সংসার ও আইনজীবী জীবন
সংসার ও আইনজীবী জীবন
তাহমিনা খাতুন
স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতেই আমাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে আমাদেরকে সর্বস্বান্ত করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। পোড়া ভিটায় একখানা ছাপড়া তুলে কোন ক্রমে দিন গুজরান করছিলেন আমাদের পরিবারের সদস্যরা।আমাদের পরিবার ছিল মূলত কৃষিজীবী। পাক বাহিনীর অত্যাচারের ফলে কৃষি কাজে স্থিত হতে পারছিল না পরিবার। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী আমার তৃতীয় ভাই মরহুম খন্দকার আবুল খায়ের। আমি সহ চার ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ, সংসারের খরচ যোগানো একজনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণে আমার বিদ্যোৎসাহী ভাই আমাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। স্বাধীনতার পর পরই আমার বিয়ে হয়ে গেল।
আমার সৌভাগ্য, আমার ভাইয়ের মতো আমার স্বামীও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। বিয়ের পর আমি ম্যাট্টিক পাশ করে ‘সিদ্বেশ্বরী গার্লস কলেজে’ ভর্তি হলাম। কিন্ত সন্তানের জন্ম এবং নিজের অসুস্থতার কারণে লেখাপড়া স্থগিত রাখতে বাধ্য হলাম। যাহোক,বিভিন্ন সমস্যার কারণে লেখাপড়া বন্ধ রাখলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের আকাঙ্খা কখনই মন থেকে মরে যায় নি। যে কারণে ম্যাট্টিক পাশ করার ১৪ বছর পর আমি আবার কলেজে ভর্তি হই এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ভালভাবে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হই। এখান থেকে অনার্সসহ এলএলবি এবং এলএলএম সম্পন্ন করি।
আরও পড়ুন আত্মকথন
তবে সংসার, সন্তানদের লালন-পালন, তাদের লেখাপড়া করানো, নিজের লেখাপড়া; এক সঙ্গে এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়েছে। তবে থেমে যাইনি। লড়াই চালিয়ে গেছি এবং শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার এই লড়াইয়ের ময়দানে সহযোদ্ধা হিসাবে পেয়েছিলাম আমার স্বামী মরহুম আনোয়ারুল হক রাশেদকে! এই মানুষটির জীবনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অল্প বয়সে পিতৃহীন হয়েছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র না হলেও অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন! ব্যবসায়ী পিতার অকাল মৃত্যুতে একদিকে পিতার ব্যবসার হাল ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের আচরণে প্রতি পদে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন।
যাহোক, সংসার জীবনে ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও সংসারের কাজে আমি তার সহযোগিতা পেয়েছি অহরহ। আমার যুদ্ধ জয়ের সঙ্গী হয়েছিল ঠিকই কিন্তু নিজে হেরে গেছে মরণ ব্যাধি ক্যান্সারের কাছে। দেড় বছর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০০৫ সালে অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে! সঙ্গীহীন আমি আজও জীবনের বোঝা টেনে নিয়ে চলেছি!
আমি নিজে আইন পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার বছরেই ১৯৯৫ সালে আমার দুই মেয়ে শুচিতা ও সঞ্চিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আমার ছেলে সুহৃদ তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। এলএলএম পাশের পর বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নেই এবং ভালভাবে উত্তীর্ণ হই। এরপর ঢাকা বার এসোসিয়েশনের সদস্য হই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে এক সহপাঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি’ নামে একটি মানবাধিকার সংগঠনের সাথে এবং আমি উক্ত সংগঠনের সদস্য পদ গ্রহন করি। বার এসোসিয়েশনের সদস্য হওয়ার পর উক্ত সংগঠনের পূর্নকালীন আইনজীবী হিসাবে যোগদান করি। সংগঠনটি সমাজের দুস্থ, অসহায় নারী শিশুদের আইনগত সুরক্ষা, আশ্রয় প্রদানসহ বিভিন্ন সেবা মূলক সহায়তা প্রদান করতো।অল্প বয়স থেকেই এধরনের সেবামূলক কাজের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিল আমার। এই সংগঠনটির সদস্য হয়ে সমিতিতে আইনজীবী হিসাবে যোগদান করার ফলে আমার সে ইচ্ছা পূরণের সুযোগ হল।
আরও পড়ুন ভাষা নিয়ে ভাবনা
সংগঠনটিতে কাজ করতে গিয়ে দেখা হল অন্য এক জগত! বৈষম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থায় যৌতুক, বাল্য বিয়ে, পাচার, এসিডের শিকার হওয়া যেন নারীর ভবিতব্য! অধিকার বঞ্চিত নারী-শিশুর প্রতি পদক্ষেপে বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার যে চিত্র প্রতিদিনই দেখেছর তা ভাষায় বর্ণনাতীত! এই সব অসহায় নারী-শিশুর দূর্বিসহ জীবনের করুণ ছবি জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে দিত। সাধ্য মত চেষ্টা করেছি এদের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে, এদের জীবনে একটু স্বস্তি এনে দিতে। কত ভেঙ্গে যাওয়া সংসারকে জোড়া লাগাতে পেরেছি, কত শিশুকে পিতা-মাতার কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, তা ভাবলে মনটা আজও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।
একই ভাবে এই সংগঠনটিতে কাজ করতে গিয়ে আরও দেখেছি মানুষের লোভ, কুপমন্ডুকতা, স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা,হীনমন্যতা আর দায়িত্বহীনতা। কন্যার প্রতি শিক্ষিত স্বচ্ছল পিতা-মাতার দায়িত্হীন আচরণ! স্বামী অথবা শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনের লাঞ্ছনা-গঞ্জনার কথা জেনেও শুধুমাত্র নিজেদের সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী মেয়েকে স্বামীর সংসার করতে বাধ্য করার বহু ঘটনা শুনতে হয়েছে। কম লেখাপড়া জানা আয়-রোজগারহীন অথবা দরিদ্র মেয়ে হলে তো কথাই নেই। পিতা-মাতা তথা পরিবারের দূরদর্শিতার অভাব, তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকায় কত মেয়েকে যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংসার করতে গিয়ে চরম নৃশংসতার বলী হয়ে অসহায় জীবনের বোঝা টেনে কোন মতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা অথবা আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার কথা শুনেছি- তার ইয়ত্তা নাই!
আবার উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবীদের মধ্যেও এ ধরনের আচরণ দেখে ব্যথিত ও লজ্জিত হয়েছি। মনে হয় উচ্চ শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত বা নিরক্ষরের মধ্যে মানুষের স্বভাবগত আচরণ খুব বেশী তারতম্য সৃষ্টি করতে পারে না। স্বল্প শিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষকে বরং তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। উচ্চ শিক্ষিতের ক্ষেত্রে সে সুযোগ একেবারেই নাই। মানুষ প্রকৃত অর্থে নিজেকে নিজে সংশোধন না করলে তাকে সংশোধন করা দুরুহ!
আরও পড়ুন সমকালীন ভাবনা
একটি ঘটনা আমাকে বিস্মিত এবং লজ্জিত করেছে। একবার ধর্ষণের শিকার হওয়া এক ভুক্তভোগীকে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলখানার নিরাপদ হেফাজতে বন্দী থাকা অবস্থা থেকে; সমিতির হেফাজতে নেওয়ার জন্য ঢাকার বাইরের এক জেলা শহরে গেলাম। সঙ্গে এক নারী আইনজীবী সহকর্মী। মেয়েটিকে জেলখানা থেকে সমিতির জিম্মায় দেওয়া হল। মেয়েটির সাথে এক রিক্সায় উঠতে ওই সহকর্মীর তীব্র আপত্তি। আপত্তির কারণ মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হওয়ায় সে অপবিত্র হয়ে গেছে। কাজেই তার সাথে বসলে ওই সহকর্মীর নিজেরও অপবিত্র হওয়ার আশংকা এবং যেহেতু তিনি একজন ধার্মিক মানুষ, সেহেতু তিনি পরকালের পুরস্কার বেহেশত্ যাওয়ার ব্যাপারটিকে ঝুঁকির মধ্য ফেলতে রাজী নন। অথচ তিনি অসহায় বিচার প্রার্থীকে সাহায্য করার জন্য সংগঠনটিতে কাজ করছিলেন। তাঁর এই কুপমন্ডুকতা দেখে নিজেই লজ্জিত হয়েছি। তিনি ভুলে গেলেন, নিরীহ মেয়েটির উপর ঘটে যাওয়া অপরাধের জন্য সে নিজে কোন ভাবেই দায়ী নয়। এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে কোন ভাবেই মানুষের সেবা করা যায় না! আমাদের মনে রাখা উচিত ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই!’
সংগঠনটিতে কাজ করার সুবাদে নারী শিশুর সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস’ সেন্টারে বেশ কিছুদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানেও অবোধ শিশুর প্রতি বিকৃত, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর শারীরিক, মানসিক ও পাশবিক অপরাধের যে চিত্র দেখেছি, তাতে নিজেকে মানুষ ভাবতে ঘৃ্ণা বোধ হয়।
সমিতির আইনজীবী হিসাবে দায়িত্ব পালনের কারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন সচেতনতা মূলক সেশন পরিচালনা করা, শিক্ষক, আলেম সমাজ, পুলিশ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষের সাথে মত বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে মানবাধিকার কোর্সে অতিথি বক্তা হিসাবে সেশন পরিচালনা করেছি। ধরা বাঁধা আইনী পেশার বাইরে এ ধরনের কাজের বৈচিত্র বেশী উপভোগ করেছি।
আরও পড়ুন যাপিত জীবনের কথকতা-
দ্বারিয়াপুর গ্রাম
আত্রাই নদী
আমার বাবা
আমার মা
ভাই-বোনদের কথা
আমার শিক্ষাজীবন
একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো
যেভাবে আইনজীবী হলাম
শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ
পাশের বাড়ির আপনজন
আমার নানী
প্রথম শহর দেখা ও প্রথম বিদেশ ভ্রমণ
তৎকালীন গ্রামের চিত্র
ছেলেবেলার ষড়ঋতু
মধুর স্মৃতি
স্নেহশীল কজন
তৎকালীন গ্রামীণ চিকিৎসা ব্যবস্থা
ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেইজে
সংসার ও আইনজীবী জীবন



