গয়নার-নৌকা
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

গয়নার নৌকা

গয়নার নৌকা

শফিক নহোর

অপ্রত্যাশিতভাবে মুন্নির সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর থেকে মুন্নি আমাকে খুন করার জন্য লোক ভাড়া করে। আমি ফেরারি আসামির মত পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। ঘরের ছোটো ছিদ্র দিয়ে আলো আসলেও ভয় করত কেউ বুঝি আমাকে দেখে ফেলল। একদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে, এই ভয়কে উপেক্ষা করে মুন্নি আত্মহত্যা করেছে শুনে দৌড়ে গেলাম।

আমি তখন নানা বাড়ি থেকে লেখাপড়া করি। মুন্নি আমাকে ভয় দেখাত, আমাকে বিয়ে না করলে বড়ো মামার কাছে বিচার দেব। আমার সামনে এসে এ কথা কখনও বলেনি। তবে সালমা আমাকে বলত, কীরে মুন্নিকে নাকি তুই বিয়ে করবি, আমার কাছে বল না সত্যি কথা। সালমার আবদার ছিল ভিন্ন রকম। আমি সালমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এই তাকিয়ে থাকাটা অন্যায় কিছু না, সুন্দর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় অনন্ত একশ বছর। ছুটির দিনে চরদুলাই বটগাছের নিচে বসে আছি। আমি গয়নার নৌকায় পাড় হব। বাড়ি থেকে খবর এসেছে মায়ের শরীর ভালো না। বড়ো মামা আমাকে প্রায়ই বলত,
— সেলিম তোকে কিন্তু ডাক্তার হতে হবে।
আমি মামার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম; তালা ঝুলানো আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হতো না। মামার কথা শুনে আমার চেহারা ম্লান হয়ে যেত; আমি বাণিজ্য-বিভাগ নিয়ে লেখাপড়া করছি। আমার দিন কাটে ডেবিট-ক্রেডিট চূড়ান্ত হিসাব নিয়ে। ডাক্তার হব কীভাবে? কি সব ভাবনা ভাবে মামা, আল্লাই ভালো জানেন। সেদিন বাড়ি পালাতক শিশুর মতো মামার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালাম।

আরও পড়ুন গল্প পুরাতন বটবৃক্ষ

আমি যে টিনের ঘরে পড়তাম, সেই ঘরের জানাল ছিল না। নতুন ঘর টিন কেটে রেখেছে, জানালা লাগানোর জন্য সেই ফাঁকা জায়গায় শীতের দিনে পাটের বস্তা দিয়ে রেখে দিতাম। যাতে বাহির থেকে কুয়াশা ও ঠাণ্ডা বাতাস না আসে। একদিন সেই খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে মুন্নি আমার মুখ আটকিয়ে ধরল, উষ্ণ আলিঙ্গনে সে আমার বুকের ভেতরে ঢুকে গেল নবজাতক শিশুর মতো। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো প্রকার শব্দ বের করতে পারছি না। আমার হাতে হালকা একটা কামড় দিয়ে চলে গেল। অথচ কিছুই বলল না। আমি ফিসফিস করে জানতে চাইলাম,
— এখানে কেন এসেছিস?
মুন্নি কোনো কথা না বলে জানালার ফাঁকা দিয়ে বের হয়ে চলে গেল। আমার শরীর কাঁপছে, কেউ যদি দেখে ফেলে। পরের দিন সন্ধ্যায় বই নিতে এসেছে সালমা, এসে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
সালমা আমাকে বলল,
— তোর ব্যাকরণ বইখান দে। কাল সকালে দিয়ে দেব।
— আমার বই নাই, আমি মুন্নির বই নিয়ে পড়ি।
সালমা কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।

শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার কষ্ট সবাই অনুভব করতে পারে না । দেখা আর তাকানোর ভেতর যোজন যোজন দূরত্ব থেকে যায়। আমরা দেখি অথচ তাকাই না অন্তর দিয়ে। কারো দিকে তাকিয়ে থাকলেই অলিক মোহমায়ায় বাধা পড়ে যায় মানুষ। আঠার চেয়ে মায়ার বাধন হল শক্ত বাধন। কেউ মায়ায় আটকিয়ে গেলে দূরে চলে যেতে পারে না।

ছোটো মামা বিলে কারেন্ট জাল পেতেছে। কৈ, পুঁটি মাছ পেয়ে কলপাড়ে মাছের বালতি থেকে পানি ঢেলে আবার নতুন পানি দিচ্ছে। আমি একটু এগিয়ে যেতেই সালমা আগ কেটে গিয়ে মুন্নিকে বলল,
— ভালোই তো চলছ, আমি সব জানি।
— জানিস ভালো কথা। সব জানিস তা আমাকে বলছিস কেন? তোর নাঙকে গিয়ে বল।
— খুব জ্বলছে, তাই না? বই কিনে নিতে পারিস না?
— পারি কিনব না, তোর কোনো সমস্যা? তুই আমার পেছনে লেগে কিছুই করতে পারবি না।
সেলিম তোকে কোনোদিনও বিয়ে করবে না।
নদীর মাছ সাগরে পড়লে যা হয়।
— এত ভাব দেখাচ্ছিস কেন রে মাগি?
— তোর চেয়ে কি আমার চেহারা কম সুন্দর?
মুন্নির ও সালমার ধারালো ছুড়ির সেই কথাবান আমার কানের সদর দরজায় ঠকঠক কড়া নাড়তে শুরু করল। মনোযোগ না দিয়ে বাহিরে যাওয়ার জন্য রেড়ি হচ্ছি তখন রাজীব এসে বলল,
— ক্রিকেট খেলা শুরু হয়ে গেছে। তুই এখনও বসে আছিস। দ্রুত রেডি হয়ে নে।
মাঠ থেকে রাজীব আমাকে ডাকতে এসেছে। রাজীব অভিযোগ করে বলল,
— মাস্টারের ছেলে খেলতে দেবে না। ওরা না কি মাঠের পাশের জমিতে গম বুনছে, খেতের আইলে বল গেলে যে আনতে যাবে তার নাকি ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে।
— বলা সহজ, করা কঠিন। চামড়ার মুখে মানুষ কত কথা বলে। আজকাল কথা বলতে পারলেই মানুষ নিজেকে বীর বাহাদুর ভাবে। আসলে সমাজে যাদের কাছে এখন টাকা নেই তাদের কোনো দাম নেই। চেয়ারম্যানের ছাওয়াল দলের অধিনায়ক। চল দেখি, কার ঠ্যাঙ কে ভাঙে। সময় হলে সব বিড়াল হয়ে ফিরে যাবে।

আরও পড়ুন গল্প একটি মিষ্টি স্বপ্ন

মাগরিবের আজান হচ্ছে, খেলা শেষ। বাড়ি এসে কলপাড়ে হাতমুখ ধুচ্ছি তখন মুন্নি জগ ভরতে এসেছে, আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। কোনো কথা বলছে না। আমার শরীর ঘেঁসে টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল ধরল, আমি বুঝতে পারছি না কি বলব। আঁধার গাঢ় হতে লাগল। জগ থেকে পানি নিয়ে হালকা ছিটিয়ে দ্রুত চলে গেল। বুকের ভেতর হাহাকার অনুভব করলাম।

নয় ছয় ভাবনা ভবতেই সালমা চলে আসলো। ওর মুখের দিকে তাকাতেই জগতের মেঘ ওর মুখ জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মলিন চেহারা, ঠোঁটে হাসি নেই, সাপের মত ফুলেফেপে থাকত সে স্বভাব এখন নেই। শান্ত অবুঝ বালিকার মত আমাকে বলল,
— এখন খুব খুশি হয়েছিস, তাই না? আমি জানতাম তুই কিছুই বলবি না। তোর সাহস আছে, আমাকে আজ রাতে পালিয়ে নিয়ে যেতে? আমাকে বিয়ে কর, তোকে ছাড়া আমি কাউকে আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে ভাবতে পারব না।
বজ্রগতিতে বলে দ্রুত প্রস্থান করল। সালমার কথা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে। আমি মাটির দিকে চেয়ে রইলাম, কে যেন আমার পা ধরে মাটির নিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সালমার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল; এই মুহুর্তে ঠিক কি বলব বুঝতে পারছি না। কাঁপা কণ্ঠে জিগ্যেস করলাম।
— তোর কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?
— সেটা জেনে তোর কি? তুই তো একটা কাপুরুষ!
মৃদু পায়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। বড়ো মামি বলল,
— জানিস, আগামীকাল সালমার বিয়ে!
— আচ্ছা মামি, মেয়েদের কি অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে হয়?
— ধুর পাগল, মেয়ে মানুষ কী ঘরে তুলে রাখার জিনিস? ভালো ছেলেপক্ষ পেলেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে হয়। তুই এ সব বুঝবি না।

আরও পড়ুন গল্প আড়ালের চোখ

বুঝি না বলেই তো আমার মুখের সামনে সালমা কাপুরুষ বলতে পারে। মুন্নির স্মৃতি আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে, আমাকে অস্থির করে তোলে। কি এমন ভুল ছিল আমার। এত তাড়াতাড়ি তার নিজস্ব একটা কালো অন্ধকার ভুবন হবে। তাকে আর কখনও দেখব না। কথা বলতে পারব না। এই অপরাধবোধ আমাকে পাগল করে দেয়। ভেতরের কষ্টটা আমি কাউকে বলতে পারি না। মুন্নি চলে যাবার পর থেকে ছোটো মামি আমার সঙ্গে কথা বলে না। অথচ প্রতিদিন রাতে সে আমার জন্য খাবার টেবিলে রেখে যায়। আমি অশ্রুজলে সিক্ত হই। এই বেদনার করুন সুর আমার বুকের ভেতর মুন্নি বলে যে চিৎকার করে ওঠে। তা তো আমি কাউকে দেখাতে পারি না, বলতে পারি না।

স্বেচ্ছায় অগ্নিদহনে নিজেকে জ্বালিয়ে অন্তর আত্মশুদ্ধি করা গেলেও বেদনার ক্ষত নিজেরই রয়ে বেড়াতে হয় অনন্তকাল।

মুন্নির স্মৃতির সঙ্গে অন্য কারো স্মৃতি আমার জীবনে যুক্ত হোক আমি তা চাই না। মুন্নি সুন্দর রুমাল সেলাই করত, আমাকে বলেছিল একদিন, তোর নামের প্রথম অক্ষর আর আমার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে রুমাল তৈরি করব, শেষ হলে তোকে দেব। আজ অকস্মাৎ পুরনো আলমারি খুঁজতে গিয়ে সেই রুমাল পেলাম। একটি রুমাল এত ওজন হতে পারে! আমি হাতে নিয়ে বেশিক্ষণ রাখতে পারিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
আজ সালমার বিয়ে। গয়নার নৌকা ঘাটে চলে এসেছ। পাশের বাড়ির কে যেন সংবাদ দিয়ে গেল।
মামি আমাকে ডাকছে,
— জামাই নামাতে হবে। তোর বড়ো মামা এই অসময়ে বাজারে গেল কেন? দেখত।
আমি রুম থেকে বের হব এমন সময় দেখি মুন্নি দাঁড়িয়ে আছে। আমি চিৎকার করে মামিকে ডাক দিলাম। মামি দেখে যাও মুন্নি বাড়ি ফিরে এসেছে।
তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই, হেমায়েতপুর থেকে সাতাশ বছর পর ফিরে এসে দেখি, পরিচিত মুখগুলো নেই। নেই সেই গয়নার নৌকা, আমার মানসিক সমস্যা হয়েছিল। আগের সেই স্মৃতি মনে করতে পারি না। শুধু কিছুক্ষণ পর পর ভেতরে থেকে একটি নাম উচ্চারিত হয় মুন্নি! মানুষ আমাকে এখন পাগল বলে ডাকে।

আরও পড়ুন শফিক নহোরের গল্প-
নীলভোর
কাঠগোলাপ ও প্রেম
পরাভূত
তিল তাল

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

গয়নার নৌকা

Facebook Comments Box

শফিক নহোর মূলত একজন গল্পকার। এছাড়া তিনি প্রতিনিয়ত অণুগল্প, ছোট গল্প ও কবিতা লিখে চলছেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: মায়াকুসুম, বিষফুল; কাব্যগ্রন্থ: মিনুফুল তিনি ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নওয়াগ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!