শৈশবের-দুঃখজাগানিয়া-স্মৃতি
বাঘুলপুর,  রানিনগর,  সাহিত্য,  স্মৃতিচারণ

শৈশবের দুঃখজাগানিয়া স্মৃতি

শৈশবের দুঃখজাগানিয়া স্মৃতি 

কৃষ্ণ ভৌমিক

 

শৈশব যেন দুঃখজাগানিয়া স্মৃতি। আর যদি সে হয় গ্রামীণ শৈশব, তাহলে মধুময় সে সোনালী দিন মনের পর্দায় বারবার ফিরে আসে। তখন মনে অনুভুত হয় আনন্দ, বেদনা। আমার শৈশব কেটেছে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার রাণীনগর ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল গাজনার পার্শ্ববর্তী বাঘুলপুর গ্রামে। কৃষিজীবি পরিবারে গ্রাম বাংলার ধুলা, কাদা মাটির সাথেই জড়িয়ে থাকে শৈশব। আমারও তার ব্যতিক্রম নয়। বনজঙ্গল, খাল-বিল, মাঠ-ঘাটে শৈশবের দৌঁড়-ঝাপ, গ্রামীণ মেঠোপথ, বর্ষায় ডুবু ডুবু গ্রামের ছবিও যেন এখনো স্মৃতিতে ভেসে উঠে। এখনো দেখতে পাই দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠ। আউশ ধানের জমিতে সাথি ফসল, ডাবধান, ভুরা আর কাউনের লম্বা শীষের সাথে বাতাসের দাপাদাপি।

দৈনন্দিন গ্রামীণ খাবারের স্বাদ আজও যেন ভুলিনি। ভুরার পায়েশ, খেজুরের নলিগুড়ের সাথে ভুরার জাউ, কাউনের চালের খিচুড়ির স্বাদও যেন এখনো মনে পরে। যবের ভাত, আম-কাঠালের সাথে যবের ছাতু, ঢেঁকিছাটা আমনের লাল ভাতের সাথে শীতের সকালের বাশি রয়না মাছের কি যে স্বাদ। আমন পান্তার সাথে বিঁচিকলা আর কাঁচা মরিচ, বাসি আমনের ভাতের সাথে পেঁয়াজ আর সরিষা তেলের স্বাদ আজও মনে পরে।গাজনার বিলের কালো বোরো ধান আর আউশের খিচুরির স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি।

যেদিন সকালে বিঁচিকলা পান্তাভাত খেতাম সেদিন দুপুরে চোখজুড়ে যেন ঘুম নামতো। আউশের ফেনাভাতের সাথে একটু আলু সিদ্ধ হলেই অমৃত মনে হতো। বরণ ধানের টোবা টোবা মুড়ির স্বাদটাও কী ভুলেছি? কতদিন পকেটে মুড়ি আর পাটালি গুড় নিয়ে লাফঝাপের মাঝে খেয়েছি তাও ভুলতে পারেনি। নানা পার্বণে ডাবধান, চিচড়া, ঢেঁপের খই, চিড়ামুড়ি দিয়ে কত রকমরই না সুস্বাদু মুয়া’র স্বাদ আজ ভুলিনি।

আরও পড়ুন বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

 নারিকেল আর তিঁলের নারু কতদিন যে চুরি করে খেয়েছি তাও আজ মনে পরে। লালঘোলের স্বাদ এখনো যেন মুখে লেগে আছে। সাগরকান্দি থেকে ঘোষেরা বাঁকে করে লালঘোল ও জিলাপী বাড়ি বাড়ি ফেরি করতো। ধানের বদলে ঘোল-জিলাপী কতদিনই না মজা করে খেয়েছি। সে সময় ঘোল আর বাতাসা দিয়েই হালখাতা করতো ব্যবসায়িরা। সে লালঘোলও আজ নেই। তাওয়ায় রুটি মচমচে করে ভেজে খাওয়াটাও ভুলিনি। শৈশবের দুধের চাঁচি ও সর খাওয়ার জন্য ভাই বোনদের মধ্যে কতই না প্রতিযোগিতা ছিলো। বাড়িতে দুধের সর থেকে ঘি বানানোর সময় যে গন্ধ বাতাসে উড়তো তাও এখন যেন অনুভব করি। ঘি’র ছোবড়া ভাত দিয়ে খেতেও কি যে ভালো লাগতো।

ছোট বেলায় দেখতাম আমাদের তীর্থভুমি সুজানগরের পদ্মায় কত বড় বড়ই না ইলিশ ধরা পরতো। সে ইলিশ ভাজার সময় কি যে মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াতো। ভাজা মাছ ও ইলিশ ভাজা তেল দিয়ে ভাত খেতেও ভারি মজা ছিলো। আজ ইলিশের সে স্বাদ গন্ধ ও নেই। বাড়িতে যেদিন ঢেঁকিতে চিড়া কোটা হতো সেদিন অপেক্ষায় থাকতাম। কখন চিড়ার দলা পাবো। এ চিড়া দলা খাওয়ার জন্য সবাই যেন উন্মুখ থাকতাম। ঝাল চিড়া কুটে খাওয়ার স্বাদটাও আজও মনের পর্দায় ভেসে উঠছে।

গাছসহ ছোলা পুরিয়ে খাওয়ার স্মৃতিটাও ভুলিনি। দলবেধে মাঠ থেকে ছোলা তুলে আগুনে পুঁড়িয়ে খাওয়ার মজাটাই ছিলো আলাদা। কতদিন যে পোঁড়া ছোলার সাথে ছাই খেয়েছি তারও হিসাব নেই। ছোট বেলায় খাল-বিল নদী-নালায় কত রকমেরই না শাপলা-শালুক আর পদ্মফুল ফুটতো। শালুক পুঁড়িয়ে খাওয়ার মজাটাও মনে পরে। শাপলা-শালুকের সাথে খাল-বিলে ঝাকে ঝাকে বালিহাঁস, রাজহাঁস, নারকেলহাঁস, লালশিড়ি, শড়াইল, মানিকজোড়, চাপাতি, ষারশ, তিরমূল, খয়রা, চখা, ভুটড়া, নলকা, সাদাবক, কানাবগ, ফেফি, ডাউক, রংধনু, কাঁছিচড়া, রাতচড়া, ভুবনচিল, মাছরাঙ্গাসহ কত প্রজাতিরই না পাখি আসতো।

আরও পড়ুন একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

এসব পাখিরা অধিকাংশই সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসতো। গভীর রাতে পাখির ডাক আর ডানা ঝাপটানোর শব্দও যেন আজও মনে পরে। এ পাখিরাও আজ বিলুপ্ত। শৈশবে ষড়ঋতুর বৈচিত্রতা যেন চোখে পরতো। একেক  ঋতুতে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সাজতো। শরতের শুভ্র কাশবনের সাড়ি, ভোরের ঘাসের ডগায় শিশিরের বিন্দু ও শিউলি ফুলের গন্ধ যেন এখন ও মনকে দোলা দেয়। শৈশবে নতুন বই’র গন্ধ কি যে মজা লাগতো। নতুন বই পেলে কতদিন যে প্রাণ ভরে সে গন্ধ অনুভব করেছি তাও মনে পরে। আরও মনে পরে গ্রামে স্কুল না থাকায় সাত মাইল হেটে খলিলপুর হাই স্কুলে ৬ষ্ট শ্রেণীতে পড়ার কথা। রোদ বৃষ্টিতে ভিজে কতই না মজা হতো। বর্ষায় বৈঠা টেনে হৈচৈ করে স্কুলে যাতায়াতের জলছবি যেন এখনো মানসনেত্রে ভেসে উঠছে।  এখন ছেলে মেয়েরা আধা কিলো ও হাটতে চায়না।

আমাদের শৈশবে বর্ষাও আগমন ছিলো যেন উৎসব। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ছিপ বানানো এবং হাট থেকে নানা আকারের বড়শি কেনার যেন ধুম পড়তো। আর কৈ জাল বানানোর কি যে প্রস্তুতি ছিলো। যেদিন মাঠে প্রথম বর্ষার জল আসতো সেদিন দল ধরে ছিপ দিয়ে মাছ মারার উৎসব শুরু হতো। কতদিন যে ট্যাংড়া, বাম, জিয়ল মাছ ধরেছি তাও মনে পরে। আর যেদিন পুকুরে বর্ষার জল আসতো সেদিন কী আনন্দই না হতো। পুকুরে ছিপ ফেললেই বড় বড় ট্যাংড়া, জিয়ল, মাগুর ধরা হতো। বর্ষায় রাতে নৌকাতেই ঘুমাতাম। রাতে জিয়ালা দিয়ে বোয়াল মাছ ধরার স্মৃতিও ভুলতে পারিনি। গাজনারবিলে দেখেছি, কৈ, মাগুর, রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউশ, কালিবাউশ, রিঠে, চিতল, বোয়াল, ফলি, পাবদা, টাটকিনি, ফেসা,বাচা, সরপুটি, শোল, গজার, টাকি, বামসহ কত রকমের মাছ যেন কিলবিল করতো। সে সময় হাত বাড়ালেই যেন মাছ আর মাছ।

গাজনা বিলের উৎসমুখ বাদাই নদীতে ছিপ ফেললেই বড় বড় সরপুটি, বাম উঠতো। জল যখন বাদাই নদী দিয়ে বের হতো তখন জেলেরা মাছের ভাড়ে ভ্যাসাল জাল উঠাতে পারতো না। একবার মাছের সময় বাদাই গ্রামে কলেরা ছড়িয়ে পরে। অনেক লোক মারা যায়। জেলেরা এ সময় মাছ মাঁটিতে পুঁতে ফেলে। আজ যেন খাল-বিলে মাছও বিলুপ্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলার দৃশ্য ভুলতে পারিনি। কতদিন বাদাম পুঁড়িয়ে, ন্যাকড়া সেলাই করে বল বানিয়ে খেলেছি তাও মনে পরে। গ্রামীণ দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, লাটিম, ডাংগুলি, গুটি খেলা, কানামাছি, সাতখাপড়া, হাডুডু, লাঠি খেলা কি জনপ্রিয় ছিলো। এসব খেলা আজ চোখে পরে না। সে সময় প্রতিটি বাড়ির সাথেই জঙ্গল ছিলো। সেসব জঙ্গলে কতই না উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর বাস ছিলো। সেখানে কত রংবেরঙ্গের প্রজাপতিরই না মেলা বসতো। বটপাকুর ও আম গাছের মগডালে হরিয়ালের ডানা ঝাপটানোর শব্দও যেন আজ মনে পড়ে। ভোরে চড়ুই পাখি, শালিক, দোয়েল, ঘুঘুর ডাকে ঘুম ভাঙ্গানোর স্মৃতিও মনে পরে। কোকিলের কুহুকুহু ডাক আজ যেন স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। বউ কথা কও, বউ কথা কও, চোখ গেলো, চোখ গেলো পাখির ডাকে কিযে ভালো লাগার অনুভুতি ছিলো তাও আজ মনকে আলোড়িত করে।

নতুন ধান উঠার সময় যে নবান্ন উৎসব হতো সেটাও কী ভুলা যায়? চৈত্র সংক্রান্তিতে যখন  মেলা বসতো তখন কী যে ভালো লাগতো। সারাদিন মেলায় ঘুরে বেড়ানোর মজাটাও তখন কম ছিলো না।চৈত্র পুঁজা সুজানগরের বিভিন্ন গ্রামে খুবই ধুম ধাম হতো। বাঘুলপুর, বাদাই, ভাতশালা,সাগরকান্দি,সাতবাড়ীয়া,নিশ্চিন্তপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে অষ্ট গানের আসর বসতো।রাতে গ্রামে গ্রামে হ্যাজাক জ্বালিয়ে যখন অষ্ট গান শোনানো হতো তখন হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বিনোদনের মেলা বসতো।

শৈশবের  আর একটি স্মৃতি এখনো মনকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে। শৈশবে দেখতাম প্রতি রোজার মাসে আমাদের বাড়িতে গুড়ের সরবত আর মুড়ি চিড়া রেডি রাখা হতো। ইফতারির সময় রাস্তা দিয়ে যেকোন রোজাদার যাবার সময় বাসায় আসামাত্রই তাদেও ইফতারি করানো হতো।  আরও মজা লাগতো যখন দেখতাম প্রতি  রোজায় প্রতিবেশি রোজদারদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হতো। পুজাপার্বনে বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু  মুসলমান নির্বিশেষে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হতো।  মানুষে মানুষে তখন ভালোবাসার বন্ধন অটুট ছিলো। সেটিও আজ যেন শিথিল। সময়ের পরিবর্তনে সব কিছুই যেন বদলেছে। হাইব্রিড ফসল চাষে কতজাতের ফসলই না বিলুপ্ত হয়েছে। নানা ভাবে আমরা যেন প্রকৃতিকেও ধংস করেছি। এখন আর সেই আগের মতো গ্রাম বাংলার শাস্বত রুপ নেই। ফসলি জমি খন্ড বিখন্ডিত । এ যেন কালের দাবি।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

শৈশবের চুল কাটার দিন এলে যেন ভয় লাগতো। সুবলকাকা বাড়িতে এসে দু’পায়ের মাঝে মাথা নিচু করে ধরে চুল কাটতেন। নড়াচড়া করলেই ধমক খেতে হতো। দলধরে ঘুড়ি উড়ানোর দৃশ্যও আজ মনে পড়ছে। শীতের পিঠাপুলি খাওয়ার স্মৃতিও মনে পরে। একটানা তিনদিন কত রকমরই না পিঠা বানানো হতো।

শৈশবে পারিবারিক অনুশাসন ছিলো কঠোর। খেলাধুলার অবাধ অধিকার থাকলেও সন্ধ্যার সাথে সাথেই বই নিয়ে বসতে হতো। কোনদিন সন্ধ্যা পার হলেই রক্ষা ছিলো না। আর এ পারিবারিক অনুশাসনের মূলে ছিলেন আমাদের ঠাকুরমা। তিনিই আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তার কাছ থেকেই শিক্ষার প্রথম পাঠ শিখেছিলাম-সদা সত্য কথা বলবে। মিথ্যা বলবে না। মিথ্যা বললে পাপ হয়। পাপ করলে— শাস্তি ভোগ করতে হয়। সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে—-। অন্যের কোন কিছু না বলে নেয়া চুরি। চুরি করলে পাপ হয়। পাপ করলে— শাস্তি পেতে হয়। পরিবারের এ শিক্ষাই আজ যেন বিবেকের ভূমিকায় শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। পেশাগত জীবনে প্রতি মুহুর্তে আজও যেন এ শিক্ষার প্রভাব অনুভব করছি। সতীর্থদের মতো ধনসম্পত্তি না থাকলেও আছে মনের অগাধ শক্তি। অর্জন করেছি সত্যকে সত্য. মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎ সাহস। এটাই বা কম কিসের?

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

শৈশবের দুঃখজাগানিয়া স্মৃতি

Facebook Comments Box

কৃষ্ণ ভৌমিক দীর্ঘকাল সাতবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতা শেষে বর্তমানে অবসর যাপন করছেন। দৈনিক জনকণ্ঠের পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে লিখছেন। তিনি ১৯৬০ সালের ১২ মে, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত রাণীনগর ইউনিয়নের বাঘুলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!