একাত্তরের-অগ্নিঝরা-দিনগুলি
আত্মজীবনী,  আহম্মদপুর,  দ্বারিয়াপুর,  মুক্তিযুদ্ধ,  মুক্তিযুদ্ধে সুজানগর,  সাহিত্য,  সৈয়দপুর (আহম্মদপুর)

একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি 

একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি 

তাহমিনা খাতুন

 

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। সে নির্বাচনে  জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি ৮১টি আসনে জয়লাভ করে।

পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান, ৩ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আনন্দে উৎফুল্ল। সবার আশা এতদিনে বাঙ্গালীর হাতে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাঙ্গালীর স্বপ্ন ভঙ্গ হতে দেরি হলো না। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণ রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানকে উপেক্ষা করে এবং সংখ্যা লঘিষ্ঠ দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কুপরামর্শে ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

অপরিণামদর্শী ইয়াহিয়ার এই ঘোষণার সাথে সাথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংক্ষুব্ধ বাঙ্গালী তীব্র প্রতিবাদে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। সর্বত্র চলতে থাকে মিছিল আর স্লোগান। অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু  ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সর্বাত্মক হরতাল আহ্বান করেন। এর মধ্যেই সামরিক জান্তা পুনরায় ১০ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের ঘোষণা করেন। অন্যদিকে ঢাকা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে জনতার প্রতিবাদী মিছিলে গুলি করে শত শত মানুষকে হত্যা চলতে থাকে।

সবার সামনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগে কাটছে মানুষের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ। জাতির চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে সবারই অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনার জন্য। ঘোষণা করা হল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিবেন।

  আরও পড়ুন বীর প্রতীক আজিজুর রহমান

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তিনি দেশের ভবিষ্যত নিয়ে কি দিক নির্দেশনা দেন-তা জানার জন্য রমনা রেসকোর্স ময়দানে সেদিন জমায়েত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা রেডিও বা টেলিভিশনে সে ভাষণ সম্প্রচার করতে দেয়নি। সম্প্রচার করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে রেডিও, টেলিভিশনের কর্মকর্তা, শিল্পী কলাকুশলীগণ প্রতিবাদ স্বরুপ রেডিও, টেলিভিশনের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে, সামরিক জান্তা পরদিন সে কালজয়ী ভাষণ সম্প্রচার করতে বাধ্য হয়।

বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত তাৎক্ষণিক বক্তৃতা হিসেবে স্বীকৃত, সে বক্তৃতা, আমরা পরদিন রেডিওতে শুনতে পাই। মূলত সেই বক্তৃতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সেদিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাতেই পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে! বাস্তবিক অর্থে পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তান সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই আর কার্যকর ছিল না।

আমরা গ্রামে ছিলাম। গ্রামের মানুষের মধ্যেও ছিল তীব্র ক্ষোভ বা উৎকণ্ঠা। ওই সময় সবার বাড়িতে রেডিও ছিল না। যে বাড়িতে রেডিও ছিল, সে বাড়িতেই সংবাদ প্রচারের সময় ঘর, বারান্দা ছাড়িয়ে উঠান ভরে যেত। খবর জুড়ে থাকত প্রতিবাদী মানুষের মিছিলে পাকিস্তানী বাহিনীর গুলি চালানো এবং নৃশংসভাবে মানুষ হত্যার খবর। কারফিউ অমান্য করে অকুতোভয় জনতার রাইফেলের সামনে নিঃসঙ্কোচে বুক পেতে দেওয়ার ।

ইয়াহিয়া খান-ভুট্টোর গোপন শলা-পরামর্শ চলতে থাকে। ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান লাহোরে সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করলে বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলে তিনি যোগ দিবেন।

বাঙ্গালী নিধনের উদ্দেশ্যে ইয়াহিয়া খান ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে পরিচিত কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেন। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান  তার সেনাবাহিনীকে বাঙ্গালী নিধনে লেলিয়ে দিয়ে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমরেড প্রসাদ রায়

২৫ মার্চ ১৯৭১ সাল। রাত বারটায় অপারেশন ‘সার্চ লাইট’ নামে অপারেশনে বাঙ্গালী নিধনে নেমে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানই পরিণত হয় পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বধ্যভূমিতে! আগুনে দগ্ধ হতে থাকে বাংলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থান পরিণত হয় প্রথম লক্ষ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন হলে অবস্থানরত হলে ছাত্র-ছাত্রী, দেশপ্রেমিক পুলিশ, ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য, আনসার সদস্যগণ পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। মেয়েদের ধরে নিয়ে তাদের উপর চালানো হয় ধর্ষণসহ সব ধরনের বিভৎস নির্যাতন।

কোন বাঙ্গালী যেন ঘর থেকে বের হতে না পারে সেজন্য কারফিউ জারী করা হয় বিভিন্ন শহরে। বঙ্গবন্ধুকে ২৫ মার্চ রাতেই গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। গ্রেফতার হওয়ার আগেই তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যান।

আব্বা-মা’সহ মেজভাই, আমি, আমার ভাই বাসার, ছোট বোন তুষার আর আজাদ গ্রামের বাড়ীতে থাকতাম। এছাড়া পরিবারসহ বড় ভাই, বড় বোন ঢাকায়, তৃতীয় ভাই ও চাকুরী সূত্রে ঢাকায়, মেজ বোন খুলনায় এবং তৃতীয় বোন করাচীতে ছিলেন। এদের জন্যও ছিল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। এর মধ্যে বিভিন্ন গুজব বা উড়ো খবর আমাদের সীমাহীন উৎকণ্ঠাকে বাড়িয়ে দিত বহুগুণে! যেমন পঁচিশে মার্চ সামরিক জান্তা ঢাকাসহ বড় বড় শহর গুলিতে হত্যা, নির্যাতন, জ্বালাও-পোড়াওসহ  সব বিকৃত জয়োল্লাসে মেতে ওঠে। আমার বড় ভাই খন্দকার আবু তাহের ওই সময় আমার ভাবী ও বছর খানেক বয়সী পুত্রসহ ঢাকার পলাশীতে সরকারী বাসায় অবস্থান করছিলেন। বড় ভাইয়ের তিনটি মেয়ে তখন ওদের নানা বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। বড় ভাইয়ের বাসাটি ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, সলিমুল্লাহ হল, ইডেন কলেজসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল পলাশী ব্যারাকের খুব কাছেই। কাজেই আমার বড় ভাই ও তাঁর পরিবারের জন্য আমাদের ছিল চরম উৎকণ্ঠা।

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু

এমন ভয়ংকর সময়ে দায়িত্ব জ্ঞানহীন এক প্রতিবেশী এসে খবর দিল, পাকিস্তানী বাহিনী পলাশী ব্যারাক পুড়িয়ে দিয়েছে। এই সংবাদ শোনার পর আমার মাকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো। সে সময় মোবাইল বা ফোনে যোগাযোগ করারও কোন সুযোগ ছিল না। ভাগ্যক্রমে দুই তিন পরেই জানা গেল পলাশী ব্যারাক নয়, তবে পলাশীর আশে-পাশের এলাকায়  পাক সেনারা অনেক স্থাপনার উপরে ব্যাপক আক্রমণ চালায় এবং  বহু মানুষকে হত্যা করে। পরে জেনেছিলাম, পাক জান্তা ২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করলে পলাশীর বাসিন্দারা তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যায়। দুঃখজনক একটি খবর ছিল, বড় ভাইয়ের পার্শ্ববর্তী বাসার এক প্রতিবেশী ফজরের নামাজ পড়ার সময় নামাজরত অবস্থায় পাক সেনাদের ছোঁড়া গুলিতে নিহত হন।

এছাড়া আমার তৃতীয় বোন ও তাঁর পরিবার অবরুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের করাচীতে। সব কিছু মিলিয়ে  নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে আতংক আর উৎকণ্ঠায় কাটতো আমাদের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত।

পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেনি বাংলার মানুষ। হায়েনাদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠতে থাকে প্রতিরোধ। পাবনা শহরেও গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। পাবনা শহরে অবস্থান নেয়া পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয় মুক্তিকামী মানুষ। পাবনা শহরে অবস্থান নেয়া প্রায় দেড় শত পাক সেনার আক্রমণের বিরুদ্ধে পাবনার পুলিশ বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতাও সে প্রতিরোধে অংশ নেয়। ওই প্রতিরোধে অংশ নেন প্রাক্তন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র, আমার তৎকালীন থানার ভাটিকয়া গ্রামের ছেলে শামসুল আলম বুলবুল এবং বীরত্বের সাথে লড়াই করে বুলবুল দেশ মাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে আত্মাহুতি  দিয়ে অসংখ্য বীর শহীদের কাতারে যুক্ত হন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বুলবুলের এই আত্মত্যাগের  প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইসলামিয়া কলেজের প্রাক্তন নাম বদল করে ‘শহীদ বুলবুল কলেজ’ নামকরণ করা হয়।

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বুলবুল

পাবনা শত্রুমুক্ত করার সংগ্রামে শিরিন বানু মিতিলের নামটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পাবনা এডোয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন শিরিন বানু মিতিল। প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান মিতিল অত্যন্ত অল্প বয়সেই বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন! তিনি তৎকালীন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন!  ২৮ মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে পাবনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে মিতিল সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া আতাইকুলা,নগরবাড়ি, কাশিনাথপুরের যুদ্ধেও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। সাহসিকতায়, দেশপ্রেমে শিরিন বানু মিতিলকে অবিভক্ত ভারতের বীর কন্যা প্রীতি লতা ওয়াদ্দেদারের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। ২০১৬ সালে ২১ জুলাই পাবনার গর্ব তথা বাংলাদেশের গর্ব এই বীর কন্যা মৃত্যুবরণ করেন। ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ এই বীর কন্যার স্মরণে ‘বাংলা একাডেমী’ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। ওই আলোচনায় সভায় যোগ দিয়ে এই বীর নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হয়েছিল।

পাবনার তৎকালীন পুলিশ বাহিনী, ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে ফলে পাবনায় পাক সেনারা পর্যুদস্ত হয় এবং ২৭ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল-১৯৭১ পর্যন্ত  পাবনা পাক হানাদার মুক্ত ছিল।

ঐ কটা দিন আমরা অনুভব করছিলাম মুক্তির স্বাদ! আমাদের গ্রামটির অবস্থান ছিল পাবনা নগরবাড়ী হাইওয়ের ঠিক পাশেই। ওই সময় পাবনা-নগরবাড়ি রুটের বাস গুলি সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে যখন সগর্বে ছুটে চলত, তখন আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত সেই পতাকা আমাদের মনকে গর্বে ভরিয়ে দিত!

কিন্তু আমাদের সে আনন্দ ছিল ক্ষণস্থায়ী। ৮ এপ্রিল-১৯৭১ বিকালেই আমরা পেয়ে গেলাম অশনি সংকেত। বিকাল চারটা নাগাদ মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া দুটি যুদ্ধ বিমানের বিকট শব্দ আমাদেরকে হতচকিত করে দিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই বিমান হামলা আমাদের গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দুলাই ও কাশীনাথপুর বাজার এবং নগরবাড়ির উপর চালানো হয়। এতে বেশ কয়েক জনের প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটে। আমরা বুঝতে পারলাম, পাক হানাদারদের দ্বারা তৈরি দুর্যোগের যে কাল মেঘ বাংলার আকাশ ছেয়ে ফেলেছে,তা থেকে শহর বা গ্রামের কোন জনপদই মুক্ত নয়!

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ গোলাম সারোয়ার খান সাধন

পরদিন সকালেই খবর এলো পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা থেকে নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে শত্রুমুক্ত পাবনা জেলাকে পুনর্দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের বাড়ি হাইওয়ের পাশে হওয়াতে আমরা  ঝুঁকির মধ্যে ছিলাম। কাজেই সমূহ বিপদের আশংকা আঁচ করতে পেরে জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সম্পদের মায়া ত্যাগ করে পরিধেয় বস্ত্র সম্বল করে আমরা বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গেলাম। আমার তৃতীয় ভাই মরহুম খন্দকার আবুল খায়ের মাত্র ৫ দিন আগেই আমার ফুফাতো বোন মিনি বু’ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে পায়ে হেঁটে ঢাকা শহর থেকে নিজ গ্রামে পৌঁছেছেন। কিন্তু ওনারা পৌঁছার মাত্র চারদিন পরেই আবার অনিশ্চয়তার যাত্রী হতে হল তাঁদের। এবারে আমরাও একই পথের পথিক।

মিনি বু’র পরিবার ছাড়াও আরো কয়েকটি পরিবার আমাদের সঙ্গী। আমার ছোট ভাই আজাদের বয়স তখন দশ বছর। ও তখন গুরুতর অসুস্থ। পালাক্রমে ওকে কোলে নিয়ে মেঠো পথ ধরে মাইল চারেক দূরে আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি সৈয়দপুর গ্রামের দিকে রওনা দিলাম। খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে চলার সময় দেখতে পেলাম, অনেক দূরে যমুনা নদীর তীরের গ্রাম গুলিতে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের লেলিহান শিখা! পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ছোঁড়া মর্টার শেলের আঘাতে মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হওয়ার দৃশ্য!

আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুর, প্রায় ২০/২১ জন মানুষকে তাঁর বাড়িতে সাদরে গ্রহণ করলেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা করলেন। আমাদের এলাকাটা ফসলের জন্য বিশেষত ধান উৎপাদনের জন্য তেমন উপযোগী ছিল না। এ কারণে সারা বছরের খোরাকির চাল এক বারে কিনে রাখা হত। একাত্তর সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পঞ্চাশ মন চাল সে বছরও কিনে রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া সে বছর রবি শস্যের ফলনও খুবই ভাল হয়েছিল। তালই সাহেব, মেজ ভাই এবং ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে আমাদের বড় চৌচালা ঘরটির মেঝে খুঁড়ে, বড় গর্ত করে সেই পঞ্চাশ মন চাল লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। যদিও আগুনের তীব্র আঁচে চালের বস্তা গুলির উপড়ের অনেকটা পুড়ে গিয়েছিল, তবু আমাদের চরম দুঃসময়ে ঐ চালই আমাদের এবং আমাদের সাথে যাঁরা ছিলেন সবারই জীবন ধারনের  উপায় হয়েছিল।

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল কুণ্ডু

আমরা প্রায় ছয় মাস তালই সাহেবের বাড়িতে ছিলাম। কিন্তু তিনি কোন দিন কোন ধরনের বিরক্তি প্রকাশ করেননি। একাত্তরে মুষ্ঠিমেয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী বাঙ্গালী ছাড়া সমস্ত বাঙ্গলাদেশের মানুষ হয়ে উঠেছিল যেন এক পরিবারের সদস্য!

এপ্রিল মাসের ৯ তারিখ। সেদিন গ্রামের সব পরিবারই নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে হাইওয়ে থেকে বেশ অভ্যন্তরে যার যার আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে চলে গিয়েছিলেন। যাঁরা এমন ব্যবস্থা করতে পারেননি ,তাঁরা নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বিলে বা বন-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমার ফুফাতো ভাই কাজী মাহবুব হোসেন চলা-ফেরায় শারীরিক ভাবে অসমর্থ ছিলেন। কোন যানবাহন না পাওয়ায় তাঁকেও চেয়ারে বসিয়ে কয়েক জনের সাহায্যে গ্রামের  বেশ অভ্যন্তরে বিলের ধারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিন একটি গরুরগাড়ি করে তাঁকে তাঁর বোনের বাড়ি দূর্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাাদের পাশের বাড়িটি ছিল আব্বার চাচাতো ভাই খন্দকার আব্দুর রহমান  সাহেবের। চাচা মার্চের কদিন আগেই বাড়িতে একটি টিনের ঘর তৈরি করেছিলেন। ঘরটিতে তখনও দেয়াল বা বেড়া দেওয়া হয়নি।

আমাদের এক ফুফা ছিলেন পারকিনসনের রোগী। বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় ছিলেন। ওনার বাড়িটি ছিল হাইওয়ে লাগোয়া। পাক বাহিনী তাঁর বাড়িটি জ্বালিয়ে দিলে তিনিও পুড়ে মারা যাবেন-এই আশংকায় তাঁকে চাচার তৈরি নতুন টিনের ঘরটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছিলো। পরে তাঁর কাছে শুনেছিলাম, পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন আমাদের পাড়ার সব ঘরে যখন আগুন দিচ্ছিলো, তখন ক্রমাগত কাঁপুনীতে আক্রান্ত ফুফাকে তারা উক্ত ঘর  থেকে বের হয়ে যেতে বলে। ফুফা ইঙ্গিতে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। তখন তারা কোন কারণে ঐ ঘরটি বাদ রেখে বাকী পাড়াটি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিয়েছিল। পাক সেনাদের বাংলাদেশের যে কোন মানুষের সাথে পৈশাচিক উল্লাসের বিপরীতে এমন আচরণ একটু অস্বাভাবিকই বটে!

আরও পড়ুন মুক্তিযুদ্ধের প্লাটুন কমাণ্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিফা আশরাফ

আমাদের সারারাত কাটলো চরম উৎকণ্ঠায়। কারণ আমরা সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে চলে গেলেও মেজভাই থেকে গিয়েছিলেন আমাদের দ্বারিয়াপুরের বাড়িতেই। পরদিন সকালের দিকে ক্লান্ত, বিপর্যস্ত মেজভাই সৈয়দপুর পৌঁছালেন। বাড়ির দরজার চাবিগুলি টেবিলে রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। একটু শান্ত হওয়ার পর জানালেন, আমাদের পাড়ার চাচার টিনের ঘরটি এবং বড় ফুফুমার পাকা ঘরটি ছাড়া কোন একটি ঘরও অবশিষ্ট রাখে নাই পাকিস্তানী সৈন্যরা। কেবল মাত্র আমাদের পাড়া নয়, নগরবাড়ী থেকে পাবনা শহর পর্যন্ত গ্রামের পর গ্রাম ‘পোড়ামাটি’ নীতি অবলম্বন করে জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করেছিল পাকবাহিনী। আবার একই সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংস লীলা যাতে বহির্বিশ্বের দৃষ্টি গোচর না হয়, সেজন্য তারা  হাইওয়ের লাগোয়া কিছু বাড়ীঘর অক্ষত রেখে দিয়েছিল। পাবনা শহরের মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেও পাবনা শহরকে শত্রুমুক্ত রাখতে ব্যর্থ হন। অনেক মুক্তিযাদ্ধা সাহসিকতার সাথে লড়াই করে শহীদ হন।

পাবনা পাক সেনাদের কব্জায় চলে যাওয়ার পর প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হানাদারদের হত্যা নির্যাতনের খবর আমাদের কানে আসত।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ‘প্রবাসী সরকার’ গঠিত হয় এবং ১৭ তারিখে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান মেহেরপুর) বৈদ্যনাথ তলার আম বাগানে নতুন সরকারের  শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন বৈদ্যনাথ তলার নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর নামকরণ করেন। পরবর্তীতে এই মুজিব নগরে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পাকিস্তানী অপশাসনের স্মৃতি হিসাবে ২৩টি স্তম্ভ সম্বলিত ‘স্মৃতি সৌধ’ নির্মিত হয়।

এপ্রিল মাস শেষ হল। মে মাসের মাঝামাঝি। ততদিনে সামরিক জান্তা প্রায় সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে। ঢাকার অবস্থা আগের চেয়ে খানিকটা স্বাভাবিক হওয়ায় মিনি বু’ ও তাঁর পরিবার ঢাকায় ফিরে গেলেন।

পাক সেনারা হাইওয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার পর কিছুদিন পর্যন্ত  নিজেদের শক্তি সংহত করতে ব্যস্ত থাকে। সেই সাথে চলে তাদের নৃশংসতা।  মে মাসের মাঝামাঝি একদিন খবর পেলাম পাক সেনারা আমাদের তৎকালীন সুজানগর থানার সাতবাড়িয়া গ্রামের ৬০০ মানুষকে হত্যা করে ২০০ মানুষের মৃতদেহ পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের খবর প্রায় কানে আসত আমাদের।

আরও পড়ুন নাজিরগঞ্জে পাক বাহিনীর ফেরি ধ্বংস

আমাদের শৈশব থেকেই দেখে এসেছি  গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি-ঘরই ছিল শনের অথবা টিনের তৈরি। আমাদের গ্রামে কেবল মাত্র আমার বড় ফুফুর (আব্বার ফুফাতো বোন) বাড়িটি ছিল পাকা। পাকিস্তানি সেনারা হয়তো ভবিষ্যতে নিজেদের কাজে লাগতে পারে- এই চিন্তা থেকেই পাকা বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়নি। পরবর্তীতে সেখানে ঘাঁটি বানিয়ে পাক বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে হত্যা নির্যাতন পরিচালনা করতো। আমাদের গ্রাম থেকে একটু অভ্যন্তরের গ্রামগুলিতে (যে সমস্ত বাড়ি-ঘর তখন পর্যন্ত  অক্ষত ছিল) হামলা চালিয়ে কৃষকের গরু-ছাগল, হাঁস , মুরগী ধরে এনে জবাই করে খেত এবং গাছের ফল-মূলও রেহাই পায়নি পাক সেনাদের সাধারণ দস্যুর মত আচরণ থেকে।

দুই মাস পর্যন্ত ফুফুর পাকা ঘরটিতে ঘাঁটি করে থাকার পর পাক সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে চলে যায়। পাক সেনারা গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর গ্রামের অনেকেই নিজেদের পোড়া ভিটায় সামান্য টিন বা খড়ের চালা তুলে আপন আবাসে ফিরতে শুরু করেন। আমাদের পোড়া ভিটায়ও কয়েক খানা টিন দিয়ে একখানা ছাপড়া তুলে আব্বা, মা, মেজ ভাই ও ছোট দুই ভাই সেখানে থাকতে শুরু করে। আমরা দুই বোন তালই সাহেবের বাড়িতেই থেকে গেলাম।

মিনি বু’ ও তাঁর পরিবার চলে যাওয়ার পর একদিন ভোর বেলা আমাদের ঘুম ভাঙ্গল রাইফেলের কট্ কট্ গুলির আওয়াজে। ততদিনে আমরা রাইফেল, মেশিন গান, স্টেন গান, মর্টার শেল ইত্যাদি মারণাস্ত্রের আওয়াজের ভিন্নতাও বুঝে গিয়েছিলাম, তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে মাঠের দিকে দৌড়ালাম।

মে মাসের প্রথম দিকে চার-পাঁচ জনের একটি হিন্দু পরিবার তালই সাহেবের বাড়িতে আশ্রয নিয়েছিল। ওরাও আমাদের সাথে চলল। মাঠ পার হয়ে আমরা সবাই একটি ঘন জঙ্গলে আশ্রয় নিলাম। গ্রামের প্রায় সব মানুষই, যে যেখানে পেরেছিল, আশ্রয় নিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পরে তালই সাহেব খুব সতর্কভাবে পাক সেনাদের অবস্থান জানতে গ্রামের দিকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে তালই সাহেব ফিরে এলে আমরা আবার বাড়ি ফিরে গেলাম। কিন্তু বিকালের দিকে আবার শুনতে পেলাম, কয়েকজন পাক সেনাকে আবার কাছাকাছি গ্রামে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন সাতবাড়িয়া গণহত্যা দিবস

এর কয়েকদিন আগেই আমার বড় ভাবী ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছেন। বড় ভাইয়ের চার শিশু সন্তানসহ আবার আমরা বাড়ি ছেড়ে বের হলাম। ছোট ছোট বাচ্চাসহ রাতে মাঠে বা জঙ্গলে থাকা অত্যন্ত বিপদজনক হবে মনে করে নিজেদের গ্রামের দিকে যাওয়ার সিদ্বান্ত হলো।

আমরা আবার এবড়ো-থেবরো  মেঠো পথ ধরে বহু কষ্টে কোন মতে নিজেদের ছাপড়া ঘরে পৌঁছালাম। ছোট্ট একখানা ছাপড়া ঘরে এত গুলি মানুষের কষ্টকর দিন যাপন। এভাবে কয়েকদিন থেকে আবার সৈয়দপুর গ্রামে ফিরে গেলাম।

জুলাই মাসের শেষের দিকে শুরু হলো বন্যা। বন্যা শুরু হওয়ার পর পাক সেনারা রাজাকার আর দালালদের সহযোগিতায় স্পীড বোট নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম গুলিতে ঢুকে চালাতে শুরু করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। ততদিনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাদের এদেশীয় দোসরদের আনুগত্য অর্জন করে ফেলেছে। এসব নরকের কীট, বেঈমান বাঙ্গালী জাতির শত্রু, শান্তি বাহিনী গঠনের নামে, নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের আশায়, ধর্মের নামে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে, যুবকদের তালিকা তৈরি করে পাক সেনাদের কাছে সরবরাহ করা, যুবতী মেয়েদের সন্ধান পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পে পৌঁছানোর মত অপতৎপরতা শুরু করে দিয়েছে।

প্রায় দিনই আমরা খবর পেতাম, বিভিন্ন গ্রাম রাতে ঘেরাও করে রেখে ভোরে গ্রামের জোয়ান ছেলেদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করার খবর। মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো আর্মিদের ক্যাম্পে।তবে একাত্তরের বন্যা একদিকে যেমন পাক বাহিনী আর তাদের দোসরদের প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকে হত্যা নির্যাতন চালাতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করেছে তাদের গেরিলা আক্রমণ জোরদার ও সফল করতে। বাংলার দামাল ছেলেরা বাংলার চেনা জানা নদী-নালা, খাল, বিল ব্যবহার করে একের পর এক সফল আক্রমনে পর্যুদস্ত করে তুলছিল পাক সেনাদের। ক্রমেই পাক সেনারা হয়ে পড়ছিল কোন ঠাসা।

আরও পড়ুন সুজানগর পাকহানাদার মুক্ত দিবস

আমাদের সময় কাটতো রেডিওর খবর শুনে। ২৫ মার্চের পর থেকে আমরা রেডিও পাকিস্তানের  খবর শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ রেডিও পাকিস্তান তখন হয়ে উঠেছিল চরম মিথ্যার এক প্রচারযন্ত্র। আকাশ বাণী, বিবিসি বাংলা, ভয়েস অব আমেরিকাই হয়ে উঠেছিল আমাদের আস্থার সংবাদ মাধ্যম। আমাদের আকাঙ্খার, আমাদের ভালোবাসার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানগুলো আমাদের মনে যোগাতো সাহস আর ভরসা। ‘চরমপত্র’, ‘জল্লাদের দরবার’, উদ্দীপনায় ভরা দেশাত্ববোধক গানগুলো শোনায় আমাদের কোন ক্লান্তি ছিল না।

জুলাই, আগস্ট শেষ হলো। একদিকে আসতে শুরু করলো বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তি সেনাদের বিজয় গাথার খবর, অন্যদিকে পাক বাহিনীর নির্মমতার খবর। পাক সেনাদের বর্বরতার শিকার হওয়া ভীত সন্ত্রস্ত অসংখ্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জীবন বাঁচানোর জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে এবং যত দিন যেতে থাকে পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারের মাত্রাও ক্রমে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া মানুষের সংখ্যা।

প্রতিদিনই বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার মাধ্যমে শুনতে পেতাম ভারতের শরণার্থী শিবির গুলিতে তাদের দুর্দশার খবর। ভারত সরকার একদিকে এসব আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযাদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহ  ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। অন্যদিকে পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে হত্যা নির্যাতনের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য মানবিক সাহায্যের আবেদন করতে থাকে এবং পাকিস্তান সরকার যাতে শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে, সে জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন সহ অনেক দেশেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ন্যায্য দাবীর সমর্থনে জনমত তৈরি হতে শুরু করে।

সময় গড়ানোর সাথে সাথে মুক্তি সেনারা হয়ে উঠতে থাকে অপ্রতিরোধ্য। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের কৌশল বদল করে সম্মুখ যুদ্ধের বদলে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে মুক্তিসেনারা হানাদারবাহিনীর উপর জলে স্থলে চালিয়ে যেতে থাকে সাঁড়াশি আক্রমণ। অন্যদিকে পাক সেনাদের অত্যাচারের মাত্রাও বিশেষত গ্রামাঞ্চলে দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। গ্রামে থাকা বিপদজনক হয়ে উঠছিল। অনন্যোপায় হয়ে আমরা দুই বোন, আমার বড় ভাবীর সঙ্গে ঢাকা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আরও পড়ুন আহমেদ তফিজ উদ্দিন

সেপ্টেম্বর মাসে সৈয়দপুর থেকে নৌকায় কাশীনাথপুর হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। কাশীনাথপুর থেকে রিক্সায় নগরবাড়ী ঘাট পর্যন্ত যেতে হলো। নগরবাড়ী ঘাট থেকে ফেরীতে যমুনা পার হয়ে বাসে করে ঢাকা পৌঁছালাম। কাশীনাথপুরে নৌকা থেকে নেমে রিক্সায় ওঠার পরেই একজন সৈন্য আমাদের রিক্সা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো, আইডি কার্ড দেখতে চাইল। তালই সাহেব ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে কিছু একটা বোঝাবার চেষ্টা করলেন। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সৈন্যটা অন্য আরেকটা রিক্সার দিকে এগিয়ে গেলে আমাদের রিক্সা তাড়াতাড়ি চলতে শুরু করল। ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকলাম সারাটা সময়ের জন্য।

ঢাকা পৌঁছালাম সেপ্টেম্বরের পাঁচ তারিখে! ঢাকা শহরকে আপাত শান্ত মনে হলেও মুক্তি যোদ্ধাদের তৎপরতা থেমে ছিল না। প্রায় প্রতি রাতেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ‘বিচ্ছুদের’ বোমা ফাটানোর আওয়াজ আসত আমাদের কানে (মুক্তিসেনাদের বাংলার মানুষ আদর করে নাম দিয়েছিল ‘বিচ্ছু’)। দুই একদিন বোমার আওয়াজ না শুনলে আমাদের মনে হতাশা ভর করতো, আর বোমার আওয়াজ যেন আমাদেরকে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগাত।

নভেম্বর মাসে শুরু হল রোজা। রোজার শেষে এল ঈদ-উল-ফিতর। দখলীকৃত ভূমিতে অত্যাচারিত, স্বজন হারানো, সর্বস্ব হারানো মানুষের মাঝে ছিল না কোন উৎসব, কোন আনন্দ। দুঃখী মানুষের দুঃখের সাথে সমব্যথী হয়েই যেন বিদায় নিল ঈদ! ঈদ উৎসবকে একদিকে ঠেলে সরিয়ে রেখে বাংলার দামাল ছেলেরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলল মুক্তিযুদ্ধকে।

এল ডিসেম্বর মাস। হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি যোদ্ধাদের আক্রমন তখন বেপরোয়া। প্রতিদিন রেডিও তে শুনছি তাদের বিজয় গাথা আর বিভিন্ন জায়গায় হানাদারদের  পর্যুদস্ত হওয়ার খবর। খুশী মনে সারা দিনই বলতে গেলে রেডিওর পাশে বসে খবর শোনা। এখনও কানে বাজে আকাশ বাণী বেতার কেন্দ্রের দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরাট গলার সংবাদ পাঠ বা সংবাদ পর্যালোচনা। বিবিসি বাংলা এবং ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ পাঠক-পাঠিকাদের সযত্নে পঠিত সংবাদগুলি আমাদেরকে আশার বাণী শোনাতো, উজ্জীবিত করতো। কোন এলাকা পাকসেনা মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ল, কোথায় কত জন পাকিস্তানি সেনা সদস্য ঘায়েল হল- এই ছিল আমাদের সর্বক্ষণের আলোচনা।

আরও পড়ুন ভাষা সৈনিক আনোয়ারুল হক

ডিসেম্বর মাসের তিন তারিখ। আমরা দুই বোন, আমার বড় বোনের বাড়ি লক্ষ্মীবাজারে ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখ বিকালে আকাশ বাণী কোলকাতার রেডিওতে প্রচার করা হচ্ছিল, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কলকাতা আগমণ ও ভাষণ প্রদানের খবর। পরপরই খবরে জানানো হল, ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় তাঁর অবস্থান সংক্ষিপ্ত করে দিল্লী ফিরে গেছেন। কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল পাকিস্তানের সেনাশাসক কর্তৃক ভারত আক্রমণের হুমকি আর আস্ফালন। আমাদের বড় ভাই-বোনদের আলাপ আলোচনায় বোঝা যাচ্ছিল, হয়তো শিগগিরই অপরিণামদর্শী ইয়াহিয়া আর তাঁর দোসর ভুট্টো বহুল প্রতীক্ষিত সেই ভুলটিই করতে চলেছে। আমাদের সব সময়ের কামনা পূর্ণ হতে চলেছে- সেই আনন্দে আমরা আত্মহারা। আমরা রাতের শেষ সংবাদ শুনে ঘুমাতে গেলাম।

শেষ রাতের দিকে গুর গুর মেঘ গর্জনের মতো আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভোরের সংবাদে জানতে পারলাম পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করেছে। তখন আমরা বুঝতে পারলাম ঐ মেঘের গর্জন ছিল ভারতের বিমান আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ঐদিন থেকে আমাদের কাজ হল যুদ্ধ বিমানের শব্দ শুনলেই দৌড়ে ছাদে যাওয়া আর ভারত আর পাকিস্তানি বিমানের মধ্যে একে অপরকে ধ্বংস করার চেষ্টা দেখা। পাকিস্তানি বিমান ধ্বংস হলে আমাদের মনে যার পর নাই আনন্দ  কিন্তু প্রকাশ করার কোন সুযোগ ছিল না। কারণ আমার বোনের বাসার পাশেই ছিল কয়েকটি বিহারী পরিবার এবং যারা ছিল পাকিস্তানের প্রতি গভীরভাবে অনুগত।

প্রথম দিন একটি ভারতীয় বিমানকে ভূপাতিত করায় বিহারীদের আনন্দ দেখে মেজাজ খারাপ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। বেঈমান বিহারীদের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। মাত্র দুদিনের বিমান হামলার পরে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সব যুদ্ধ বিমানের মজুদ শেষ হয়ে যায়। এছাড়া ভারতীয় বোমার আঘাতে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে কোন বিমান উড্ডয়নের মত অবস্থাও ছিল না। পাকিস্তান  নামক রাষ্ট্রটি তার দেশের পূর্ব অংশকে কতটা অরক্ষিত অবস্থায় রেখেছিল-তাও বোঝা গিয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল এক কিম্ভুত কিমাকার ধরনের গোঁজামিলের উপর ভিত্তি করে এবং সেনাতন্ত্রের কব্জায় চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক রাজনীতির বিকাশ ঘটারও কোন সুযোগ তৈরি হয়নি পাকিস্তানে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্ণধারদের লক্ষ্যই ছিল পূর্বাঞ্চলকে শোষণ!

আরও পড়ুন পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বই রিভিউ

ডিসেম্বর মাসের এগার বা বার তারিখে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ না করলে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক বোমা বর্ষণ করা হবে বলে ঘোষণা করা হতে থাকে। একই সময়ে ঢাকার বাসিন্দাদের ঢাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এই অবস্থায় আমাদের কি করা উচিত-তা ঠিক করা কঠিন ছিল। এর মধ্যেই ডিসেম্বরের তেরো বা চৌদ্দ তারিখে সন্ধার পর পরই আমার বোনের বাসার গলির দিকে স্লোগান দিতে দিতে একটি মিছিল এগিয়ে আসতে লাগলো। বাঙ্গালী না বিহারীদের মিছিল বোঝা যাচ্ছিল না। আমরা আতংকিত হয়ে উঠলাম।

বিহারীদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এসে প্রস্তাব দিল, যদি বিহারীদের মিছিল হয় এবং তাদের যদি আমাদের বাসায় ঢোকার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে ওরা অর্থাৎ বিহারী পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে যাবে আর যদি বাঙ্গালীদের মিছিল হয়, তবে আমরা এগিয়ে যাবো। মিছিলটি একটু কাছাকাছি হলে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শোনা গেলো কিন্তু কোন গুলির আওয়াজ শোনা গেল না! এতে আমরা বুঝতে পারলাম  বিজয় সন্নিকটে। না হলে পাক সেনাদের তাণ্ডব এতক্ষণ শুরু হয়ে যেত।  প্রকৃতপক্ষে পাক সেনারা তখন ভীত ইঁদুরের মত নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিল।

পনেরো তারিখ সারা দিন ধরেই আকাশ বাণী কোলকাতার রেডিওতে ঘোষণা চলতে লাগলো পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

এলো বহু কাঙ্খিত ষোলই ডিসেম্বর। পনের তারিখ রাত থেকেই বিভিন্ন জনের মুখে শোনা যাচ্ছিল ষোল ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে।  সারা রাত বলতে গেলে উত্তেজনায় ঘুম হলো না।যতক্ষণ রেডিও স্টেশনগুলো খোলা ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে চলল খবর শোনা। পরদিন সকালেই জানা গেল বিকাল চারটায় পাকিস্তান বাহিনী তৎকালীন রেস কোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর (বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী) নিকট (স্বাধীনতার পরই ঘোড়দৌড় বা রেস নামের জুয়া বন্ধ করে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ নামকরণ হয়) আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। সকাল থেকেই সারা দেশ থেকে শুরু হয়েছিলো ঢাকামুখী জনতার ঢেউ। বিকাল চারটায় পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। রেডিওতে এ সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা পরিণত হয় এক জনসমুদ্রে।

আরও পড়ুন মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামান

বিকাল চারটার পর থেকেই আমরা দু’বোন, আমার বড় বোনের পুরো পরিবার দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে গলির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের হাতে বোনের বারান্দায় লাগানো টবের গোলাপ আর বিভিন্ন ফুলের পাপডী, ঘরে রাখা আতর, গোলাপের শিশি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘’জয় বাংলা’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে গলিপথ ধরে আসতে শুরু করল একের পর এক মিছিল। আমরাও সবাই মিলে তাদের সাথে গভীর রাত পর্যন্ত  ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে কণ্ঠ মিলিয়ে গেলাম নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না মিছিল আসা বন্ধ হল। পর দিন আমার বড় বোন বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করলেন। এক উৎসবের আমেজ শুধু মাত্র ঢাকা শহরে নয়, সারা দেশ জুড়েই!

কিন্তু উৎসবের আনন্দ উদযাপনের সুযোগ পেল না বাঙ্গালী জাতি! ১৮ তারিখ  সকালে রেডিওতে প্রচারিত সংবাদ শুনেই আমাদের ‘হরিষে বিষাদ’ নেমে এল। পাকিস্তানি দুর্বৃত্তরা বুঝে গিয়েছিল, বাংলার মানুষের উপর তাদের ‌অপশাসন টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব হবে না। তাদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। জানা গেল শেষ মুহূর্তে পাক হানাদার বাহিনী  তাদের দোসর বাংলার বেঈমান ‘আল-বদর’, ‘আল-শামস’বাহিনীর সহায়তায় মরণ ছোবল দিয়েছে। নিজেদের পতন অত্যাসন্ন-পাক হানাদাররা বুঝে গিয়েছিল, তাই এই সব বিষধর সাপেদের সহায়তায় পাকিস্তানিরা জাতির সব মেধাবী সন্তানদের শেষ করে দেওয়ার জন্য এক ‘নীল নকশা’ তৈরি করেছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধা শূন্য করার জন্য আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের তালিকা প্রস্তুত করেছিল। তাদের নীল নকশা অনুয়ায়ী স্বাধীনতার মাত্র দুই দিন আগে চৌদ্দ ডিসেম্বর এই সমস্ত দেশ বরেণ্য সন্তানদের রাতের অন্ধকারে মুখোশধারী হায়েনার দল বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং ঢাকার রায়ের বাজারের নির্জন স্থানে নিয়ে নিষ্ঠুর, বিভৎস বর্বরতায় হত্যা করে।

আরও পড়ুন কবিতা মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু নেই

স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনের মুহূর্তে বাঙ্গালী জাতির সামনে উদ্ঘাটিত হয় মানুষের অবয়বধারী শ্বাপদদের জান্তব উল্লাসের দৃশ্য। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই স্বজন হারানো মানুষদের আহাজারীতে বেদনার্ত হয়ে ওঠে ঢাকার আকাশ, বাতাস! এই হৃদয় বিদারক ঘটনায় শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত, আনন্দে আত্মহারা বাংলার মানুষ। রায়ের বাজারের ডোবায় আবিষ্কৃত হয় ইতিহাসের এক চরম নিষ্ঠুরতার নিদর্শন। রাতের অন্ধকারে ‘মনুষ্য’ নামের অযোগ্য এই সব ‘নরকের কীট’ তালিকা অনুযায়ী তাদের পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংবাদিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য তাদের সাথে যাওয়ার অনুরোধ করে এবং রায়ের বাজারের নির্জন স্থানে নিয়ে তাঁদেরকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেয়।স্বাধীনতার দুদিন পরই আবিষ্কৃত হয় রায়ের বাজারের বধ্যভূমি। যেখানে চোখ বাঁধা, পিছ মোড়া করে হাত বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় অসংখ্য শহীদের মৃতদেহ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁদেরকে বর্বরোচিত ভাবে হত্যা করা হয়।

আরও পড়ুন যাপিত জীবনের কথকতা-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ম পর্ব
১১তম পর্ব
১২তম পর্ব
১৩তম পর্ব
১৪তম পর্ব
১৫তম পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী।তিনি ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বাড়িয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!