তৃতীয়-সাক্ষী
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প)

তৃতীয় সাক্ষী

তৃতীয় সাক্ষী
শফিক নহোর

 

মেয়েটি ভর্তি হবার পর থেকে আমাকে নানাভাবে ইশারায় ইঙ্গিত দিয়ে কিছু একটা বলতে চাইত, মেয়েদের প্রতি আমার এক ধরনের ঘৃণা কাজ করে, আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি ঠিক তখন থেকেই। মেয়ে মানুষ খুব সহজে- বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। এদের চরিত্র ঠিক পানির মতো যখন যে পাত্রে রাখা যাবে ঠিক সেই আকার ধারণ করবে। ভালবাসা, সহানুভূতি এরা কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল হলে বাকবাকুম তালে নাচে বেহায়ার মতো। কে মরলো কে আঘাত পেল, কে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ল তাতে কী যায় আসে। অনেক কিছু না ভেবেই মেয়েরা-প্রতারণা করে। এদের মায়া মমতা যেমন বেশি পুরুষের তুলনায়, ধোঁকা দেবার স্টাইলটা  চমকপদ মনে হবে। মেশিন দিয়ে করা খুবই সূক্ষ্ম এদের ব্রেইন। যে কাউকে চোখের পলকে খুন করতে পারে মেয়েরা। এই ক্যারিশমেটিক ক্ষমতা ঈশ্বর প্রদত্ত মনে হয় আমার। এই ভাবনার সঙ্গে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে আমার কাছে নারী পুরুষ।

আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যেতেন। স্কুল ছুটির বেশ-কিছুক্ষণ পর, মা গেটের সামনে থেকে আমাকে নিয়ে আসতেন বাসায়। বাবা অফিসে যাবার পথে কখনো-কখনো আমাকে দেখে যেতেন, স্কুলের স্যারদের সঙ্গে কথা বলে যেতেন; আমাকে বলতো,
──ফাহিম তোমার মা আসলে বলো, বাবা এসেছিল, কেমন।’

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম। বাবা কেমন মায়াবী চোখে আমার দিকে তাকাত, বাবা ছিল আমার কাছে সিনেমার নায়কের মতন। আমাকে নিয়ে মা বাসায় ফিরত, বাসায় গিয়ে আবার টেলিফোনে ব্যস্ত হয়ে যেত, আমার স্কুলের পড়া, বাসার হাতের কাজ, ড্রয়িং আমি নিজেই করতাম, কখনো-কখনো নিজে সব পারতাম না, মাকে দেখাতে গেলে রেগে যেতেন। বাবা রাত করে বাসায় আসতেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পারত, সকালে যখন ঘুম ভাঙতো টের পেতাম।

আরও পড়ুন ঐতিহাসিক গল্প সুরেন বাবু

সকালে ওঠে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হতাম। কোনো কোনো দিন বাবা আমাকে দিয়ে আসত স্কুলে। মায়ের সঙ্গে বাবার মাঝে মধ্যেই ঝগড়া হতো, মা প্রচণ্ড রেগে যেতেন। আমার সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতেন, কখনো কখনো মা’ আমাকে আঘাত করতো, বাবা একদম পছন্দ করতেন না, মায়ের এমন আচরণ। বাবা ব্যবসার কাজে বিদেশ চলে গেলে, মা তার বন্ধুদের নিয়ে এসে বাসায় পার্টি দিতেন।

রাতভরে বাসায় নাচ, গান হতো। আমাকে বলতো,
──ফাহিম, তুমি ছোট মানুষ যাও রুমে গিয়ে ঘুমাও।

আমার দিকে রাক্ষস চোখে তাকাত, দেখেই ভয় পেতাম। একটা সময় এমন হয়েছিল, বাবার কাছে মায়ের নামে প্রচুর অভিযোগ আসতে লাগল, বাবা তেমন কিছু মনে করতেন না। আমি বুঝতাম আমার দিকে তাকিয়ে বাবা মায়ের অনেক অন্যায় মেনে নিতেন। কিন্তু মা ইচ্ছে করেই বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। একটা সময় মা বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে দিল। মা আমাকে ফেলে রেখে চলে যায়। আর কখনো যোগাযোগ করেনি।

আমি মাকে প্রচণ্ড মিস করতাম। বাবা চাইত আমার সঙ্গে মায়ের দেখা হোক, যোগাযোগ থাকুক। যাতে আমার উপর মানসিক কোন চাপ না পরে। তখন মা মোবাইল ব্যবহার করতেন। বাবা মাঝে মধ্যে চেষ্টা করত, যেই রিংটোন হত আমাকে দিয়ে বলতো কথা বলো তোমার মায়ের সঙ্গে।
মোবাইলে শুধু রিংটোন হয়েই যেত, মা কখনো ফোন রিসিভ করেনি। একটা সময় আমি ইচ্ছে করেই বাবাকে না করতাম। প্লিজ! বাবা তুমি আর মায়ের কাছে ছোট হইয়ো না। কখনো ফোন দিও না, আমি অনেক এসএমএস দিয়েছি, সে দেখেছে, ডেলিভারি রিপোর্ট এসেছে, কখনো প্রতি উত্তর পাইনি।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

আমার জন্মদিনে বাবা একদিন বললেন,
──ফাহিম তোমাকে আজ অনেক বড় গিফট দেবো, বাবাকে দেখলাম; মায়ের নম্বরে কল করতে,
লাউড স্পিকার দেওয়া, অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে,
── ‘দুঃখিত নম্বরটি এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। বাবা চোখে মুছে, মুখে মেকি হাসি এনে বলল,
──ফাহিম তোমার মা বুঝি এখন খুব ব্যস্ত থাকে। তাই হয়তো ফোন ধরেনি। চাকরি টাকরি করে হয়তো, অন্য একদিন ফোন দিয়ে কথা বলো কেমন, আজ মন খারাপ করো না। আমি মনে-মনে ভাবতাম; ‘বাবারা এত ভালো হয় কেন?’

‘যে মানুষের মন নেই, তার আবার মন খারাপ হয় কি করে বাবা।’
বাবা নিঃশব্দে সোফা থেকে উঠে গেলেন। কোনো কথা বললেন না। বাবাকে বলেছি, ──বাবা আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি একাই পারবো। এভাবে কেটে গেল অনেক বছর।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া নিয়ে বাবা খুব ভাবত। বাবার শরীর খারাপ হলেও, ইচ্ছে করে কোনো দিন ডাক্তার দেখাবে না।
আমি কিছু বললে, বলবে,
──তুই চলে আয়। আমার অসুখ ভালো হয়ে যাবে।
দিনদিন কেমন ছেলে মানুষী করতো। প্রায় কাজে দেখে মনে হত বাবা আমার চেয়ে বয়সে ছোট। বাচ্চাদের মত আচরণ করতো। আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু ছিল বাবা।

কোন মেয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ছিল আমার পক্ষে দুরূহ, নাদিয়া আমাকে বিভিন্ন ভাবে প্রস্তাব দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবার পর থেকেই। রাসেলকে দিয়ে অফার দিয়েছে বহুবার। রাসেল আমার খুব ভাল বন্ধু। অনেক বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা হতো; রাসেল রঙ বদলাতে পারতো, কত মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতো, আমি এসব একদম পছন্দ করতাম না। আমাকে নাদিয়ার বান্ধবীরা খুব পছন্দ করতো, আমার চোখ না-কি সবার খুব পছন্দ।

আরও পড়ুন গল্প অচেনা

আমার নাকের প্রশংসা শুনতাম, হরহামেশা। আমাকে মহিলা মেসে নিয়ে যেতে চাইত, জোর করে। পড়াশোনার রেজাল্ট নাদিয়ার বেশ ভালো, আমার খুব কাছাকাছি নম্বর পেত প্রায় সেমিস্টারে। একটা সময় নাদিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়ে যায় নাটকীয়ভাবে। একদিন আমাকে কাক-ডাকা দুপুরে লিচু-গাছের তলায় দাঁড়িয়ে, সাফ জানিয়ে দিলো, আমাকে আপন করে না নিলে সে অন্য রাস্তায় পা রাখবে। প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখত আমাকে সম্পর্ক হবার পর থেকে।

──মামা অল্প করে কড়া লিকার দিয়ে এক কাপ রং চা দাও
── মামা আজ একা দেখছি, ফাহিম মামা আসেনি?
চায়ের দোকানির কথায় আমার মনে পড়ল, আজ আমি একা চা খেতে আসলাম কেন ফাহিমকে রেখে। চারপাশ কেমন যেন অন্ধকার মনে হচ্ছে। এত আলো খই ফুঁটা রোদ, তবুও কেমন আঁধার একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে আছি মনে হচ্ছে। পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল বের করব, অবশ হয়ে আসছে শরীর, কপালে হাত দিয়ে একটু চেক করে নিলাম শরীরে জ্বর আছে না-কি। শরীর ঘামছে অতিরিক্ত। পরান অস্থির করছে। চা বিক্রেতা মামা তো ঠিকই বলছে। আজ আমি একা চা খেতে আসলাম। ফাহিম আসেনি কেন?’
চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে ঘুমঘুম চোখে একটা রিকশা ডেকে মহিলা হোস্টেলের পাশ দিয়ে যেতেই পুলিশের গাড়ি আমাকে আটকিয়ে দিলো। ফাহিমের বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে,
── কাকা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কী হয়েছে এমন করে কান্না করছেন কেন?’

──ফাহিম আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

আরও পড়ুন গল্প স্বর্ণলতা

রক্তে ভেসে যাচ্ছে কালো পিচের রাস্তা। মনে হচ্ছে লাল রক্তের নদীর স্রোত। ফাহিমের লাশের কাছে যেতেই পুলিশ আমাকে সন্দেহজনক ভাবে ফাহিমের মার্ডার কেসের আসামি করে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে যায়।
আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয় মুচলেকা নিয়ে।
লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে পরের দিন জানা গেল।
ফাহিমকে বলৎকার করে রক্ত শূন্য করে হত্যা করা হয়েছে, ফাহিম হত্যা মামলায় দ্বিতীয় বারের মত সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ১৩ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্য-গ্রহণের সময় নির্ধারণ করেছেন আদালত।

পুলিশ ওই মামলায় এজাহারভুক্ত চারজন আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়, এতে প্রধান আসামি নাদিয়া সহ তার তিনজন বান্ধবী।
ফাহিমের মৃত্যু শোক আমাকে প্রচণ্ড তাড়া করে, নিখোঁজ হয়ে যায় ফাহিমের বাবা। পৃথিবীর সব বাবার কাছেই হয়তো ছেলের লাশ নিজের কাঁধে সবচেয়ে বেশি ভারী মনে হয়। এ বেদনা থেকেই হয়তো নিজেকে আড়াল করে নিরুদ্দেশ হয়েছে ফাহিমের বাবা, আমাকে ফাহিম হত্যা মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসাবে আদালতে তলব করেছে আজ নোটিশ পেলাম হাতে!’

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

তৃতীয় সাক্ষী

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!