জোছনা-মাখা-আলো-৩য়-পর্ব
এ কে আজদা দুলাল,  গল্প,  সাহিত্য

জোছনা মাখা আলো (৩য় পর্ব)

জোছনা মাখা আলো (৩য় পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

—আরও দুঃখের কথা শুনবেন?
—বাবার পরিচিত অনেকেই সেদিন বুকে আশা বেঁধে গিয়েছিলেন এই ভেবে, তাদেরই পরিচিত স্বজন ব্যক্তিবর্গ যাচাই-বাছাই বোর্ডে আছেন। এবার নাম তালিকাভুক্ত হবেই। অনেকে আবার আপসোস করে বললেন এত দিনে কেন নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। কথা শুনলাম। বয়সে ছোট ছিলাম তো অতশত বুঝে উঠতে পারিনি। এখন বুঝি কিসে কি হয়।
—বলেন কি?
—ঠিকই তাই। পরে শুনেছিলাম ২০০৪ সালে যে তালিকা করা হয়েছিল তাতে বাবার নাম আছে তাই তার নাম বাদ পরেছে। বেশ কিছু দিন পর বুঝতে পারলাম এখানে অন্য খেলা ছিলো।
—২০০৪ সালের তালিকা নিয়ে চেষ্টা করেননি?
—করিনি আবার। সে ভাই অন্য ইতিহাস। আপনারা রাতে খেয়ে যাবেন।

আলোকে যত দেখছে শামিম ততটাই মুগ্ধ হচ্ছে। আলো ভেতরে গেলো। প্রায় দশ মিনিট পর ফিরে এলো, খালি হাতে নয় সাথে ডালের বড়া ভাজা। সামনে রেখে বলল,
—এবার গরম ডালবড়া ভাজা খান। ভালো কথা আমার মা বাড়িতে নেই। তার ছোট ছেলের বাসায় ঢাকায় আছেন। আমার নিঃসন্তান বিধবা ফুপু, অসহায় মানুষ কোথায় যাবেন তাই ভাইয়ের আশ্রয় আছেন। বলতে গেলে সংসারটা আগলে রেখেছে। আমারও স্কুল বন্ধ। তাই মা সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে। সবাই সুবিধাবাদী বুঝলেন। বলেই ফিক করে হেসে শামিমের চোখের দিকে তাকায়। শামিম কিছু বুঝে উঠার আগেই নিমিষে চোখের মনি ঘুরিয়ে অন্য দিকে দৃষ্টি ফেরায় আলো।
—ইতিহাস শুনবেন?

আরও পড়ুন গল্প সুরেন বাবু

শামিম এবার একটা সুযোগ পেলো।
—আপনি তো চা পাঠে বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিলেন।
—খোঁচা মেরে তারপর শুনতে রাজি। অসুবিধা নেই। এখন মুডে আছি। আচ্ছা আপনার ছোট ভাই বোবা নাকি?
—কি যে বলেন, বোবা হলে কোর্টে দাঁড়িয়ে গলাবাজি করবে কেমন করে?
—তাই তো। তবে শোনেন। একদিন ভোর বেলায় বাবার কমান্ডার এসে হাজির। আহারে চাচা আজ বেঁচে নেই। বাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন। বাবাকে বড় ভাই বলে ডাকতেন। হাতে কিছু কাগজপত্র। আগেই বলেছি তখন আমি এসএসসি’র ছাত্রী। বাবার সাথে কথাবার্তা বলে চলে গেলেন। প্রায় পনের দিন পর এসে বললেন আগামী পরশু ঢাকায় যেতে হবে। দিন তারিখ সময় এবং কোথায় থাকতে হবে বিস্তারিত বলে গেলেন। তখন বড় ভাই ভাবীকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। মেজ ভাই ডিগ্রি পড়ে। মেঝ ভাইকে সাথে করে বাবা ঢাকায় গেলেন।
তিনচার দিন পর ফিরে এসে বললেন এবার সরকারি গেজেট তালিকায় নাম ছাপা হবে। হাই কোর্টে রীট মামলা দায়ের করা হয়েছে। উকিল সাহেব আশ্বাস দিয়েছেন যে, একই ধরণের রীট মামলায় অন্য একটা পার্টিকে জিতিয়ে দিয়েছেন। বাবার সাথে আমরাও খুশি। দিন যায় মাস যায় বছর যায়। এমনই করে দু’বছর অতিবাহিত হল, কোন খবর নেই। নিরাশার সাগরে ভাসছে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা আমার বাবা নাজমুল হক। আগে জানতাম না হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি হতে কত বছর লাগে।
এবার তামিম মুখ খুলল।
—মানে ঢাকায় গিয়ে হাইকোর্টে রীট আবেদন করেন। মোট কত জন এক সঙ্গে আছেন?
—তা বাবা, ত্রিশ জনের মতো হবে।
—জি, আমিও শুনেছি মামলাগুলো শুনানীতে দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে।
—তাই বুঝি? কথায় বলে, বিচার নীরবে কাঁদে।

আরও পড়ুন গল্প একটি মিষ্টি স্বপ্ন

একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো আলো। শামিমের কাছে মনে হলো মেয়েরাই বাবার কষ্ট বুঝে থাকে।
—শুনে আশ্চর্য হবেন, প্রায় সাড়ে তিন বছর পর মাননীয় হাইকোর্ট আবেদনকারীদের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছেন। শুনে আমরা মহাখুশি। ঢাকা হতে বড় ভাই বিকাশে টাকা পাঠালেন মিষ্টি মুখ করার জন্য। কমান্ডার চাচা এলেন। বাবার সাথে কথা হলো। কি কথা হলো তা আমরা জানতে পারলাম না। আমাদের মিষ্টি খাওয়া হলো না। মিষ্টি কেনার টাকাটা কমান্ডার চাচার হাতে তুলে দেয়া হলো। কাজ আরও বাকী আছে। টাকা লাগবে। সরকার পক্ষ যদি আপীল করে তখন উকিল সাহেব তো শুকনো মুখে আদালতে দাঁড়াবেন না। দেখেন তো, আমি একাই অর্নগল বলে যাচ্ছি। বিরক্ত হচ্ছেন না তো?
—এ ইতিহাস শোনার সৌভাগ্য ক’জনের হয়? কিন্তু এর শেষ পরিণতি কি হয়েছিল? শামিক কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়।
—পরিণতি? সেই বিখ্যাত গান শোনেননি- পথের শেষ কোথায়। এরও শেষ নেই। হঠাৎ মহামারী করোনা। সারা বিশ্ব তচনচ হয়ে গেল। অফিস-আদালত বন্ধ। ভয়ে কেউ ঘরের বাইরে বের হয় না। রায়ের ঘোষণার প্রায় এক বছরের মাথায় রায়ের আদেশে মাননীয় বিচারপতি স্বাক্ষর করেন। আইনের অনেক মারপ্যাঁচ আছে। রায়ের নকল কপি বাবাকে দিয়েছিলেন কমান্ডার চাচা। এর একটা ফটো কপি সযত্নে তুলে রেখেছি। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য। যদি কোন দিন সরকারি গেজেট তাদের বংশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ছাপা হয়।
কথাগুলোর মধ্যে ব্যঙ্গ সুর ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি শামিমের।
—তাতে লেখা আছে রায়ে নকল কপি প্রাপ্তির ৯০ দিনের মধ্যে কার্যক্রম করতে হবে। আবার আশায় জীবন চঞ্চল হয়ে উঠলো কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধার। কমান্ডার চাচার কাছে শুনেছি আরও তিন চারটা জেলার অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে রায় ঘোষণা হয়েছে। দেখুন, সরকারি নিয়ম কানুন আমরা জানি না। যে যা বলেছে আমরা তাই বিশ্বাস করেছি এবং প্রয়োজনীয় মতো খরচ দিয়েছি। বাবাকে মোবাইলে করে আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছের মাসের পর মাস। এই তো মাস খানেকের মধ্যে সরকারি গেজেটে নাম প্রকাশিত হবে। কত যে এক মাস গেলো কিন্তু গেজেটে নাম প্রকাশ হয় না।

আরও পড়ুন গল্প কবর

—আপনাদের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে কি সরকার আপীল করেছে?
—ঠিক ধরেছেন। আইন পড়ছেন তাই গলদ কোথায় ধরে ফেলেছেন। পরে জেনেছি আজ পর্যন্ত সরকারের তরফ হতে কোন আপীল দায়ের করা হয়নি।
—তাহলে তো কেস তামাদি হয়ে গেছে।
—আমরাও তাই শুনেছি। কি আর করার আছে, জলে বাস করে কুমিরের সাথে তো লড়াই করা যায় না। এই ত্রিশ জন একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা এখন নিস্তেজ অসহায় বুড়ো গরুর মতো জাবর কাটছে। তাদের জীবন দশায় সোনার হরিণের মতো সরকারি গেজেটে কালো অক্ষরে ছাপানো নাম দেখে যেতে পারবে কিনা তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

ঘরের ভেতরে নেমে আসে নীরবতা। কারো মুখে কোন কথা নেই। একাত্তরের বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন দশায় দেখে যেতে হচ্ছে জীবনের পরাজয়ের গ্লানি। আমাদের সমাজে স্বাভাবিক নিয়মকানুন কবে চালু হবে, মানুষ তার প্রাপ্ত অধিকার সহজে পেয়ে যাবে। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না, নায্য অধিকার পেতে। কারো খামখেয়ালির জন্য অন্যের জীবনে নেমে আসবে না অন্ধকার।

কখন যেন সন্ধ্যা নেমেছে। অন্ধকারে চারজন প্রাণী নিশ্চুপ মাথা নিচু করে বসে আছে। হঠাৎ একশো পাওয়ারে বিদ্যুৎ বাল্ব জ্বলে উঠলো। আলো তার ঔড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
—খাবার প্রস্তুত। বাবা, ওদের সাথে করে ভেতরে এসো।
বলেই আলো ভেতরে চলে যায়। শামিম যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক কত বই পড়েছে, গল্প শুনেছে কিন্তু একাত্তরের একজন বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার এ রকম পরাজয়ের গ্লানি শোনেনি। এ রকম কত মুক্তিযোদ্ধা আছেন কে জানে। মুক্তিযোদ্ধারা এখন রাজনৈতিক যোদ্ধায় পরিণতি হয়েছে।

আরও পড়ুন জোছনা মাখা আলো-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

জোছনা মাখা আলো (৩য় পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষা পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!