সুতা-ছেঁড়া-ঘুড়ি-শেষ-পর্ব
উপন্যাস,  তাহমিনা খাতুন,  সাহিত্য

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (শেষ পর্ব)

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (শেষ পর্ব)
তাহমিনা খাতুন

 

চৌব্বিশ.

দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। হাবিবুর, মোমিনা দুজনেরই বয়স বেড়েছে। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবুও হাবিবুর রহমান এখনো পুরোপুরি অবসরে যাননি। গ্রামের মসজিদে ইমামতি, সংসারের টুকটাক কাজ কর্ম, বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া জমিতে শাক-সবজি লাগানো ইত্যাদি করে সময় কাটান।

আষাঢ় মাস। আকাশ কালো করে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। নূরপুরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। হাবিবুর রহমান একটা ছাতা নিয়ে অনেকক্ষণ আগেই মাগরিবের নামাজের ইমামতি করার জন্য মসজিদে চলে গেছেন। মাগরিবের নামাজের ইমামতি শেষ করে হাবিবুর রহমান সাধারণত এশার নামাজের সময় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং একেবারে এশার নামাজের ইমামতি শেষ করে বাড়ি ফেরেন।
এশার নামাজের সময় পার হয়ে গেছে বেশ অনেকক্ষণ। হাবিবুর রহমানের দেখা নাই। দুশ্চিন্তা হচ্ছে মোমিনার। এত রাত হয়ে গেছে, এখনো দেখা নাই মানুষটার। এই দুর্যোগে কাউকে পাঠাতেও পারছেন না। কাজেই ঘর বারান্দা করছে। হঠাৎ দেখলেন পাশের গ্রামের সোহরাব কাজির ছোটো ছেলে মিনহাজ হাবিবুর রহমানকে ধরে ধরে বাড়ির উঠানে এসে ঢুকল। বৃষ্টিটাও তখন জোরে এসেছে।
“তোমার চাচার কি হয়েছে, মিনহাজ? এভাবে নিয়ে আসছ?”
“দুশ্চিন্তা করবেন না চাচি। নামাজ পড়ানো শেষ করার পর চাচা বললেন, ওনার শরীর খারাপ লাগছে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। কিন্তু শরীরটা বিশেষ ভালো বোধ না করায় মুয়াজ্জিন সাহেব আমকে পাঠালেন, চাচাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে।”
রাতের খাবার খাওয়ার পর হাবিবুর রহমান ঘুমাতে গেলেন। কিন্তু রাতে ভালো ঘুম হলো না। পর দিন সকালে অসুস্থতা আরও খানিকটা বাড়ল। গ্রামের মজিদ ডাক্তারকে ডেকে পাঠানো হলো।
কয়েক দিন মজিদ ডাক্তারের ওষুধ চলল। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় মোমিনা ঢাকায় সেজো ছেলে রফিকুল ইসলামকে টেলিগ্রাম করলেন। টেলিগ্রাম পেয়ে পরের দিনই রফিকু্ল গ্রামে এসে হাজির। বাবাকে ঢাকায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করল। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন গেল হাবিবুরের দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। কিডনি এমন অবস্থায় ডায়ালাইসিস করলে হয়তো কিছুটা উন্নতি হবে। শুরু হলো চিকিৎসা। কিন্তু তেমন কোনো উন্নতি দেখা গেল না। মাস তিনেক চিকিৎসার পর মোমিনাকে একা করে শিশু কালে পিতৃ-মাতৃহীন হাবিবুর রহমান চিরবিদায় নিলেন। এক বছর বয়সে পিতা হারানো মোমিনা জীবনের সুখ-দুঃখের সাথীকেও হারিয়ে ফেললেন চিরতরে।

পঁচিশ.
বিয়ের পরেই মোমিনা অনেক চেষ্টা করেছে মাকে নিজেদের কাছে নিয়ে এসে রাখতে। কিন্তু হালিমাকে কোনোভাবেই রাজি করাতে পারেনি। হাবিবুর রহমান নিজেও অনেক দিন অনুরোধ করেছে শাশুড়িকে তাদের সাথে এসে থাকতে। হালিমা রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলে হালিমা মোমিনার বাড়িতে বেড়াতে যায়। কিন্তু রাতের আগেই ফিরে যায় জয়নালের ভিটায়। হালিমা যেন অনুভব করে রাতের অন্ধকারে জয়নালের আত্মা এই বাড়ির চারদিকে ঘোরাফেরা করে। জয়নাল মারা যাওয়ার পরে মাত্র পনের বছর বয়সের হালিমা একটি ছোট্ট শিশুকে নিয়ে যখন বসবাস করেছে, তখন শিশু কন্যার কোনো বিপদের আশংকায় মাঝে মাঝে ভীতি কাজ করেছে কিন্তু মোমিনাকে বিয়ে দিয়ে স্বামীর সংসারে পাঠানোর পর মনে কেমন এক নিরুদ্বিগ্নতা কাজ করে। চারদিকে বড়ো বড়ো ঘন গাছ পালায় ছাওয়া বাড়িটিতে সম্পূর্ণ একা থাকতে কোনো ধরনের ভীতি কাজ করে না।
অল্প বয়স থেকেই অসম্ভব পর্দানশীন আর ধার্মিক হালিমা। মাথার ঘোমটা কোনো দিনই কপালের উপরে ওঠে না। কখনও মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে মোমিনার রান্না ঘর ছাড়া অন্য ঘরে ঢোকে না। এছাড়া মেয়েকে আগে থেকেই বলে দেয়, সে যতক্ষণ মোমিনার বাড়িতে থাকবে ততক্ষণ যেন কৃষি-শ্রমিকেরা অন্দরে প্রবেশ না করে।
হাবিবুর রহমানের নির্দেশ মতো হালিমা বেগমের অবস্থানকালীন সময়ে মোমিনার অন্দর বাড়িতে কখনও কোনো কিষাণ প্রবেশ করে না।

আরেকটা মধু মাস এসেছে শাজাহানপুরে। হালিমার বাড়ির লাগোয়া আম বাগানের চারদিকে ডাল-পালা ছড়ানো বাঁটুলে আম গাছটায় এবছরও আমে ভরপুর হয়ে আছে। বৈশাখ মাসের শেষ দিক থেকেই প্রতি বছরের মতোই টুপটাপ আম পড়ার শব্দ শোনা যায় প্রায় সময়ই। পাড়ার ছেলে মেয়েরাও ভীড় করে থাকে গাছের তলায়।
সন্ধার কিছু আগে হালিমা বেগম রান্না ঘরে রান্নার আয়োজন করছেন। একলা মানুষ। স্বল্প ভোজী হালিমা বেগম তবুও একটু বেশি পরিমাণেই রান্না করেন এক মাত্র মেয়ে মোমিনাকে বিয়ে দেওয়ার পর থেকেই। সব সময়ই পথ চেয়ে থাকেন যদি কন্যা জামাতা অথবা নাতি-নাতনিরা কেউ চলে আসে! তাদের জন্য রান্না করতে দেরি হলে যাতে তাদেরকে খাবার না খেয়ে চলে যেতে হয়। এখন তো নাতি-নাতনিরা সবাই বড়ো হয়ে গেছে। তবু অভ্যাসটা কোনোভাবেই ছাড়তে পারেন না! বাড়তি খাবার গরিব দুখীদেরকে বিলিয়ে দেন।
সেদিনও রান্নার আয়োজন করতে রান্না ঘরে গিয়েছেন। জামাতার অসুস্থতার খবর তো আগে থেকেই জানা আছে। মোমিনাও অসুস্থ স্বামীর সঙ্গে ঢাকা গেছে। দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় দিন কাটছে হালিমা বেগমের।
ভাতের হাঁড়িতে চাল নিয়ে ধুতে গিয়েছেন, এমন সময় দৌড়ে এল পাশের বাড়ির শামসুল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“দাদি, এক্ষুনি তৈরি হয়ে নেন। আমি একটা রিকশা ডেকে আনছি।”
“কেন কি হয়েছে? কোথায় যাব?”
“আপনি তৈরি হয়ে নেন তো। ঘরে তালা দিয়ে নেন। আমি আসছি,” বলে ছুটে বেরিয়ে গেল শামসুল।
অজানা আশংকায় কেঁপে উঠল হালিমা বেগমের মন। নিশ্চয়ই হাবিবের কিছু হয়েছে। আমার মোমিনার কপাল ভেঙেছে! কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগে দুই একটা কাপড় ভরে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ালেন হালিমা।

শেষ.
এক বছর হলো মারা গেছেন হাবিবুর রহমান। দীর্ঘ দিনের জীবন সাথীকে হারিয়ে একাকীত্বকে মোমিনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। চোখের পানি যেন তার শেষ হবে না। সব সময় কাঁদছে। মাত্র এক বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিল সে। পিতৃহীন হওয়ার বেদনা বোঝার বয়স হয়নি তখন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল মায়ের কষ্ট আর বেদনা। বিয়ের পর নিঃসঙ্গ হালিমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। যে হালিমা কিশোরী বয়সে স্বামীকে হারিয়ে কন্যাকে নিয়ে দীর্ঘ সময় পার করেছেন, কন্যাকে বিয়ে দিয়ে স্বামীর শূন্য ভিটায় একাকী জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন, আজ নিরুপায় হয়ে মৃত স্বামীর ভিটা ছেড়ে মেয়ের বাড়িতে থাকছেন। ছোট্ট বেলার মতো মোমিনাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন।
মোমিনার ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা মারা যাওয়ার পরে মায়ের সঙ্গে কয়েক দিন থেকে যার যার কর্মস্থলে বা সংসারে ফিরে গেছে। জীবনের বাস্তবতা এমনই! ইচ্ছে থাকলেও মানুষকে এই বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হয়। কেবল মাত্র হালিমাই মেয়েকে একা রেখে নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারেনি।
মা, মেয়ের নিস্তরঙ্গ জীবন এভাবেই বয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই এক দিন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল হালিমা বেগমের। সারা রাত জেগে মায়ের সেবা করল মোমিনা। পরদিনও যখন জ্বর কমলো না, পাশের গ্রামের শচীন ডাক্তারকে ডেকে পাঠাল। ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিলেন। ঔষধ-পথ্য-সেবা কোনোটাতেই ঘাটতি রাখল না মোমিনা। নিজের কথা ভুলে গেল যেন।
চার পাঁচ দিন ধরে জ্বর চলল। এক দিন মোমিনাকে কাছে ডেকে বললেন হালিমা,
“শোন মা, আমি বুঝতে পেরেছি, আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। আমার জীবনের সব সময়ের একটাই প্রার্থনা ছিল, আমি যেন বেশি দিন অসুখে না ভুগি। আমার নিজের শক্তি-সামর্থ্য থাকতেই যেন পরম করুণাময় আমাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেন। তোমার কাছে আমার একটাই চাওয়া, আমি মারা যাওয়ার পর আমাকে শাজাহানপুরে তোমার বাপের কবরের পাশে কবর দিও। এ জীবনে তো তাকে পাইনি, পরের জীবনে যেন তাকে আর না হারাই। আর যদি সম্ভব হয়, তোমার ছেলে-মেয়েদেরকে খবর পাঠাও, যদি তারা পারে শেষবারের মতো এসে যেন আমাকে দেখে যায়।”
সেদিনই ছেলে-মেয়েদেরকে চিঠি পাঠাল মোমিনা। তারা যেন একবার বাড়ি এসে তাদের প্রিয় নানিকে দেখে যায়। চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ছুটে এলো নূরপুরে। কিন্তু তাদের নানিকে দেখার আশাপূরণ হওয়ার আগেই নানির সারা জীবনের অপেক্ষারত আত্মা পৌঁছে গেছে তাঁর প্রিয় মানুষটির কাছে।
আর পিতার মৃত্যুর সময়ে এক বছর বয়সের যে মোমিনা পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল মৃত পিতার শেষশয্যা পাশে; আর আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চিরদুখিনী মায়ের মৃত দেহের উপর বাঁধ ভাঙা শোকের বন্যায় দুমড়ে মুচড়ে আছড়ে পড়ল সে।

আরও পড়ুন সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি-   
১ম পর্ব
২য় পর্ব 
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০তম পর্ব
১১তম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১লা মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!