নিথর নিরীহ দাঁড়িয়ে আছ আঁখিতারার ভেতরে, তুমি, একাকিনী সবুজ পল্লব, কাঁপছ বাতাসে সাদা হিমে…।” অস্ফুট কণ্ঠে হেনরিয়েট বলে উঠল, — অপূর্ব! অপূর্ব! এটা কার কবিতা কবির? কবির সলজ্জ গলায় বলল, — আমার। — তোমার! সম্পূর্ণ আবেগ ধরে রাখতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল হেনরিয়েট। —…
-
অন্তর্দাহ
অন্তর্দাহ রাতুল হাসান জয় মরুভূমিতে একা হাঁটছি। যেদিকে তাকাই মনে হচ্ছে বিভীষিকাময় অন্ধকার, পা ফেলতেই মনে হয় আমি গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছি। একটু এগিয়ে যেতেই পা ভিজে যাচ্ছে রক্তে। নিচে তাকাতেই দেখি মুহূর্তে দৃশ্যপট বদলে গেল। মরুভূমি ছাপিয়ে সমুদ্রের মাঝে বসে আছি একাকী ডিঙি নৌকায়। হাতের কাছে না আছে কোনো লাঠি, না বৈঠা। স্রোতে ভাসছে নৌকা, দুলছি আমিও। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো দমকা বাতাস। সমুদ্রের বুক ঠেলে উঠে এল তুফান। মরুর বুক থেকে সমুদ্রের বুকে কীভাবে এলাম! তা ভাবার আগেই হঠাৎ উলটে গেল নৌকা। আমি ডুবে যাচ্ছি! দম বন্ধ হয়ে আসছে। দুচোখ আর হাত খুঁজছে নূন্যতম বাঁচার আশা।…






























