জোছনা-মাখা-আলো-শেষ-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

জোছনা মাখা আলো (শেষ পর্ব)

জোছনা মাখা আলো (শেষ পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

হক সাহেবের পিছনে পিছনে পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে লম্বা বারান্দা। বারান্দায় ডান দিকে পর পর দুটো কামরা। তালা দেয়া। তারপর রান্না ঘর। রান্না ঘরের সামনে ডাইনিং। বাম দিক পুরোটা গ্রিল দিয়ে আটকানো। বেশ বড় উঠোন এবং তারপর বিভিন্ন জাতের ফলজ গাছ। আছে বিভিন্ন জাতের ফুল গাছ। এটা একটা সৌখিন রুচিশীল শিক্ষিত ভদ্রলোকের বাড়ি এতে কোন সন্দেহ নেই। দু’ভাই একে অপরের দিকে তাকায়। আলো বুঝতে পারছে, এ রকম পরিবেশ দেখে মনে খটকা লাগছে দু’ভাইয়ের মনে।
—কি, বিশ্বাস হচ্ছে না গ্রামে এ রকম একটা বাড়ি থাকতে পারে? এটা আমার দু’ভাই এবং আমার দু’ভাবীর অবদান। তাদের আইডিয়া। বাবা-মাকে খুশি রাখার জন্য। বিশেষ করে বাবাকে খুশি রাখার জন্য। বুঝতেই তো পারছেন।
তামিম আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে উচ্ছ্বাস আবেগে বলে,
—আবার যদি আসি ঢুকতে দিবেন তো?
আলো এবার একটু অভিমানে সুরে বলে,
—আমাকে দেখে কি ঝগড়াটে মেয়ে বলে মনে হয়?
দু’ভাই এক সঙ্গে বলে উঠে,
—আরে, কে বলছে আপনি ঝগড়াতে মেয়ে?
—পিয়ারা গাছে নিশ্চিত পাকা পিয়ারা ঝুলছে, বললো তামিম।
—পেয়ে যাবেন।
—রাতের বেলা গাছ হতে ফল পারতে হয় না, বললো তামিম।

আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা

আলো আর কোন কথা না বলে হাত ধুঁয়ে বসতে বললো। খাবার টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। একজন বয়স্ক মহিলা রান্না ঘর হতে বের হয়ে এল। ততক্ষণে দু’জন হাত ধুঁয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে পরেছে। তাদের সামনে হক সাহেব বসেছেন। আলো মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে, এই হলো তাদের ফুপু।
—দুঃখিত। আপনাদের কাছে একটা অসত্য কথা বলেছি। আমার ফুপু বিধবা বটে তবে নিঃসন্তান নয়। তরতাজা দুটো ছেলে এবং একজন মেয়ে বেঁচে আছেন। কি দুর্ভাগ্য কপাল আমাদের দেশের মেয়েদের। ফুপা মারা যাওয়ার পর দু’ভাই পৃথক হয়ে গেলো। একটা মাত্র মেয়েকে ফুপা বেঁচে থাকতেই বিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। দু’ছেলে তাদের মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি শুরু করল।
—কি ধরনের চাপ। জানতে চাইলো শামিম।
—ভাইয়া, আমি জানি।
—বলুন তো, আলো বলল।
—আপনার ফুপুর পৈতৃক সম্পত্তির ওপর দু’ভাইয়ের চোখ পরেছিলো। ঠিক?
আলো খুশি হয়ে বড় একটা আস্তা স্বরপুঁটি মাছ ভাজা তামিমের থালায় তুলে দিয়ে বলে, পূর্ণ মার্ক পেয়ে গেলেন। আমার বাবা একভাই বোন। বাবা, বড় ফুপু ছোট। কি আর করবে। ফুপুর ভাগের সম্পত্তির টাকা দু’ভাইকে এবং তাদের একমাত্র বোনকে দিয়ে বাবা জমি রেজিষ্ট্রেশন করে নিলেন।
—তাহলে আপনার ফুপু আপনাদের আশ্রয় কেন? আলোর চোখে চোখ রেখে জানতে চাইলো শামিম।
আলো এক দৃষ্টিতে কিছু সময় শামিমের চোখের দিকে তাকিয়ে, চোখ নিচে নামিয়ে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিতে পারলো না। মনের ভেতরে কেমন যেন ঝড় বয়ে গেলো। সেই বিকেল হতে অপরিচিত দু’জন যুবকের সঙ্গে সংসারের ভেতর-বাইরের খবর নির্দ্বিধায় বলে যাচ্ছে। কেন? এরা কারা, কেন এসেছে? উদ্দেশ্য কি? বেশ চিন্তায় পরে যায় আলো। আবার রাতে খাবারের আয়োজন। আজ কি হয়েছে তার। মা বাড়িতে এসে জানতে পারলে আগে বাবাকে ইচ্ছে মতো ধুলাই দিবে তারপর ফুপু এবং তাকে। ধ্যাৎ, ভুল যখন করে করেই ফেলেছে বাকীটা বলে মনের দুঃখটা লাঘব করা যেতে পারে। নিজে নিজে ভেবে নিলো।

 আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

—আমার ফুপুর জায়গা হলো না তার দু’ছেলের সংসারে। আমার মা তাকে নিয়ে এলেন এই বলে, আজ হতে সে নিঃসন্তান। মায়েদের মনতো। চোখের আড়ালে আমার ফুপু চোখের পানিতে বুক ভাসায়। তাই বলেছিলাম বিধবা নিঃসন্তান অসহায় বোন ভাইয়ের সংসারে আশ্রিত। এই যে আমার বাবাকে দেখছেন। নিকট দূরসম্পর্কের আত্মীয় স্বজনরা নানান ভাবে সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছে, এখন তারা ফিরেও দেখে না। বাবা তার কর্তব্য পালন করেছেন মাত্র। অনেকে আবার এড়িয়ে চলে। বোঝেন তো আমাদের সমাজে তেলে মাথায় তেল দিয়ে থাকে। মেয়ে হয়ে বাবার কষ্টের কথা বুঝি। আর আমার দু’ভাইয়ের জন্য গর্ববোধ করে থাকি। কারণ তাদের সাংসারিক শত ঝামেলা থাকা শর্তেও মা-বাবাকে, বিশেষ করে বাবাকে খুশি রাখার জন্য এই বাড়িখানা তৈরি করে দিয়েছে। এ নিয়ে বড় ভাইয়ের পরিবারের মধ্যে কিছু দিন অশান্তি বিরাজ করেছিলো। একজন মেয়ে হিসেবে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমিও তো একদিন কারো বাড়ির বৌ হয়ে যাবো।

মনের ভেতরে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকায় শামিমের দিকে। শামিম চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেয় অবশ্যই যাবেন সেই দিনের জন্য অপেক্ষা থাকতে হবে। ততক্ষণে সবার খাওয়া শেষ। হাত ধু্ঁয়ে বসার ঘরে এসে বসে সবাই। আলো একটা পলিথিন ব্যাগ এনে তামিমের হাতে দিয়ে বলল, আপনার জন্য।
—ধন্যবাদ। তবে একটা অনুরোধ।
—কি অনুরোধ?
—আমি তো বয়সে আপনার ছোট তাই “তুমি ” বলতে হবে।
—আবার দেখা হলে।
বাড়ি গিয়ে তার মার কাছে জানতে চাইবে হক সাহেবের বাড়ীতে পাঠানোর হেতু কি? রাত হয়েছে, অনেকটা পথ যেতে হবে। তারা উঠতে চায়। হক সাহেব কোন আপত্তি করলেন না। অনেক দূরে যেতে হবে। তাছাড়া রাত হয়ে যাচ্ছে।
—বাবা, আমি খুব খুশি হয়েছি। এমন করে কাউকে বলা হয়নি। কেন যেন তোমাদের দু’ভাইকে বড্ডো আপন লাগলো। পদ্ম নগরের নাম শুনেছি। এখন অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না। তবে হ্যাঁ, বাংলার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সর্বোপরি একাত্তরের এবং পরবর্তী ইতিহাসের কথা ভুলে যাইনি। স্মৃতিপটে সাজিয়ে রেখেছি।

আরও পড়ুন গল্প  ওরা তেরোজন

শামিম চেয়ে দেখে, হক সাহেব হাতের গামছা দিয়ে চোখ মুছছেন; তার কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে। চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করলেন।
—আলোর মা হয়ত চিনতে পারে তোমাদের এলাকা। শুনেছি ওর বান্ধবীর ছোট বোনের বিয়ে হয়েছিল।
শামিমের কাছে এবার স্পষ্ট হয়ে যায় তার মায়ের পরিকল্পনা। হক সাহেবের কাছ হতে বিদায় নিয়ে ঘর হতে বের হয়ে দেখে, আলো আর তামিম খালপাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
শামীম কাছে যেতেই আলো বলে,
—এ বার দু’ভাইকে বুদ্ধির পরীক্ষা দিতে হবে।
—মানে? এক সাথে বলে উঠে দু’ভাই।
—আচ্ছা। আসার সময় যখন সাঁকো পাড় হয়েছিলেন, তখন সাঁকোর নিচে কিছু দেখেছিলেন কি?
—না তো।
—দু’ভাই জিপিএ -৫।
বলেই মুচকি হেসে শামিমের দিকে অদ্ভুত নয়নে তাকালো। শামিমের ভেতর অন্তর আত্মা নিমেষে দুলে ওঠে।
—এখন কি দেখছেন?
তামিম কিছু সময়ে নিয়ে বলল,
— একটা কিছু আছে কিন্তু চিনি না।
আলো হেসে বলল,
—আপনারা তো আবার পানিবিহীন ডেঙ্গার প্রাণী।
—ঠাট্টা করছেন?
—এটা মাছ ধরার যন্ত্র। রান্না করা যে মাছ দিয়ে ভাত খেলেন তা এই যন্ত্র দিয়ে ধরা।
—রান্নাটা খুব ভালো হয়েছিলো।
—ফুপুকে বলবো।

আরও পড়ুন গল্প নীরুর মা

শামিম ধরা খেয়ে গেলো। ততক্ষণে তামিম আলোর দেয়া ব্যাগটা এক হাতে করে, সাইকেল নিয়ে সাঁকো পাড় হয়, ওপার চলে গেছে। আলো আর শামিম পাশাপাশি দাঁড়িয় আছে পুবদিকে মুখ করে। দু’জন দু’জনকে মন দিয়ে চেনার চেষ্টা করছে। হেমন্তের চাঁদের আলো এসে পড়েছে দু’জনের গায়ে। সেই চাঁদের আলতো আলোয় আলোকে আরো আলোকিত করে তুলেছে। শামিম মুগ্ধ হয়ে মনপ্রাণ উজাড় করে দেখছে, আর মনে মনে বলছে-’মা তোমার ঘর আলোকিত করার জন্য আলো এনে দেব’। তামিমের ডাক শুনে দু’জনে সংবিৎ ফিরে পায়। লজ্জিত মুখে কিছু সময় নিচের দিকে চেয়ে থাকে।
—ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। এবার আসি।
সবাই বলে কার্তিকের জোছনার আলো নাকি মরা মরা লাগে। শামিমের মনের ভেতরে জেগে ওঠে,

‘জোছনায় মাখা আলো তুমি মন রাঙালে।’

আরও পড়ুন জোছনা মাখা আলো-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব

 

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

জোছনা মাখা আলো (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষা পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!