সম্রাট-জাহাঙ্গীরের-স্বর্ণমুদ্রা-২য়-পর্ব
সাইফুর রহমান,  সাহিত্য

সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা (২য় পর্ব)

সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা (২য় পর্ব)

সাইফুর রহমান

 

নিতাইকুন্ডের গরুর খামারটিকে সুজানগর উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা একটি আদর্শ খামার হিসেবেই বিবেচনা করে। তাদের এই বিবেচনাটি আদতে মিথ্যা নয়। নিতাই দীর্ঘ দশ বছর ধরে সততা ও একাগ্রতা দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে তার এই খামারটি। বেশিরভাগ পশুর দেখভাল সে নিজেই করে। নিজ হাতে গরুর শরীর থেকে উকুন, আঠালি কিংবা সিঁদুর পোকা ও অন্যান্য পরজীবীগুলোকে অপসৃত করে। খামারের প্রতিটি গরুই অকৃত্রিম ও নির্ভেজাল। ব্যবসায়ী হিসেবে সে কখনও অসাধু পন্থা কিংবা প্রতারণার আশ্রয় নেয়নি। এটি মনে হলে মাঝে মাঝে তার বেশ গর্বই অনুভব হয়। সেই জন্য একজন সৎ খামারি হিসেবে সে অত্র অঞ্চলটিতে বিশেষ পরিচিত ও তার সুনাম বিশেষভাবে সমুন্নত ও অক্ষুন্ন।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদে নিদেন পক্ষে বিশ-পঁচিশটি করে গরু বিক্রি করে সে। আর তাতে মুনাফাও হয় নেহাত মন্দ না। মোটা লভ্যাংশ থেকে কেনই বা সে বঞ্চিত হবে। তার অন্যান্য সহখামারিরা যেখানে ইউরিয়া, গ্রোথ হরমন কিংবা স্ট্রেরোয়েড ইনজেকশন দিয়ে গরু মোটাতাজা করে থাকে। কিন্তু সে সেটি করে না। সে জানে স্বাভাবিক ও জৈব পদ্ধতিতেই গরু মোটাতাজাকরণ সম্ভব এবং দীর্ঘ দশ বছর ধরে সে সেটি করে আসছে। কাঁচা ঘাস, বিচালি, সুষম ও মিশ্র খাদ্যের সঙ্গে আর দুই তিনটি উপকরণ যোগ করলেই অনায়াসে গরুর স্বাস্থ্য বৃদ্ধি সম্ভব। এটি তেমন কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য কোনো কাজ নয়। প্রচুর পরিমাণে শুকনো খড় দুই থেকে তিন ইঞ্চি করে কেটে একরাত লালীগুড় কিংবা চিটাগুড় মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে গরুগুলোকে খাওয়াতে হয়। তাছাড়া শস্য জাতীয় তাজা উদ্ভিদের উপজাত- নেপিয়ার, পারা, কলাই, খেসারি, দূর্বা এসব দুই তিনটি উপকরণ যোগ করেই খামারের গরুগুলোর স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করা যায়।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে এই বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলো সে ধীরে ধীরে লাভ করেছে। এঁড়ে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধির হার বকনা বাছুরের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি হয়ে থাকে। অন্যদিকে যেসব বাছুরের বুক চওড়া ও ভরাট, পেট চ্যাপ্টা ও বুকের সঙ্গে সমান্তরাল, মাথা ছোট ও কপাল প্রশস্ত, চোখ উজ্জ্বল ও ভেজা ভেজা, পাগুলো খাটো প্রকৃতির ও হাড়ের জোড়াগুলো স্মিথ সেই সঙ্গে বাছুরগুলোর পাজর হতে হয় প্রশস্ত ও বিস্তৃত, শিড়দ্বারগুলো সোজা। তার সীমাহীন অধ্যাবস্যায় ও কঠিন পরিশ্রম তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, এ ধরনের বাছুরগুলোর গা-গতর বৃদ্ধি পায় খুবই দ্রুত।

বেলা তখন দ্বিপ্রহর সূর্যের গগণে উত্তাপে গোলাপের জীবন যেন ওষ্ঠাগত। ঠিক সেই সময় গোলাপ ঢুকল নিতাইয়ের আদর্শ গরুর খামারটিতে। তেমন বিশেষ কোনো কারণে নয়- ওর ওখানে বিখ্যাত হল্যান্ডের হলস্টেইন ফ্রেইসিয়ান গাভীর খাঁটি দুধের লস্যি হয়। এই লস্যি সাধারণ কোনো লস্যি নয়। সাধারণত দোকানে লস্যি নামে যা বিক্রি হয় তা হলো ঘোলের শরবতেরই নানা রকম ফের। কিন্তু নিতাইয়ের খামারে যা তৈরি হয় তা হলো সেই ভারতের পাঞ্জাব কিংবা উত্তর প্রদেশের বিখ্যাত লস্যি পানীয়টির সঙ্গে তুল্য। লস্যি ও ঘোলের মধ্যে পার্থক্য হলো এই যে, ঘোলের শরবত হয় পাতলা, আর লস্যি হয় ঘন। উপরোন্ত নিতাই সেই খাঁটি দুধ বেশ ক’বার জাল দিয়ে আরও ঘন করে তৈরি করে লস্যি। বিশু ছেলেটা খুব ভালো লস্যি তৈরি করতে জানে।

খামারের এক কোণে ছোট্ট একটি অফিস করা হয়েছে। সেখানে বসেই নিতাই নিত্যদিনের হিসাবপত্র ও কাজকর্ম সারে। তার একজন অফিস সহকারীও আছে বটে। নাম অসীম পাল। নিতাই আর গোলাপ ছোট বেলার বন্ধু হলেও স্বভাব চরিত্রে দু’জনে একেবারে উল্টো। পেশায় গোলাপ সিজনাল ব্যবসায়ী। যখন যেই মৌসুম তখন সে সেই ব্যবসায় নিজেকে যুক্ত করে। মধু মাসে সে রাজশাহী-দিনাজপুর থেকে আম-লিচুর চালান দেয়। পেঁয়াজ রসুনের মৌসুমে সেগুলো মজুদ করে। শীতকালে গাজনার বিল কিংবা বিলগগুহস্তি থেকে ঢাকায় বিপুল পরিমাণ মাছ রফতানি করে। তখন সে হয়ে যায় পুরো দস্তুর একজন নিকিরি যাকে বলে মৎস্য ব্যবসায়ী।

আরও পড়ুন গল্প  তৃতীয় স্বাক্ষী

আবার কোরবানির ঈদের আগে সে হয়ে যায় গরুর ব্যাপারি। কিংবা কখনো সখনো ফোঁপর দালালিতেও তার কোনো আপত্তি নেই। সিজনাল ব্যবসায়ী হওয়ার আগে এমন কোনো কাজ নেই যে সে করেনি। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে, চটকলে, লুঙ্গি প্যাকিংয়ের কারখানায়, তেলের ডিপোতে। কখনো বা হিলি বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাচার হওয়া সস্তা মদ ব্লাডারে ভর্তি করে নিয়ে সে বাসে কিংবা ট্রেনে করে চলে যায় মফস্বল এলাকায়। থানা পুলিশ হোমগার্ডরা ধরলে লাভের গুড় পিঁপড়ে খায়। পাঁচশত টাকার ক্ষেতমজুর। অথচ কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে দুইশত টাকার মজুর হিসেবে তাকে খাটতে হয়েছে বিস্তর।

অফিস ঘরে ঢুকেই গোলাপ দেখল নিতাই মাথা নিচু করে এক মনে কি সব হিসাবপত্র নিয়ে ব্যস্ত। কিছুটা ক্লান্ত ও বিরস গলায় নিতাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-বন্দুরে, আগে বিশুক ডাকদি তারাতারি বড় এক গিলাস ভালো লাচ্চি বানা আনবির হুকুমদে এহনি। তিশি লাইগে দম আমার এহেবারে বারা যাওয়ার মতো অবস্থা। আর এই ভরাদুইপরে তুই কীই বা এতো হিসাব-নিকাশ নি বসিছিস।

-ইকটু দাড়া। হিসাব পত্তর গুলি গুছা নেই আগে।

গোলাপের দিকে না তাকিয়ে কথাগুলো নির্লিপ্তভাবেই বলে যায় নিতাই।

গোলাপ লক্ষ্য করল পাশেই রাজ্যের কাগজপত্রগুলো এক মনে ফাইলবন্দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অসীম পাল। মুখে এতটুকুও ক্লান্তি, প্রশন্নতা কিংবা বিষণ্ণতা কিছুই নেই। মানুষ এতোটা নিরেট যান্ত্রিক হয় কী করে? গোলাপের সেটা মাথাতেই আসে না। এরই মধ্যে বিশু বড় গেলাসের একটিতে লস্যি নিয়ে হাজির। গলা দিয়ে লস্যি প্রবাহ নেমে যেতেই এক স্বর্গীয় প্রশন্নতায় মনটা ভরে গেল গোলাপের। সে মনে মনে ভাবে, ছোকরাটার বুদ্ধি আছে বলতে হয়। লস্যির মধ্যে কায়দা করে বেশ পরিমাণ বরফ কুচি মিশিয়ে এনেছে।

হিসাবপত্রগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় নিতাই এবার গোলাপের দিকে তাকিয়ে সাগ্রহে বলল,

-গুলাপ আমি মনে মনে তোকই খুজতিছিলাম। আমার কী ভাইগ্য দেখ। আইজই তুই হেনে আস্যি উপস্থিত।

-ক্যারে? আমাক খুজা হচ্ছিলি ক্যা?

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

-কুরবানির ঈদ তো পরায় আসিই পড়লি। হাতে আর মাস খানিকের মতো সুমায় আছে। আমার ইচ্ছা যে, গাবতলীর কুরবানির হাটে ইবার তুই আমার গরুগুলেক তোল। পরায় বিশটার মতো গরু ইবার আমি কুরবানির হাটে দিবির পারবো। তার মদ্যি পাঁচটা রেড-সিন্দি, তিনডে হরিয়ানা, চাইরডে শাহিওয়ার, চাইরডে কাঙ্করেজা দুড়ে করে অনগোল ও দেওনি।

-নারে বন্দু তা হবি নানে। এই পর্যন্ত একবারও তোর গরু আমি নিবের পারি নাই। সব সুমায়ই তুই তোর গরুর দাম বড্ড বেশি কইস।

– না ইবার সেরহম হবি নানে। দাম না হয় ইকটু কুমায়েই ধরবোনে। তোর এডাও বিবেচনায় রাখতি হবি যে আমার প্রত্যেকড়া গরুই সরেশ। ভালো জিনিসের দাম তো ইকটু বেশি হবিই। এডাই তো স্বাভাবিক। আমার বিশটে গরুর মদ্যি কোনডা হয়তো বেচা হবি এক লাখ বিশ হাজার টাহায়, কোনডা আবার এক লাখ দশ হাজার টাহায় কিংবা সবচেয়ে বড় গরুটা হয়তো দেড় লাখ টাহায় বিকিরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু না। কোনডা আবার নব্বই হাজারও হবির পারে। তুই আমাকে এক লাখ টাহা কইরে নেট ২০ লাখ টাহা দিলিই হবিনি। বাদবাকি যা বেশি হইরবের পারবি সিডা তোর। রাজি আছিস নাহি ভাইবে দ্যাখ।

-নারে নিতাই। গরুগুলির দাম কিন্তুক ইকটু চরাই মনে হচ্চে। কুরবানির হাটে বেচার জন্যি তোর খামারের গরুগুলিক আমি আগে দেহিচি। তার মদ্যি কয়ডা ৭০-৮০ হাজারেরও বেশি হবি কিনা সন্দেহ।

-আমি যে অন্য কোন ব্যাপারিক গরুগুলে দিবির পাড়ি ন্যা তা কিন্তুক না। আতাইকুল্যের মোসলেম ব্যাপারী আমার গরুগুলে হাটে তুলার জন্যি রোজ আমাক তাগাদা দেচ্চে। আমি রাজি হই নাই এই জন্যি যে, যেই দুই চাইরবের আমি তাক গরু দিছিলাম প্রতিবারই সে টাহা-পয়সা নি গ্যাঁজলা আর তালবাহানা করিছে। গুলাপ তুই আমার ছোট বেলাকার বন্দু। তোর মেলা বিপদে আপদে আমি তোর পাশে থাহার চিষ্টা করিচি। জীবনে মেলাব্যার তুই আমার কাছে আইসে হাত পাতিছিস। আমি কহনও না করি নাই। তোর কতো অন্যায় আবদার আমি মাইনে নিছি।

আরও পড়ুন গল্প পরাজিত নাবিক

যে গরুক আমি মা তুল্যু পুঁজা করি যে গরুর মাংস খাওয়াতো দূরির কতা তার ঘিরান পর্যন্ত নিয়া আমার জন্যি পাপ। কুরবানির ঈদি গরু জবাই করার সুমায় তোর কতায় আমি সেই গরুর পাও পর্যন্ত চাইপে ধইরে গরু কুরবানিত সাহায্য হরিছি। আর আইজ তুই কচ্ছিস আমার গরুগুলেক তুই হাটে তুইলবের পারবুনা। ঠিক আছে তোক নিতি হবি ন্যা আমার গরু। তুই এহন যা হেনতিন। এইবেলা আমার মেলা কাম জইমে রয়ছে।

– ঠিক আছে আমি আগে ভালো কইরে ভাইবে দেহি। তোক দুই এক বেলার মদ্যিই জানাবোনে তোর গরুগুলেক আমি হাটে তুইলবের পারবো কিনা। দোস্ত আমার না হরায় মনে কোন দুঃক্কু রাহিসনে। এসব সান্ত্বনার বাণীগুলো শুনিয়ে গোলাপ দ্রুতই কেটে পড়ে নিতাই কুন্ডের আস্তানা থেকে।

আরও পড়ুন সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা-
১ম পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
শেষ পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

সাইফুর রহমান মূলত একজন গল্পকার। মানবজীবনের বৈপরীত্য ও মনস্তাত্ত্বিক বহুমুখিতা তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। প্রকাশনা- নিবন্ধনগ্রন্থ: জানা বিষয় অজানা কথা, যুক্তি তর্ক ও গল্প, ভিঞ্চির কালো জুতো, করোনায় শেক্সপিয়র রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য; গল্পগ্রন্থ: শরৎচন্দ্রের শরৎ উপাখ্যান ও অন্যান্য গল্প, পক্ষিরাজের ডানা, মরিচপোড়া।তিনি ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত দুলাই ইউনিয়নের চরদুলাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!