ও-রিহানা-১ম-পর্ব
গল্প,  সাহিত্য,  সৈকত আরেফিন

ও রিহানা (১ম পর্ব)

ও রিহানা (১ম পর্ব)

সৈকত আরেফিন

 

একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে দিন। কিছুতে এই ঘোর কাটছে না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠছি, খাচ্ছি, বাইরে যাচ্ছি, ফিরে আবার ঘুমাচ্ছি। কিন্তু কিছুই যেন করছি না। রিহানা আমাকে যাদুঘোর বিহ্বলতায় বিপন্ন করেছে। সকালে ফোন দিয়েছিলাম রিহানাকে। ধরেনি। ও এখন আমার ফোন ধরে না। সিগারেটের দোকানে গিয়ে তিন প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস নিলাম। সিগারেটের আগুনে কি যন্ত্রণা পোড়ে? আমার তো এমন হবার কথা নয়! ছেলে, মেয়ে বউ নিয়ে সুখে সংসার করার কথা আমার। ব্যতিক্রম কিছু আমার ভাল লাগে না। অথচ বারবার এই গাড্ডাতেই আমি পড়েছি।

স্কুলে থাকতে কখনো ফার্স্ট হতে হবে—এমন কি সেকেণ্ড হবার কথাও কখনো ভাবিনি। আমি স্কুলে গিয়েছি, ব্যস! যেটুকু পড়েছি, আমার মত করে। পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট কী হলো সেটা কখনো দেখতেও যাইনি। হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে আমি ক্লাসেও মনোযোগ হারিয়ে ফেললাম। স্যারদের কথা তেমন ভাল লাগে না। মনে হয়, স্যারেরা অন্যদের জন্য বলছে, আমার জন্য না।

সেই সময় আমার উদাসকালে ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠতে আগের বছর যে ছেলেটি ফার্স্ট হয়েছিল, সেবার কোনো কারণে সে হয়তো পরীক্ষা ভাল দিতে পারে নি; আর যে ছেলেটি সেকেণ্ড হত সে-ও আরও খারাপ করে থার্ড হয়ে গেছে। আমি কী হয়েছিলাম, খোঁজ নিই নি।

আরও পড়ুন গল্প একজন অনন্যা

এরমধ্যে পয়লা বৈশাখের ছুটি। সেলন্দার জয়দেব পড়ত আমাদের সাথে। জয়দেবের বড়দি কুসুমকে আমিও দিদি ডাকতাম। নববর্ষের প্রথম দিনে জয়দেবদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কুসুমদি আমাদের দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে মিষ্টি, মুড়ি-মোয়া খেতে দিয়েছিল। সেদিন ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছিল। জয়দেব আমাকে সেলন্দা বাজার পর্যন্ত দিয়ে গেল। বাবু ভাইয়ের চা দোকানে দুজন মিলে দু-কাপ লাল চা খেয়ে যখন বিদায় নিচ্ছি তখন চারদিকে বেশ অন্ধকার নেমেছে। অন্ধকারের মধ্যে রাস্তায় একটা রিকশাও নেই। পয়লা বৈশাখ বলে অবশ্য রাস্তায় তখনও হাঁটা মানুষ আছে।

ডেমরা স্কুলের কাছে এসে যখন পাথাইল হাটের রাস্তাটা ধরেছি, বড় মসজিদটার কাছে কয়েকজন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। খুব মারল আমাকে। কিন্তু, ঘুষি, চড় থাপ্পর যে যা পারল। আমি একটুও কাঁদলাম না। চিৎকার করলাম না। শুধু ওদের জিজ্ঞেস করলাম, কী করেছি আমি? তখন তাদের মধ্যে একটি ছেলে রাগে-দুঃখে-অপমানে আমার গালে দুটো থাপ্পড় দিয়ে বলল, শালা তুই ফার্স্ট হলি কেনো? সেই কবে আমি ফার্স্ট হয়েছি! আমি তো এ নিয়ে কোন আনন্দ করিনি! কাউকে ঘাড় ফুলিয়ে বলিনি দ্যাখ আমি ফার্স্টবয়। একদিনও বলি নি, একবারও নয়। তবুও এতদিন পরে আমাকে ফার্স্ট হবার জন্য মার খেতে হল!

সেই ছেলেটি রবিউল ইসলাম। প্রাইমারি স্কুলেও ও-ই ফার্স্ট হত। এবার সে সেকেণ্ড হয়ে গেছে। তখন অপমানাহত রবিউলের কথা শুনে আমার খুব মায়া হয়েছিল। বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলনি। অনেক রাত হবার জন্য মা বকেছিল। জয়দেবদের বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি বলে সেদিন আর কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুম আসছিল না। আমি রবিউলের বেদনা বুঝতে চাইছিলাম। যারা একবার ফার্স্ট হয়, তারা বারবার ফার্স্ট হতে চায়।

আরও পড়ুন গল্প লালু

সেজন্যে আমার উপর রবিউলের রাগ হয়েছিল। আমি আর কখনো ফার্স্ট হতে চাই নি। এরপর পরীক্ষার খাতায় জানা প্রশ্নগুলোও আমি এড়িয়ে যেতাম। অঙ্কের খাতায় এঁকে দিয়ে আসতাম নদীতে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। এমনভাবে লিখতাম যেন কেউ ভুল করেও আমাকে কখনো ফার্স্ট করতে না পারে। এমন গাড্ডায় আমি বার বার পড়েছি। এখন রিহানা আমাকে আবারও গাড্ডায় ফেলেছে। এক রাতেই তিন প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস ফুরিয়ে গেল। বেদনা ফুরোল না।

রিহানার সঙ্গে আমার পরিচয় ফোনে, মুঠোফোনে। ওর নম্বরটা দিয়েছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটভাই লিঙ্কন। পড়াশুনা শেষ করে যখন চট্টগ্রাম ছাড়ছি, তখন লিঙ্কন নম্বরটা দিয়ে বলেছিল—এই নম্বরটা রাখেন, আমার খালাত বোন। দুলাভাই বড় ব্যবসায়ী। ঢাকায় গেলে যাইয়েন আমার বোনের কাছে। সেই থেকে নম্বরটা ছিল আমার কাছে। ছিল মাত্রই। চট্টগ্রাম থেকে এসে অনেকদিন ঢাকায় ছিলাম। তখন এখানে ওখানে চাকরির খোঁজে ছুটছি। তবু লিঙ্কনের বড়লোক দুলাভাইয়ের অনুকম্পা পাবার জন্য কখনো খালাত বোনের নম্বরে ফোন দিইনি। দেবার প্রয়োজন পড়েনি। এরমধ্যে ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পেয়ে গেলাম। পোস্টিং হল গ-গ্রামে।

যমুনা নদীর ভাঙনপ্রবণ কাজিপুরে কাটিয়ে দিলাম চারটি বছর। দেখতে দেখতে সময় পার হয়ে গেল। বিয়ে করিনি তখনও। অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা বলতাম। একজনের সঙ্গেও কখনো দেখা হয়নি এমনসব মেয়েদের সঙ্গে। নান্নু বলে একটা ছেলে ছিল সরকারি কলেজটার পাশেই। ফোনের দোকান চালাত সে। নান্নুর ফোন দোকানে মাস শেষে হাজার হাজার টাকা শোধ করতে হত। অচেনা মেয়েদের সঙ্গে রাত জেগে কথা বলার মধ্যে কী আনন্দ তখন ছিল! কিন্তু তখনও রিহানার কথা একবারও মনে পড়েনি। রিহানার নম্বরটা আমার হ্যান্ডসেটের ফোনবুকে খুব নীরবে গোপন হয়ে ছিল।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

এরমধ্যে মা তাগাদা দিচ্ছিল বিয়ে করে ফেলতে। বেকার তো আর নই! ছোট ভাইটাও বিয়ে করার জন্য বলছে। না হলে ওর বিয়ে পিছিয়ে যাবে। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হল। চাটমোহরে একটা মেয়েকে দেখতে গিয়ে মায়ের খুব মেয়ে পছন্দ হয়ে গেল। মেয়ে শিক্ষিত, মা-বাবা বড়লোক। মায়েদের পছন্দ হতে আর কী লাগো আমি দ্বিধা-বিহ্বলভাবে সম্মতি জানালাম। ওইদিনই শীলা আমার বউ হল। আমার বউ! এক ধরনের আনন্দ, ভয় আর শিহরণের মধ্যে রাত এল। বাসরঘরে আদর করতে যেয়ে শীলা আমার ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দিল। আমি চারদিন বাদে ঠোঁটে কামড়ের দাগ নিয়ে কাজিপুরে হাজির হলাম। যে আমি ফিরলাম, সে আমি আলাদা। তখন অন্য মেয়েরা আমার ফোন তালিকা থেকে হারিয়ে গেল।

রাতভর কথা বলতাম শীলার সাথে। টান বাড়ছিল। প্রায়ই ছুটি নিয়ে শীলার কাছে ছুটে যেতাম। কিন্তু শীলা আমার থাকেনি। শীলার কোন দোষ নেই। আমারও না। ভাগ্যের দোষ হয়তো। সম্পর্কের মধ্যে যখন টাকা একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় তখন ভালোবাসা হারিয়ে যায়। শীলার বড়লোক বাবা-ভাইয়েরা আমার মত দুপয়সার সরকারি চাকুরের সাথে মেয়ে-বোন বিয়ে দিয়ে হয়তো ভুল করেছিল। ভুল শোধরাতে ওরা আমার কাছ থেকে শীলাকে ছাড়িয়ে নেয়। ও প্রেগনেন্ট ছিল। আমাকে বলেছিল—আমি কিন্তু মেয়ে চাই। ওকে বলেছিলাম, তোমার চাওয়াই আমার চাওয়া।

ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর জেনেছি, পাবনা শহরের একটা ক্লিনিকে অ্যাবরশনের দিন শীলা কোনমতে বেঁচে গেছে। বেঁচে থাক শীলা। ভাল থাক। যেখানেই থাকুক। এর কিছুদিনের মধ্যে শীলার বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে শীলার বিয়ে হয়ে যায়।

আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা

সামাজিক কারণে আমাকেও আর একটা বিয়ে করতে হল। শারমিনের সঙ্গে বিয়ের দিন মনে হয়েছিল–বংশদোষ এড়ানো এত সহজ নয়! আমার বাবা বাদে দাদা, কাকারা প্রায় সবাই একাধিক করেছিল। তীব্র অনিচ্ছাও আমার দ্বিতীয় বিয়ে আটকানো যায়নি। শারমিনের সঙ্গে আমার কোন সমস্যা নেই। নির্দ্বিধায় ওকেও আমি বলতে পারি—ভালবাসি। শারমিনের গর্ভে জন্ম নিয়েছে আমার দুটো বাচ্চা। বাচ্চারা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। আমি বুঝেছি, পিতৃত্ব কেমন! বুকের ভেতর হাহাকার করা তুমূল অনুভুতি নিয়ে আমার বাচ্চাদের দিকে আমি তাকাই। আমার ভাল লাগে। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল!

কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম। আমি জানতাম শারমিন বাসায় নেই। বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে গেছে। ঘুরতে। আমারও যাবার কথা ছিল। প্রিন্সিপাল ফোন করায় আমি কলেজে আটকে পড়েছিলাম। ফিরে স্নান করে খেয়ে শুয়ে এটা ওটা ভাবছিলাম। হাতে কোন কাজ ছিল না। বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে কী একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সেই বিকেলটায়। হ্যান্ডসেটটা হাতে নিয়ে মনে হল কাউকে ফোন দেওয়া যায়। তখন এতদিন আমার ফোনবুকে নীরবে গোপন হয়ে থাকা রিহানা আমার কল রিসিভ করে বলল- ‘হ্যাঁ বলুন।’

আরও পড়ুন ও রিহানা-
শেষ পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

ও রিহানা (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

সৈকত আরেফিন একজন গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: পাতা ও পতত্রি, মৃদু ব্যথা হতে পারে; প্রবন্ধগ্রন্থ: সমাপ্তি-শাস্তি-অতিথি, সাহিত্য পাঠ ও পর্যেষণ।তিনি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহাম্মদপুর ইউনিয়নের আহম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!