-
বেওয়ারিশ অশ্রু
বেওয়ারিশ অশ্রু ফজলুল হক এতোদিন পরেও দেখো কোলাহলময় স্মৃতির চত্বর জীবনের মতোই যেনো ব্যস্ত, শুধু নতুনের ভীড়ে বদলে গেছে সময়ের আয়োজন। এভাবেই গল্প মুছে আর এক গল্পের পাণ্ডুলিপি লিখে যায় প্রত্নতাত্ত্বিক সময়, কালের আবর্তে মানুষ হয়ে ওঠে স্মৃতির শিরোনাম। মনে আছে তোমার? শেষবার কোথায় দেখা হয়েছিলো? অভিমানে চোখ নামিয়ে বললে, হবে হয়ত প্রিয় ক্যাম্পাসে, গোধূলির কফিশপে অথবা মেঠোপথে; ভাগ্যিস বলোনি যে, কখনো দেখা হয়নি তো। বিষাদের ক্লান্তি ছাপিয়ে কী যেনো একান্ত ভাবতেই তোমার বেওয়ারিশ অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে তৃষ্ণার্ত মাটিকে করে গেলো ঋণী, আমি জেনে গেলাম জল নিঃসরণের ইতিবৃত্ত ভালো নেই তুমি ঠিক আগের মতো। আর কখনো…
-
সীমাবদ্ধতা
সীমাবদ্ধতা ফজলুল হক অগণন বিবর্ণ চুলে বয়স গুনছো? জানিয়ে দিলাম- প্রতিটি ধূসর চুলে এক একটি বছর লুকিয়ে রেখেছি; স্বচ্ছলতার কথা ভাবছো? আমার সীমাবদ্ধতার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, পূরণের উপায় নেই জেনে অভাবগুলো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে; কী খাই, কী পরি-এসব জানাও একান্ত দরকার, তাই তো? বন্ধ হেঁসেলের সকরুণ কান্না শোনো, কতোবার আশ্বাস দিয়েও তার জ্বলে ওঠার উপকরণ দিতে ব্যর্থ হয়েছি। বাঁশ-বিছানায় বসে চালের ফুটোয় যখন আকাশের তারা দেখতে পাবে বৃষ্টিতে ঘরে-বাইরে যখন তেমন কোনো ব্যবধান খুঁজে পাবে না তখনই বুঝতে পারবে আমার মাথা গুঁজবার ঠাঁই আর তৈজসপত্র কতো নাজুক! দৈন্যের কাছে হেরে যাই বারবার সময়ের ধূসর আয়নায় থমকে দাঁড়াই! আর…
-
মেঠোপথে
মেঠোপথে ফজলুল হক সবুজ কুঁজবন আর মাঠ অবিশ্রামী মানুষের পাহারায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে খড়কুটোর সারি সারি ঘর, কুয়াশার কান্না শেষে সোনালি রোদের অকৃপণ হাসি শীর্ণ দেহে উষ্ণতার প্রলেপ; পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত সবুজ ঝোপঝাড়– মাঝের সরু আলটি ধরে চলে গেছে কোন সুদূরের গ্রাম, যেনো সোনালি-সবুজে আঁকা চিরচেনা জীবনের আল্পনা। রাখালের ভাটিয়ালি গান কৃষাণ কৃষাণীর মনে ছন্দের দোলা, কী করে ভুলি আমিও যে এই মাটিরই সন্তান! বিধবা মায়ের একাকীত্বতা আঁকে ধূসর জীবনের আল্পনা, ঋণের বোঝা মাথায় ফিরবো ফিরবো করে ফেরা হয় না, তারপর ফেরা হলো। শিশিরভেজা মেঠোপথে বেদনার দীপ নিভে জীবন উপভোগ করি ফসলের লকলকে ডগায়; রিক্ত নীড়ে হেসে…
-
নিঃসঙ্গ নির্জনতা
নিঃসঙ্গ নির্জনতা ফজলুল হক স্বাধীনতাকে ভালোবাসার আঁচলে বাঁধতে পারিনি; খাঁচায় একটি পাখি পুষতে ব্যস্ত ছিলাম- গম ও চালের মিহিদানা সরিষা, ঘাসের কচি ডগাসহ সবকিছু খেতে দিতাম। কাছে গেলেই ঠোঁট বের করে সোহাগ ঢেলে দিতো হরহামেশায়, একদিন খাঁচা খুলে আদর করতেই সুযোগ বুঝে বাঁধন ছিঁড়ে ডানা মেলে উড়ে গেলো আকাশে! আমি নির্বাক হয়ে ডানার স্বাধীনতা দেখছিলাম। অনুভবে শিহরণ জাগে এমন একটি নরম হাত যেনো পিঠে স্পর্শ করে অদ্ভুতভাবে বললো, তুমি পাখিটাকে খাঁচাবদ্ধ করে রেখেছিলে-এর নাম নির্যাতন তিনবেলা খাবার দিয়েছো- এর নাম অনুগ্রহ বা দয়া আর পাখিটা ডানা মেলে উড়ে গেলো- এর নাম স্বাধীনতা। ঘোর কেটে গেলো ততোক্ষণে নিঃসীম নিঃসঙ্গতায় ডুবে…
-
প্রতিবেশি সমাচার
প্রতিবেশি সমাচার ফজলুল হক দাদি প্রায়ই বলতেন গাছগাছালিতে ঘেরা গ্রামের এ্যাতো বড় বাড়ি, দেড় বিঘা পুকুর- গৃহপালিত পশুপাখি পালন না করলে হয় নাকি? মাচান থেকে ধান নিয়ে হাটে গেলাম চার জোড়া হাঁস কিনে ফিরলাম- উঠোনের একপাশে তাদের জন্য ঘর তৈরি করা হলো। পাড়ায় পড়ে গেলো হৈচৈ বাড়ির ছোট সদস্যদের উৎসাহের কোনো কমতি নেই। প্রথম কয়েকদিন হাঁসগুলোকে সকালে ঘর থেকে বের করে পুকুরে নিয়ে যাই বেলাশেষে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসি নিরাপদ আশ্রয়ে, সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে ওরা নিজেরাই চেনা পথ ধরে প্রতিদিন নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে লাগলো, যতোক্ষণ আঙিনার ভেতরে থাকে সমস্বরে ডাকাডাকি করে। মা বলেন,ওদের পেটে খিদে বাবা বলেন, নতুন…
-
এক জোড়া আয়ত চোখ
এক জোড়া আয়ত চোখ ফজলুল হক কফিনটা খোলা হলো ডুকরে কেঁদে উঠলো টুঙ্গিপাড়ার মাটি! তখনও নেতার শরীর হতে রক্ত ঝরছিলো, যেনো একটি মানচিত্রের ক্ষত-বিক্ষত ব্যবচ্ছেদ! সেদিন দীর্ঘতর হয়েছিলো অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মিছিল, কলংকিত ইতিহাসের রসদ জুগিয়ে লাল-সবুজের পতাকা ঘিরে ক্ষমতালিপসু কিছু শকুনের অকৃতজ্ঞ উল্লাস। একজোড়া নিথর আয়ত চোখ আজও যেনো চেয়ে আছে চেতনার পথজুড়ে, চোখের ভাষায় বলছেন কথা শপথ ভেঙো না কেউ। ছয়চল্লিশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এখনও আঁচড় কাটে মানচিত্রে, স্বাধীনতার শরীর থেকে রক্ত ঝরে থেমে থেমে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের কালো থাবায়, এ দায়,এ লজ্জা কী শুধুই সার্বভৌমত্বের! কোথায় স্বাধীনচেতা দেশ প্রেমিকের দল হৃদয়-বিবেক কি জেগে উঠবে না? নেতা কি আর একবার আহ্বান…
-
বিড়ম্বনা
বিড়ম্বনা ফজলুল হক এক সময় ভালোলাগা আর অভিমান নিয়ে লিখতাম লোকে বলতো প্রেমে পড়েছে বোধহয়, তারপর বিরহ নিয়ে লেখা অনেকে ফিসফিস করে ছেঁকা খাইছে কবি। ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে লিখলাম কেউ বলে সাহস কতো বেটার! রাজনীতি নিয়ে লিখতেই স্বজনেরা বললো জীবনের মায়া নেই? তারপর প্রকৃতি নিয়ে লেখা মাচানে বসা অলস লোকগুলো উৎসুক নয়নে চেয়ে বলে পাগলে পাইছে নিশ্চয়। ভ্যাবাচ্যাকায় কিছুদিন লেখা বন্ধ হলো, এক গোধূলিতে পথের বাঁকে হঠাৎ এক কবিতা প্রেমির দেখা সে বললো,কবি কলম বন্ধ কেনো? নির্বাক দৃষ্টিতে তার চোখে চেয়ে সমুদ্রের উন্মাদনা দেখতে পেলাম; অতঃপর যা হওয়ার তাই হলো! মস্ত বড় এক কবিতার পাণ্ডুলিপি সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো! নাম…
-
অমরত্ব
অমরত্ব ফজলুল হক আমি বিচলিত যেমনটা হয় আঁধারে হারালে জোছনা কথা; শ্রাবণ কি তোমায় দেয়নি আভাস? গভীর নিমগ্নতায় সন্ধ্যাকে রাতের গভীরে নিমন্ত্রণ করেছি- পৌরাণিক অরণ্যের পাণ্ডব গুহায় মুখোমুখি হতে চাই দুজনে। যতো ঘৃণা আছে উগরে দিও তাচ্ছিল্যের ইঙ্গিতে সজোরে খুলে দিও অভিযোগোর সবকটি খিড়কি, ভুলেও জানতে চেয়ো না নিছক অভিমানের কথা আমি শোনাবো রোদনের গল্প। পূতপবিত্র অর্ঘ্যজলের ঘটি নেই কোনো মালি হাতে তুলে দেয়নি কোনোদিন দুটো সতেজ বা বাসি ফুল নামমাত্র মূল্যে কিনে আনবো সে সাহস হয়নি কখনো, আমি হতদরিদ্র প্রেমিক আছে প্রার্থনার একজোড়া বিনয়ী হাত,চোখে জল টলমল। বিত্তবৈভব তুচ্ছ সবই তুচ্ছ নেশার শরাব- পাশে পাবার নিবিড় ভরসায় স্রষ্টার…
-
কারও পথের দূরত্বে
কারও পথের দূরত্বে ফজলুল হক পুরোনো গলি নিষিদ্ধ প্রহরের প্রতিধ্বনি ধ্রুপদী প্রেম ও নিটোল ভালোবাসার নিঃশ্বাসে বিরহের গন্ধ, শেওলাবৃত নেই আর চলাচলের পথটি। চারিদিকে চেনা চেনা ঘ্রাণ প্রেমিকা বাতাসে ভেসে আসে সুখ-আনন্দের গুঞ্জন, যে রকম ঘ্রাণে ঠোঁটে জলমেখে প্রথম চোখ তুলে দেখেছিলাম তোমাকে। বদলে গেছে অবয়ব জীবনের চারিধার ব্যর্থ প্রণয়ের আগুনে পুড়ে গেছে গোপন ইচ্ছেরা, নিজেকে বদলাতে পারিনি এতোটুকুও কালান্তরে বদলে গেছো তুমি। কী লিখবো কবিতায়? নেই কোনো নতুন কথা, না আছে জীবন-সঙ্গীতের হিল্লোলিত সুর-ছন্দ, উত্তাল নদী হয়ে ভেঙেছো হৃদয়ের সবুজ পাড়। প্রেম-বিরহি মেঘ কষ্ট-বৃষ্টিতে এখনও ভিজে যায় পোড়া দু’টো চোখ, আজও পথিক-প্রহরে ফুলেরা শোনায় করুণ আর্তনাদ!…
-
স্বপ্নহীন
স্বপ্নহীন ফজলুল হক নিভে যাওয়ার অভিলাষে কেনো মিথ্যে প্রদীপ জ্বালো, সরে আসার ফাঁদ পেতে কেনোইবা অলীক গল্পের পাণ্ডুলিপি লিখো? এ কেমন মিছে অভিনয়! জীবনের ভাষাগুলো পরিষ্কার দুর্লভ স্মৃতির মতো, বিষণ্নতায় ছেয়ে গেছে ভালোবাসার অনুরঁজন, স্বপ্নের রশি টেনে ক্লান্তপ্রায় ফেলে আসা দীঘল সময়। ঘুমহীন ঘুমচোখ স্বপ্নহীন রাত স্মৃতির বাসর ভেঙে ডুবে গেলো অভিমানী নীল চাঁদ, কে কখন শূন্যতায় ডুবে যায় নেই যেনো কারো তার দায়ভার। এ আঁধার যদি কেটে যায় রুপালি আলোর আলিঙ্গনে, সবুজ ঘাস ভিজবে আবার হেমন্তের শিশিরজলে। তুমিও তো শিশিরজল যাকে খুশি ভিজিয়ে দাও রবি’র জেগে ওঠার আগেই অতঃপর আচানক নিজেকে গুটিয়ে ফেলো শামুকের…






























