জারজ-১ম-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

জারজ (১ম পর্ব)

জারজ (১ম পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

জজকোর্টের তিন নম্বর এজলাসের সামনে বেশ কিছু সাধারণ লোকের সমাগম। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বস্তির অধিবাসী। তারা স্থানীয় একটা গার্মেন্টসের কর্মী। মাসখানেক আগে গার্মেন্টসের সুপারভাইজার ইদ্রিশ আলী নৃশংসভাবে খুন হয়েছিল। কেন হয়েছিল তার কুলকেনারা পুলিশ আজ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি। পুলিশের ভাষ্যানুযায়ী এলাকায় অল্প পরিচিত একজন যুবক নিজে জঘন্য হত্যাকারী পরিচয় দিয়ে  থানায় ধরা দিয়েছিল। এ সংক্রান্ত কথিত যুবকের স্বীকারোক্তি এবং প্রমাণস্বরপ একখানা  রক্তমাখা খুর আর তার ব্যবহৃত পোশাক। এছাড়া আর কোন সাক্ষী পুলিশ সংগ্রহ করতে পারেনি। হত্যাকারীর  সঠিক পরিচয় জানা যায়নি।

যুবকটির স্বীকারোক্তি থেকে এটুকু জানা গেছে, সে একটা মোটর গ্যারেজে মেকানিক্সের কাজ করত। গ্যারেজের মালিক বা অন্যদের থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, যুবকটি প্রায় সাত-আট বছর এ গ্যারেজে কাজ করে আসছে। চাল-চলন-স্বভাবে এবং কথা-বার্তায় খুবই ভাল। কারো সাথে কোন দুর্ব্যবহার করেছে বলে কেউ বলেনি। তবে সে একটু চাপা ধরনের ছেলে। মাঝে মাঝে চুপচাপ কি যেন ভাবতো এবং কাঁদতো। জানতে চাইলে কোন জবাব দিতো না বরং বিরক্তবোধ করত। বস্তির যে খুপরিতে যুবকটি রাতে ঘুমাতো, সেখানে পুলিশ তল্লাশী করে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পায়নি যা দ্বারা তদন্তের সুবিধা হয়। হুমায়ুন আহমেদের লেখা উপন্যাস হিমু এবং মিসির আলীর পুরাতন বইসহ কিছু পুরানো পত্রিকা পেয়েছে। যুবকটির কোনো আইডি কার্ড ছিলো কিনা জানা যায়নি। পুরোটাই রহস্যে আবদ্ধ। সে পুলিশকে বলেছে, যা বলেছে সত্য বলেছে,  বাকীটা কোর্টে বলবে।

আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

এদিকে নিহত ইদ্রিশ আলী এলাকায় প্রায় পনের বছর ধরে ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছে। সে স্থানীয় একটা নামকরা গার্মেন্টসের সিনিয়র সুপারভাইজার। তার স্ত্রী অন্য একটা গার্মেন্টসে কর্মরত। তাদের দুটো মেয়ে সন্তান। সে একজন নিরীহ এবং নামাজী ব্যক্তি ছিল। প্রয়োজন ছাড়া তাকে বাইরে বেশি দেখা যেতো না। সে হিসেবে এলাকায় খুব একটা পরিচিত ছিল না। নিহত হওয়ার পর পরিচিতি পেয়েছে। লোকজনের মধ্যে বদ্ধ  ধারণা জন্মেছে, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। গার্মেন্টেস কর্তৃপক্ষ এবং নিহতের স্ত্রীর ইচ্ছেয় মামলা রুজু করা হয়েছে। তাই  আজ মামলাটির প্রথম শুনানী হবে। বস্তি এবং এলাকাবাসীর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে যারা বাড়ি-ঘর ভাড়া দেয় তাদের কাছে তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই।

এজলাসে  উপস্থিত উৎসুক বস্তিবাসী অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে কখন জজ সাহেব আসবেন। তাদের  ধারণা যারা বিচার করেন তারা সবাই জজ। যুবকটিকে নিয়ে বস্তিবাসীর  বেশি আগ্রহ, কারণ তারা যুবকটিকে অত্যন্ত ভদ্র এবং নিরহ হিসেবে এতদিন জেনে এসেছে। এহেন জঘন্য কাজ তার দ্বারা সংগঠিত হয়েছে  বলে তারা  বিশ্বাস করতে পারছে না। কেউ তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করতে চেয়েছে। পুলিশের ধারণা সেটাই ছিল। তবে সে যে ভাড়াটে হত্যাকারী নয়, এটা নিশ্চিত হতে পেরেছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন গল্প নীরুর মা

কাঁটায় কাঁটায় সকাল দশটা। এজলাসে ঢুকলেন মাননীয় বিচারক নাসরিন জাহান হেনা। দেখেই বুঝা যায় একজন বুদ্ধিমতী বিচারক। শুধু তাই নয় যথেষ্ট ব্যক্তিসম্পন্ন বিচারক। এজলাসে উপস্থিত সবাই চুপচাপ। সাড়া শব্দহীন এজলাস কক্ষটি। মাননীয় বিচারক টেবিলে রাখা নথিপত্র দেখে আজকের মামলা শুনানির জন্য পেশকারকে নির্দেশ দিলেন। পেশকার বিচারক মহোদয়ের অনুমতিক্রমে আজকের ফৌজদারী মামলার নম্বরসহ এজাহারভুক্ত  আসামীকে কাঠগড়ায় আসার জন্য উচ্চস্বরে ডাক দিলে দুইজন পুলিশ, উনিশ-বিশ বছর বয়সী একজন যুবককে কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করাল। যুবকটির দুটো হাত হ্যান্ডকাপ পরানো। পরনে জিন্সের প্যান্ট এবং গায়ে লাল রঙের টি-শার্ট। শার্টের সামনে ঠিক বুকের ওপরে চে গুয়েভারার মুখচ্ছবি। পায়ে চামড়ার স্যাণ্ডেল। আয়ত চোখ। চুলগুলো কুঁকড়ানো এবং অগোছালো। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণের। এক কথায় যাকে বলে সুদর্শন। নির্ভয় মুখমণ্ডল। ভাবলেশহীন চেহারা।

উপস্থিত যারা যুবকটিকে চেনেন না, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোন বিপথগামী ছাত্র। কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর ভাড়াটে গুণ্ডা হয়ে খুনখারাবী করে বেড়ায়। তাই পুলিশের হাতে ধরা পরেছে। এজলাজের ভেতরে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিচারক মহোদয় অর্ডার অর্ডার বলে সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন। মাননীয় বিচারক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামী যুবকটির দিকে কিছুক্ষণ সন্তর্পণে একনজর দেখে নিলেন। কি সুন্দর মায়াভরা চেহারা। মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন। তিনি একজন বিচারক। বিচারক আসনে কোন আবেগ নেই। সবার জন্য ন্যায় বিচার। এখানে পক্ষপাতিত্বের কোন স্থান নেই। তবুও মনের ভেতরে প্রশ্ন জাগে, এমন একটা সুশ্রী চেহারার যুবক মাডারকেসের আসামী? চেহারা মানুষের আসল পরিচয় নয়। বিচারকী জীবনে কত রকমের ঘটনার সাথে পরিচিত হয়েছে। মামলার রায় প্রদান করেছে। এমনও মামলার রায় দিতে হয়েছে  যার  প্রমাণের অভাবে আসল দোষী খালাস পেয়েছে। বিচিত্র আমাদের সমাজ। তিনি একজন বিচারক। তার কাছে আবেগ মূল্যহীন। চাই প্রমাণ।

আরও পড়ুন ভৌতিক গল্প অশরীরী আত্মা

বাদী পক্ষের উকিল আসামীকে কিছু প্রশ্ন করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলে, মাননীয় বিচারক অনুমতি মঞ্জুর করলেন। বাদী পক্ষের উকিল এসে আসামীর সামনে দাঁড়ালেন। ফৌজদারী মামলার জাঁদ্দরেল উকিল জনাব হাসমত আলী মুন্সী। নাকের নিচে সাদা লম্বা গোঁফ। শকুনি চাহনি। এই হাসমত আলী উকিল আসামীর পেটের ভেতর হতে সত্য কথা বের করে ছাড়েন। একবার চোখের দিকে তাকালে আসামীর পরান পাখী উড়ু উড়ু করে। মিথ্যে বলার তো দূরের  কথা, নিমিষে বুকের ভেতর কাঁপন  শুরু হয়ে যায়।

উকিল হাসমত আলী তার স্বভাবসুলভ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন আসামীর চোখের দিকে। উকিল সাহেব ভেবেছিলেন তার শকুনি দৃষ্টিতে আসামী কুপোকাত হয়ে যাবে। কিন্তু জাঁদ্দরেল উকিল হাসমত আলী নিজেই থতমত খেয়ে গেলেন। আসামীর চোখের দৃষ্টিতে প্রতিহিংসার আগুন। দীর্ঘ জীবনে ফৌজদারী মামলার পক্ষে উকালতি করে আসছেন, এমন চাহনি তো কখনো কোন আসামীর চোখে দেখেননি। চোখের ভেতরে আগ্নেয়গিরির আগুন জ্বলছে। কিসের প্রতিহিংসা? আবার দেখেও মনে হয় ভদ্র ঘরের শান্ত-স্বভাবের ছেলে। আইনজীবি পেশা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এ কেমন আসামীকে পেলেন। তাই বেশি সময় ব্যয় না করে একটু নরম সুরে প্রশ্ন করলেন,

_তোমার নাম?

_নাসিম।

_শুধু নাসিম? মানে নামের আগে পিছে কিছু আছে কি-না?

_না। শুধু নাসিম।

_ঠিক আছে। বাবার নাম?

_জানা নেই।

_মানে?

যা জানি না, তার উত্তর -“না।”

আরও পড়ুন গল্প  বাক্সবন্দি প্রেম

আসামী  দৃঢ়তার সাথে উকিলের প্রশ্নের উত্তর শুনে মাননীয় বিচারক অবাক হলেন।

_মাননীয় বিচারক। আসামী তো কোন প্রশ্নের সদুত্তর দিচ্ছে না। এতে মামলা পরিচালনা করা সম্ভবপর হবে না।

_আপনি বসুন।

মাননীয় বিচারক আসামীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

_আপনার নিযুক্ত কোন উকিল আছে কি?

_জ্বী না।

_আপনি তো পুলিশের কাছে  হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

_Absolutely right. আমি নিজে তাকে হত্যা করেছি। আমি যখন স্বইচ্ছে- স্বজ্ঞানে পবিত্র আদালতে স্বীকার করছি এবং  যা জ্ঞাতসারে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছি। স্বীকারোক্তি পুলিশের কাছে জমা আছে। শুধু তাই নয়, প্রমাণাদি জমা দিয়েছি। এছাড়া এ বিষয়ে অতিরিক্ত  কোন কিছু বলার নেই হুজুর।

_তাহলে কি আপনি আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন না?

_জ্বী না। তবে মাননীয় আদালতের কাছে আমার বিনীত আর্জি। শাস্তি আমার যাই হোক না কেন মাথা পেতে নিবো। কিন্তু  তার আগে একজন মহিলাকে এই আদালতে উপস্থিত করা হলে মরেও শান্তি পাবো।

_সেই কথিত মহিলা কোথায় থাকে?

_হুজুর,আমি তার ঠিকানা পুলিশের কাছে দিতে চাই। পুলিশ ইচ্ছে করলে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে পারবেন।

বাদীর পক্ষের উকিল সাহেব আর্জি সমর্থন বিরোধীতা করেন। কিন্তু মাননীয় বিচারক কথিত মহিলার ঠিকানা পুলিশকে দিতে বললেন এবং পরবর্তী দুইদিন পর্যন্ত আদালত মুলতবি ঘোষণা করলেন। উক্ত দিনে অবশ্য মহিলাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন জারজ-
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

জারজ (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষাপাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!