সুরেন-বাবু-শেষ-পর্ব
কে এম আশরাফুল ইসলাম (গল্প),  গল্প,  তালিমনগর,  বালিয়াডাঙ্গি,  শ্যামসুন্দরপুর,  সাগরকান্দি,  সাগরকান্দি ইউনিয়নের ইতিহাস ও ঐতিহ্য,  সাহিত্য

সুরেন বাবু (শেষ পর্ব)

সুরেন বাবু (শেষ পর্ব)

কে এম আশরাফুল ইসলাম

 

রেকাত শাহ, বাড়ি সাগরকান্দি ইউনিয়নের পুকুরনিয়া গ্রামে। তিনি কলকাতায় লেখাপড়া করতেন। কথিত আছে তিনি হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিনের খাস দোয়া পেয়েছিলেন। তৎকালে রেকাত ইংরেজিতে ৯৯% নম্বর  নিয়ে বাংলাখ্যাত ফলাফল করেন।

বাবুজি রেকাতের পিতাকে বলেছিলেন, “রেকাত কখনো পাস করতে পারবে না। পাস করলেও টেনেটুনে।” 

পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে রেকাতের পিতা বাবুজিকে খবরটি জানানোর জন্য মহাখুশিতে রওয়ানা দিলেন। খুশির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে তিনি পথ হারিয়ে অন্য পথে চলে গিয়েছিলেন। পথচারী একজন জিজ্ঞাসা করলেন, 

-এমন খোশ মেজাজে কোথায় যাচ্ছেন?

-বাবুজির দরবারে। 

-আপনি পথ ভুলে গেছেন বুঝি?

রেকাতের পিতার সম্বিৎ ফিরে আসে। এরপর তিনি বাবুজির দরবারে রেজাল্ট শীট নিয়ে তাঁকে দিয়ে বললেন, 

-দেখেন বাবুজি,আমার রেকাত পাস করেছে।  

বাবুজি তাচ্ছিল্য সহকারে রেজাল্ট দেখতে লাগলেন। তিনি রেজাল্ট শীটের নিচের দিকে রেজাল্ট খুঁজে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 

-কোথায় তোমার ছেলে পাস করেছে? 

-বাবুজি আপনিতো রেজাল্ট নিচের দিকে খুঁজছেন। আমার ছেলের রেজাল্ট নিচে থাকে নাকি?

-কোথায় থাকে তোমার ছেলের রেজাল্ট?  

-সবার ওপরে। আমার ছেলের ওপরে কারো রেজাল্ট থাকতে পারে নাকি? আমার ছেলে ভারত উপমহাদেশের সেরা রেজাল্ট করেছে। 

মুসলিম ছেলের অবিশ্বাস্য রেজাল্ট। বাবুজি দেখলেন যে ঘটনাটি চরম এবং পরম সত্য। এই রেকাতই পরবর্তীতে হলফনামার মাধ্যমে রেকাতের পরিবর্তে মাওলানা রইস উদ্দিন আহম্মেদ নামে খ্যাত হোন। তিনি  ছিলেন ডাবল এম এ (ইংলিশ ও আরবি সাহিত্যে)। তিনি ছিলেন সুজানগর উপজেলার প্রথম এমএ পাস করা ব্যক্তি। তেরোটি ভাষায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। শের-এ-বাংলার মতো তিনিও ছিলেন অনলবর্ষী বাগ্মী। উত্তরবঙ্গের বাঘ বলে খ্যাত ছিলেন। ডক্টর মুহাম্মদ শহিদুল্লাহার পরেই তিনি ছিলেন একমাত্র বহুভাষাবিদ। যিনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের হয়ে জাতীয় নির্বাচনে পাবনা-২ থেকে অংশ নিয়ে এম এল এ নির্বাচিত হোন।  

মাওলানা রইস উদ্দিন আহম্মেদ-এর সমসাময়িক ছিলেন তালিমনগরের মাওলানা খোয়াজ উদ্দিন মোল্লা এবং শ্যামসুন্দরপুরের ডেপুটি সাহেব (ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন)। সাবেক শ্যামসুন্দরপুর ছিল হিন্দু পরিবার মুক্ত এলাকা।    

আরও পড়ুন মাওলানা রইচ উদ্দিন

ঈদ-উল-ফিতর শেষ। ঈদ-উল-আযহা সমাগত। শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) তালিমনগর বসে অন্যদের সাথে কুরবানির কথা পাকাপোক্ত করলেন। এতে তিনি সমর্থন পেলেন। ঈদ-উল-আযহার সালাত ডেপুটি সাহেবের বাসভবনের সামনে ঈদগাহ মাঠে আদায় করলেন। এরপর তিনি শ্যামগঞ্জ হাটের খোলা মাঠে সবাইকে নিয়ে হাজির হলেন। যথারীতি তিনি গরু কুরবানি করলেন। মুসলমানদের মধ্যে কিছু দুর্বল চিত্তের লোক ছিল, যারা বাবুজির জমি চাষ করত। তারাই গরু কুরবানির কথা তড়িৎ গতিতে বাবুজির কানে পৌঁছে দিলো। 

বাবুজি রাম! রাম!! রাম!!! চিৎকারে বলতে লাগলেন, মাধুর এত বড় সাহস! আমার জমিনে গরু কুরবানি। কুরবানির ঘটনা শুনে বাবুজিতো রেগে অগ্নিশর্মা। গোখরা সাপের মতো ফণা তুলে যেন ফোঁসফোঁস করছেন। তাঁর তল্লাটে গো-দেবতার অপমান। তাঁর জমিন গো-দেবতার রক্তে রঞ্জিত। মাহতাবকে আজ উপযুক্ত শিক্ষা দেবো। কথাগুলো উন্মাদ এর মতো পায়চারি করে বলতে থাকে। এই কে আছিস, ব্যাটা মাহতাবকে পিঠমুড়া করে বেঁধে নিয়ে আয়।

বাবুজির লোকজন ঘটনাস্থলে এসে হাজির। তারা শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) কে সসম্মানে বললেন,”হুজুর! বাবুজি আপনাকে তাঁর দরবারে তলব করেছেন।” 

তিনি বাবুজির দরবারে উপস্থিত হলেন। আজকের দরবার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নিয়ে গঠিত। সেরা সেরা পুরোহিত, সাধু, সন্ন্যাসি দরবার কক্ষে উপবিষ্ট। উদ্দেশ্য, মাহতাব আজকে চূড়ান্ত রায়ের মুখোমুখি হবেন। 

-মাহতাব তুমি আমার জমিনে গরু কুরবানির দুঃসাহস কীভাবে পেলে?

-আমি তোমার জমিনে গরু কুরবানি করেনি। আমি মুসলিম। আমার ধর্ম ইসলাম। আমার ধর্ম অনুযায়ী আল্লাহর জমিনে গরু কুরবানি করেছি। 

মাহতাবের বীরোচিত জবাব বাবুজি কখনো প্রত্যাশা করেননি। বাবুজি রাগে ফোঁসফোঁস করছেন। সভাসদের কোনো কথাই তিনি আর জানতে চাইলেন না। সভাকক্ষ ছেড়ে তিনি প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সভাসদের দৃষ্টি ক্রোধান্বিত বাবুর গমনাগমন পথের দিকে।

অন্দরমহলে বাবুজির মা বসে আছেন। বাবুজি নিত্যদিনে ব্যবহৃত বন্দুক নিয়ে বের হচ্ছেন। তার মা জিজ্ঞেস করলেন,

-কীরে সুরেন, বন্দুক নিয়ে কোথায় যাস?

-আজ মাধুর কেল্লা ফতে করবো।

সুরেনের মা তাঁকে এ কাজটি করতে বারণ করলেন। বললেন,

-মাধু কিন্তু সাধারণ কেউ নারে। ওঁর সাথে না লাগাই ভালো। 

সুরেন মায়ের কথা কর্ণপাত করলেন না। মুহুর্মুহু ফাঁকা ফায়ারে পরিবেশ আতঙ্কিত করতে করতে সরাসরি সভাকক্ষে মাধুকে শিকারের বেশে হাজির। আজ বাবুজি শিকারি, আর মাধু তাঁর চূড়ান্ত শিকার।

বাবুজি আল্লাহর ওলি হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) কে বললেন, 

-হে মাধু। তুই এখন পরপারের জন্য প্রস্তুত হ। 

মুচকি হেসে অকুতোভয় আল্লাহর হক্কানি ওলি মাহতাব দাম্ভিক বাবুজিকে বললেন, 

-রে নরাধম সুরেন। তোর আসন্ন পতন আমি দেখতে পাচ্ছি। এই বুকে গুলি চালা। বুক পেতে দিয়েছি। আজ জনতা তোর হিম্মত দেখে যাক। কিন্তু তোর বন্দুক আমার বুকে কাজ করবে না। তোর বন্দুক ফুটবে না। পরীক্ষা করে দেখ। নির্বোধ পাজি। 

সভাসদ মাধুর চ্যালেঞ্জ আজ স্বচোক্ষে দেখবে। 

বাবুজি নিশানা ঠিক করে মাধুর দিকে। কিন্তু বন্দুক নিষ্ক্রিয় কেন? মাধুর কথাই সঠিক। বারংবার চেষ্টার করেও তিনি গুলি করতে ব্যর্থ হলেন। কিন্তু ফাঁকা ফায়ার ঠিকই হচ্ছে। 

সুরেনের ছোট আরও দুই ভাই চেষ্টা করে অকৃতকার্য হলেন। 

উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) এর চাক্ষুষ কারামতি অবলোকন করে তাঁর নিকট তওবা পূর্বক সবাই মুসলমান হয়ে গেলেন।

আরও পড়ুন মুসলিম জমিদার আজিম চৌধুরী

হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) বাবুজির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ পূর্বক বললেন,

-তোমার বিজয়ের দিন শেষ। পরাজয় তোমাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করছে। আমাকে নিয়ে তুমি অনেক খেলা খেলেছো। আজকেই তোমার খেলা সাঙ্গ হলো। আর এই দিনের প্রতীক্ষায়ই আমি ছিলাম। 

-হে বাবুজি, মুক্তির দরজা তোমাকে ডাকছে। ইচ্ছে হলে প্রবেশ করো, নতুবা গোল্লায় যাও। তোমার দাম্ভিক প্রাসাদের ইট একটা একটা করে খসে পড়বে। কথাগুলো বলা মাত্রই, তীব্র এক ভূমিকম্পে এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।   

লজ্জায় অপমানে বাবুজি সপরিবারে রাতের আঁধারে দেশ ছেড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন, তা এখনো অজ্ঞাত।

আল্লাহর ওলির সেই দিনের অভিশাপের বাস্তবতা মানুষ চাক্ষুষ দেখল। কিছুদিনের মধ্যেই বাবুজির প্রাসাদের ইট খসেখসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে লাগলো। ভগ্নপ্রায় পারিবারিক মন্দিরটি কালের সাক্ষী হয়ে দণ্ডায়মান। আবাসিক প্রাসাদের কিছুই আর এখন অবশিষ্ট নেই।   

আরও পড়ুন সুরেন বাবু গল্পের-
১ম পর্ব
২য় পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

সুরেন বাবু (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!