হাইয়া-আলাল-ফালাহ্-শেষ-পর
গল্প,  বিমল কুণ্ডু (গল্প),  সাহিত্য

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (শেষ পর্ব)

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (শেষ পর্ব)
বিমল কুণ্ডু

 

একটি টেবিলের পিছনে পর পর চেয়ার সাজানো হয়েছে। মাঝের চেয়ারে যুবক আর তার সঙ্গীরা বসেছে দু’পাশে।

যুবক উঠে দাঁড়িয়ে জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললো, আমরা যে কাজ করতে এসেছি সেটাই আপনাদের বলবো। এই যে বিজলী আলো দেখছেন, এই আলো আমরা চর হাফেজিয়ার প্রতিটি ঘরে জ্বালাতে চাই। আপনাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে সবার মুখে হাসি ফুটাতে চাই। এই গ্রামে স্কুল হবে, হাসপাতাল হবে, মসজিদ হবে। আপনাদের সবার রুটি রুজির পথ করে দেয়া হবে। আপনারা নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। বলেন, এসব চান কিনা?

উপস্থিত জনতা একযোগে বলে ওঠলো, হ্যাঁ আমরা চাই ।

যুবক আবার বলতে শুরু করলো, এসব করতে আপনাদের সহযোগিতা দরকার। কিভাবে করতে হবে তা আমরাই শিখিয়ে দেবো। সবাই শুনুন, আমাদের সংগঠনকে বিশ্বব্যাংক সাহায্য দিয়েছে। তা আপনাদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এই টাকা খরচের একটা নিয়ম আছে। গ্রামের মাতুব্বর সাহেব একটু আমাদের সামনে আসেন।

আজিজ সরদার মারা যাবার পর তার ছেলে গিয়াস সরদার মাতুব্বর হয়েছে। বয়স প্রায় ৪৫ বছর। তিনি এসে সামনে দাঁড়ালেন।

যুবক এই প্রবীণ মানুষটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তাকে সালাম জানালো। পাশের সহকর্মীকে নির্দেশ দিতেই সে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।

যুবক আহ্বান করলো, মাতুব্বর সাহেব বসেন।

চর হাফেজিয়ার মাতুব্বরের জীবনে এই প্রথম সম্মান। তিনি প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে চেয়ারে বসলেন। যুবক হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত করলো। দেখাদেখি উপস্থিত জনতাও হাততালি দিল। সবাইকে শান্ত হতে বলে সে মাতুব্বরকে বললো, আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। দশজন উদ্যোগী যুবক আর দশজন মেয়েকে বাছাই করতে হবে। তাদের লেখাপড়া না জানলেও চলবে। এদের সঙ্গে থাকবে আমার
সহকর্মীরা। তারা সব কাজ বুঝিয়ে দেবে। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সব সদস্যের তালিকা তৈরি করতে হবে। মেয়েদের দলে থাকবে আমাদের মহিলা সহকর্মী। তালিকা তৈরির পর দশজন করে এক একটা দল গঠন করে তাদের কাজ করার জন্য টাকা মঞ্জুর করা হবে।

আরও পড়ুন গল্প লালু

এরপর যুবক জনতার দিকে তাকিয়ে একটু উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, কিন্তু সব কাজ শুরুর আগে আপনাদের তিনটি কাজ করতে হবে।

হুজুরের বাড়িতে যিনি বাস করেন, কালই তাকে ঐ বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। নিজ খরচে তাকে আমরা জন্য জায়গায় বাড়ি করে দেবো। ওখানে আমাদের সংগঠনের স্থায়ী অফিস ঘর হবে। হুজুরের যে স্কুল ও মাদ্রাসা ছিল তাও আমরা নতুন করে তৈরি করবো। আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু হবে। আজ রাতেই দেওয়ানগঞ্জ থেকে ইট, সিমেন্ট নিয়ে রাজমিস্ত্রি পৌঁছে যাবে। তার ব্যবস্থা আমরা করে এসেছি। আপনাদের মধ্যে থেকে চল্লিশজন কাল কাজে যোগ দেবেন। তাদের নগদ মজুরি দেয়া হবে। পনের দিনের মধ্যে একাজ আমি শেষ করতে চাই। তারপর ঢাকা গিয়ে পরবর্তী কাজের ব্যবস্থা করে দিন দশেকের মধ্যে আমরা ফিরে এসে নতুন অফিস ঘরে বসবো। আলোচনা এখানেই শেষ।

লোকজনকে বিদায় করে যুবকেরা কাজের বিবরণ লিপিবদ্ধ করলো, প্রকল্প ও নকশাপত্র নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে নিজেরা আলাপ-আলোচনায় মনোযোগ দিল।

ঠিক পনের দিনের মাথায় কাজ তিনটি সমাপ্ত হলো। যুবক নিজে সার্বক্ষণিক কাজের তদারকি করেছে। আজ তার মুখে তৃপ্তির হাসি। দু’জন সহকর্মীকে এখানে রেখে আর সবাই ভোর রাতে ঢাকা ফিরে যাবে।

সময় গড়িয়ে আগামী দিনের সূর্য উঠতে এখনো কিছু সময় বাকি। লঞ্চ ছাড়ার সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। শীতের কুয়াশাঢাকা হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে যুবক লঞ্চের ডেকে এসে দাঁড়ালো। ইতোমধ্যে প্রিয় হয়ে যাওয়া গ্রামের মানুষগুলো সেই অন্ধকারেও নদীর পাড়ে জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে গিয়াস মাতুব্বর সবার আগে দাঁড়িয়ে।

আরও পড়ুন গল্প  তিলতাল

আবছা আঁধারে আন্দাজ করে নিয়ে যুবক বললো, মাতুব্বর সাহেব – আসি, আবার দেখা হবে।

বিগলিত কণ্ঠে মাতুব্বর বললো, সাহেবেরে একখান কথা জিগাবার চাই। পনের দিন এইসব গরীবদের লগে রইলেন, এতসব কাম করলেন, কিন্তু আপনের নাম
পরিচয় কিছু জানা গেল না। এই গাঁয়ের লিগে কিসের এত দরদ তাও বুঝা গেল না। যদি যাওয়ার সময় কিছু কয়া যান…..।

যুবক কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর মৃদু হেসে বললো হ্যাঁ, আজ যাবার সময় আপনারা আমার পরিচয় জেনে রাখেন। আমাদের দলে যে মহিলা কর্মী রয়েছে, তার নাম সুরাইয়া খাতুন। সে এই গ্রামের আপনাদের বউ। একটু থেমে সে আবার উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, আপনারা সবাই আমার পরিচয় শোনেন, আমি আমেরিকায় লেখাপড়া শিখে সেখানেই চাকুরী করতাম। আব্বাজানের নির্দেশে দেশে ফিরে এসে,
গরীব মানুষের জন্য এই সংগঠন করেছি। তাঁর নির্দেশেই প্রথম এই গ্রাম থেকে কাজ শুরু করলাম। আমার নাম সোহেল আজাহার আমার বাবার নাম খোড়া রহমত, মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন-দাদার নাম হাফেজ মুহাম্মদ আজাহার আলী-দাদীর নাম হুরমতি……….।

আবেগে আপ্লুত যুবকের কণ্ঠ রোধ হয়ে গেল। যমুনার তীরে দাঁড়ানো মানুষগুলো নির্বাক।

হঠাৎ গিয়াস মাতুব্বর চিৎকার করে বলে ওঠলো, বাপজান-বাপজানরে, আমি তোর ছোট মামু।

সে কথা যুবকের কানে প্রবেশ করলো না। সারেঙ লঞ্চের নোঙর তুলে ফেলেছে। যুবকের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে একটি বিশেষ জায়গায়। আবছা অন্ধকারে চোখে পড়ছে সদ্যগড়া হাফেজ হুজুরের মসজিদ। হঠাৎই তার মনের আয়নায় ভেসে উঠলো হুজুর যেন ঐ মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভোরের আযান দিচ্ছেন। কি সুমধুর সেই আযানের ধ্বনি;

“হাইয়া আলাল ফালাহ্”…….. “কল্যাণের  জন্য এসো”

আরও পড়ুন গল্পটির-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!