ছেলেবেলার-ষড়ঋতু
আত্মজীবনী,  আহম্মদপুর,  দ্বারিয়াপুর,  বিরাহিমপুর,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য,  স্মৃতিচারণ

ছেলেবেলার ষড়ঋতু

ছেলেবেলার ষড়ঋতু

তাহমিনা খাতুন

 

চৈত্রের খর তাপের দাবদাহের পর বৈশাখ আসতো ভয়ঙ্করী রূপে। প্রায়ই কালবৈশাখী ঝড়ে গাছপালা উপরে, ঘর- বাড়ি ভেঙ্গে মানুষের দুর্দশার সীমা থাকত না। আর আমাদের চলতো কাঁচা আম কুড়ানোর ধুম। ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙ্গে মাথায় পড়বে কিনা-তাতে কোন ভ্রুক্ষেপও করতাম না।

আমি তখন খুবই ছোট। একদিন দুপুরের পর পরই আকাশের ঈষান কোন ঘন কাল মেঘে ছেয়ে গেল। আব্বা, মা সহ বেশীর ভাগ ভাই-বোন বাড়ির বড় চৌচালা ঘরটায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। কেবল মাত্র মেজ ভাই অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরটায় অবস্থান করছিলেন। প্রচন্ড বেগে ঝড় শুরু হল। আব্বা চিৎকার করে মেজভাইকে বড় ঘরটিতে চলে আসতে বললেন। মেজভাই দৌড়ে বড় ঘরটিতে চলে আসার সাথে সাথেই ছোট ঘরটি প্রচন্ড ঝড়ের ঝাপটায় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। অল্পের জন্য মেজভাই রক্ষা পেলেন!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বিদ্যুৎ ছিল না কোন গ্রামেই। তীব্র গরমে হাত পাখাই ছিল গ্রামের মানুষের গরম থেকে রেহাই পাাওয়ার এক মাত্র উপায়। আমাদের লেখাপড়ার জন্য বরাদ্দ ছিল একটি হ্যারিকেন লণ্ঠন। নাভিশ্বাস ওঠা গরমে ঘরে টিকতে না পেরে উঠানে খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে আমরা ছোট তিন ভাই বোন পড়া তৈরি করতাম। সবার ছোট আজাদ তখন অনেক ছোট। স্কুলে যেতে শুরু করনি। বাড়িতে দুটো বা তিনটে লণ্ঠন থাকতো। প্রতিদিনই বিকালে হ্যারিকেনের চিমনিগুলি পরিষ্কার করা ছিল আমাদের দায়িত্ব। এছাড়া রান্না ঘরে বা খাবার ঘরের জন্য থাকতো কুপি যেটাকে আমাদের অঞ্চলে বলা হত ‘চেরাগ’। একটু বাতাসেই নিভে যেত কেরোসিন তেলে ডুবানো সরু সলতেয় টিম টিম করে জ্বলা ‘চেরাগ’!

বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসের তীব্র গরমে দুপুর বেলা টিনের চালের নীচে ক্লাস করা দূরুহ হয়ে পড়তো। একারনে গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই আমাদের কিছুদিনের জন্য ‘মর্নিং স্কুল’ চলতো।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

গরমের ছুটির বেশীর ভাগ সময় নানীর বাড়িতেই কাটতো। নানীর ছিল বিশাল আম বাগান। ফজলী, ল্যাংড়া, হিমসাগর সহ বিভিন্ন স্বাদের আম গাছে ভরা ছিল বাগানটি। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে আষাঢ় মাসের শেষ পর্যন্ত বাগানটি থেকে আম সংগ্রহ চলতো। এত আম হতো যে আম রাখার জায়গা করতে রীতি মত হিমশিম খেতে হতো। নানীর বাগানের আমের প্রাচুর্য নানীর পাড়ার হত দরিদ্র মানুষকগুলোকেও কিছুটা হলেও অন্তত দুই মাসের খাদ্যের যোগান দিতে সহায়তা করতো! কেবল মাত্র আম নয়, বাগানে ছিল লিচু, কাঁঠাল, জাম, নারিকেল, সুপারি আরো অনেক ধরনের ফলের গাছ।

আম বাগানটি জুড়েই ছিল ছোট ছোট ঝোপ-জঙ্গল। বিভিন্ন দিক দিয়ে ছিল পায়ে চলার পথ। আমরা দিনের বেলা ওই ঝোপ জঙ্গলের মধ্য থেকেই আম কুড়াতাম। বহু বছর আগেই আমার নানী দুনিয়ার মায়া ছেড়ে গেছেন। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিশাল বাগানের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই! পুরো বাগানটিই এখন ফসলের জমি। নানীর বাগান ছাড়াও আমাদের নিজেদের বাড়িতেও আম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল, সুপারী, খেজুর ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছালিতে ভরপুর ছিল।

মনে আছে, আমাদের পাড়ার প্রায় সব বাড়িতেই অনেক বড় বড় গাছের লিচু যখন পাকতে শুরু করতো, শুরু হত বাদুরের উপদ্রব! বাদুরের আক্রমণ থেকে লিচু বাঁচানোর জন্য লিচু গাছের বেশ উঁচু ডালে কাঠের তক্তা বেঁধে লিচু পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হত। আমাদের ছোটদের দিনের অনেকটা সময় গাছের ডালে বাঁধা তক্তার উপরেই কাটতো। বর্তমানে কেবল মাত্র নানীর বাগান নয় বা আমাদের গ্রাম নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামই গাছ-পালাহীন, সবুজের ছোঁয়াবিহীন রুক্ষ নগর জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে! নদী ভাঙ্গন, জন সংখ্যার চাপ, শিল্প কারখানা স্থাপন সহ আরও অনেক কিছুর কারণে পল্লী তার স্বাভাবিক শ্রী হারিয়েছে।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

বর্ষাকালকেও সাদরে আহ্বান জানাতাম আমরা! আমাদের গ্রামের বা আশে-পাশের গ্রামের পাড়াগুলো বর্ষায় পুরোপুরি ভাবেই পানিতে ডুবে যেত। অথচ আমাদের পাড়াটা বর্ষাকালে কখনোই পানিতে ডুবে যেতে দেখিনি। ছোট বেলায় বাড়িতে পানি ঢুকতো না বলে আমাদের মনঃকষ্টের সীমা ছিল না। নিকটস্থ পাড়াগুলো পানিতে ডুবে গেলে পাশের গ্রাম বিরাহিমপুরের অনেক বাড়ি থেকেই নারী, শিশুরা আমাদের পাড়ায় আশ্রয় নিতেন। তাদের দুর্দশা বোঝার মত বয়সও তখন আমাদের হয়নি। আমাদের মনে হত আমাদের বাড়ি পানিতে ডুবে গেলে কি মজাই না হত! বর্ষায় বাড়িতে পানি না ওঠার দুঃখটা আমরা অন্যভাবে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। যেমন কলা গাছ কেটে ভেলা বানানো, আমাদের বাড়ির পাশের একটা বড় ডোবা যেটাকে আমরা পুকুর বলতাম, বর্ষার পানি তার কাছাকাছি এলেই আমরা কোদাল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম।

অনেকটা খাল কেটে আমাদের প্রিয় ‘পুকুরে’ পানি ফেলে সেটি ভরে ফেলা হত, যাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সাঁতার কাটা যায়। বর্ষাকালে এভাবে পানিতে মাতামাতি করার কারণে কম পক্ষে দুই এক বার জ্বর বাধিয়ে যেন মায়ের দুর্ভোগ বাড়ানোই ছিল আমাদের কাজ। এছাড়া বর্ষার পানি কমে গেলে ডোবায় নেমে মাছ ধরা আর শিং মাছের কাঁটার ঘায়ে গগণ বিদারী চিৎকারে পাড়া মাথায় তোলারও কমতি ছিল না। আমাদের বাড়ির পাশের আত্রাই নদীটি বছরের বেশীর ভাগ সময় শুকানো থাকার কারণে আমাদের গ্রাম বা আশে-পাশের গ্রামের কোন বাড়িতে নৌকার ব্যবহার ছিল না। এ কারণে নৌকা ভ্রমণের জন্য আমাদের আগ্রহের সীমা ছিল না। বর্ষায় আত্রাই নদী প্রমত্ত রূপ ধারণ করতো। বর্ষায় দূরের গ্রাম থেকে কোন আত্মীয় স্বজন নৌকা নিয়ে বেড়াতে এলে আমরা সেই নৌকায় চড়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে’ মেটানোর চেষ্টা করতাম!

আরও পড়ুন  সমকালীন ভাবনা

আমরা বয়সে অনেক ছোট হলেও সে আনন্দ যাত্রা থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করা হয়নি। কিছুদিন আগেই কাশীনাথপুরে আত্রাই নদীর উপরে একটা ব্রীজ তৈরী হয়েছে এবং সরকারী কর্তা ব্যক্তিদের থাকার জন্য নির্মিত হয়েছে একটি ‘বাংলো’ যাকে আমরা বলতাম ‘ডাক বাংলা’। এই অদ্ভুত নামকরণের রহস্য অবশ্য আমার জানা নাই! সে সময়ে ওই ব্রীজ এবং ‘ডাক বাংলা’ দেখে যারপরনাই আনন্দ পেয়েছিলাম। তবে সবচেয়ে বেশী আনন্দ পেয়েছিলাম ভরা বর্ষায় চাঁদনী রাতে নৌকা থেকে শাপলা তুলতে পেরে। কত দেশ ঘুরলাম, কত কিছু দেখলাম, সেদিনের সে অনাবিল আনন্দ আর কিছুতে খুঁজে পেলাম না!

বর্ষায় আমাদের আর একটা আনন্দের অনুসঙ্গ ছিল, হালোটে পানির তীব্র স্রোতের বিপরীতে খানিকটা হেঁটে গিয়ে স্রোতে ভেসে যাওয়া। আমাদের বাড়ির পাশের হাইওয়েতে আত্রাই নদীর পানি প্রবাহের জন্য তৈরি করা হয়েছিল কালভার্ট-যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হত ‘চোঙ’। বর্ষাকালে এই কালভার্টের মুখ দিয়ে প্রচন্ড বেগে পানি প্রবাহিত হয়ে ‘হালটে’ তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হত! কালভার্টের মুখের পানির সেই তীব্র স্রোতে যে ঘূর্ণি সৃষ্টি হত তাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হত ‘পাক পড়া’। আমরা প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে সেই তীব্র স্রোতের বিপরীতে বহু কষ্টে কালভার্টের কাছাকাছি পৌঁছে সাঁতার দিতাম। সেই তীব্র স্রোত আমাদেরকে প্রচন্ড বেগে ভাসিয়ে হালটের প্রায় মাঝামাঝি নিয়ে ফেলত!

আমাদের এই প্রাণখোলা আনন্দে নেতৃত্ব দিতেন বড় ফুফুমা। দারুণ উপভোগ্য ছিল এই সাঁতার। এছাড়া পুকুরে বড় ফুফুমার সাথে সাঁতার কাটতে নামলেই বড় ফুফুমা পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে ‘মরা লাশের’ মত পানিতে ভেসে থাকতেন আর আমরা ওনার পা ধরে ঠেলে ঠেলে সারা পুকুরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতাম। বেশী সময় ধরে আমাদের প্রিয় পুকুরে ঝাঁপা-ঝাঁপি করার কারণে বড় ফুফুমা যেমন বকা দিতেন, তেমনি বর্ষাকালের আনন্দ উচ্ছ্বলতায় উনিই ছিলেন আমাদের সঙ্গী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বড় ফুফুমা অসুস্থ হয়ে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। শৈশবের আনন্দ ভরা দিনগুলির স্মৃতির সাথে বড় ফুফুমার স্মৃতিও মনে অমলিন হয়ে বেঁচে থাকবে চিরদিন!

আরও পড়ুন শানশি লাইব্রেরি ও মোরগের ডাক

বর্ষায় বকুল ফুল কুড়িয়ে ‘ঘামাচি’ লতায় মালা গাঁথাও ছিল আমাদের ছেলেবেলার বড় বিনোদন। গ্রামের মসজিদের কাছেই ঝাঁকড়া বকুল গাছটির তলা ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকতো। ভোর বেলায় বকুল ফুল কুড়িয়ে ঘামাচি লতায় গাঁথা হত মালা। কে কত বড় মালা গাঁথতে পারে-ছিল সে প্রতিযোগিতা। ছোটবেলা থেকেই বকুল আমার এত প্রিয় ফুল ছিল যে এখনও বকুল ফুল বা মালা দেখলেই নিজেকে সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে!

শরতে শিউলী ফুল কুড়ানো আর সেই ফুলে মালা গাঁথা, কে কত ভোরে উঠে শিউলী ফুল কুড়াতে পারে তার জন্যও ছিল আনন্দময় প্রতিযোগিতা। শিউলী ফুল কুড়াতে গিয়ে একদিনের বোকামির কথা মনে হলে এখনও হাসি পায়। আমাদের প্রিয় পুকুর পাড়েই ছিল একটি শিউলী ফুলের গাছ। যথারীতি সবার আগে শিউলী কুড়ানোর আশায় একটা বেতের ডালা (আমাদের অঞ্চলে বলা হয় কাঠা) হাতে গিয়েছি গাছ তলায়। দেখলাম শিউলি তলা শূন্য। কারণ আমার শিউলী তলায় পৌঁছার আগেই কোন পুষ্পপ্রেমী শিউলী ফুলগুলি কুড়িয়ে নিয়ছিল। তখন আশ্বিন মাস। সে সময় আশ্বিন মাসেই গ্রামে বেশ শীত অনুভূত হতো। বয়স আর কত হবে? প্রাইমারীর শুরুর দিকে হয় তো। গায়ে একটা চাদর জড়ানো। কারণ আমাদের শিশু কালে সোয়েটার বা জ্যাকেট কিংবা পায়ে স্যান্ডেল বা চটি পড়া আমাদের কল্পনাতেও ছিল না।

প্রতিদিন ঘুমানোর আগে পা ধুয়ে কাঠের খড়ম পায়ে দেয়া ছিল আমাদের অভ্যাস! শীত নিবারণের জন্য বড় জোর একটা চাদর অথবা মা কিংবা বড় বোনদের পরনের শাড়ী ভাঁজ করে গায়ে পেঁচিয়ে দেওয়া হত।পুকুরের পানিও তখন প্রায় তলানিতে এবং পানিও বেশ ঠান্ডা। কাছেই ছোট ফুফুমার (আমার আপন ফুফু) রান্নাঘর থেকে কাঠ কয়লা নিয়ে দাঁত মেজে পুকুরের পানিতে কুলি করার উদ্দেশ্যে নামলাম। এর মধ্যে কয়েকজন গুরুজন শ্রেণির আত্মীয় পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। কুলি করতে গিয়ে কিভাবে যেন হাত ফসকে বেতের কাঠাটা পানিতে ভেসে গেল। ব্যস! সকাল বেলার ওই ঠান্ডা পানিতে চাদর জড়ানো অবস্থাতেই আমিও কাঠা তুলে আনার উদ্দেশ্যে সাঁতার দিলাম। পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো মুরুব্বীরা আমার কান্ড দেখে হেসে অস্থির! বেতের ডালা যে ডুবে যাবে না- সে কথাই আমার মাথায় আসেনি!

আরও পড়ুন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

মালা গাঁথা ছাড়াও শিউলীর বোঁটার রঙে রাঙাতাম পুতুলের কাপড়। অনাবিল আনন্দের এই অনুসঙ্গ গুলি এখন গ্রাম থেকেও হারিয়ে গেছে। গ্রামের শিশুরা ও এখন শিউলী , বকুলের মালা গাঁথার আনন্দের চেয়ে মোবাইলে গেম খেলতে বা ভিডিও দেখতেই বেশী পছন্দ করে।আধুনিকতার নামে বকুল বা শিউলীর মালার বদলে আমরা শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছি সর্বনাশা প্রযুক্তি। কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রের একটি সংবাদ ছিল, উন্নত অনেক দেশই শিশুদেরকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলতে বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছে! পক্ষান্তরে ধনী দেশগুলির উদ্ভাবিত প্রযুক্তির করাল গ্রাসে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে! এ থেকে পরিত্রান পেতে হলে আমাদের আপন সংস্কৃতিতে ফেরার কোন বিকল্প নাই।

হেমন্তে নতুন ধান ওঠার আগে কার্তিক মাসে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কেবল মাত্র আমাদের গ্রাম নয়, সব গ্রামেই খাদ্যাভাব দেখা দিত। অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারে ভাতের বিকল্প হিসাবে রুটি, গম বা কাউনের জাউ, যবের ছাতু বা ‌অল্প চালের সাথে মসুর বা খেসারি ডাল মিশিয়ে খিচুরি রান্না করে খেয়ে আধা পেট খেয়ে কষ্টে জীবন ধারন করতো। অভাব মানুষকে কতটা অমানবিক এবং স্বার্থপর করে তোলে বহু বছর আগের শৈশবের ছোট্ট একটা ঘটনা আমাকে অত্যন্ত অল্প বয়সে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিল।

আমাদের পাশের গ্রামের হত দরিদ্র কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় ছিল অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন পরিবারে কৃষি শ্রমিক হিসাবে কাজ করা। এ ধরনের একটি পরিবারের ছেলে বা মেয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে বেড়াতে এসেছিল ৭/৮ বছরের একটি ছেলে। অভাবে জর্জরিত পরিবারটিতে হয়তো বহু কষ্টে যোগাড় করা গমের আটা থেকে কয়েকটা রুটি তৈরি হচ্ছিল। হয়তো পরিবারের সবার জন্য বরাদ্দকৃত রুটি থেকে ছোট্ট ছেলেটি ক্ষুধার তাড়নায় কাউকে না বলে একটি রুটি নিয়েছিল ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। ওই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ এক জন দেখতে পেয়ে ছেলেটির হাত থেকে রুটিটি কেড়ে নেওয়ার জন্য তার পিছনে তাড়া করে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত এসেছিল। ওই লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম বিষয়টা। সে কেঁদে ফেলেছিল কারণটা বলতে গিয়ে।

আরও পড়ুন  গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

অথচ তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লোক সংখ্যা হয়তো চার/ সাড়ে চার কোটির বেশি ছিল না। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা আঠার কোটির বেশি ছাড়া কম হবে না। তারপরও বাংলাদেশের মানুষ অনাহারে থাকে না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণা, নতুন নতুন ফল-ফসলের উদ্ভাবন এক কথায় কৃষিতে যুগান্তকারী উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিও সম্ভব হয়েছে। ফলে আত্ম অবমাননাকর অবস্থা থেকেও মানুষ বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। একাত্তরের লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে আত্মসম্মানের এই স্বীকৃতি।

গরীব, খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি মিলত অঘ্রাহায়ণ মাসে নতুন ধান ওঠাকে কেন্দ্র করে। ফসল কাটা, মাড়াই করে ফসল ঘরে তোলা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত সময় পার করতো গৃহস্থ পরিবারগুলো। নতুন ধান ঘরে ওঠার পরেই শুরু হতো পিঠা-পুলি বানানো, খই মুড়ি ভাজা, চিড়ে কোটা, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো ইত্যাদি এবং এসবই ছিল গ্রামীণ জীবনের উৎসব।

ফাল্গুন- চৈত্র মাসে রবি শস্য ঘরে তোলার ব্যস্ততাও নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে নিয়ে আসতো একটা উৎসবের আমেজ। চৈত্রের শেষের দিকেই আমাদের শুরু হতো গাছের ঝরে পড়া কচি আম কুড়ানো, কচি আমের ভর্তা বানিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে খাওয়া, দল বেঁধে মাঠে মাঠে ঘুরে কোঁটা (বাঁশের কঞ্চির মাথায় একটা কাঠি বাঁধা আঁকশিকে আমাদের এলাকায় বলা হয় কোঁটা) দিয়ে বড়ই (কুল) সংগ্রহ করা, তেঁতুল গাছ থেকে কাঁচা তেঁতুল পেড়ে খাওয়া, জামরুল, গোলাপ জাম, বেথুল (বেত ফল) ডেঁফল, বঁইচি ফল (এক ধরনের টক মিষ্টি বুনো ফল) নোনা ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে খাওয়া ছিল আমাদের শৈশবের আনন্দ।

আরও পড়ুন কামাল লোহানীর বিপ্লব মন্ত্রের প্রথম পাঠশালা

বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর অমর চরিত্র অপু-দূর্গার মতই আমরাও ছিলাম যেন প্রকৃতির সন্তান! প্রকৃতি যেন আমাদের শৈশবে আনন্দের এসব খোরাক অকৃপণ উদারতায় ঢেলে দিত। এখন আর গ্রামে ঝোপ-ঝাড়ও নাই, ঝোপ-জঙ্গল বিনাশের সাথে সাথে আধুনিক হওয়ার কৃত্রিম উন্মাদনায় প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে এসব বুনো ফল। গ্রামের শিশুদের হাতে এখন দেখা যায় স্বাস্থ্য হানিকর আলুর চিপসের প্যাকেট, ফলের জুসের নামে স্যাকারিন মিশ্রিত রঙীন পানি অথবা বহুজাতিক কোম্পনীর কোমল পানীয়ের নামে কোকাকোলা সহ নানা ধরনের সর্বনাশা পানীয়! আত্মবিনাশকারী এসব খাদ্যগ্রহণের নেশায় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জটিল সব রোগে!

মানুষের সুন্দর স্বাভাবিক চেতনা ফিরে আসুক। আধুনিকতার নামে প্রকৃতির অকৃপণ দানকে অস্বীকার না করে প্রাণ ভরে বরং সে দানকে উপভোগ করার মানসিকতা তৈরি হোক-তবেই মানুষ ফিরে পাবে তাদের হারানো সম্পদ, ফিরে পাবে সুস্থ সুন্দর জীবন উপভোগের নিশ্চয়তা!

আরও পড়ুন যাপিত জীবনের কথকতা-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ম পর্ব
১১তম পর্ব 
১২তম পর্ব
১৩তম পর্ব
১৪তম পর্ব
১৬তম পর্ব
১৭তম পর্ব
১৮তম পর্ব
১৯তম পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

ছেলেবেলার ষড়ঋতু

Facebook Comments Box

তাহমিনা খাতুন ছড়া, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, নারীর অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন। পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বাড়িয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!