তবুও-ভালবাসলাম-১ম-পর্ব
গল্প,  সাহিত্য

তবুও ভালোবাসলাম (১ম পর্ব)

তবুও ভালোবাসলাম (১ম পর্ব)

শাহানাজ মিজান

 

ফারিহা অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে বাসর ঘরে। বিয়ে বাড়িতে আগতো সমস্ত মেহমান হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। আর কারো কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ফারিহা ওয়ালক্লকটার দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত প্রায় তিনটে বাজে। ফেব্রুয়ারি মাস। শেষ রাতে বেশ শীত শীত লাগছে। সেই রাত বারটার আগেই সবাই ফারিহাকে বাসর ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেল কিন্তু এত রাত হয়ে গেল ইমন এখনো এলো না। বারান্দায় বসে আছে। এই শীতের মধ্যে বারান্দায় এভাবে বসে আছে, ঠান্ডা লেগে যাবে। ফারিহা সবই বুঝতে পারছে আর ভাবছে – আমার কি একবার যাওয়া উচিৎ? 

ইমন একটার পর একটা সিগারেট খেয়েই যাচ্ছে। ফারিহা এসে ডাকলো-  রাত প্রায় শেষ, শোবেন না? 

ইমন চমকে উঠে ফারিহার দিকে তাকালো, কোন কথা না বলে ঘরে এসে বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো। ফারিহাও কিছু না বলে বারান্দায় চলে এলো। কিছুক্ষণ পর ফজরের আযান হলো। ফারিহা নামাজ পড়ে শুয়ে পরলো। 

কখন যে আটটা বেজে গেছে কেউ টের পায়নি। ইমনের ছোটবোন ইরিনা এসে দরজা নক করলো। ফারিহা ইমনকে ডেকে বিছানায় দিয়ে তারপর দরজা খুললো বিয়ে উপলক্ষে অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও এসেছে। তাদের মধ্যে ইমনের বড় চাচার ছেলের বউ শিরিন ভাবী এগিয়ে এসে ফারিহাকে কানে কানে বললো- কি কেমন কাটলো রাত?

ফারিহা: ( লজ্জা মিশ্রিত লাজুক হেসে) সবার যেমন কাটে।

শিরিন ভাবী: সব ঠিক ছিলো তো?( ঠাট্টা করে) 

ফারিহা: হুম, সব ঠিক।

শিরিন ভাবী: তো তোমার বরটাকে ডেকে ওঠাও। দুজনে ফ্রেস হয়ে ডাইনিংয়ে চলে এসো।

ফারিহা: ঠিক আছে ভাবী, আপনারা যান, আমরা আসছি।

ইরিনা: ইস ভাবী, তুমি এত সুন্দর কেন বলতো?

ফারিহা: ( মুচকি হেসে) তাই? তুমিও তো অনেক সুন্দর।

ইরিনা: তবুও তোমার মতো নই!

শিরিন ভাবী: চল, গল্প পরে করবি, অনেক কাজ পরে আছে।

আরও পড়ুন গল্প বাক্সবন্দী প্রেম

ওরা চলে গেলে, ফারিহা ইমনকে ডেকে উঠালো। দুজনেই ফ্রেস হয়ে ডাইনিংয়ে এলো। সকালের নাস্তা করার পর সবাই বসে অনেক কথাবার্তা হলো। আজ এ বাড়িতে বৌভাতের অনুষ্ঠান। বাড়ি ভর্তি মেহমানদের যাওয়া আসা। সবাই বউ দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রতিবেশি খান সাহেব এবং তার স্ত্রী তো ইমনের মা বাবাকে বলেই ফেললেন- কি যে সুন্দর বউমা হয়েছে আপনাদের, কি আর বলবো! আমাদের ছেলেটা তো বিদেশ রয়েছে, পড়াশোনা করছে, দোয়া করবেন ভাবী, আমাদের ছেলের জন্যও যেন এমন সুন্দর একটা মেয়ে পাই। 

ইমনের মা: আপনারা ও দোয়া করবেন ভাবী, আমাদের ছেলে – বউমা যেন খুব সুখী হয়। খান সাহেব: ইনশাআল্লাহ্, অনেক সুখী হবে।

খান সাহেবের স্ত্রী : শুনেছি, একটা মানুষ নাকি সবদিক দিয়ে সুন্দর হয়না, কিন্তু আপনাদের বউমাকে দেখে তো সব জানাশোনা মিথ্যে হয়ে গেল। যেমন দেখতে উচু- লম্বা, তেমন গায়ের রং, তেমনি উচ্চ শিক্ষিত, আর কি সুন্দর মিষ্টি করে কথা বললো। 

খান সাহেব: তা ভাই সাহেব, বউমাকে কি অন্য কোম্পানিতেই চাকরিটা করতে দিবেন, নাকি ইমনের সাথে নিজেদের কোম্পানির হাল ধরবে?

ইমনের বাবা: আসলে এ ব্যপারে এখনো কোনো কথা হয়নি। কি বলুন তো ভাই সাহেব, ফারিহা মা, আমার প্রিয় বন্ধুর একমাত্র সন্তান। ওর নিজস্ব স্বাধীনতায় আমরা কিছু বলতে চাইনা। তাছাড়া, সবেমাত্র বিয়েটা হলো। যাক কিছুদিন, তারপর ওরা স্বামী স্ত্রী মিলে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তো সেখানে আমাদের আর কি বলার আছে বলুন! 

খান সাহেব: জ্বী, ভালোই বলেছেন। তো ভাই সাহেব, আজ আমরা তাহলে আসছি। 

ইমনের বাবা- মা, আত্মীয় – স্বজনদের কাছে বউমার প্রশংসা শুনছেন, তাদের খুব ভালো লাগছে, হাসিমুখে সবাইকে বিদায় জানাচ্ছেন।

ইরিনা, তো চড়ুই পাখির মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, পেছনে দশ- বারোজন বান্ধবী। খুব হৈ- হুল্লোড় করছে। 

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

যথারীতি সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হলো। ফারিহা আজ বাবার বাড়িতে এলো। ফারিহা, খেয়াল করছে, এখনো পযর্ন্ত ইমন ফারিহার সাথে কোন কথা বলেনি, কিন্তু আত্মীয় সজন সবার সাথে বেশ হাসিমুখে কথা বলছে। ফারিহার  মা বাবা আত্মীয় স্বজন ও খুব খুশি এমন একটা সুন্দর  জামাই  পেয়ে।  বিয়ের রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান, সমস্ত নিয়মকানুন করতে করতে দশদিন কেটে গেলো। এর মধ্যে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া, মুখে কোনো কথা হয়নি। ফারিহা যদিও নিজ থেকে কথা বলতে চেয়েছে কিন্তু ইমন পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। ফারিহা ঠিক বুঝতে পারছেনা, ব্যপারটা কি!

রাতে শোয়ার সময় আজও ইমন বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো।

ফারিহা: (কোন ভনিতা না করেই সরাসরি ) এই বিয়েটা আপনি ইচ্ছে করে করেননি।  বিয়েতে রাজি ছিলেন না, তো বিয়েটা করলেন কেন?

ইমন: (একটু চমকে উঠে ফারিহার দিকে তাকিয়ে) বাবার কথা রাখতে।

ফারিহা: বাবার বাধ্য ছেলে বটে,  তা বাবার কথা রাখতে বলির পাঠা, আমাকেই পেলেন? 

ইমন: তো কি করতাম?

ফারিহা: একটি বার আমাকে ফোনে বলতে পারতেন, আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান না, অন্য কাউকে পছন্দ করেন। আমি সব ম্যানেজ করে নিতাম। এ বিয়ে ক্যানসেল করে দিতাম। আমার ফোন নম্বর আপনি তো জানেনই।

ইমন: বাবা মা আমাকে জোর করেছে।

ফারিহা: আপনি কি ছোট বাচ্চা? জোর করে মুখের মধ্যে খাবার ঢুকিয়ে দিলো আর আপনি গিলে ফেললেন?

ইমন: আপনি বুঝতে পারছেন না, সিচুয়েশন অন্য রকম ছিলো- – — – –

ফারিহা: দেখুন, আমি একেবারেই অবুঝ নই। আমার সম্বন্ধে নিশ্চয়ই আপনি সব শুনেছেন।  আমি একজন আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার, লেখাপড়া শেষ করে দেশের একটা নামী কোম্পানিতে জব করছি। আপনি যা করছেন- এসব বোঝার মতো যথেষ্ট জ্ঞান বুদ্ধি আমার আছে। বিয়ে থেকে শুরু করে আজ এখন পযর্ন্ত যে আচরণ আপনি আমার সাথে  করেছেন, তাতে অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো কেঁদে কেঁদেই অস্থির হতো। হয়তো পরিবারের সবাইকে সবকিছু বলেও দিতো কিন্তু তার কিছুই করিনি।

আরও পড়ুন গল্প  হাতের চুড়ি

দেখুন, আমি ও আমার মা বাবার একমাত্র সন্তান। আমার জন্মের সময় মায়ের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, ডাক্তার বলেছিলেন আমার মা আমাকে জন্ম দেওয়ার পর আর কখনো মা হতে পারবেনা। তাই বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে তাদের স্বপ্ন পূরন করতে চেয়েছি। স্কুল -কলেজ ভার্সিটিতে যে বন্ধুদের সাথে মিশিনি তা নয়, তবে কখনো সিরিয়াস কোনো রিলেশনশিপে নিজেকে জড়াইনি। আমার লক্ষ্য ছিলো ক্যারিয়ার নিয়ে। তাছাড়া বাবা বলতেন, তার বন্ধুর ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, তাই বিয়ের ব্যাপারে আলাদা করে কিছু ভাবিনি। বাবা মা আমাকে বললেন, বিয়ের বয়স হয়েছে, বিয়ে করতে হবে, তাই তাদের কথামতো বিয়ে করে ফেললাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা, আপনি অন্য কাউকে পছন্দ করার পরও কেন আমাকে বিয়ে করলেন? 

ইমন:  বলতে পারেন ঐ একই ব্যাপার! আপনার বাবা আর আমার বাবা দুজন বন্ধু। অনেক আগেই নাকি তারা আমাদের বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন। আমি বন্যা কে পছন্দ করি কিন্তু বাবা কিছুতেই বন্যাকে পছন্দ করলেন না। বললেন- বন্যা নাকি ভালো মেয়ে নয়, তারপর বাবা একজন হার্ট পেশেন্ট, আবার বললেন- আপনাকে বিয়ে না করলে আমাকে ত্যাজ্য করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কি বলবো বলুনতো? আমি আপনাকে বিয়ে করতে বাধ্য হলাম।

তবুও ভালোবাসলাম গল্পের-
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

তবুও ভালোবাসলাম (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!