গ্রন্থাগার-আইন
খ ম আব্দুল আউয়াল,  প্রবন্ধ,  সাহিত্য

গ্রন্থাগার আইন

গ্রন্থাগার আইন

খ ম আব্দুল আউয়াল

 

মানব সমাজে ইউরোপীয় রেনেসাঁ পরবর্তীকালে বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (Nation State) প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। মানব বিবর্তনের পরিবর্তনের ধারায় রাষ্ট্রীয় সভ্যতায় এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে জনকল্যাণের জন্য নানাবিধ আইন ও নীতিমালা প্রণীত হতে থাকে। বর্তমান বিশ্বে যে সকল দেশ তথ্যের মহাসরণীতে অবস্থান করছে তাদের তো কথাই নেই, উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও গ্রন্থাগার আইন চালু হয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর সভ্যতার শুরুতে প্রথমে ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্র পাবলিক লাইব্রেরিকে সমাজের মৌলিক চাহিদা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। ১৫৩৭ সালে তারা লাইব্রেরি বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৮৪৫ সালে নিউইয়র্কে করারোপের মাধ্যমে পাবলিক লাইব্রেরি সার্ভিস গড়ে তোলে। ১৮৫০ সালে Library Legislation জারি করে ব্রিটিশ সরকার। উনিশ শতকের মধ্যভাগে এই গ্রন্থাগার আইন পাস হওয়ার ফলে ইংল্যাণ্ডে প্রচুর পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে ওঠে এবং এ সকল লাইব্রেরি কেন্দ্রীয়ভাবে উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা থাকায়, কথিত আছে মাস্তান ছেলেপুলেরাও রাস্তার তীব্র শীত ও বৈরি আবহাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথম প্রথম লাইব্রেরিতে যেতে থাকে। পরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাঠ্যাভাস গড়ে ওঠার ফলে তারা সব মানুষ হয়ে বের হতে থাকে। অর্থাৎ পাবলিক লাইব্রেরির কল্যাণে ইংল্যাণ্ডের সমাজ জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। সত্যিকার অর্থে ইংল্যাণ্ডের পাবলিক লাইব্রেরি জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখা দেয়।

আরও পড়ুন বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

তারই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ শাসিত ভারতে তথা বাংলাদেশে সেই উনিশ শতকের শেষে বেশ কয়েকটি পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরি বগুড়া, যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি সরকারি পর্যায়ে ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি পর্যায়ে একই সময়ে পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরিসহ জেলায় জেলায় লাইব্রেরি স্থাপিত হতে থাকে । ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে নিখিলবঙ্গ গ্রন্থাগার পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৩ সালে লিখিলবঙ্গ গ্রন্থাগার পরিষদের নাম পরিবর্তন করে বেঙ্গল লাইব্রেরি এসোসিয়েশন রাখা হয়। বর্তমানে তার নাম বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ। এলবার্ট হলে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে তিনশর অধিক প্রতিনিধি অংশ গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ সমগ্র বঙ্গদেশে পাবলিক লাইব্রেরির সংখ্যা ছিল তিনশর অধিক। ১৯৩২ সালেই বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে বেসরকারি প্রস্তাব হিসেবে গ্রন্থাগার আইনের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়। কিন্তু তৎকালীন বঙ্গীয় প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। যেমন তিনি পরবর্তীকালে পাকিস্তানের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলাকেও প্রত্যাখান করেছেন ।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার এক যুগ আগেই প্রখ্যাত গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী ডক্টর এস. আর. রঙ্গনাথন মডেল লাইব্রেরি লেজিসেলশান তৈরি করে দিয়েছিলেন যা ১৯৪৮ সালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয়। অপরপক্ষের ভারত ভাগের এক যুগ পরে পাকিস্তানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় লিয়াকত লাইব্রেরি নামে। বই সংগ্রহের একটি শাখা অফিস ঢাকায় নামমাত্র খোলা হয়েছিল। এই বঞ্চনার ধারাবাহিকতায় লাইব্রেরি লেজিলেশন করার তো আশাই করা যায় না।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের (Knowledge based society) কথা বলা হয়। সমাজ ও গ্রন্থাগার একে অপরের পরিপূরক। একটির অস্তিত্ব অন্যটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মানবসমাজের বিকাশ থেকেই তা লক্ষ্য করা যায় ।

আরও পড়ুন একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

গ্রন্থাগার হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সমাজের প্রতিটি শ্রেণী পেশার মানুষের আত্ম আকাঙ্ক্ষার প্রতিভূ। সমাজের শ্রেষ্ঠ সংগঠন হিসেবে গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে না পারলে জনসমাজের আধুনিকতম বিকাশকে রুদ্ধ করা হয়। একারণে পরিকাঠামো গঠনের জন্য ক্রমাগত পরিকল্পনা ও অর্থায়ন যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি পক্ষপাতমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য কমিউনিটি লাইব্রেরির কোন বিকল্প নেই। এজন্যই এক চীনা দার্শনিক বলেছিলেন, “যদি এক বছরের খাদ্য পেতে চাও শস্য বপন কর, যদি দশ বছরের ফল পেতে চাও বৃক্ষ রোপণ কর, যদি সারাজীবনের ফল পেতে চাও তাহলে গ্রন্থাগার গড়ে তোল।”
গ্রন্থবর্ষ, গ্রন্থাগারবর্ষ, গ্রন্থনীতি, গ্রন্থাগার নীতি ও গ্রন্থাগার আইন এগুলো নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে মৌলিক অধিকার হিসেবেই প্রাপ্য। ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস উদযাপনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক লক্ষ্য মাত্রা থাকে। একটি পাঠক সমাজ গড়ে তোলার জন্য বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করে লক্ষমাত্রা অর্জন করতে হয়। এজন্য লাইব্রেরি লেজিসলেশন ও লাইব্রেরি বিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেই একটি স্বাধীন জাতি ও সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হতে পারে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিই হলো স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৭২-এ সংবিধান তৈরি হয়। সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে আসে শিক্ষা। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুশীল ও সভ্য সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ডক্টর কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন যে রিপোর্টে সরকারকে দিয়েছিল, তাতে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে লাইব্রেরির বিষয়ে একটি পৃথক অধ্যায়ই লেখা হয়েছিলো। সেখানে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের কিছু সুস্পষ্ট নীতিমালাও দেয়া হয়েছিল, যা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু আজ অবধ্নি স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হলেও গ্রন্থাগার আইন প্রণীত হয়নি।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আত্মপরিচয় ও আত্মবিকাশের দর্পন হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থাগার। জাতীয় গ্রন্থাগার হচ্ছে একটি দেশের যাবতীয় মুদ্রিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান। সাধারণত একটি দেশের আইনের মাধ্যমে ঐ দেশে লিখিত ও প্রকাশিত এবং ঐ দেশ সম্পর্কিত বিদেশে লিখিত ও প্রকাশিত সকল বই পুস্তকও জাতীয় গ্রন্থাগারে সংগৃহীত হয়। ঐ সকল সংগ্রহের ন্যাশনাল বিবলিওগ্রাফী প্রণয়ন করা জাতীয় গ্রন্থাগারের আইনসিদ্ধ বা বিধিবদ্ধ কাজ। এককথায় জাতীয় গ্রন্থাগার জাতির আয়না স্বরূপ ।

জাতীয় গ্রন্থাগার আইনে মুখ্য যে বৈশিষ্টগুলো সেগুলো হচ্ছে:
ক. জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সংগঠন (Constitution of a National Library Authority)
খ. জাতীয় গ্রন্থাগার পদ্ধতি প্রবর্তন (Establishedment of System of National Central Libraries) অর্থাৎ এর মধ্যে থাকবে-

  • National Copy Right Library
  • National Dormitory Library
  • National Service Library.

গ. জাতীয় গ্রন্থাগার কমিটি সংগঠন (Constitution of National Library Committee
ঘ. জাতীয় গ্রন্থাগার তহবিল সংগঠন (Constitution of National Library Fund এবং
ঙ. জাতীয় গ্রন্থ, গ্রন্থাগার ও তথ্য নীতি প্রণয়ন।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন এনজিওদের গ্রন্থাগার বাদে বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের সংখ্যা সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি ৬৪টি এবং বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরিসহ ন্যূনতম ৫০০টি। বর্তমান সংখ্যা প্রায় ২,৫০০। কিন্তু এগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য দেশে কোনো গ্রন্থাগার আইনতো নেইই, এমন কি নীতিও নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পর দেশে জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভস নামে যে দপ্তর চালু করা হয়, তা মূলত পাকিস্তান প্রত্যাগত বাঙালিদের চাকরি পুনর্বাসন করে ঐ নামে একটি সরকারি দপ্তর খোলা হয়। অপর দিকে পূর্ব পাকিস্তান পাবলিক লাইব্রেরি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের যে অংশ ছিল তা সরিয়ে এনে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির মর্যাদা দিয়ে শাহবাগে স্থায়ী জায়গায় স্থাপন ও পুনর্গঠন করা হয়। অনেক পরে, তবে এটিও আসলে সরকারি অধিদপ্তরের স্থবিরতায় আবদ্ধ ।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করে, গ্রন্থাগার আইন না করে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন করেছিল। মূলত জাতীয় গ্রন্থনীতি গ্রন্থাগার আইনের অংশ বা এর আওতাভুক্ত বাস্তবায়ন পদ্ধতি। পরবর্তী আওয়ামীলীগ সরকার জাতিকে গ্রন্থাগার আইন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু তা প্রতিশ্রুতি মাত্র। গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্র ও জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গ্রন্থাগারকে আমাদের সমাজের শ্রেষ্ঠ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা না হলে গণতান্ত্রিক সরকারও সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পাবে না ।

পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন, বিকাশ সাধন এবং এর উন্নয়নের জন্য গ্রন্থাগার আইন অপরিহার্য। সমাজের সকলের কাছেই গ্রন্থাগার উন্মুক্ত হওয়া উচিত। সমগ্র দেশে সমানভাবে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার সুযোগ দেয়াই পাবলিক লাইব্রেরির মুখ্য উদ্দেশ্য। সর্ব সাধারণের জন্য সুপরিকিল্পত, সুসংগঠিত ও সুপরিচালিত গ্রন্থাগার ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা থেকেই ১৮৫০ সালে ইংল্যান্ডে পাবলিক লাইব্রেরিজ অ্যাক্ট জারি করা হয়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে জাতিসংঘ ও ইউনেস্কো Living force for popular education এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সমঝোতা ও শান্তির জন্য দেশে দেশে পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপনের সুপারিশ করে। সুতরাং সার্বজনীন শিক্ষা এবং সমাজ মানসের উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাবলিক লাইব্রেরি হচ্ছে জনগণের বিশ্ববিদ্যলয় এবং এটি তাদের অধিকার। এই অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য আইন অপরিহার্য।

আরও পড়ুন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

১৯৫৩ সালে ইউনেস্কো পাবলিক লাইব্রেরি বিষয়ে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল; এতে ছিল “Only Legislation can empower the appropriate authorities to provide and ensure adequate financial support and efficient administration”. ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষে ইউনেস্কো পাবলিক লাইব্রেরি প্রসঙ্গে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রস্তাবটি ছিল্ল The public library should be establischd under the clear mendate of law. So framed as to ensure nation-wide provision for public library service. সমগ্র দেশের পাবলিক লাইব্রেরি ব্যবস্থাকে সুসংহত করা, গ্রন্থ ও অন্যান্য পাঠোপকরণ সংগ্রহে আর্থিক অনুদান দেয়ার ব্যবস্থা করা, পাঠোপকরণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, জাতীয় গ্রন্থনীতি এবং এতদসংক্রান্ত পরিকল্পনা ও উন্নয়নের নীতিমালা সংবলিত পাবলিক লাইব্রেরিজ অ্যাক্ট জাতীয় সংসদের আইন প্রণেতাদের দ্বারা আইন হিসেবে জারি করার নির্দেশনা দেয়া হয় ঐ প্রস্তাবে। এজন্য নির্ধারিত থাকবে Appropriate authority বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, Principal officer বা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত কর্মকর্তা, পর্যাপ্ত আয়ের উৎস ও আর্থিক বরাদ্দ এবং দক্ষ পেশাজীবী ও দক্ষ প্রশাসন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারকে তিনটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে :

১. পাবলিক লাইব্রেরি অধ্যাদেশ এবং ন্যাশনাল লাইব্রেরি অধ্যাদেশ লাইব্রেরি লেজিসলশেনের আওতায় হলেও পৃথক আইন/ পৃথক অধ্যাদেশ হতে পারে। কারণ উল্লেখিত দুই শ্রেণীর লাইব্রেরির দু’টি ভিন্নধর্মী উদ্দেশ্য ও পৃথক কর্মপন্থা রয়েছে। পাবলিক লাইব্রেরির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি জাতীয় গ্রন্থাগারের মত নয়। জাতীয় গ্রন্থাগার হচ্ছে একটি দেশের যাবতীয় মুদ্রিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান। সাধারণত একটি দেশে ন্যাশনাল লাইব্রেরি এক্টে বা আইনের বিশেষ ধারার সেই দেশে মুদ্রিত প্রতিটি গ্রন্থের কপি, সেই দেশের জাতীয় গ্রন্থাগারে বিনামূল্যে সংগ্রহ করা হয় এবং বিদেশে ঐ দেশ সম্পর্কে প্রকাশিত বই পুস্তকও ঐ দেশের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংগৃহতি হয়।

আরও প্রবন্ধ সমকালীন ভাবনা

ন্যাশনাল বিবলিওগ্রাফি প্রণয়ন করা জাতীয় গ্রন্থাগারের আইনসিদ্ধ কাজ যা অন্য কোনো গ্রন্থাগার বা মন্ত্রণালয় করতে পারেন। জাতীয় গ্রন্থাগার জাতির মননের সকল মাধ্যমের প্রকাশকে সংরক্ষণ করে থাকে। আমাদের দেশে জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভস আছে; ন্যাশনাল হেলথ লাইব্রেরি আছে, বিজ্ঞানের জন্য ব্যান্সডক আছে; কৃষির জন্যও জাতীয় গ্রন্থাগার ও ডকুমেন্টেশন কেন্দ্র আছে; কিন্তু আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল লাইব্রেরি হিসেবে নয়, এগুলো সরকারের দপ্তর বা অধিদপ্তর অথবা দপ্তরের অধীনে গ্রন্থাগার মাত্র। সুতরাং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং কর্মপদ্ধতির ভিন্নতার জন্যই ন্যাশনাল লাইব্রেরি ও পাবলিক লাইব্রেরি নামে দু’টি পৃথক অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।

২. পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাক্টের আওতায় দেশে প্রতিটি জনপদে পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে উঠার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ইতোমধ্যে এনজিওগুলোর উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে বেশকিছু গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে। সেগুলোকে বিকশিত হতে দিতে হবে। যেমন গণউন্নয়ন গ্রন্থাগার গণমানুষের চেতনা বিকাশে এবং তথ্যের অধিকার মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার লক্ষ্যে দেশে বেশ কিছু গ্রামীণ গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছে। এ ধরণের উদ্যোগকে এবং বিশেষ করে বেসরকারি উদ্যোগকে সরকারি সহায়তায় এবং জনগণের অংশগ্রহণে সার্থক করে তুলতে হবে। আইন যেন এক্ষেত্রে অন্তরায় না হয়ে সহযোগী হয়ে উঠে । এজন্য পাবলিক লাইব্রেরিজ অ্যাক্টে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সকল স্তরের জনসাধারণের প্রতিনিধি নিয়ে লাইব্রেরি কমিশন গঠন করতে হবে। এক্ষেত্রে কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লাইব্রেরি লেজিসলেশন প্রণীত হতে হবে।

আরও পড়ুন আমি ভিআইপি?

৩. একাডেমিক লাইব্রেরি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের আলোকে ন্যূনতম মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জাতীয় পর্যায়ে প্রণীত ও অনুসৃত হওয়া আবশ্যক। আমাদের দেশের মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি বেসরকারি সাধারণ স্কুল ও কলেজে নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো জাতীয় ঐক্য নেই। ফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনাতেও নেই কোনো নীতিমালা । জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের উপযোগী উচ্চ শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের। বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষিত ধীশক্তি সম্পন্ন সুদক্ষ জনশক্তি শুধু তৈরি করে না, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের জ্ঞানের লালন, বিকাশ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার কেন্দ্রও। এহেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে তার সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারের কর্মদক্ষতার উপর। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পূর্ণতই গ্রন্থাগার নির্ভর

British University Grants Committee এর ১৯২১ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল “The character and efficiency of university may be gauged by its treatment of its central organ-the library” পুনরায় ১৯৭৬ সালের রিপোর্টে British UGC af The Library is the core of the university. As a resource it occupies the central and primary place, because it serves all the functions of a university-teaching and research, the creation of new knowledge and transmision to posterity of the learning and culture of the present and the past.

ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রফেসর ডি এইচ কোঠারি ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের মান নির্ধারণ ও তার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে যে সকল নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তা অনুসরণ করে ভারতবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ তথ্যের মহাসরণীতে অবস্থান করছে। ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের আছে শক্তিশালী Information and Library Netweork (INFLIBNET) বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রন্থাগার গড়ে তোলার ও ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো নীতিমালা নেই। এক ভয়ঙ্কর অব্যবস্থার কবলে পড়ে আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ। এক্ষেত্রেও জাতীয় পর্যায়ে একক গ্রন্থাগার নীতিমালা প্রণীত হওয়া আবশ্যক

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

গ্রন্থাগার আইন

Facebook Comments Box

খ ম আবদুল আউয়াল (১৯৫১-২০২২ খ্রি.) একজন লেখক ও গবেষক। তিনি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সাবেক পরিচালক।১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত সাগরকান্দী ইউনিয়নের শ্যামসুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ; অস্ফুট বাক, উনিশ শতকের বাংলা সাময়িকপত্র সমীক্ষা, ষোড়শ শতকের কবি ও কাব্য, দৃশ্যমান ভাষা : ভাষাপত্র, সমালোচনা ও আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা, উচ্চশিক্ষার গতি প্রকৃতি-সুন্দরম।তিনি ২০২০ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন।

error: Content is protected !!