গ্রন্থ-ও-গ্রন্থাগার
খ ম আব্দুল আউয়াল,  প্রবন্ধ,  সাহিত্য

গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

খ ম আব্দুল আউয়াল

 

এমন একদিন ছিল যখন এই পৃথিবীতে মানুষ ছিল না। মানুষ যখন সৃষ্টি হলো, তখন থেকেই শুরু হলো এই পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কষ্ট ছাড়া, শ্রম ছাড়া প্রকৃতির কাছ থেকে মানুষের বেঁচে থাকার কোনো উপকরণই পাওয়া যায়নি। আদিম কালে মানুষ ছিলো অসহায়। আত্মরক্ষার তাগিদে, বেঁচে থাকার সংগ্রামে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে করতেই মানুষ সমাজ সৃষ্টি করে।

পৃথিবীতে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে শিখেছে আত্মরক্ষার তাগিদে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে জয়ী হয়েছে মানুষ সমাজ সৃষ্টি করে। নৃবি জ্ঞানীদের মতে মানব সভ্যতার সূচনা হয়েছে সমাজ সংগঠনের মধ্য দিয়ে। প্রকৃতির বৈরিতার সাথে একক সংগ্রামে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে একে অপরের সাথে মিলে সংগঠিত সামাজিক শক্তি দিয়ে মানব সভ্যতা ক্রমাগত এগিয়ে গিয়েছে। পৃথিবীতে অস্তিত্ববান হওয়ার পর নানা বাধা বিপত্তি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঋতু পরিক্রমায় শীত গ্রীষ্মের প্রখরতাকে একে অপরের সাথে মিলে মোকাবিলা করার সংগঠিত রূপই হলো সমাজ।

মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে বুঝতে চেয়েছে, বোঝাতে চেয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মানুষ সৃষ্টি করেছিল ভাষা। ভাষাও একদিনে বা এক বছরে সৃষ্টি হয়নি। চিত্রলিপি থেকে ধ্বনিনির্ভর লিপির ভাষা বহু উদ্ভাবন ও বিবর্তনের ফল। মানুষ পরস্পরকে যেমন জেনেছে, তেমনি তার পার্থিব পরিবেশকেও জানতে চেয়েছে, বুঝতে চেয়েছে, বুঝাতে চেয়েছে। মানুষের এই অনুসন্ধিৎসাই ক্রমান্বয়ে স্মৃতির ভাণ্ডারে জ্ঞানভাণ্ডার হয়ে দেখা দিয়েছে। ক্রমান্বয়ে অর্জিত এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একসময় স্মৃতিশক্তিতে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠলো। মানুষ তখন তার অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করলো। অর্জিত অভিজ্ঞতা ও লব্ধ জ্ঞানের স্মৃতির এই ভাঙার মানুষ তার পরবর্তী প্রজন্মকেও দিয়ে যেতে চেয়েছে, চেয়েছে আপন উপলব্ধি অপরকে অবহিত করাতে।

আরও পড়ুন বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

অবহিত করেছে পাহাড়ে খোদাই করে, পাথরে শিলালিপির আকারে, পরিশেষে বইয়ের মাধ্যমে। তথ্যানুসন্ধানী মানুষের কর্মকাণ্ড ও অভিজ্ঞতার এই ফসল মানব সভ্যতায় বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে মানব সমাজ ও সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন হিসেবে প্রতিভাত হয়ে আছে। তাই বই জ্ঞানের প্রতীক, সভ্যতার প্রতিলিপি । স্থায়ীভাবে ধরে রাখার মাধ্যম অতীতে ছিল মাটির ফলক, পাথর, গাছের বাকল, চামড়া, কাঠ, প্যাপিরাস এবং সবশেষে কাগজ। মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারও বাড়তে লাগলো। অতীতকালে এ জ্ঞানভাণ্ডারকে মানুষ সংরক্ষণ করেছে, মন্দির বা উপাসনালয়ে কিংবা রাজার বাড়িতে । এভাবেই গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার সমাজের শ্রেষ্ঠ সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠে।

মানবসভ্যতায় সমাজ সংগঠন যেমন সংগ্রামী মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, ঠিক তেমনি গ্রন্থাগার হচ্ছে সমাজের শ্রেষ্ঠ সংগঠন। অন্যকথায় বলতে হয় গ্রন্থাগার হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে পুরো সমাজের আত্মপরিচয় বিধৃত থাকে। একটি সমাজ তার মহত্ব ও ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ করে তার গ্রন্থাগারের মধ্য দিয়ে। যে সমাজে গ্রন্থাগার নেই সে সমাজ আসলে এখনো বুনো বা বর্বর সমাজ।

‘বই’ শব্দটি বাংলা শব্দ নয়। আরবি ‘বহী’ শব্দ থেকে সহজ বিবর্তনে বাংলা ভাষায় বই শব্দটি গৃহীত হয়েছে। অনুরূপভাবে ‘পুস্তক’ শব্দটির উৎস পারসিক ‘পুস্ত’ অর্থাৎ চামড়া দিয়ে বাঁধানো পঠন সামগ্রী। বইপু স্তক বাংলা ভাষায় এমনভাবে গৃহীত হয়েছে যে, এগুলো যে বাংলা শব্দ নয় তা এখন ভাবাই যায় না। তেমনি কাগজ, কলম, খাতা, দোয়াত এ সকল আরবি ও ফারসি শব্দ বাংলায় তুর্কি, পাঠান ও মুঘল শাসন আমলে বাংলা ভাষা গ্রহণ করেছে। ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বাংলা ভাষায় আররি ফারসি ভাষার শব্দ সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।

আরও পড়ুন একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

গ্রন্থ শব্দটি সংস্কৃত; ব্যাকরণে আমরা যাকে তৎসম শব্দ বলি সেই তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ ‘গ্রন্থ’ অবিকৃত ভাবে বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একসঙ্গে গাঁথা বা গ্রন্থিত থেকে গ্রন্থ শব্দটির উৎপত্তি। অতীত কালে তাল পাতার বা ভূর্জপত্রের পুঁথি উপরে নীচে কাঠের টুকরার চাপে গেঁথে রাখা হতো। সেই থেকে গ্রন্থ। বাংলা পুঁথি কথাটির মূল ‘পত্র’ বা ‘পাতা’। এ শব্দটির সাথে ফারসি ‘পুস্ত’ শব্দটির সাদৃশ্য রয়েছে।

ল্যাটিন ভাষার Liber অর্থ গ্রন্থ। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Book Liber থেকে ল্যাটিনে Librarium এবং এই Librarium থেকে ইংরেজি Library শব্দের উদ্ভব। লাইব্রেরি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারকে কখনই পাঠাগার বলা সঙ্গত গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার নয়। অনুরূপভাবে কোনো বই পুস্তক বিক্রির দোকানকেও লাইব্রেরি বলা উচিত নয়। প্রাচীনকালে জ্ঞানভাণ্ডার বা স্বরস্বতীভাণ্ডার বলা হতো। মধ্যযুগে মুসলমানরা বলতো ‘কুতুবখানা’। বাংলাদেশে পুঁথিশালা প্রচলিত ছিল। এ যুগে আবার জ্ঞানভাণ্ডার কথাটি ফিরে আসছে তবে আন্তর্জাতিকভাবে। এখন আর লাইব্রেরি শব্দ দিয়ে লাইব্রেরির সমগ্রতা বুঝানো সম্ভব হচ্ছে না। বিগত শতাব্দীর শেষে উন্নত বিশ্বে লাইব্রেরি নাম ধারণ করেছিল Information Resource Center. এখন একুশ শতকের শুরুতেই শোনা যাচ্ছে Knowledge Management Centre অর্থাৎ জ্ঞান ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বা জ্ঞানভাণ্ডার। ব্যবহারিক অর্থে Library বা গ্রন্থাগার হচ্ছে সেই স্থান যেখানে সমাজের সকলের জন্য বই পত্রপত্রিকা যাবতীয় মুদ্রিত ও অমুদ্রিত, দৃশ্য ও শ্রব্য জ্ঞানভাণ্ডার থাকে এবং যে কেউ প্রয়োজনমত তা ব্যবহার করতে পারে। ফলে গ্রন্থও তার প্রচলিত অর্থদ্যোতনা ছাপিয়ে আরও বিস্তৃত অর্থ গ্রহণ করেছে।

কম্পিউটার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এখন গ্রন্থ। পোড়ামাটির ফলক যেমন অতীতের গ্রন্থ, তেমনি আইসিটি হচ্ছে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের গ্রন্থ। এখন কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন একবিংশ শতাব্দীতে এসে কম্পিউটারের মনিটরে বিশ্বের তাবৎ তথ্য ও জ্ঞান প্রতিভাত হচ্ছে। সমগ্র বিশ্বই এখন একখানা গ্রন্থ এবং একজন পাঠকের জন্য তার নিজের পিসি বা ল্যাপটপই হচ্ছে সর্বাধুনিক গ্রন্থাগার, যদি তার সঠিক ব্যবহার আয়ত্ব করা যায়। বিপুল এই জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পাঠের উপকরণ সংগ্রহ করার আধুনিক কৌশলই হচ্ছে সাক্ষরতার নতুন সংজ্ঞা ।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে ক্রমান্বয়ে অর্জিত প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক সকল প্রকারের এই জ্ঞান এক সময়ে স্মৃতিশক্তিতে ধরে রাখা মানুষের জন্য যখন আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না এবং যখন তা প্রজন্মান্তরে প্রতিস্থাপন করার আকাঙক্ষায় মানব সমাজ ব্যাকুল হয়ে উঠছিল; তখন মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান ভাণ্ডারকে সংগৃহিত করে রাখার নানা উপায় খুঁজছিল। স্থায়ীভাবে ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে অতীতে মানুষ মাটির ফলক, পাথর, গাছের বাকল, চামড়া, কাঠ, প্যাপিরাস এবং সবশেষে কাগজ ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এই আহরিত জ্ঞানভাণ্ডারকে অতীতে মানুষ তাদের উপাসনালয়ে বা মসজিদু মন্দিরে কিংবা সমাজ অধিপতি বা রাজার বাড়িতে একত্রে সংগৃহিত করে রাখার প্রয়াস পেয়েছে। এভাবেই মানব সমাজে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার অত্যন্ত মর্যাদাবান বস্ত্র ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে সৃষ্ট ও সমাদৃত হয়েছে। মানব সভ্যতায় সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন ও মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারই হচ্ছে সভ্যতার পরিমাপক।

সমাজের মনন সংগৃহিত থাকে। মানুষের মননের ইতিহাসই মানব সভ্যতার ইতিহাস। আদিম পর্যায়ে মানুষ তার আত্মরক্ষার তাগিদে যেমন সমাজ গড়ে তুলেছিল তেমনি মানব সমাজের অগ্রগতির ইতিহাসে তার মননের আধার হিসেবে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিল। মানব সমাজই গ্রন্থাগারকে সৃষ্টি করেছে আর গ্রন্থাগারেই মানব সমাজের মননের প্রতিফলন সংগঠিত রূপে প্রতিভাত। এজন্যই বলা হয়েছে Where there is civilization there must be books and wherever there are books there must be libraries. ডা. লুৎফর রহমান যথার্থই বলেছিলেন ‘কোন সভ্য জাতিকে অসভ্য করবার ইচ্ছা যদি তোমার থাকে, তাহলে তাদের সব বই ধ্বংস করো এবং সকল পণ্ডিতকে হত্যা করো, তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।’ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আমাদের দেশে সেই কাজটিই করতে চেয়েছিল।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

মানব সমাজে গ্রন্থাগার হচ্ছে তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম সংগঠিত প্রকাশ । জ্ঞান সামগ্রীর বিভিন্ন ও বিচিত্র মাধ্যম গ্রন্থাগারের সংগ্রহে সন্নিবেশিত হয়ে যুগে যুগে মানব সভ্যতার পরিচয় বহন করে নিয়ে আসছে। মানুষ যখন প্রথম লিখতে শিখল তখন থেকেই লিখিত জিনিসটি মানুষ তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে দিতে আগ্রহ বোধ করল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়েছে সুমেরীয়, আসিরীয় ও ব্যবিলনীয় সভ্যতা। এসব সভ্যতার নিদর্শনে কিউনিফর্ম লিপিতে মাটির চাকতির উপরে খোদাই করে লেখা পোড়ামাটির ফলকই মানব সভ্যতার আদি গ্রন্থ। সেই সভ্যতা টাইগ্রিস্ন ইউফ্রেটিস নদীর তীর জুড়ে গড়ে উঠেছিল ৩৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ব্যবিলনীয়রা মাটির চাকতির উপরে লিখত। এরাই সুমেরীয় সভ্যতার ধারক। আসিরীয় রাজা আসুরাবাণীপাল তার নিনেভার গ্রন্থাগারে সেগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন। বিশ্বের প্রথম লাইব্রেরিয়ান হচ্ছেন আমিলানু (Amilanu) যিনি তাঁর সময়ে সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে মানব সমাজে সমাদৃত ছিলেন। তিনি ব্যবিলনীয় এবং খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতকে বর্তমান ছিলেন। কিউনিফর্ম লিপির বিশিষ্ট নিদর্শন হাম্বুরাবির বাণী প্যারিসের ল্যুভর সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে।

মিশরীয় সভ্যতার হায়ারোগ্লিফ (Hieroglyph) ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের লিখন পদ্ধতি হিসেবে আবিষ্কৃত হয়। মিশরেই লিখন সামগ্রী হিসেবে প্যাপিরাস ব্যবহার শুরু হয়। লেখার সামগ্রী প্যাপিরাস (Papyrus) আসলে নলখাগড়া জাতীয় গাছের বাকল। এই প্যাপিরাস থেকে ইংরেজি ‘পেপার’ শব্দটির উৎপত্তি। এই প্যাপিরাস রোলের বিশাল সুসংগঠিত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার মিশরীয় সভ্যতার দান। গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার জগতে এই আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার এক বিশাল মাইল ফলক।

আরও পড়ুন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

গ্রীকদের সভ্যতাও অতি প্রাচীন। ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানরা গ্রীস দখল করে। তারপর গ্রীক ও রোমানদের সভ্যতা মিলেমিশে টিকে ছিল অনেক দিন। গ্রীস ও রোমে যেসব সামগ্রীর উপর লেখা হতো সেগুলো হলো গাছের ছাল বা পাতা, পাথর, কাঠের খণ্ডে এবং ব্রোঞ্জ ধাতুতে ৷ পার্চমেন্ট ও ভেলাম (Vellum) জাতীয় চামড়ায়ও লেখা হতো। ল্যাটিন ভাষায় এই গ্রন্থকে বলা হতো কোডেক্স (Codex) যা থেকে কোড (Code) শব্দটি এসেছে। গাছের ছালকে পরিষ্কার করে নিয়ে তার উপর লিখতো প্রায় সকল দেশের প্রাচীন লেখকরাই। এই ছালকে বলে লিবার (Liber) যার ল্যাটিন অর্থ হচ্ছে বই। প্লেটোর এ্যাকাডেমিতে ও ম্যাসিডোনে গ্রীকদের গ্রন্থাগার ছিল এবং রোমান সাম্রাজ্যের পথের মোড়ে মোড়ে গ্রন্থাগার ছিল। জুলিয়াস সীজারের গ্রন্থাগার ছিল বিশাল।

চীন দেশেও প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই লেখার পদ্ধতির নিদর্শন পাওয়া যায়। মহাকালের প্রবহমান ধারায় মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের বিচিত্র গতি পথে ১০৫ খ্রিস্টাব্দে চীনে কাগজের আবিষ্কার হয়। অষ্টম শতকে বাগদাদে কাগজের ব্যবহার শুরু হয়। বাদশাহ হারুন আল রশিদের আমলে বাগদাদে জ্ঞানচর্চার এত প্রসার ঘটে যে, তখন তাকে বলা হতো বিশ্বের জ্ঞানের রাজধানী। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কুতুবখানা ছিল বাগদাদে। দশম শতকের সিরাজের গ্রন্থাগার ছিল বিখ্যাত।

আজকের ইরাক, অতী তে যা জ্ঞানের নগরী ছিলো বারবার আ ক্রান্ত হয়েছে এবং ধ্বংস হয়েছে এ জ্ঞানভাণ্ডার। অতীতের মতো এই একুশ শতকের শুরুতেও সেই বাগদাদ আবার আক্রান্ত। যেখানে রয়েছে মানরসমা জের সবচেয়ে পুরনো সভ্যতা, সংস্কৃতি ও গ্রন্থাগারের নিদর্শন । অতীতের সেই গ্রন্থাগারগুলোও গড়ে উঠেছিলো তৎকালীন সমাজের সামাজিক চেতনা দ্বারা। ফলে দেখা যায় সমাজে ও রাষ্ট্রে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিটি হচ্ছেন গ্রন্থাগারিক। ব্যবিলনীয় সভ্যতায় তাই আসুরবনিপালের (খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতাব্দী) নামের সাথেই পাওয়া যায় গ্রন্থাগারিক আমিলানুর নাম। ‘বাদশাহ হারুন আল রশীদের (৭৮৬৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) নামের সাথে বায়তুল হিকমার গ্রন্থাগারিক সহল ইবন হারুন এর নাম।

আরও প্রবন্ধ সমকালীন ভাবনা

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ভূর্জপত্র, তালপাতা এবং গাছের ছালের উপর লিখবার বহু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। সম্রাট অশোকের জয়স্তম্ভে যে সব লিপি পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে খরোষ্ট্রি ও ব্রাহ্মী লিপির নিদর্শন পাওয়া যায়। এসব লিপির ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সংস্কৃত ও পালি। প্রাচীন ভারতবর্ষে বৌদ্ধ আশ্রম ও মঠকেন্দ্রিক গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেমন তক্ষ্যশিলা, নালন্দা, অমরাবতী, অদন্তপুরী, বিক্রমশীলা গ্রন্থাগার। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলেও জ্ঞান ও গ্রন্থাগারের চর্চা ছিল উল্লেখযোগ্য।

এরপর রেঁনেসা পরবর্তীকালে ইউরোপে কাগজের ব্যবহার শুরু হয়। নব জাগরণে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ফ্রান্সের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও ল্যুভর মিউজিয়াম গ্রন্থাগার অত্যন্ত মূল্যবান সংগ্রহে সমৃদ্ধ হয় ।

পঞ্চদশ শতকে কাগজ লেখন সামগ্রী হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। মুদ্রণ ব্যবস্থা কাগজের ব্যবহারকে অনিবার্য করে তুলেছিল। আধুনিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সচল হরফ। জার্মানীর গুটেনবার্গ পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই (Moveable Type) আবিষ্কার করেন। বাংলাদেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে বাংলা হরফ তৈরি করেন পঞ্চানন কর্মকার ও জন উইলকিনসন। ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহড এই ছাপা হরফ প্রথম ব্যবহার করেন, তার ‘এ গ্রামার অব বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ’ নামক বইতে। তারপর উনিশ শতক জুড়ে বাংলাদেশই ছিল সমগ্র উপমহাদেশের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগামী চর্চাকেন্দ্র। ছাপাখানার দৌলতে বইয়ের জগৎ ও গ্রন্থাগারের সমারোহ বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিপুল গতিতে এগিয়ে যায়। দেশে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ‘বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ’ এ সময়েই অর্থাৎ ১৯২৫ সালে লিখিলবঙ্গ গ্রন্থাগার পরিষদ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন আমি ভিআইপি?

কালের প্রবাহমান ধারায় সামাজিক প্রয়োজন ও বিকাশের পরিবর্তনের সাথে গ্রন্থাগারের আকৃতি, প্রকৃতি ও কার্যক্রমও পরিবর্তিত হয়েছে। সমাজ বিবর্তনের ধারায় গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য কার্ল মার্কসের ভাষায় বলতে হয়, “In modern society, the soldier no longer personally owned the instrument of war, and more relevnantly for our purposes, the scholar no longer owned the productive equipment of scholarships -a large library of books (Libraries and Mass Culture). সমাজ ও গ্রন্থাগার শব্দ দুটি একটি অপরটির পরিপূরক। সমাজই গ্রন্থাগারকে সৃষ্টি করেছে, আবার গ্রন্থাগারেই সমাজের চেহারা প্রতিফলত। সামাজিক উন্নয়ন নির্ভর করে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন স্বশিক্ষিত মানুষের উপর। এই মানুষ সেই সমাজেই সম্ভব যে সমাজে গ্রন্থাগার হচ্ছে সেই সমাজের শ্রেষ্ঠ সংগঠন, অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি নাগরিকই গ্রন্থাগারের সদস্য। যেমন বর্তমানের নরওয়েজিয়ানদের কথা বলা যায়, এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকার গ্রন্থাগারের সদস্য। এরা সপ্তাহে একদিন চার্চে না গেলেও প্রত্যেকে সে যে পেশাজীবীই হোক, গ্রন্থাগারে যাবেই। কারণ জীবন যাপনের সকল তথ্যই বিশ্বাসযোগ্যভাবে গ্রন্থাগারই সরবরাহ করে।

মানব সমাজ এখন পৃথিবীর মানচিত্রে গণতান্ত্রিক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে গ্রন্থাগারও তার পরিবর্তিত আকৃতি অবয়ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গ্রন্থাগারহীন রাষ্ট্রের প্রসঙ্গে এঙ্গেল্‌স্ বলেছেন যে ‘গ্রন্থাগারবিহীন রাষ্ট্র সে শুকিয়ে মরার মত’। হেগেল বলেছেন ‘গ্রন্থাগারের মাধ্যমে জনসমাজ যখন রাষ্ট্রীয় সমাজে রূপান্তরিত হয়, তখনই সে সাবালকত্ব অর্জন করে এবং বিশ্ব সমাজের অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য দিকে গ্রন্থাগার এখন শুধুমাত্র কাগজ নির্ভর বই ও সাময়িকীর সংগ্রহশালা মাত্র নয়। মানব মননের সর্বশেষ অগ্রগতি হচ্ছে কম্পিউটারযা কে এক কথায় মানব সভ্যতার দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগের সূচনাকারী বলা হয়।

আরও পড়ুন দুলাইয়ের জমিদার আজিম চৌধুরী

প্রথম শিল্প বিপ্লবে মানুষ তার কায়িক শ্রম ও গৃহপালিত পশুশ্রমের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয় খনিজ সম্পদ আবিষ্কারের দ্বারা। মানুষ তার আবিষ্কারের দ্বারা খনিজ সম্পদ কয়লা বা পেট্রোলিয়ামের অন্তনির্হিত শক্তিকে ব্যবহার করতে শিখেছিল প্রথম শিল্প বিপ্লবে অর্থাৎ তখন শুরু হয় বিজ্ঞানের যুগ। ফলে নানা ধরনের মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্রাদির আবিষ্কার ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত হয় এই যুগে। বিশ শতকের শেষে এসে মানব সভ্যতা এই দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কম্পিউটার ও উপগ্রহ নির্ভর কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্য নিয়ে মানুষ তার অনেক কাজ অনায়াসেই যন্ত্রকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারছে । এই নতুন প্রযুক্তি আমাদের কায়িক ও মানসিক উভয় প্রকার শ্রমেরই উৎপাদিকা শক্তি অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়, The tide of human fortune has changed swept breaking up old boundaries, opening up new changes. New ideas and new inventions both for good and for ill, have transformed mankind. A whole new world, intellectual and physical, moral and aesthetic, political, social and economic has changed. এই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানব সমাজ, মানব সমাজের মনন, তার গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার এক ব্যাপক পরিবর্তনের টেউয়ে এক নতুন অভিধায় অভিহিত হতে যাচ্ছে।

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

Facebook Comments Box

খ ম আবদুল আউয়াল (১৯৫১-২০২২ খ্রি.) একজন লেখক ও গবেষক। তিনি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সাবেক পরিচালক।১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত সাগরকান্দী ইউনিয়নের শ্যামসুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ; অস্ফুট বাক, উনিশ শতকের বাংলা সাময়িকপত্র সমীক্ষা, ষোড়শ শতকের কবি ও কাব্য, দৃশ্যমান ভাষা : ভাষাপত্র, সমালোচনা ও আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা, উচ্চশিক্ষার গতি প্রকৃতি-সুন্দরম।তিনি ২০২০ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন।

error: Content is protected !!