তৎকালীন-গ্রামের-চিত্র
আত্মজীবনী,  আহম্মদপুর,  দ্বারিয়াপুর,  বিরাহিমপুর,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য,  স্মৃতিচারণ

তৎকালীন গ্রামের চিত্র

তৎকালীন গ্রামের চিত্র ও শৈশবের পালা-পার্বন

তাহমিনা খাতুন

 

তৎকালীন গ্রামের চিত্র

আমাদের ছেলেবেলার দ্বারিয়াপুরের সাথে বর্তমানের দ্বারিয়াপুরের এখন আর কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর বা তার আগের দ্বারিয়াপুর ছিল ঘন বন-জঙ্গল, বিশাল বিশাল তেঁতুল গাছ, বিশাল আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, জামরুল ইত্যাদি গাছ-গাছালিতে ভরপুর। ছিল তাল, খেজুর, নারকেল, সুপারি। এক শান্ত গ্রাম। ভোর হওয়ার সাথে সাথেই পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠত চারিদিক।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই শোনা যেত শেয়ালের হুক্কাহুয়া রব। বনবিড়াল, মেছো বাঘ (স্থানীয়ভাবে বলা হত বাঘ ডাঁশ) ঘরের আশেপাশে উঁকি-ঝুঁকি দিত। বাড়ির আশেপাশে ঝোপ জঙ্গলে সজারু, বেজী, বুনো খরগোশের (যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো লাফারু) এমনকি মাঝে মাঝে বুনো শুকরেরও দেখা পাওয়া যেত। বর্ষার শেষে মাঝে মাঝেই দেখা যেত এক পাল ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের পোষা শুকরের পাল নিয়ে গ্রামে হাজির হত এক শ্রেণির মানুষ। পোষা শুকরগুলো ছোট ছোট খানাখন্দে জন্মানো কচু বাগানে নেমে বুনো কচু খেয়ে উদর পূর্তি করে নিত। সেই পোষা শুকরের পাল দেখতে আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। শুকরের পাল যতক্ষণ পাড়ায় অবস্থান করতো,আমরাও ওদের পিছু পিছু ছুটতাম।

আমাদের শৈশবেই পাবনা নগর বাড়ি হাইওয়ের ঢালাই কংক্রিটের কাজ শুরু হলো। হাইওয়ে থেকে আমাদের গ্রামে ঢোকার হালটটি তখন ছিল কাঁচা রাস্তা। হালটের কাঁচা রাস্তাটি ‘লাঙ্গলখালি’ বিল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অল্প কয়েকটি বাড়ি ঘর ছিল তখন পাড়াটিতে। তারপরই ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ, যেগুলো ছিল মূলত কৃষি জমি। এই পাড়াটি এবং কৃষি জমিগুলো ছিল বিরাহিমপুর গ্রামের অংশ। বর্তমানে নদী ভাঙ্গন কবলিত ঘর বাড়ি হারানো দুর্দশাগ্রস্ত অনেক পরিবার এই গ্রামে বাড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করছে। দুর্দশাপীড়িত এই মানুষগুলোর বাসস্থান তৈরি করার কারণে আগের পাড়াটির সাথে আরও একটি নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। এক সময়ের লাঙ্গল খালি বিলটির অস্তিত্ব এখন বিলীন! পুরোটাই চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

আমাদের শৈশবে যে ছোট্ট বিলটি ছিল প্রাকৃতিক মৎসের আধার, মানুষের অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে তা আজ অস্তিত্ব বিহীন! আমাদের পাড়া বা আশেপাশের গ্রামে কোন পাকা বাড়ি ঘর ছিল না। সবই ছিল শনের বা টিনের ছাউনী দেয়া কাঁচা মাটির ঘর। আমার বড় ফুফুর বাড়িটি পরবর্তীতে পাকা দালানে রুপান্তরিত হয়। বর্তমানে দ্বারিয়াপুর বা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও খুব কমই কাঁচা বাড়ি ঘরের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। এমনকি যে সমস্ত পরিবারের লোকজন তুলনামূলকভাবে ভাল আর্থিক অবস্থানে থাকা লোকজনের কৃষি জমিতে বা বাড়িতে সহায়ক শ্রমিক হিসাবে শ্রম দিত, তাদের বাড়িতেও আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীসহ পাকা বাড়িঘর চোখে পড়ে।

প্রাকৃতিক ঘন বন-জঙ্গলের অস্তিত্ব এখন আর নেই। ঘন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তৈরি হয়েছে ফসলের জমি অথবা অপরিকল্পিত বিদেশী গাছের বাগান কিংবা ছোট বড় ফলের বাগান। বড় বড় বট, পাকুর, অশ্বত্থ, এমন কি বিশাল বিশাল আম, জাম, লিচু ইত্যাদি গাছ এখন আর দেখা যায় না। হালটের পাশ ঘেঁষেই কবর স্থানটি। কবর স্থানটি ছিল একসময়ে খন্দকার পরিবারের সম্পত্তি, যে কারণে কেবল মাত্র খন্দকার পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের কবর দেওয়ার জন্যই নির্ধারিত ছিল। যে কারণে আমরা দেখেছি খন্দকার পরিবারের বাইরের কারও মৃত্যু হলে তাকে ঐ পরিবারের নিজস্ব জমিতে কবর দেওয়া হত। বেশ অনেক বছর যাবত এই নিয়মটি বাতিল করে এটিকে সার্বজনীন কবরস্থান করা হয়েছে। কবরস্থানটির উপর ছিল বিশাল একটি বট গাছ।

আরও পড়ুন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

আমাদের শৈশবে দেখা বিশাল আকৃতির বট গাছটির সঙ্গে বর্তমানের বট গাছটির কোন মিলই এখন আর নাই। বট গাছটিতে সব সময়ই অসংখ্য শকুন বাসা করে থাকত! মানুষ এবং পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু এই পাখিটির অস্তিত্ব কেবল মাত্র দ্বারিয়াপুর গ্রামেই নয়, সমগ্র পৃথিবীতেই বিপন্ন! যে কারণে এই পাখিটির বংশ বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। ছিল বড় বড় তাল গাছ। তাল গাছ জুড়ে ঝুলতো অসংখ্য দৃষ্টি নন্দন বাবুই পাখির বাসা! বিশালাকৃতির গাছ-পালা না থাকার ফলাফল মানুষ ভয়ঙ্কর ভাবেই উপলব্ধি করছে। প্রতি বছরই বজ্রপাতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটছে। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই বিশালাকৃতির বৃক্ষ প্রয়োজন। কবরস্থানটির এক কোণায় যেখানে খন্দকার পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কবরগুলো রয়েছে-ছিল একটি কাঠ গোলাপ গাছ।বছরের অনেকটা সময় জুড়েই গাছটি সাদা রঙের ফুলে ভরা থাকতো। এর মিষ্টি সুবাসে ছড়িয়ে পড়তো আশপাশ জুড়ে।

কয়েক বছর আগেও বাস অথবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করলেও হালট ধরে পায়ে হেঁটেই আমাদের পাড়ায় প্রবেশ করতে হত। এখন আর আগের সে অবস্থা নাই। ছোট গাড়ি, মাইক্রোবাস বা রিক্সায় বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া যায়। যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতির কারনে বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল বলে এখন আর কোন এলাকা আছে বলে মনে হয় না।এ প্রসঙ্গে যাযাবরের দৃষ্টিপাত স্মৃতিচারনা মূলক গ্রন্থের একটি অসাধারন উক্তি মনে আসে,” বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে গতি? কেড়ে নিয়েছে যতির আনন্দ!”

 

শৈশবের পালা-পার্বন

আমাদের বাল্য কালের উদযাপিত উৎসবগুলোর মধ্যে ধর্মীয় উৎসবগুলো বেশী প্রাধান্য পেত। যেমন- মহররম, দুই ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর, শবে মেরাজ। এই উৎসবগুলো সামাজিক ভাবে পালন করা হত। সমাজের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এসব উৎসবে অংশগ্রহণ ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার।

আরবী মহররম চাঁদের দশ তারিখে বিভিন্ন বাড়িতে পায়েস অথবা খিচুড়ি রান্না হত এবং তা গ্রামের মসজিদে পাঠানো হত। ছোট বেলায় মাকে দেখেছি, খুব ভোরে উঠে পায়েস রান্না করে মসজিদে পাঠাতেন। মসজিদে উপস্থিত মুসুল্লী বা ছোট ছেলে মেয়েরা এই সব খাবারের ভাগ পেত। আবার সবে মেরাজ অর্থাৎ রজবের চাঁদের সাতাশ তারিখেও একই ভাবে পায়েস বা খিচুড়ি রান্না হতো এবং সমাজের সবাই মিলে সমাজের প্রধান যিনি থাকতেন, তাঁর বাড়ির উঠানে কলাপাতায় করে গরীব, ধনী নির্বিশেষে সবাই এসব খাবারে অংশ নিতেন। এক্ষেত্রে ছোট বড়র মধ্যে কোন পার্থক্য করা হতো না।

শবে বরাতের উৎসবের আয়োজনটা ছিল অপেক্ষাকৃত জমকালো ধরনের। শবে বরাতে আয়োজন চলতো বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। শবে বরাতের প্রধান অনুসঙ্গ হালুয়া, রুটি। আতপ চাল দিয়ে ঢেঁকিতে তৈরি হত আটা। একই সাথে হালুয়ার জন্য তৈরি হত সুজি। আর তৈরি হতো ‘হাতে কাটা’ সেমাই। কে কত মিহি করে সেমাই কাটতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলতো। শবে বরাতের দিন বাড়ি বাড়ি চলতো রুটি বানানোর ধুম। কে কত দক্ষতায় পাতলা ফিনফিনে রুটি বানাতে পারে, চলতো সেই প্রতিযোগিতাও। আর আমাদের ছোটদের দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন বাড়িতে হালুয়া, রুটি বিলানো।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

রোজার মাসটা ছিল আরও আনন্দের। আমাদের পাড়াটা ছিল খুবই ছোট। আমরা খন্দকার বাড়ির ছিলাম দুই পরিবার। আমরা আর আব্বার আপন চাচাত ভাই মরহুম খন্দকার আব্দুর রশীদের পরিবার। ওনাকে আমরা ছোট কাকা বলে ডাকতাম। আব্বার আপন ভাই আমাদের আপন চাচা আমাদের পাড়া থেকে অল্প দূরে বাড়ি করে সেখানে বসবাস করতেন। আমাদের চাচাতো, ফুফাতো ভাই বোনদের মধ্যে ছিল অসম্ভব আন্তরিকতার সম্পর্ক।

ফুফাতো ভাই বোনেরা আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন। ওঁদের ছেলেমেয়েরা ছিল আমার খেলার সাথী।
ছোট কাকার ছিল চার মেয়ে। পাশাপাশি ঘরে বসবাস করায় রোজায় বা অন্য যে কোন উৎসব আনন্দে ছোট কাকার মেয়েদেরকেই আমরা বেশী কাছে পেতাম। আমাদের ছোট্ট পাড়ার আর চারটি পরিবার ছিল কাজী পরিবার।

আরও প্রবন্ধ সমকালীন ভাবনা

আমাদের ছোট বেলায় আমাদের পাড়ায় কারোরই ঘড়ি ছিল না। যে কারণে আমাদেরকে নির্ভর করতে হতো আকাশের তারার উপর। আব্বা তারা দেখে খুব ভাল সময় বুঝতে পারতেন। একটি নিয়ম ছিল, যে পরিবারেরই সেহরি খাওয়ার সময় ঘুম ভাঙবে, তারা অন্য পরিবারের লোকজনকে সেহরি খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে ডেকে তুলবে। বেশীর ভাগ বাড়িতেই সেহরির জন্য শেষ রাতে ভাত রান্না হত। গরম ভাতের সাথে আলু, বেগুন শীম বা পেঁপে ভর্তা। শীতকালে রোজার সময় সেহরি খেতে কষ্ট হলেও বিষয়টা এত আনন্দদায়ক ছিল, যে কোন কষ্টই কষ্ট মনে হতো না। সেহরি খাওয়ার পর চাচাতো বোনদের সাথে চলতো আড্ডা, হই হুল্লোড়! আর সারা রোজার মাস ধরেই ঈদের জন্য চলতো দিন গণনা। ঈদের তিন চার দিন আগে থেকেই চলতো ঈদুল ফিতরের আয়োজন।

আমাদের ছোট বেলায় অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, ছিল প্রাণের প্রাচুর্য।

বেশীর ভাগ ঈদেই আমাদের নতুন কাপড় হতো না। কিন্তু তাতে আমাদের কোন আক্ষেপ ছিল না। পুরনো কাপড় সোডার পানিতে সিদ্ধ করে কখনো বা তাতে ভাতের মাড় দিয়ে, লোহার ইস্ত্রীতে কাঠ কয়লা ভরে, তাল পাতার পাখার বাতাসে, কয়লার আগুনে ইস্ত্রী গরম করে নিয়ে, সেটা দিয়ে ইস্ত্রী করে নেওয়া হত। চলতো মাটির ঘর লেপে নেওয়া, উঠান, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। ঈদের আগের দিন চলতো মেহেদী গাছ থেকে মেহেদীর পাতা তুলে বেঁটে গভীর রাত পর্যন্ত হাতে লাগানো এবং ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কার মেহেদীর রঙ কত বেশী লাল হয়েছে, চলতো তার প্রতিযোগিতা।

আরও পড়ুন  গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

এরপর যার যে কাপড় থাকতো তাই পরে, কিছু প্রসাধনী মেখে-আমাদের ছোট বেলায় প্রসাধনী বলতে ছিল ক্রীম, পাউডার, হাতে তৈরি কাজল (সর্শের তেলের সলতে জ্বালিয়ে সিরামিকের ভাঙ্গা প্লেটের টুকরা সলতের উপরে ধরলে যে কালি পড়তো তাই হত আমাদের হাতে তৈরি কাজল) শুরু হতো আমাদের সবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুরুব্বীদের সালাম করা। মুরুব্বীরা কেউ কেউ এক আনা বা দু’ আনা ঈদের বখশিশ দিতেন। এ ছাড়া সব বাড়িতেই সেমাই, খিচুড়ি, পায়েস খাওয়ার জন্য ছিল অবারিত দ্বার। সন্ধ্যায় সমাজের অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো থেকে সংগৃহীত খিচুড়ি আর পায়েস সমাজ প্রধানের বাড়ির আঙ্গিনায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কলা পাতা নিয়ে বসে খেতেন। উদ্দেশ্য ছিল ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করা।

দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ছিল ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানীর ঈদ। স্বামর্থবান পরিবারগুলো গরু, ছাগল বা ভেড়া কোরবানী দিত। অনেকেই নিজেদের গৃপালিত গরু-ছাগল থেকে কোরবানী করতেন। আবার অনেকে কোরবানী দেওয়ার উদ্দেশ্যে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গরু-ছাগল পুষতেন। কোরবানীর ঈদে সাধারণত নতুন কাপড় কেউই কিনতেন না, কারণ কোরবানীর পশু কিনতে একটা বড় অংকের অর্থের জোগাড় রাখতে হত।

আরও পড়ুন একটি বহুল কাঙ্ক্ষিত আইনী সংশোধনী

প্রতিবছর গরু কোরবানী দেওয়ার সামর্থ আমাদের পরিবারের ছিল না। যে বছর গরু কোরবানী দেওয়া হতো না, সে বছর খাসী কোরবানী করা হত। অন্য অনেক গ্রাম বা পাড়ার মতো আমাদের পাড়া সমাজভূক্ত ছিল। সমাজভূক্ত মানুষগুলোর সুযোগ ছিল আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-বেদনা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ। কোরবানীর ঈদে কোরবানীর মাংস ভাগাভাগি করার চমৎকার একটি নিয়ম ছিল আমাদের পাড়ার সমাজভুক্ত মানুষগুলোর।

যে সব পরিবারে কোরবানী করা হত, কোরবানীর পশুর মাংস প্রথমে অর্ধেক ভাগ করে একভাগ পশুর মালিককে দেওয়া হত, বাকী অর্ধেক সমাজের অন্তর্ভূক্ত লোকজনের জন্য রেখে দেওয়া হতো। এ কারণে আমাদের যে বছর গরু কোরবানী দেওয়া হতো না, সে বছরও সমাজের আর দশ জন যে পরিমাণ মাংস পেতো, আমরাও সেই একই পরিমান মাংস পেতাম। ফলে সামর্থহীন পরিবারগুলো বছরে একবার অন্তত গরু বা খাসীর মাংস খাওয়ার সুযোগ পেত। পরবর্তীতে আমার আরও কিছু গ্রামের কোরবানীর মাংস বণ্টন দেখার সুযোগ হয়েছে, যখানে এ ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় ঐ সব গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বছরে অন্তত একবার সম্মানজনক ভাবে মাংস খাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। তাদেরকে নির্ভর করতে হত কোরবানী দাতার দয়া দাক্ষিণ্যের উপর!

সার্বজনীন উৎসবগুলোর মধ্যে প্রধানতম ছিল নববর্ষের উৎসব বা হালখাতা। পুরনো বছরের হিসাবপত্র শেষ করে নতুন বছরের জন্য ব্যবসার হিসাবের খাতা খোলা উপলক্ষ্যেই এই উৎসব পালন করা হত। বাংলা বছরের প্রথম দিন কোন দোকানে কিছু কিনতে গেলে আমরা বাতাসা, কদমা, খোরমা নামের মিষ্টি জাতীয় খাবার উপহার হিসাবে পেতাম। এছাড়া নতুন ধান ঘরে তোলার পর পিঠা, চিড়া, পায়েস তৈরির একটা উৎসব চলত। বিশেষত অঘ্রাহায়ণ মাসে নতুন ধান যখন ঘরে তোলা শেষ হত, তখনই উৎসবের আমেজটা পুরোপুরি জমে উঠত। আমাদের ছেলেবেলায় অঘ্রাহায়ণ মাসেই বেশ শীতের আমেজ অনুভব করা যেত। বৈশ্মিক উষ্ণায়নের সর্বনাশা ছোবল তখনো এত তীব্রভাবে পৃথিবীকে গ্রাস করে নি। বন-জঙ্গল,পাহাড়, নদী, খাল-বিল ধ্বংস করার উন্মত্ত নেশা আচ্ছন্ন করেনি তখনো মানুষকে।

আরও পড়ুন কামাল লোহানীর বিপ্লব মন্ত্রের প্রথম পাঠশালা

আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি মাঠে চাষের জমিগুলো ছাড়া এ পাড়া থেকে ও পাড়া যেতে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু পায়ে চলা রাস্তা ধরেই যাতায়াত করতে হত। বর্তমানে সে ঘন জঙ্গলের চিহ্ন মাত্রও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে তৈরি হয়েছে, চাষের জমি অথবা ছোট ছোট ফলের বাগান। অথচ ঐ ঘন জঙ্গলের ভিতরেই ছিল আম, জাম, লিচু,কাঁঠাল ইত্যাদি সুমিষ্ট ফলের বিশাল বিশাল গাছ। যে লাঙ্গলওখালি বিল এক সময়ে ছিল শোল,বোয়াল,কই ,শিং মাগুর ইত্যাদি সুস্বাদু মাছের আধার, এখন সেখানে শুধুই চাষের জমি। যে হালটে বর্ষাকালে আমরা কলা গাছের ভেলায় চড়ে দুষ্টুমীতে মেতে উঠতাম, এখন সেই হালট পাকা রাস্তা! পাবনা নগরবাড়ি হাইওয়ে থেকে প্রাইভেট কার এখন দ্বারিয়াপুরের বিভিন্ন বাড়িতে যাতায়াত করে।

মানুষের বিলাসী জীবনের যোগান দিতে প্রকৃতিকে দিতে হচ্ছে আত্মাহুতি, প্রকৃতিও বসে নেই, প্রকৃতির ভয়ঙ্কর প্রতিশোধে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সমস্ত রুপ-রস, হারাচ্ছে শান্তি, হারাচ্ছে স্বস্তি!

ভাদ্র আশ্বিন মাসে তাল পাকলে বিভিন্ন বাড়িতে তালের রসের পিঠা অথবা নারকেল আর গুড় দিয়ে চালের রস ঘন করে জ্বাল দিয়ে চিড়া-মুড়ি দিয়ে খাওয়া হত। কার্তিক মাসের শেষের দিকেই চলতো গ্রামের খেজুর গাছগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। অঘ্রাহায়ণ মাসের শেষ দিক থেকেই রস সংগ্রহ করে খেজুর রসের গুড় পাটালি দিয়ে পিঠা পায়েসের উৎসব।সারা শীত কাল জুড়েই চলতো এই উৎসব।

আরও পড়ুন যাপিত জীবনের কথকতা-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ পর্ব
১১তম
১২তম
১৩তম
১৫তম

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

তৎকালীন গ্রামের চিত্র

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বাড়িয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!