রোদেলা-দুপুর-কাঁদে-২য়-পর্ব
খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব)

রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব)

খলিফা আশরাফ

 

চিঠিটা পড়ে অনেক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো অনিমা। হায়রে ভালোবাসা! সেও যে তিলে তিলে কখন অনিকের নিবিড় ভালবাসায় বাঁধা পড়েছে, তাই-ই কি সে বলতে পেরেছে? অনিকের ভালোবাসা প্রতিটি প্রহর তাকে জড়িয়েছে অচ্ছেদ্য করে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেনি অনিমা। অতীত তাকে বারবার টেনে ধরেছে, বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও সেই অতীত দুর্লঙ্ঘ পাহাড় হয়ে দণ্ডায়মান। কি করে বলবে সে, ‘একাত্তরের নভেম্বরের এক রাতে, যখন তার মায়ের গর্ভে মাত্র তিন মাস বয়স তার, তার বাবাকে বেঁধে তার সন্মুখেই এক পাঞ্জাবী পাকি অফিসার মাকে ধর্ষণ করেছিলো। সে রাতেই মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পেটের সন্তানের দোহাই দিয়ে বাবা মাকে নিবৃত করেছিলেন। মা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়লে স্কুল শিক্ষক বাবা নিবিড় যত্নে মাকে সারিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু বাহাত্তরের ৩০ শে মে তাকে জন্ম দিতেই মা মৃত্যু বরণ করেন।’

মাকে বড্ড ভালবাসতেন বাবা। আর বিয়ে করেননি তিনি। অনিমা নাকি তার মায়ের প্রতিচ্ছবি। গায়ের রং, নাক, মুখ, চোখ সবই মায়ের মতো। তার মধ্যে দিয়েই মাকে খুঁজতেন বাবা। অনিমা যখন একটু বড় হল, রূপের দ্যুতি খুলতে শুরু করলো, স্বাধীনতাবিরোধীরা সঙ্গোপনে গুজব ছড়িয়ে দিলো, ‘পাঞ্জাবীর মেয়ে সুন্দরী তো হবেই’। অথচ সেই কলংকময় রাতের তিন মাস আগেই গর্ভবর্তী হয়েছিলেন তার মা। এ কথা অনেকেই জানতেন, প্রতিবাদ করেছেন তারা। কিন্তু গুজব ডালপালা মেলতে সময় নেয় না। দ্রুত চাউর হয়ে গেলো চারিদিকে। সম্মানের খাতিরেই বাবা বাড়িঘর সহায় সম্পত্তি সব বিক্রি করে দূরের জেলা শহরে বসবাসরত এক আত্মীয়ের সহায়তায় সেখানেই বাড়ি করলেন। তখন মাত্র ৫/৬ বছর বয়েস অনিমার। বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন বাবা। খুব সহজেই স্কুলে চাকরীও জুটে গেলো তাঁর। বাবার স্কুলেই ভর্তি হল অনিমা। বাবার স্বপ্ন মা-হারা মেয়েকে যোগ্য করে তোলা। আর কোন সন্তান ছিলো না তাঁর। মন প্রাণ ঢেলে দিলেন তিনি মেয়ের জন্য। ফাইভ আর এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলো অনিমা।

আরও পড়ুন গল্প জারজ

মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় ১৭তম। রেজাল্ট হবার আগেই ব্যাংকার বাবার সদ্য পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব আসলো। ছেলের বাবা স্থানীয়, প্রভাবশালী। ঘটক সেই সাহায্যকারী আত্মীয়। ফলে অনিমার প্রবল আপত্তি, বাবার অনিচ্ছাতেও সবার অনুরোধে, চাপে আর নাছোড় বরপক্ষের আগ্রহে বিয়ে হয়ে গেলো। কিন্তু অনিমার ভাগ্য লেখা হয়ে গিয়েছিলো গর্ভে থাকতেই। কষ্টই তাঁর আজন্ম সঙ্গী। পরশ্রীকাতর বাঙ্গালীরা কুৎসা রটাতে পারদর্শী। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই একাত্তরের সেই মিথ্যে গুজব পৌঁছে গেলো শ্বশুড় বাড়িতে। চেহারা পাল্টে গেলো শ্বশুড়, শ্বাশুড়ী এমনকি স্বামীরও। কথায় কথায় মাকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য। এক বছরও ঘর করতে পারলো না অনিমা। ভেঙ্গে গেলো বিয়ে। একেবারে মুষড়ে পড়লো সে।

বরাবরের মতো এবারও ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ালেন বাবা। তাকে বোঝালেন, কারো জন্যেই জীবন থেমে থাকে না। নিজের পথ নিজেকেই করে নিতে হয়, সৌভাগ্যকে জিতে নিতে হয় যোগ্যতা দিয়ে। বাবার প্রেরণায় ধীরে ধীরে কষ্ট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো অনিমা। বাবা ছুটি নিয়ে তাকেসহ চলে এলেন ঢাকায়। অনিমার রেজাল্ট আর বাবার এক বন্ধুর সহায়তায় বদরুন্নেছা কলেজে ভর্তি হয়ে গেলো সে। আবাসিক হলেই থাকার ব্যবস্থা। অনিমার জেদ পেয়ে বসলো। যোগ্যতা দিয়েই জয়কে জিতে নেবে সে। হোলও তাই। এবার মেধা তালিকায় অনিমা ১১তম। সারা কলেজ তাকে নিয়ে মেতে উঠলো। অভিনন্দন আর অভিনন্দন। বাবা ছুটে এলেন ঢাকায়। তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। অনিমা জানে বাবার এ ক্রন্দন মায়ের জন্য। মাকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার, ছবি দেখেছে। মায়ের বড় একটা ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে বাবা টাঙিয়ে রেখেছেন তার ঘরে। অনেক সময় ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে কাঁদতে দেখেছে অনিমা। শুনেছে, দাদার অমতেই ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। যুগল ছবিটা বাবার মানিব্যাগে। মায়ের স্পর্শ সব সময় অনুভব করেন তিনি।

আরও পড়ুন গল্প ও রিহানা

অনেকক্ষণ কেঁদে উঠে দাঁড়ালো অনিমা। ডাইরির ভাঁজ থেকে অনিকের চিঠিটা বের করলো সে। কতবার যে চিঠিটা পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই। চিঠি পাবার পরে একদিন সে রুম থেকে বের হয়নি। কোথাও যায়নি, ভার্সিটিতেও না। এই প্রথম ক্লাশে অনুপস্থিত সে। বান্ধবীরা এসে জেরার পর জেরা করেছে, কারো কাছেই মুখ খোলেনি অনিমা। বলেছে শরীর ভালো নেই। ভেতরে বয়ে যাওয়া ঝড় যে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ, ক্ষতবিক্ষত করেছে, রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে তার কিছুই বুঝতে দেয়নি কাউকে। যেমন বুঝতে দেয়নি অনিককে তার ভালোবাসার কথা। গভীর ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়, যেমন অঘাধ জলরাশি নিস্তরঙ্গ, শান্ত। কিন্তু অনিকের ভালোবাসা সেই শাস্ত্রী জলে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের সৃষ্টি করেছে। সেই তরঙ্গাঘাতে অনিমার হৃদয়ের দু’কুল ভেঙ্গে প্লাবিত করেছে। দীর্ঘ অবরুদ্ধ প্রণয় জোয়ার ভাসিয়ে দিয়েছে তার মৌনব্রত, নীরব ধৈর্যের বাঁধ।

নিজের সাথেই নিজে যুদ্ধ করেছে অনিমা একদিন একরাত। তারপর তার প্রগাঢ় ভালোবাসাকে টুটি চেপে স্তব্ধ করেছে। কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনিকের চিঠিতে সাড়া না দেবার। একদিন পরে যখন ক্লাশে গেলো অনিমা, একেবারে স্বাভাবিক, যেন কিছুই ঘটেনি। সবার সাথেই কথাবার্তা, হাসাহাসি আগের মতোই, অনিকের সাথেও। কিন্তু অনিক যেন হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে, প্রাণচঞ্চল সদাহাস্য ছেলেটা নিষ্প্রাণ চুপচাপ। অনিমার খুব কষ্ট হত অনিকের জন্য, কিন্তু তার পরেও নিজেকে সংযত রেখেছে সে।

আরও পড়ুন রোদেলা দুপুর কাঁদে-
১ম পর্ব
৩য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

রোদেলা দুপুর কাঁদে (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

খলিফা আশরাফ জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিপরীত করতলে, কালানলে অহর্নিশ, অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ; গল্পগ্রন্থ: বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি, অগ্নিঝড়া একাত্তুর, একাত্তরের মোমেনা, পাথরে শৈবাল খেলে; ছড়াগ্ৰন্থ: ভুতুড়ে হাওয়া, কাটুশ-কুটুশ। তিনি  ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

error: Content is protected !!