জারজ-শেষ-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

জারজ (শেষ পর্ব)

জারজ (শেষ পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

একনাগারে নিজের কষ্টের এবং অপরাধের কথা বলে, সে যেন মানসিকভাবে শান্ত। বেশ কিছুক্ষণ নীচের দিকে চেয়ে কি যেন বিড়বিড় করে বলছে। ফৌজদারী মামলার অভিজ্ঞ আইনজীবী হাসমত আলীকে মনে হচ্ছে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা ক্লান্ত। তবুও বাদীর পক্ষে নিযুক্ত উকিল। আসামীকে তো কিছু প্রশ্ন করা দরকার। উঠে দাঁড়িয়ে অনুমতি প্রার্থনা করলে, মাননীয় আদালত  অনুমতি দিলেন। উকিল সাহেব ধীর গতিতে আসামীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আসামীর চোখের দিকে তাকালেন,

-তুমি এত সময় ধরে যা বললে, তা কি বানানো গল্প? না-কি কোর্টের কাছে সহানুভূতি চাইছো?

দৃঢ়তার সাথে আসামী বলল,

-না।

-জানো তোমার ফাঁসি হতে পারে?

-আদালত যে শাস্তি দিবেন, তা মাথা পেতে নেব। উকিল সাহেব আসামীকে বাজিয়ে দেখলেন। সাক্ষী না থাকলেও আসামীর জবানী এবং খুরের ওপর তার হাতের ছাপ মিলে গেছে। তাছাড়া রক্তাক্ত পোশাকও প্রমাণ। তাই আর কোন প্রশ্ন না করে নিজের আসনে গিয়ে বসলেন।

আদালত এক ঘন্টার জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হলো।

টানা দু-ঘণ্টা আসামীর কথা শুনতে শুনতে বেশ ক্লান্তিবোধ করছে। আরদালি  গরম এককাপ কফি, বিস্কিট দিতে বলে ইজি চেয়ারের ওপর শরীর এলিয়ে দিলেন। চাকরির বয়সে অনেক ঘটনা শুনেছেন। অথচ এমন ঘটনা বিরল। অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা আর মায়াভরা চোখ ঠিক ছেলেটার মায়ের মত। একবারের জন্যো মা  শব্দ উচ্চারণ করেনি। যতবার প্রসঙ্গ এসেছে ততবার গর্ভধারিনী বলেছে। ছেলেটির পক্ষে কেউ নেই।একটা মেয়ে ছেলেটিকে ভালোবাসে। তাকে প্রতাখ্যান করেছে। বিষণ্ন-ম্লান জীবন। ভালোবাসা তার কাছে প্রতারণা। পরিচয়হীন ভাসমান সমাজের মানুষ হিসেবে নিজেকে জেনেছে।

আরও পড়ুন গল্প ওরা তেরোজন

মাকে অবহেলা করলেও মায়ের কষ্ট অন্তর দিয়ে অনুভব করে। এই জঘণ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, সশরীরে প্রমাণযোগ্য এভিডেন্স সঙ্গে করে থানায় উপস্থিত হয়েছে। বিচারক নাসরিন জাহান হেনা একজন মা। তার ঘরে আসামী নাসিমের মত একটা ছেলে রয়েছে। কেন যেন এই মুহুর্ত্বে নিজের ছেলের মুখখানি চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু তিনি তো একজন বিচারক। বিচারকের চোখ অন্ধ, হাত বাঁধা। আবেগ তার কাছে মূল্যহীন।প্রমাণ-যুক্তি দিয়ে চলে মামলা।

সময় শেষ। ধীরে ধীরে এজলাসে ঢুকলেন। সবাই উঠে মাননীয় বিচারককে সম্মান করল। বিচারক মহোদয় আসন গ্রহণ করলেন। সামনে রাখা নথিপত্র মনোযোগ সহকারে পড়ে, রায় লিখে, সামনে বসা এবং দাঁড়ানো সবার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন,

-আদালত এখন রায় ঘোষণা করবে।

আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামী হাত জোড় করে, মাননীয় বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে,

-হুজুর, আপনার কাছে আমার জীবনের শেষ আর্জি।  ঔ মহিলাকে একটু স্পর্শ করতে চাই। জানি না রায়ে আমার কি শাস্তি অপেক্ষা করছে। শুধু একটিবার।

মাননীয় বিচারক এক মুহুর্তে কি যেন ভেবে বললেন,

-আসামীর আর্জি মঞ্জুর করা হল।হ্যাণ্ডকাপ খুলে তাকে মহিলার কাছে নেওয়া হোক।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী সকাল

আদালত কক্ষে নিরবতা নেমে এল। সবার দৃষ্টি এখন আসামী এবং মহিলার দিকে। কি হতে চলেছে? আসামী ধীর গতিতে মহিলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর মহিলা তার দিকে এগুচ্ছে। কাছাকাছি আসতে আসামী মহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। এ সময় আদালত কক্ষ যেন নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ জলাশয়।

-মা, তোমাকে আমি কোন দিনই ঘৃণার চোখে দেখিনি। তুমি আমার গর্ভধারিণী। তোমাকে কি ঘৃণা করা যায়? কিন্তু তোমাকে যে অসম্মান আর কলঙ্কিত করেছে তার তো বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। তাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। পরাজিত হইনি। একজন মুখোশধারী শয়তানকে চিরবিদায় দিয়েছি।

মহিলা তার গর্ভের রক্তকে শুধু ধরে রেখেছে মাতৃত্বের আদরে। এক সময় আসামী তার মার বুক হতে মুক্ত হয়ে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।

আদালতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে মাননীয় আদালত রায় ঘোষণার প্রস্তুতি নিলেন।

-আদালতের কাছে জমাকৃত এভিডেন্স এবং আসামী নাসিমের পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি; তদুপরি আদালতে দাঁড়িয়ে একই ভাবে স্বীকার করাতে আদালতের কাছে এটাই প্রতিয়মান হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ড তার দ্বারাই সংগঠিত হয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে এই সমাজে তার যে অধিকার, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে মাতৃ-পিতৃ স্নেহ-ভালোবাসা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। মানসিক এবং সামজিক যন্ত্রণা হতে রেহাই পাওয়ার জন্য জঘণ্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড একটা গুরুতর অপরাধ। তাই আলাদত আসামীর মানসিক এবং বয়সের দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ দণ্ড বিধি অনুযায়ী দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলখানায় প্রেরণের নির্দেশ দিল। আর নাসিমা বেগমকে ভরণ-পোষণের জন্য সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হল।

আরও পড়ুন গল্প চোখে দেখা নীলকণ্ঠ

রায় ঘোষণার সাথে সাথে আসামী নাসিম চিৎকার করে বলে উঠলো,

-মাননীয় বিচারক, আমাকে ফাঁসির রায় দেন। এ জীবন নিয়ে, জারজ সন্তান হয়ে, জেল হাজতে বেঁচে থাকতে চাই না……

আদালত কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। জনতার পিছন থেকে একজন যুবতীর আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। সে চিৎকার বলছে, 

-নাসিম, আমি তোমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তোমার জন্মের জন্য তুমি দায়ী নও। তুমি জারজ সন্তান নও। তোমার জন্য অপেক্ষা করব….

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী নাসিম চিৎকার করে বলতে থাকে,

 -মা, তুমি পবিত্র। মায়ের গর্ভ কখনো অপবিত্র হতে পারে না। কিন্তু জারজ সন্তান হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। জারজ সন্তানের এ সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই….

আরও পড়ুন জারজ-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

জারজ (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত একজন গল্পকার। এছড়াও তিনি নিয়মিত কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: বিবর্ণ সন্ধ্যা; উপন্যাস: জোছনায় ভেজা বর্ষাপাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!