সরদার-জয়েনউদ্দীন-৩য়-পর্ব
কামারহাট,  নাজিরগঞ্জ,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

সরদার জয়েনউদদীন (৩য় পর্ব)

সরদার জয়েনউদদীন (৩য় পর্ব)

 

সাহিত্য মূল্যায়ন: কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ান ঢুলী’ নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বাংলা সাহিত্যের কতটা শিখরে উঠেছিলেন, যদিও তাঁকে নিয়ে সেভাবে প্রায় আলোকপাত করা হয় না। নয়ান ঢুলী গল্পগ্রন্থের করালী, ভাবী, কাজী মাস্টার, সবজানের সংসার গল্প পর্যালোচনা-

করালী

করালী চিরদিনের মতো জামেলাকে হারাল। এভাবেই সরদার জয়েনউদ্দীন ‘করালী’ গল্পের পরিণতি দেখিয়েছেন। জমিদার-সামন্ত বাবুরা কীভাবে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করেছে এবং ঘরের ইজ্জত নিয়ে বেইজ্জত করেছে তার একটা ছবি এই গল্পে চিত্রায়িত হয়েছে। ঘরে বউ নিয়ে শুয়ে ছিল কিন্তু হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে জামেলা হাওয়া। কোথায় গেল, বুঝে উঠতে পারে না। দৌড়ে যায় কাছারিতে, তাও পায় না। লোকজন উত্তেজিত হয়। জমিদারের বিরুদ্ধে কথা ওঠে–খাজনা নিচ্ছে আবার ঘরের বউকেও ছিনিয়ে নেয়। সবাই বলে, সদরে গিয়ে মামলা ঠুকে দিতে; কিন্তু মন তার বোঝে না। ইচ্ছে করছিল খুব করে কাঁদে; কাঁদলে বোধহয় দুঃখ কিছু কমে। করালী পেয়াদা কী করবে ভেবে যখন দিশেহারা, তখন মানিক বিশ্বাস ধমক দিয়ে ওঠে। সোজা কোটে যাও। তোর সাথে গাঁয়ের-দেশের মান-সম্মান জাত যায়। ভালো চাস তো আজই সদরে যা। থানায় গিয়ে কাজ নাই, ওসব দারোগা-ফারোগায় বিশ্বাস নাই, শালারা ঘুষের বাচ্চা। সোজা সদর, পুলিশ সা’ব কি ম্যাস্টের কোট। ঘরের বউ পরের সাথে ভেগেছে, শরম-লজ্জায় কাঁচুমাচু করে করালী।

আরও পড়ুন আমাদের সুজানগর সংকলন রিভিউ

আকস্মাৎ বৈঠকখানার কোনা থেকে নব্বই বছরের বুড়ো উজির সরদার–এককালের নামকরা লেঠেল, চাপাস্বরে ফিসফিসিয়ে বলে, জমিদারের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করবার দরকার নাই। সবাই মিলে হুজুরের হাতে-পায়ে ধরে ঘরের বউকে ঘরে নিয়ে আসো। হাজার হলেও জমিদার মুনিব। তারপর স্মৃতি হাতড়ে পেছনের গল্প বলে, খোনকারের ছেলের, হুজুরের এবং গহের সরদারের… মানিক প্রতিবাদ করে। সেকাল নাই চাচা, জমিদারের বিষদাঁত ভেঙে দেবো। শালার জমিদার… বংশ নিপাত না করে ছাড়ছি না; কিন্তু করালী ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাতপাঁচ ভেবে ঘুরে বসে। মামলা-মকদ্দমা বড় খারাপ জিনিস, ওপথে অনেক হাঙ্গামা। উজির দরদারই ঠিক কথা বলেছে, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে পেরে ওঠা যায় না। করালী মনস্থির করে, সত্যিই হয়তো তাই। সামন্তরাজ সর্বত্র গ্রাস করছে, বেঁচে থাকা কঠিন। শেষে তার পেয়াদাগিরি চাকুরি চলে যাবে। হাজার ভেবে করালী জমিদার বাড়িই রওয়ানা হলো। এভাবেই মানুষ হয়তো ক্ষমতার কাছে, শক্তির কাছে মাথা নত করে এবং করতেই হয় জীবনযাপনের কারণে।

ভাবী

ভালোবাসা যে সত্যিই ভাগ করে দেওয়া যায় না, ‘ভাবী’ গল্পে সোহাগী সে-কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কৃপণ নেজামদ্দি সরকার মরে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরে তার বড় ছেলে নেয়াজ মহাম্মদ, ছোট ছেলে নবীবক্স নবম শ্রেণিতে পড়ে। নেয়াজ জমিজিরাত নিয়ে দিনমান মেতে থাকে, আর নবীবক্স শুধুমাত্র ভাবিকে নিয়ে দিনরাত্রি শেষ করে। সংসারের দিকে বিন্দুমাত্র তার খেয়াল নেই। শহরে গিয়ে সিনেমা দেখা, ভাবির জন্য চুড়ি-ফিতে-শাড়ি কিনে আনা যেন নবীর কাজ হয়ে দাঁড়ায়, যদিও সেসব পয়সা সোহাগীই দিত স্বামীর কাছ থেকে চেয়ে। একপর্যায়ে যে সোহাগী একটু-একটু করে নবীবক্সের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তা নিজেই টের পায়। তখন নিজেকে শক্ত করে বাঁধে; কিন্তু দেখা যায়, তা বাঁধতে গিয়ে সোহাগী নিজেই হারিয়ে ফেলে নিজেকে। নবীর বিয়ে দিতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে টের পায় যে, সত্যি-সত্যিই নবীকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে। সেই ভালোবাসা হয়তো শারীরিক নয়, তারপরও মানসিক এক সম্পর্কের দোলাচলে গল্পটি এগিয়ে যায় অনেকটা দূর।

আরও পড়ুন গল্পগ্রন্থ মায়াকুসুম রিভিউ

নবীবক্স বিয়ের দিন সালাম করতে গিয়ে দেখে ভাবির সেই চেহারা আর নেই। মুখখানা শুকিয়ে আধখানা হয়েছে। বুক ভেঙে যায়, কী দেখছে সে! সোহাগী টাল খেয়ে পড়ে। কাঁদতে থাকে আর মনে-মনে ভাবে পুরুষ জাতটার পরাণ বলে কিছু নাই, বড় বে-রহম! মনস্তাত্ত্বিক এ-গল্পে জীবন যেন অন্যভাবে ধরা দিয়েছে। ভালোবাসা যে কতটা সূক্ষ্ম অনুভূতি, তা একবাক্যে বোঝানো সম্ভব নয়; ভালোবাসার স্পর্শ দিয়েই বোঝাতে হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক বা স্টাইল গল্পে ধরা পড়েছে।

কাজী মাস্টার

‘কাজী মাস্টার’ গল্পে আমানত কাজী মাস্টারের চরিত্রটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। যে কিনা ১৯২১ সালে বিএ পাশ করেও শহরে গিয়ে হাকিম-উকিল না হয়ে হয়েছে স্কুলের মাস্টার। দেশের মানুষকে, গাঁয়ের মানুষকে শিক্ষার আলো দেবে। যার এমন আকাঙ্ক্ষা, তাকে শেষাবধি একটা স্কুলের জন্য নতুন করে আবার তৈরি হতে হয়। নিজের উৎপাদিত কফি বিক্রি করে পাঠশালার ঘর তুলবে, লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষকে নতুন করে বাঁচাবে। সে পরাণের মেয়ে ময়নাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিল। শহরে গিয়ে বৃত্তি দেবে, কত নাম হবে দেশজোড়া। কিন্তু গ্রাম সমাজের গণি মল প্রধান তা চায় না। কারণ তার নজর পড়েছে ময়নার ওপর। বুড়ো কিনা ময়নাকে বিয়ে করতে চায়, ঘটক পাঠায়। আমানত মাস্টার প্রতিবাদ করায় নতুন যুগের বে-শরিয়তি বলে ময়নার পড়া বন্ধ করে গ্রামপ্রধান গণি। স্কুল ভেঙে ফেলার হুকুম দেয়।

আরও পড়ুন লোকসাহিত্য বিশারদ ও লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন এর প্রকাশনা

বসারত আর দেরাজ মোল্লা সে-রাতে মাস্টারের চোখের সামনে পাঠশালার চালা কেটে ফেলে। শুধু তাই নয়, পরাণের জমিটুকু একে-একে চলে যায় গণির জরিপ করা টাকা-খাওয়া আমিনের হাত দিয়ে। এভাবেই সমাজের একশ্রেণির মানুষ নিজেদের ক্ষমতা প্রকাশ করে। বিচারের বাণী নীরবে কেঁদে মরে। আর কেঁদে মরে মনুষ্যত্ব। ধর্ম দিয়ে মানুষকে কব্জা করতে না পারলে যে-অত্যাচার তার জন্য নির্ধারিত হয়, গাল্পিকতার রূপ যে এভাবে গল্পাকারে তুলে ধরবেন, তা সত্যিই অভিনব। গল্পে গ্রামীণ মানুষের কষ্ট-যন্ত্রণার সঙ্গে ভালো মানুষের পাশাপাশি নষ্ট-ভ্রষ্ট এক শ্রেণির চরিত্রটি বেশ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যার ভেতর কুরআন-হাদিসের জ্ঞান না থাকলেও উল্টাপাল্টা বিধান দিতে এতটুকু কার্পণ্য  করে না। জোতদার শ্রেণি আমাদের সমাজদেহকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তার চালচিত্র গল্পে দেখতে পাওয়া যায় আগাগোড়া।

সবজানের সংসার

প্রেসিডেন্ট সবজানকে বাঁধা মাগি হিসেবে রেখেছে। ‘সবজানের সংসার’ গল্পটি এভাবেই শেষ হয়। কেতাবদি জেল থেকে ফিরে দেখে বাড়ি ঘরের শ্রীবৃদ্ধি। দিনকাল ফিরেছে। তাহলে দুঃখ-দুর্দশা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বাঁচতে-বাঁচতে মানুষ একটা সময় কূল-কিনারা পেয়ে যায়। একটা আশা এবং স্বপ্ন যখন সত্য-সত্যি মুছে যায়, তখন সে কী নিয়ে বাঁচে? হিতাহিত-জ্ঞান হারিয়ে কোনো একটা খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকতে চায়। কেতাবদিকে মিথ্যে চুরির অপরাধে জেলে ছয় মাস থাকতে হয়। প্রেসিডেন্ট যতই যাকাত দিক বা দান-খয়রাত করেন না কেন, সে মূলত সর্বনাশা বদমায়েশের চূড়ান্ত। সবজানকে সে নিজের করে পেতে চায় এবং তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ক্ষেতের সেরা কামলা কেতাবদিকে কিল-লাথি, চড়-ঘুষি মারলেও কথা ছিল, চুরির অপরাধ দিয়ে দারোগা ডেকে ধরিয়ে দেয়। সামন্ত-মহাসামন্তরা যেভাবে মানুষকে চুষে খায়, শুষে খায় রক্তচোষার মতো, সেভাবেই সাম্রাজ্যবাদ নিষ্পেষিত করে এবং সেখান থেকে পরিত্রাণের কোনো রাস্তা নেই। গ্রাম্য অর্থনীতি একশ্রেণির হাতে মজুদ। তারাই নিয়ন্ত্রণ করে সমাজের আর দশজনের ভাগ্যকে। শ্রেণিহীন মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে উপর্যুপরি নির্যাতন করে মানসিক-শারীরিকভাবে এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিকভাবে।

আরও পড়ুন কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীন
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সরদার জয়েনউদদীন (৩য় পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশ এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন ‘আমাদের সুজানগর’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাধারণ সম্পাদক। তিনি ‘আমাদের সুজানগর’ ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। এছাড়া ‘অন্তরের কথা’ লাইভ অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালি ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!