-
আমার শিক্ষাজীবন
আমার শিক্ষাজীবন তাহমিনা খাতুন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করলাম। পূর্বসূরী বড় বোনদের চেয়ে আলাদা নয় আমার গল্প! উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাব। প্রায় বছর খানেক কেটে গেল ঘরে বসেই। আমার তৃতীয় ভাই মরহুম খন্দকার আবুল খায়ের (বড় তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ হওয়ায় আমরা ছোট ভাই-বোনেরা তাঁকে ‘ছোট ভাই’ বলে সম্বোধন করতাম) যাঁর অবদান আমার জীবনে সবচেয়ে বেশী। শুধু আমার জীবনে নয়, আমার ছোট আরও তিন ভাই, বোনের জীবনেও ছোট ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য! ছোট ভাই নিজে তখন ঢাকায় সামান্য বেতনে একটি চাকুরীর পাশাপাশি নৈশ কলেজে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। ছোট ভাই ছুটিতে বাড়ি এলেন। আমার কাছে জানতে চাইলেন কি করে সময়…
-
ভাই-বোনদের কথা
ভাই-বোনদের কথা তাহমিনা খাতুন আমারা মোট এগারো ভাই-বোন। আমাদের সবার বড় ভাই মরহুম খন্দকার আবু তাহের। আমাদের বড় ভাইকে আমরা ‘মিয়াভাই’ বলে সম্বোধন করতাম। মিয়া ভাই বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রাম থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে, মিয়া ভাই আমাদের গ্রাম থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে ধোবাখোলা করোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন, আমার জন্মেরও আগে! মাত্র ৫ম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া এক বালক নিজ পরিবার ছেড়ে দূর গ্রামের অপরিচিত এক পরিবারে ‘লজিং’ বা ‘জায়গীর’ থেকে লেখা-পড়া চালিয়ে গেলেন। লজিং বা ‘জায়গীর থাকার’ ধারণাটা হয়তো এখন অনেকেরই অপরিচিত। বৃটিশ ভারতের শেষের…
-
আমার মা
আমার মা তাহমিনা খাতুন আমার মায়ের তুলনা একমাত্র আমার মা নিজেই। নিজের মা বলে বলছি না। প্রত্যেকের মা প্রত্যেকের কাছে প্রিয়। কিন্তু কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট ছিল আমার মায়ের। মাকে নিরক্ষরই বলা যায়। কিন্ত নিজের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে মা ছিলেন সদা সতর্ক প্রহরী! সময় মত পড়তে বসলাম কিনা, ঠিক মতো স্কুলে গেলাম কিনা, পরীক্ষার ফলাফল কেমন করছি-প্রতিটি ব্যাপারে মায়ের ছিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এছাড়া দেশ বিদেশের বিভিন্ন খবরাখবর নিয়ে মায়ের ছিল অপরিসীম আগ্রহ। আমার ছোট বেলায় আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় গৃহিণীদের দেখেছি ঘরকন্না ছাড়া তাঁদের মধ্যে দেশের বা বহির্বিশ্বের ঘটনা জানার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আমার মা যেটুকু রিডিং পড়তে পারতেন…
-
আমার বাবা
আমার বাবা তাহমিনা খাতুন আমার বাবা মরহুম খন্দকার আবুল কাসেম। আমার বাবার শিশুকালটি শুরু হয়েছিল নিতান্তই দুঃখের মধ্য দিয়ে! অত্যন্ত অল্প বয়সে আমার আব্বা তাঁর ছোট দুই ভাই বোনসহ পিতৃ-মাতৃহীন হন। এতিম তিন শিশু তাঁদের নানী এবং খালাদের স্নেহ-মমতায় লালিত পালিত হন। আমার বাবার কাছে শুনেছি ওনার নানী খালারা আরবী এবং ফারসী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। আব্বা তাঁর নানী খালাদের নিকট আরবী এবং ফারসী ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, তবে আব্বার বাংলা ভাষাতেও চমৎকার দখল ছিল। তাঁর বাংলা হাতের লেখা এবং ভাষাশৈলী ছিল অত্যন্ত গোছালো এবং পরিপক্ক। আব্বার সুনিপুণ হস্তাক্ষর এবং ভাষাশৈলী ছিল যে কোন উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে চমৎকৃত করার মতো। আব্বার…
-
আমাদের আত্রাই নদী
আমাদের আত্রাই নদী তাহমিনা খাতুন দ্বাড়িয়াপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে আত্রাই নদী। আমাদের ছেলেবেলায় দেখতাম বর্ষাকালে নদীটি কানায় কানায় পানিতে ভরে যেত। অনেক সময় যখন বেশ বড় বন্যা হত, নদীর কূল ছাপিয়ে হাইওয়ের উপর দিয়েও স্রোত বয়ে যেত। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও বেশ কিছু দিনের জন্য বর্ষাকালীন ছুটিতে যেতে বাধ্য হত। কারণ বিদ্যালয়ের ঘরটিতেও বন্যার পানি ঢুকে পড়ত। বর্ষাকালে আত্রাই যখন পানিতে ভরে যেত, তখন কিছু লোক এক ধরনের জাল দিয়ে (যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হত ‘খরা’) ট্যাংরা, পুঁটি, খলশে, ছোট আকারের শোল, বোয়াল, নলা, মৃগেল, টাকিসহ আরও অনেক ধরনের সুস্বাদু মাছ ধরতেন। আমাদের পাড়ার বাসিন্দারা সহ অনেকেই বর্ষার…
-
আমাদের দ্বারিয়াপুর গ্রাম
আমাদের দ্বারিয়াপুর গ্রাম তাহমিনা খাতুন পাবনা জেলার তৎকালীন সুজানগর থানার দ্বারিয়াপুর গ্রামে আমার জন্ম। পাবনা তখন দুই মহকুমা বিশিষ্ট বৃহত্তর জেলা। তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের সতেরটি জেলার মধ্যে দুই মহকুমা বিশিষ্ট একটি জেলা পাবনা। পাবনা সদর ও সিরাজগঞ্জ। মূল পাবনা জেলার সদর অংশে আমার জন্ম। আমাদের গ্রামটির অবস্থান পাবনা শহর থেকে পাবনা-রাজশাহী হাইওয়ের ছাব্বিশ মাইলের মাইল ফলকের সাথেই। শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার অভাবকে যদি প্রত্যন্ত গ্রাম বা অজপাড়া গাঁ হিসাবে মূল্যায়ন করতে চাই, তবে দ্বারিয়াপুরকে ‘প্রত্যন্ত গ্রাম’ বা ‘অজপাড়া গাঁ’ বলা যাবে না। আবার শিক্ষা ব্যবস্থা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার দিক থেকে বিবেচনা করলে দ্বারিয়াপুরকে গণ্ডগ্রামও বলা যাবে…
-
মোহাম্মদ আবিদ আলী (২য় পর্ব)
মোহাম্মদ আবিদ আলী (২য় পর্ব) মোহাম্মদ আবিদ আলীর ‘হাদীসের গল্পগুচ্ছ’ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন সুজানগর উপজেলার আরেক কৃতি সন্তান লোকসাহিত্য বিশারদ মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ভূমিকাটি- “ইসলাম ধর্ম সভ্য সমাজে সুপরিচিত। ইসলাম ধর্মের পয়গম্বর হজরত মুহম্মদ (সা.)। আরব দেশে সর্বপ্রথম এই শ্রেষ্ঠ পয়গম্বরের বাণী প্রচারিত হয়েছিল। আরবেরা তখন অসভ্য এবং সভ্য জগত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা পাপাচারে লিপ্ত হয়ে জীবন যাপন করত। সেদেশে এবং সে জাতির মধ্যে হজরত মুহম্মদের অভ্যুদয় একটি পরম বিস্ময়ের ব্যাপার। আরও অধিক বিশ্বয়ের কথা এই যে তাঁর একক এবং আপ্রাণ চেষ্টার ফলে ইসলামের তৌহিদ-বাণী সমগ্র আরব দেশে পরিগৃহীত হয়েছিল; বর্বর আরবজাতি নব উন্মাদনায় দুর্বার…
-
মোহাম্মদ আবিদ আলী (১ম পর্ব)
মোহাম্মদ আবিদ আলী (১ম পর্ব) মোহাম্মদ আবিদ আলী (১৯০৪-১৯৮৭ খ্রি.) ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও লেখক। জন্ম: মোহাম্মদ আবিদ আলী ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত ভায়না ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক জীবন: পিতা মুন্সি মিয়াজান মল্লিক ও মাতা বুলুজান নেছা। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মোহাম্মদ আবিদ আলী ছিলেন সবার বড়ো। মোহাম্মদ আবিদ আলী, এম. আকবর আলী ও মোহাম্মদ আবদুল জব্বার এই তিন সহোদর যেন একই বৃত্তে তিনটি ফুল। তাঁদের জন্মদায়িনী মা ‘রত্নগর্ভা’ জননীর সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। পিতা মিয়াজান মল্লিক প্রথম জীবনে মাঝি ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি স্বাধীনভাবে ছো্টো ছোটো ব্যবসা শুরু করেন এবং এই ব্যবসার সীমিত…
-
ডা. অশোক কুমার বাগচী
ডা. অশোক কুমার বাগচী উপমহাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্রের এক অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন। তিনিই সর্বপ্রথম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসুস্থ জীবন সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দাখিল করেন। জন্ম: ডা. অশোক কুমার বাগচীর পৈত্রিক নিবাস পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত তাঁতিবন্দ গ্রামে। তিনি ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে নভেম্বর রংপুরে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক জীবন: ডা. বাগচীর পিতার নাম দ্বিজদাস বাগচি। তাঁর জন্মের সময় পিতা দ্বিজদাস বাগচী পাবনা শহরের ‘বাগচি ফার্মেসি’তে ডাক্তারি করতেন। পিতা ও পিতামহ উভয়েই সেকালের নাম করা ডাক্তার ছিলেন। শিক্ষা জীবন: ডা. বাগচী ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা জি.সি আইতে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে…
-
আবু জাফর খান
আবু জাফর খান পেশায় একজন চিকিৎসক। ভাবনায় কবি, কথাশিল্পী ও সংগঠক। তাঁর পুরো নাম কে এম আবু জাফর। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে তিনি পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারি পরিচালক পদে কর্মরত আছেন। লেখক হিসেবে আবু জাফর খান এর বিশেষত্ব, তিনি নিবিড় অন্তর অনুভবে প্রত্যহ ঘটে চলা নানান ঘটনা, জীবনের গতি প্রকৃতি, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, ব্যক্তিক দহনের সামষ্টিক যন্ত্রণা তুলে আনেন নান্দনিক উপলব্ধির নিপুণ উপস্থাপনায়। তাঁর লেখায় ধ্বনিত হয় বিবেক কথনের অকৃত্রিম প্রতিভাষা। তিনি তাঁর লেখায় প্রতিধ্বনিত করেন নন্দনতাত্ত্বিকতায় জীবন বোধের সমকালীন বাস্তবতা। জন্ম: কবি ও কথাশিল্পী আবু জাফর খান ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের…






























