সুতা-ছেঁড়া-ঘুড়ি-১ম-পর্ব
উপন্যাস,  তাহমিনা খাতুন,  সাহিত্য

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (১ম পর্ব)

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (১ম পর্ব)

তাহমিনা খাতুন

এক.
জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি। আম, জাম ও লিচু গাছগুলো পাকা ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। বাগানের পূর্বদিকে ছোটো একটা বাড়ি। এ বাড়িতে জয়নাল মিয়ার বিধবা স্ত্রী হালিমা বেগম বহু বছর ধরে একা বসবাস করছেন। হালিমা বেগমের একমাত্র মেয়ে মোমিনাকে বিয়ে দিয়েছেন কয়েক মাইল দূরের গ্রাম নূরপুরে। সেও বেশ অনেক বছর হলো। মোমিনার ছেলে মেয়েরা প্রায়ই এসে তাদের নানির বাড়িতে থাকে। কয়েক দিন হলো মোমিনার দশ বছরের মেয়ে কলি, নানির বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। নানির ঘরের বারান্দায় বসে পাশের বাগানের গাছ থেকে টুপটাপ আম পড়ার শব্দ শুনে কলি নানিকে বলল,
“নানি, চল বাগানে যাই। বাঁটুলে গাছের আম পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমগুলো কুড়িয়ে আনি। নইলে এক্ষুনি পাড়ার লোকজন এসে সবগুলো আম কুড়িয়ে নিয়ে যাবে।”
“নিক না কুড়িয়ে। এত আম কী হবে? পাড়ার গরীব মানুষগুলো ঠিক মতো খেতে পায় না। ওরা যদি খেতে পায়, অসুবিধা কী?”
“ওরা আম কুড়িয়ে নিক। আমি তো মানা করব না। শুধু কয়েকটা আম কুড়িয়েই চলে আসব।”
নাতনির পিড়াপীড়িতে হালিমা বেগম বাগানে যেতে বাধ্য হলেন। গাছের তলায় পড়ে আছে রাশি রাশি আম। এ গাছটার আম একটু পাকলেই টুপটাপ ঝরে পড়তে থাকে। গাছের নিচে পড়া আমগুলো পাড়ার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা কোঁচড় ভরে কুড়িয়ে নিচ্ছে। কলিও কুড়িয়ে নিল কয়েকটা আাম। আম কুড়ানো শেষ হলে কলি নানিকে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা নানি, এসব জমি কি নানার ছিল?”
“হ্যাঁরে সোনা। চারদিকের যত জমি দেখছিস সব জমিই ছিল তোর নানার। বেশিরভাগই তোর নানার বাপের আমলে কেনা। বাপের কাছ থেকে পাওয়া জমি ছাড়াও তোর নানার নিজের কেনাও অনেক জমি ছিল। আমার ননদের কারণে এমন সোনার জমিজমা আজ জালিয়াত মোবারক প্রামাণিক আত্মসাৎ করার সুযোগ পেয়েছে। আপন মানুষ যখন আপন মানুষের সাথে শত্রুতা শুরু করে, তখন তা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।”

আরও পড়ুন  মরিচপোড়া

নাতনির প্রশ্নের জবাবে কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হালিমা বেগম।
“আচ্ছা নানি, নানা তো মারা গেছে অনেক বছর। মায়ের বয়স যখন মাত্র এক বছর। তুমি আর বিয়ে করোনি কেন? তোমার তখন বয়স কত ছিল?”
হালিমা বেগম জানেন তাঁর এই নাতনিটা খুবই বুদ্ধিমতী। তাই তার কথায় অবাক হলেন না। বললেন,
“তোর নানার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল মাত্র বারো বছর বয়সে। সেই সময় তো মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। বিয়ের বছর দুয়েক পরেই তোর মায়ের জন্ম হলো। তোর নানা আমার থেকে বয়সে প্রায় বারো-তের বছরের বড়ো ছিলেন। তোর নানা আমাকে বিয়ে করার আগে আরও একটা বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের ছয় সাত মাস পরেই বেচারি ম্যালেরিয়া জ্বরে মারা যায়। তার বছর খানেক পরে তোর নানা আমাকে বিয়ে করেন। তোর নানা আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। ঘরের কোনো কাজ করতে গেলেই আমাকে বকা দিতেন। বলতেন-আমার বাড়িতে কি কাজের লোকের অভাব পড়েছে যে তোমাকে রোদের মধ্যে ধান, গম শুকাতে হবে, আগুনের ধোঁয়ার মধ্যে রান্না করতে হবে।

কাজের লোকজনকেও বলে দেওয়া হয়েছিল যেন আমাকে কোনো কাজ করতে না দেয়। আমার মতো পোড়াকপালীর, এত সুখ সইল না। অল্প বয়সে বাপ-মা মরা আমার মতো দুখী মেয়েকে বিয়ে করে আদরে, সোহাগে রেখেছিলেন। স্বামীর আদর ভালো করে বোঝার আগেই মানুষটাই যখন আমাকে ছেড়ে অসময়ে চলে গেল, কোন সুখের আশায় আরেকটা বিয়ে করব? পনের বছর বয়সে সাদা থান পরেছি, এই সাদা থান পরেই যেন কবরে যেতে পারি।”

আরও পড়ুন  পাথরে শৈবাল খেলে

বলতে বলতে আঁচলে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন হালিমা। কিছুক্ষণ পর একটু শান্ত হয়ে বললেন,
“আমার যখন চৌদ্দ বছর বয়স, তখন তোর মায়ের জন্ম। তোর মাকে পেয়ে লোকটা যেন হাতে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল! কি যে আদর করত মেয়েকে। প্রায়ই মাঠ থেকে ছুটে আসত মেয়েকে আদর করতে। তোর মায়ের একটু সর্দি লাগলে, একটু গা গরম হলে সারা রাত মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুরত। এত আদরের সেই মেয়েকে আর আমাকে ছেড়ে কত বছর আগে চলে গেছে মানুষটা। বুকের ভেতর আগুন চাপা দিয়ে তোদেরকে নিয়ে জীবন পার করছি। এখন আমার জীবনের একটাই চাওয়া, আল্লাহ যেন তোদেরকে ভালো রাখেন, শান্তিতে রাখেন। সেটাই আমার সুখ, সেটাই আমার পরম আনন্দ।”
নানির আবেগঘন কথাগুলো শুনে দশ বছরের কলি আর স্থির থাকতে পারল না। নানিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আদরের নাতনির চোখের পানি মুছিয়ে চুমু খেয়ে বাড়ির পথ ধরলেন হালিমা।

পাবনার শাজাহানপুর বেশ বড়ো একটি গ্রাম। গ্রামটির দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনার শাখা আত্রাই। উত্তর দিকে গাজনার বিল। ঘন গাছপালায় ছাওয়া বাংলাদেশের আর দশটা গ্রামের মতোই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবী। অল্প কয়েকটি ছোটো মনিহারি দোকান আছে। এই দোকানগুলো গ্রামের লোকজনের লবণ, কেরোসিন চাল, ডাল, আলু, বাতাসা টুকটাক জিনিসপত্রের প্রয়োজন মিটায়। মাইল দুয়েক দূরের শিবপুরে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। মানুষজন শিবপুর হাটেই নিজেদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনাকাটা করেন।
শনে ছাওয়া কাঁচা মাটির ঘর-বাড়িতেই বসবাস গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার। দুই একখানা ঢেউ টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর চোখে পড়ে। রাস্তা-ঘাট সবই কাঁচা। বর্ষাকালে নৌকা আর সারা বছরের যানবাহন গোরু কিংবা মহিষের গাড়ি।

আরও পড়ুন  স্বপ্ন গোধূলি

ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের মাঝামাঝি সময়। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট ভারতবর্ষের জনজীবন। অশিক্ষা, অভাব-অনটন, অপুষ্টি এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। এক সময়ের সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা সমৃদ্ধ জনপদ বাংলার অধিকাংশ মানুষই এখন হতদরিদ্র। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এ দেশের সম্পদ লুটে নিয়ে বাংলাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। অফুরন্ত সম্পদের অধিকারী বাংলার মানুষ কষ্টে খেয়ে না-খেয়ে জীবন পার করে। এর মধ্যেও হাতে গোনা কয়েকজন মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন কৃষক আছেন শাজাহানপুরে। পশ্চিমপাড়ার জলিল মিয়া একজন অবস্থাসম্পন্ন কৃষক। প্রায় ষাট-সত্তর বিঘা জমির মালিক। লবণ, কেরোসিন আর জামা-কাপড় ছাড়া আর কোনো কিছুই বলতে গেলে কিনতে হয় না। সারা বছরই নিজের জমির কোনো না কোনো ফসল ঘরে ওঠে। গোয়ালে বাঁধা দুধেল গাভি, উঠানে হাঁস-মুরগি চড়ে বেড়ায়। উঠানে পাতকুয়া। বাড়ির সাথে বিশ পঁচিশ বিঘার বিশাল বাগান। আম-জাম-লিচু-কাঁঠাল ছাড়াও আরও নানান ফল গাছে ভরা। এক কথায় সমৃদ্ধশালী এক কৃষক।
জলিল মিয়ার ছেলেমেয়ে দুজন। ছেলে জয়নাল। বয়স বাইশ-তেইশ বছরের বেশি নয়। প্রচন্ড পরিশ্রমী। কৃষিকাজে সাহায্য করার জন্য দুই জন কিষাণ সারা বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেন জলিল মিয়া। তাদের সাথে নিয়ে নিজেও সারাদিন মাঠে পড়ে থাকে জয়নাল। ফসল বোনা কিংবা ঘরে তোলার সময় বাড়তি কিষাণ নিয়োগ দেওয়া হয়।

জলিল মিয়ার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। জয়নালের বয়স যখন মাত্র তিন বছর এবং জয়নালের বোনের সাত বছর বয়স। তাদের মা জয়নব বিবি ছোটো ছোটো দুটি অবোধ শিশুকে রেখে দুদিনের জ্বরে মারা গেছেন। জয়নব বিবি আদর করে পিতা জলিল মিয়ার নামের সাথে মিল রেখে মেয়ের নাম রেখেছিলেন জবা কুসুম আর নিজের জয়নব নামের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রেখেছিলেন জয়নাল। মাতৃহীন অবোধ দুই শিশুকে বাবা-ই কোলে পিঠ করে মাতাপিতা দুজনের স্নেহ-মমতা দিয়ে বড়ো করেছেন। নিজের পরিশ্রম আর চেষ্টায় পিতার প্রায় ষাট সত্তর বিঘা সম্পত্তির সাথে নিজেও আরও প্রায় আট-দশ বিঘা সম্পত্তির মালিক হয়েছে।

আরও পড়ুন  নীলভোর

মেয়ে জবা কুসুমকে বিয়ে দিয়েছেন আগেই। পাশের গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন কৃষক আব্দুল মান্নান মিয়ার ছেলে জালালের সঙ্গে। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরেই ছেলে জয়নালকেও বিয়ে করিয়েছিলেন। কিন্তু জয়নালকে বিয়ে করানোর মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই জয়নালের স্ত্রী ফাতেমা দুই দিনের জ্বরে মারা গেল। বছর খানেক পরে জয়নালকে আবার বিয়ে করালেন। মনে মনে একটা বাসনা ছিল নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটাবেন। কিন্তু সে সাধ পূরণ হওয়ার আগেই মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে দুরন্ত কলেরায় আক্রান্ত হয়ে দুই দিনের মধ্যে মারা গেলেন জলিল মিয়া!
জয়নালের দ্বিতীয় স্ত্রী হালিমার বাবার বাড়ি কয়েক মাইল দূরে যমুনা পাড়ের গ্রাম যদুপুরে। পিতৃ-মাতৃহীন হালিমার এক বোন আর এক ভাই। বড়ো বোন খালেদার অনেক বছর আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। হালিমা দেখতে যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী। বয়স খুব বেশি হলে বারো বছর। বয়স কম হলেও বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই সুন্দরভাবে সংসারের হাল ধরেছে।
জয়নাল আর হালিমার বয়সের বেশ পার্থক্য। স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসে জয়নাল। স্ত্রীর প্রতি জয়নালের অগাধ ভালোবাসা তার বোন জবা কুসুমের মনঃপীড়ার অন্যতম কারণ। ছোটোবেলা থেকেই অত্যন্ত স্বার্থপর আর মুখরা জবা কুসুম। সময় সুযোগ পেলেই বাপের বাড়িতে এসে হাজির হয় এবং ভাইয়ের বউয়ের উপর খবরদারি করতে ছাড়ে না।
জলিল মিয়া মারা যাওয়ার পরপরই জবা কুসুম চড়াও হলো হালিমার উপর। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করল। হালিমা অপয়া, অলক্ষুণে! এজন্য সে বাড়ির বউ হয়ে আসার পরই তার বাপকে খেয়েছে; এমন অপবাদ দিতেও বাধল না জবা কুসুমের। জলিল মিয়া মারা যাওয়ার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পৈতৃক সম্পত্তির অংশ আদায় করে নেওয়ার জন্য জয়নালকে অপমান-অপদস্ত করতে ছাড়েনি।

আরও পড়ুন  সোনালী সকাল

জলিল মিয়া মারা যাওয়ার বছর খানেকের মধ্যে হালিমার কোল জুড়ে এসেছে ফুটফুটে চাঁদের মতো মেয়ে। বাবা-মায়ের আদরে সোহাগে দিন দিন বেড়ে উঠছে মোমিনা।
বর্ষাকাল। অঝোরে ঝরছে শ্রাবণের ধারা। নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে টইটম্বুর। বেশ কয়েকদিন ধরেই জয়নাল জ্বরে ভুগছে। পাড়ার কবিরাজ গনি মিয়ার কবিরাজি ওষুধ, মসজিদের ইমাম সাহেবের পানি পড়া, ঝাড়ফুঁকেও জ্বর কমছে না। পাশের গ্রামের হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে বাড়িতে ডেকে এনে দেখানো হয়েছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।
শ্রাবণ মাস শেষ হয়ে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি। জয়নালের জ্বর কমছেই না। একদিন একটু কমে তো পরের দিন আবার জ্বর আসে। খেতে পারে না ঠিক মতো। দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অসহায় হালিমা স্বামীর অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগে দিন পার করছে।
উপায়ান্তর না দেখে হালিমা তার বড়ো ভাই শাহাবুদ্দীন পন্ডিতকে খবর পাঠাল।

আরও পড়ুন সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি-  
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ম পর্ব
১১তম পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১লা মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!