পথভোলা-এক-পথিক-শেষ-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

পথভোলা এক পথিক (শেষ পর্ব)

পথভোলা এক পথিক (শেষ পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

বড় বোন নতুন বৌকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নতুন গৃহিণী বু’র সাথে দল বেধেছে। ছুটির ব্যবস্থা করেছে। বাকী আমি। ভাগনের পরীক্ষা শেষ হলেই যাত্রা শুরু করবো। তারা কেনাকাটা শুরু করেছে। আর মাত্র ক’টা দিন, তারপর এক সপ্তাহের ছুটি। কতদিন গ্রামে যাওয়া হয় না। সাথে থাকবে নতুন বৌ। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছুটি শুরু হবে। কলেজে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বেড়িয়ে পড়লাম। সাথে শাহানা। হাঁটতে হাঁটতে বাসস্টাণ্ডে এসে, ওভার ব্রিজের মাথায় দাঁড়াতেই ঘুর্ণিঝড়ের মত সাঁ করে সামনে দাঁড়ালো শ্যামলী। আজ সুন্দর করে সেজেছে। চোখে পড়ার মত। প্রথমে টের পায়নি। কথা বলার আগেই,
_খুব ভাল পরীক্ষা হয়েছে। বাংলা পরীক্ষা সবচেয়ে ভালো হয়েছে।
এক নাগারে বলে যাচ্ছে। আমার সাথে একজন মহিলা আছেন সে দিকে ওর কোন খেয়াল নেই। ওর কাছে আমি একমাত্র শ্রোতা। বেশ ক’মিনিট এভাবে কেটে গেলো। সাহানার মুখের দিকে তাকাতেই দেখি হাসছে। বুঝলাম বিষয়টি অন্যভাবে নিয়েছে। শ্যামলীকে থামাতে হবে। আজ গল্পের যবনিকা টানতে হবে।
_শ্যামলী শোন।
একটু জোর গলায় শব্দ দুটো প্রয়োগ করলাম। থেমে গেল শ্যামলী। চোখের দিকে তাকালো। সে চাহনি কিসের যেন আবেদন। চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলতে বাধ্য হলাম। এছাড়া তো আর কোন উপায় নেই।
_শ্যামলী, ইনি সাহানা নাসরিন। আমার নববিবাহিতা বধু।
কথাগুলো মনে হলো চাবুকের মত ওর কানে গিয়ে বিধলো। এক মুহূর্তের জন্য আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু অস্পষ্ট মৃদুস্বরে বললো,
_ও তাই।
বলেই সোনালী ডানার চিলের মত, গাড়ি আসছে বলে ফার্মগেটের ওভার ব্রিজের সামনে শ্যামলী অদৃশ্য হয়ে গেলো চিরদিনের মত। বেকুব সেজে নতুন বৌকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। নতুন বৌ কি বুঝেছিল আজও জানা হয়নি। শুধু বলেছিল,
_তোমার ছাত্রীটি দেখতে ভারী মিষ্টি। একটু চঞ্চল।

আর পড়ুন পরাজিত নাবিক

এরপর মাসখানেক কেটে গেছে। সাত দিনের সফর শেষে আবার পেশায় দু’জনই যোগদান করেছি। বাসা ভাড়া করতে হবে। বুবুর নির্দেশ এখন হতে নিজেদের সংসার সাজিয়ে নিতে হবে। ছোট বোনকে কাছে রাখতে হবে, এটা সাহানার আদেশ। মানতেই হবে। কলেজের আশেপাশে বাসা নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শ্যামলীর কথা যে ভুলে যে যায়নি তা কিন্তু নয়। ওর যাওয়াটা ছিল অস্বাভাবিক। মনের ভেতরে এক অজানা ভয় বাসা বেঁধেছে। এটা সত্য ও আমাকে ভীষণভাবে ভালোবেসেছে। সাহানার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মাত্রই এক মিনিট সময়ও অপেক্ষা করেনি। প্রবল ঝড়ে যেন নদীর স্রোত উথাল-পাতাল হয়ে ছুটে যায়, ওর গতিও তাই ছিল। কোন দূর্ঘটনা ঘটিয়ে না বসে। অল্প বয়স।

আরও সপ্তাহখানেক অতিবাহিত হলো। ব্রিজের গোড়ায় এলেই দু-চোখ খুঁজে ফেরে কিন্তু শ্যামলীর দেখা মেলে না। এ দিকে আসার তো আর কারণ নেই। মনে যে আশার আলো ছিলো তা নিভে গেছে। বিকেলটা বেশ শান্ত। বাসস্ট্যাণ্ডে লোকের ভীড় অতটা নেই। পাঁচটার পর হতেই ভীড় বেড়ে যায়। আজ আগেই কলেজ হতে বের হয়েছি। ফুটপাত দিয়ে আনমনে হাঁটছি। আকস্মিক সামনে এসে দাঁড়ানো ষোল-সতের বছরের যুবতী। প্রথমে চিনতে পারিনি। সাধারণ বেশভুসা। চুলগুলো এলোমেলো। মুখ জুড়িয়ে বিষন্নতা।
_আমি মিতালী। ভাল আছেন?
মিতালীর নাম শুনেই চমকে উঠলাম। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করতেই,
_শ্যামলী ভালো নেই। আত্মাহুতি দিতে গিয়েছিল।
_বলো কি?

আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

এটাই সত্যি। আপনার সঙ্গে যেদিন শেষ দেখা হয়েছিল সেই দিন রাতে। বাসায় ফিরে ভীষণ কেঁদেছিল। ওর মন জুড়ে শুধু আপনি। বলতো আঠার বছর বয়স হলেই আপনার সাথে বিয়ে হবে। দাদী আর আমি বলতাম এটা কেমন করে সম্ভব? তোদের বয়সের ফারাকটা কত জানিস? ও বলতো সব মনের ব্যাপার। প্রেমে পড়লে মানুষ অতি বোকা হয়। শ্যামলী তাই হয়েছিল। ভাগ্যিস ঠিক মতো চিকিৎসা দেওয়াতে ভাল হয়ে গিয়েছে। কি বলতো জানেন, যে দিন একসিডেন্ট হয়েছিল সেদিন পাশে আপনি ছিলেন। ওকে ধরেছিলেন আর শ্যামলী ভয়ে আপনাকে সজোড়ে জড়িয়ে ধরেছিল। টের পাচ্ছিল কোন এক পুরুষ মানুষকে ধরে আছে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে দেখে একজন যুবকের বুকে মাথা দিয়ে আছে। ইচ্ছে করেই কিছুটা সময় ব্যয় করে। তারপর আপনি ওকে ফুটপাতের ওপর নিয়ে যান।

মিতালীর কথাগুলো অবাক হয়ে শুনছি। মিতালী আবার বলতে শুরু করলো।
_এখন ঢাকার বাইরে খালার বাড়িতে। পরীক্ষার রেজাল্টের পর ঢাকায় ফিরবে।
অবাক হয়ে শুনছি শ্যামলীর কাণ্ড। দু-তিন মাসের মত ওর সাথে একটা দূর্ঘটনাজনিত কারণে পরিচয়। অথচ কি কাণ্ড! ঘটনার সূত্রপাতে এক তরফা কঠিন প্রেম। প্রেমের ব্যর্থতায় আত্মাহুতির চেষ্টা। নিজেকে বার বার অপরাধী লাগছে।
_তোমরা কি ওকে আরও বুঝানোর চেষ্টা করোনি?
_করেনি আবার। একদিন মা ওকে খুব মেরেছিল। কিন্তু বাবা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। মার খাওয়ার পর কি বলেছিল জানেন? শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। এ বয়সের একজন মেয়ে প্রেমে পড়লে যতটুকু বেপরোয়া হয়ে উঠে, আমার বোন তাই হয়েছিল।
_কি বলেছিল?
_’যখন আমার বুক আর মুখ চেপে ধরেছিল তখনই তাকে মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়েছি। তাই আমার এই বুক চিরকাল শুধু তার জন্য থাকবে। এখানে অন্য কারোর স্থান নেই।’ সেই দিন আপনার স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেনি। জানি না ভবিষ্যতে ওর ভাগ্যে কি আছে। এ ঘটনা আপনাকে না বললেও চলত। আপনি শ্যামলী নামের একজন অপ্রাপ্ত-অবুঝ মেয়েকে কতটুকু জানতেন।ভালোবাসায় অন্ধ। সমতা-অসমতা বুঝে না। মাফ করবেন আপনাকে জেনেশুনে বিরক্ত করলাম।

আরও পড়ুন গল্প পরাভূত

কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মিতালী অদৃশ্য হয়ে গেল। শ্যামলীর মায়া ভরা দুটো আঁখি আর মিষ্টি চেহারা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেতে থাকে। মনে হলো পানির ওপর ভাসমান মিয়্রমান পদ্মফুল। জীবনে যে একেবারেই ভুলে গেছি তা নয়। ক্ষণিকের জন্য হলেও শ্যামলীর শেষ মুহূর্তের করুণ মলিন মুখখানা মনে জমানো অদৃশ্য পানির ওপর ভেসে উঠে। এখন ভাবী আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে প্রথম দর্শনেই প্রেম যমুনায় হাবুডুবু খায়, তারপর ব্যর্থ হলে গলায় দড়ি। আর বাউলের ভাষায়, “যে জন ডুবলো সখা,আর কি আছে বাকি গো।”

ঠিক ত্রিশ বছর পর ঠিক এই মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া কাহিনী, নতুন করে সাঁজ বেলাতে সেই ষোড়শী শ্যামলীকে সন্তানের মমতাময়ী মা হিসেবে দেখা মিলবে ভাবতেই পারিনি। এখনো মনের অগোচরে পুরাতন অসমপ্রেমকে মনে রেখেছে। আর আমার উপন্যাসের পাতায় আমার অটোগ্রাফ নিয়ে নিলো-“আমি এক পথভোলা পথিক এসেছি।”

আরও পড়ুন পথভোলা এক পথিক-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

পথভোলা এক পথিক (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষাপাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!