পৃথিবীর স্বর্গ সুইজারল্যান্ডে (২য় পর্ব)
পৃথিবীর স্বর্গ সুইজারল্যান্ডে (২য় পর্ব)
লুকার্নে বা লুজার্নে ইউরোপের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন শহর! শহরটি ফ্রান্স, ইতালি এবং সুইজারল্যান্ডের এক মিলিত সংস্কৃতির শহর। জেনেভা থেকে লুকার্নে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা ২০ মিনিট। জেনেভা থেকে সড়ক পথে লুকার্নে যেতে সুইজারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি এবং ফ্রান্স-ইউরোপের এই ৪টি দেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ প্রসঙ্গে একটি গুরত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি, সুইজারল্যান্ড ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভূক্ত দেশ নয় কিন্তু কোন বিদেশি নাগরিকের সুইজারল্যান্ডের ভিসা থাকলে সে কেবল মাত্র যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপের আটাশটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে থাকে। সেই সুযোগ নিয়ে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া গেল।

শামনী (Chamonix) সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, ভীতি জাগানিয়া এক স্থান। শামনীতে রয়েছে আল্পস পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া মঁ ব্ল (Mont Blance) যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৮০৭ মিটার। শামনীকে বলা যেতে পারে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স এবং ইতালির এক জংশন। জেনেভা থেকে সড়ক পথে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে শামনী পৌঁছাতে। শামনীর একটি স্টেশন থেকে ক্যাবল কার পর্যটকদের নিয়ে যায় মঁ ব্লতে। মঁ ব্লর চূড়ায় পৌঁছাতে দুবার ক্যাবল কারে উঠতে হয়। প্রথম ক্যাবল কার মাঝামাঝি একটা উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। পরের ক্যাবল কার আল্পসের চূড়ায় পৌঁছে দেয়। বিভিন্ন ধাপে সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্যাবল কার একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পর লিফট বা এলিভেটর নিয়ে যায় আরও উচ্চতায়।
এরপর পর্যটকরা সিঁড়ি দিয়ে মঁ ব্লর সর্বোচ্চ উচ্চতায় যেতে পারেন। মঁ ব্লতে পর্যটকরা খুব কাছে থেকে দেখতে পারেন আল্পসের বরফাচ্ছাদিত চূড়া। জুলাই-আগস্ট মাসের তাপমাত্রা যখন প্রায় ৪০ ডিগ্রি, তখনও মঁ ব্লতে রীতিমতো ওভার কোট, গ্লাভস বুট পড়তে হয়। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, মানুষের সর্বনাশা লোভ এবং চাহিদার কারণে যেভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে, তাতে হয়তো এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন আল্পসের বরফহীন চূড়া লোভী মানুষকে ভেংচি কাটবে। গেল বছরেই অর্থাৎ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে দেখা গেল কোনো কোনো পাহাড়ি নদী শুকিয়ে গেছে! কোনটা হয়তো শীর্ণ জলধারা নিয়ে ধুঁকছে।
সুইজারল্যান্ডের চার দিকই বলতে গেলে পাহাড় ঘেরা। আল্পস পর্বত মালার অবস্থান অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জার্মানী, ইতালি, মোনাকো, স্লোভেনিয়া, লিস্টেনস্টেইন এবং সুইজারল্যান্ডের অংশীভূত মোট এক লক্ষ নব্বই হাজার সাত শত কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। আল্পস ছাড়াও বেশ কয়েকটি পর্বত জেনেভাকে ঘিরে রেখেছ। এগুলো হলো ‘খ্রিষ্টাব্দে ভ’ এবং ‘জুরা’ পর্বত। খ্রিষ্টাব্দে ভের (Mont Salev) উচ্চতা ১৩৭৯ মিটার এবং জুরা (Montes Le Jura) পর্বতের উচ্চতা ১৭২০ মিটার। এই পর্বত দুটির সর্বোচ্চ উচ্চতায় যেতে বেশ সরু আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে উঠতে হয়। খ্রিষ্টাব্দে ভ পর্বতের চূড়ায় ওঠা তাই বেশ রোমাঞ্চকর এবং বিপজ্জনক। এ কারণে শীত কালে কয়েক মাসের জন্য খ্রিষ্টাব্দে ভ পর্বতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

মানুষের শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক উৎকর্ষের জন্য খেলাধূলার অবদান অপরিসীম। এ কারণে কালের আবর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য ধরনের খেলাধুলার উদ্ভব হয়েছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় এক অনন্য সাধারণ উদ্ভাবনের নাম অলিম্পিক গেমস! প্রথম অলিম্পিক গেমসের সূচনা হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে প্রায় ৩০০০ বছর আগে! আধুনিক অলিম্পিক গেমসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দে! পরবর্তীতে রোমান সম্রাট থিউডোসিয়াস অলিম্পিক গেমস নিষিদ্ধ করেন। গ্রীসের অলিম্পিয়া নগরীর নাম অনুসারে ‘অলিম্পিক’ নামকরণ করা হয়েছে। প্রথম অলিম্পিক আয়োজনে গ্রীস, জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেনসহ মোট ১৪টি দেশ অংশগ্রহণ করে। প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফরাসী ইতিহাসবিদ ব্যারন পিয়েরে দ্য কুবার্তিন আধুনিক অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করেন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা। পিয়েরে কুবার্তিন কেবল মাত্র অলিম্পিক গেমস আয়োজনের নায়কই ছিলেন না, মানুষের শারীরিক মানসিক ও মানসিক সৌন্দর্য বিকাশে খেলাধুলার অপরিহার্যতা অনুধাবন করে তিনি ফ্রান্সের স্কুলগুলোতেও খেলাধুলার প্রবর্তন করেছিলেন।
জেনেভায় রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত অলিম্পিক মিউজিয়াম। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এই মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠি হয়। মূল মিউজিয়ামটি তিনতলা বিশিষ্ট ভবন। তবে ৮০০০ স্কয়ার জায়গা জুড়ে রয়েছে অলিম্পক পার্ক। একটি মিউজিয়ামের প্রবেশ মুখেই পর্যটকদের চোখ পড়বে অলিম্পিকের মূল কিছু বিষয় প্রদর্শনের ব্যবস্থা। যেমন- রাখা হয়েছে অলিম্পিক মশাল, অলিম্পিক গেমসে অংশ গ্রহণকারী পাঁচ মহাদেশ বোঝাতে একত্রিত পাঁচটি বৃত্ত, প্রাচীন অলিম্পিক গেমসকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার নায়ক এবং আধুনিক অলিম্পিক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা পিয়েরে দ্য কুবার্তিনের ভাষ্কর্য, দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টের ভাষ্কর্য, রয়েছে বিভিন্ন সময়ে অলিম্পিক গেমসে সোনার মেডেল জয়ী ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়ায় অংশগ্রহণকালীন ভঙ্গিমার ভাষ্কর্য! গ্রীক মিথোলজির বিভিন্ন দেব-দেবির ভাষ্কর্য ছাড়াও হাই জাম্প, লংজাম্প, জিমনাস্টিকসহ বিভিন্ন খেলার ভঙ্গিমায় মোট ৪৩টি ভাষ্কর্য রাখা হয়েছে অলিম্পিক পার্কে। অলিম্পিক গেমসে নারী ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ এবং অসংখ্য ইভেন্টে তাঁদের সাফল্য অর্জন বহু বছরব্যাপী সর্বস্বীকৃত বিষয়। কিন্তু ৪৩টি ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো নারী ক্রীড়াবিদের ভাস্কর্য দেখতে পাইনি। নারী পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য যেন এখানেও প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
মূল মিউজিয়াম ভবনে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে ক্রীড়াবিদদের খেলাধুলায় ব্যবহৃত ও ব্যক্তিগত দশ হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী; আছে শিল্পকর্ম। মিউজিয়ামে প্রবেশ করলে প্রথমে চোখে পড়বে পিয়েরে দ্য কুবার্তিনের একটি বিশাল হাতে আঁকা ছবি। ভিডিওর মাধ্যমে দেখানো হয় বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক আয়োজনের দৃশ্য। জেনেভা লেকের পাড়ে জেনেভার দৃষ্টিনন্দন এলাকা লুজানে এই মিউজিয়ামের অবস্থান। এটি বিশ্বের সর্ব বৃহৎ অলিম্পিক মিউজিয়াম। বছরে প্রায় আড়াই লক্ষ্য দর্শনার্থী অলিম্পিক মিউজিয়াম দেখতে ভিড় জমান।
খেলাধুলাকে মহিমান্বিত করতে এবং মানব জীবনের সাথে একীভূত করতে পিয়েরের একটি অসাধারণ উক্তি, ‘জীবন মানে সংগ্রাম, বিজয় অর্জন নয় এবং জয়ী হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ নয়, জয়ের জন্য লড়াই করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।’

জেনেভার পুরোনো অংশ বা Old Geneva ভিয়েলে ভিলে (Vielle-Ville) নামে পরিচিত। এটি সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক শহর। ঐতিহ্যবাহী সেইন্ট পিটার্স বা পিয়েরে ক্যাথেড্রাল পুরাতন জেনেভার মূল আকর্ষণ। কারণ ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংস্কারের মাধ্যমে প্রোটেস্ট্যান্ট ক্রিস্চিয়ানিটির আন্দোলন এই ক্যাথেড্রাল থেকেই শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এটি প্রটেস্ট্যান্ট চার্চ হিসেবে খ্যাতিলাভ করে। ১৫৭ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে চোখে পড়ে জেনেভা লেকসহ আশেপাশের অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য! পুরোনো শহরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এখানকার ছোটো ছোটো সরু গলিপথ। প্রবেশ এবং নির্গমনের গোপন সুরঙ্গগুলো জেনেভার অতীত ইতিহাসের জানান দিয়ে চলেছে আজও!
জেনেভা থেকে সড়ক পথে বিশ পঁচিশ মিনিটের দূরত্বে ফ্রান্সের বর্ডারে ‘আনিসি’ নামে আরও একটি চমৎকার বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে আসার সুযোগ আছে। আনিসিতে রয়েছে এমন অসাধারণ একটা লেক। ‘আনিসি’ লেকের পানি সবুজাভ! এই লেকে পর্যটকদের বোটে করে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলো ছাড়াও আরও অনেকগুলো আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে সুইজারল্যান্ডে। লূকার্নে, লুগার্নো, কলোনি, নিয়ন সবগুলো জায়গার সৌন্দর্যই মনোমুগ্ধকর! পাহাড় নদী লেকের অনাবিল সৌন্দর্য যেন একাকার হয়ে গেছে।
সুইজারল্যান্ড মূলত গ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল। শিল্পবিপ্লব ঘটলেও সুইজারল্যান্ডের গ্রাম যেন শিল্পীর নিপুণ তুলিতে আঁকা ছবি। উঁচু পাহাড়ের গায়ে গায়ে গ্রাম। শহরের সমস্ত সুবিধাসহ অনাবিল প্রকৃতির মধ্যে বসবাস। এক কথায় অনন্য। মুল শহর থেকে কিছুটা দূরে গেলেই চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে আঙুর, আপেল, স্ট্রবেরি, রাস্প বেরি, প্লুম, এপ্রিকট, আরও অনেক ধরনের অচেনা ফলের বাগান। কোথাও চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে হলুদ সর্ষেখেত। ইউরোপে সর্ষেফুল থেকে তেল করা হয়। আমাদের দেশের মতো সর্ষেবীজ থেকে তেল উৎপাদন করা হয় না। যে কারণে এসব দেশের সর্ষে তেলের রং সাদা।
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ঘড়ি, চকোলেট, পনির পৃথিবী বিখ্যাত। ১৬ শতাব্দী থেকে সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি বিশ্বখ্যাত। ‘পাটেক ফিলিপ্পি’ সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ঘড়ি মিউজিয়াম। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ‘এ্যান্টনি পাটেক’ নামে একজন ঘড়ি নির্মাতা তাঁর একজন চেকোস্লোভাকিয়ান সঙ্গীসহ প্রথম হাতঘড়ি নির্মাণ শুরু করেন। এই ঘড়ি নির্মাতার নামানুসারে ঘড়ি মিউজিয়ামিটির নাম রাখা হয়।
সুইজারল্যান্ডের চকোলেট এবং পনির পৃথিবী বিখ্যাত। আঠারো শতক থেকে সুইজারল্যান্ডের বার্নে পৃথিবী বিখ্যাত চকোলেট উৎপাদন শুরু হয়। বার্ন ছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থানে চকোলেট উৎপাদন করা হয়। জেনেভা শহর থেকে সড়ক পথে ৪৫ মিনিট দূরত্বে ‘গুয়েরে’ চকোলেট এবং পনীর উৎপাদন কারখানা দেখতে যাওয়া হলো। কত অসংখ্য ধরনের এবং আকৃতির চকোলেট যে এখানে তৈরি করা হয়, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সুইজারল্যান্ডে ‘ফন্ডু’ নামের এক ধরনের নরম পনির তৈরি করা হয়, যার চাহিদা ব্যাপক।
সুইজারল্যান্ডের কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। তবে নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। এ দেশের বর্তমান জন সংখ্যা ৮.৭ মিলিয়নের কিছু বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন লোকের লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। তবে এদেশে আমেরিকার মতো আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার নাই।
আরও পড়ুন পৃথিবীর স্বর্গ সুইজারল্যান্ডে-
১ম পর্ব
শেষ পর্ব
ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে
পৃথিবীর স্বর্গ সুইজারল্যান্ডে (২য় পর্ব)



