ও-রিহানা-শেষ-পর্ব
গল্প,  সাহিত্য,  সৈকত আরেফিন

ও রিহানা (শেষ পর্ব)

ও রিহানা (শেষ পর্ব)

সৈকত আরেফিন

 

রিহানার সঙ্গে আমার নতুন জীবন শুরু হল। এরকম হবার কথা ছিল না। ব্যতিক্রম আমি পছন্দ করি না। অথচ বার বার আমাকে এই গাড্ডায় পড়তে হয়। আমার মাথার মধ্যে রিহানার জন্য একটা জায়গা ফাঁকা হয়ে গেল। বুকের মধ্যেও। শারমিন বুঝতে পারছিল আমার কিছু একটা হয়েছে। বাচ্চারাও। মেয়েটা সেদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বাবা তোমার কি অসুখ করেছে? আমার আসলে অসুখ করেছে। রিহানা-অসুখ।

রিহানাকে আমি রি বলে ডাকি। ও আমাকে এবি বলে। বলে, এবি তুমি জানো না, কী জীবন আমি যাপন করি! রিহানা দিনে দিনে অনেক কথাই বলেছে আমাকে। খুব ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তার। ভালোবাসার বিয়ে। যখন সে একটু বড় হলো, পূর্ণতা পেল তার নারীত্ব, ভাল করে বুঝতে শিখল চারপাশ, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ততদিনে তার স্বামী আব্দুর রশীদ অনেক দূরে সরে গেছে। চিৎকার চেঁচামেচি এ নিয়ে কম হত না। স্বামীকে তার দিকে ফেরাতে চেয়েছিল সে। পারেনি। ততদিনে বিছানা আলাদা হয়ে গেছে। রিহানা জেনে গেছে স্বামীর অন্য মেয়ে সঙ্গর সব কথা। আব্দুর রশীদ অবশ্য তার মেয়ে সঙ্গ নিয়ে কোন রাগঢাক রাখেনি।

আরও পড়ুন দীপ্তিদের দেবতা

স্বামী-স্ত্রীর এই ফোঁকরটা দূর থেকে দেখছিল আরেকজন। নিয়ামুল বাশার। বয়সে রিহানার অনেক বড়। শুধু বয়সে নয় চাতুরিতেও অনেক বড় ছিল সে। নিয়ামুল বাশার ছায়ার মত লেগে ছিল রিহানার সাথে। রিহানাও তার মধ্যে একটা আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। ধর্মবুদ্ধি দিয়ে বাশার রিহানাকে বশ করে একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল তাকে। একসময় রাত জেগে নামাজ পড়াও অভ্যাস করে ফেলেছিল রিহানা। তখন নিয়ামূল বাশার রাতের বেলা রিহানার ঘরে আসতে শুরু করল। বিভ্রান্ত রিহানাকে সে এটাও বুঝাতে পেরেছিল, সে-ই তার আসল স্বামী। ফলে শারীরিক সম্পর্কেও কোন বাধা ছিল না। রিহানা রাতে নামাজ পড়তে পড়তে বাশারের অপেক্ষা করত। এই অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে যখন রিহানা জড়িয়ে আছে তখন খালি বাড়িতে বৃষ্টিশেষের বিকেলে আমার হ্যান্ডসেটের ফোনবুকে নীরবে গোপন হয়ে থাকা নম্বরে কল করলে রিনরিনে গলায় রিহানা বলেছিল—’হ্যাঁ বলুন।

একদিন রিহানাকে বললাম চল বিয়ে করে ফেলি। আমি যে এমনি এমনি বললাম এমন নয়। রিহানাও বুঝল। বলল–তোমারও তো বউ বাচ্চা আছে। ওদের কী হবে? তখন আমি ঘোরের মধ্যে রিহানার জন্য পাগল। বললাম, সব ছেড়েছুঁড়ে চল দুজন কোথাও চলে যাই। রিহানা হাসল। পাগল হয়েছ! ঠিক আছে, যাও তোমার সঙ্গে আর কথা বলব না। আমার জন্য তোমার সংসারে কোন অশান্তি হোক আমি চাই না। তাছাড়া নিজের সুখের জন্য আমি কিছু করব না। রিহানা ফোন রেখে দিল।

আরও পড়ুন অন্তর্জাল ও মৃত্যু

সেই থেকে একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে দিন। কিছুতেই এই ঘোর কাটছে না। এই যে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠছি, খাচ্ছি, বাইরে যাচ্ছি, ফিরে আবার ঘুমাচ্ছি। কিন্তু যেন কিছুই করছি না। রিহানা আর আমার ফোন ধরছে না। কল করলে কেটে দিচ্ছে। আমার কেবল মনে হচ্ছে আমি হেরে যাচ্ছি। কোথাকার কে নিয়ামূল বাশার, আমাকে বেমালুম হারিয়ে দিচ্ছে। এভাবে হেরে যাব আমি? রিহানা একদিন আমার বুকে মাথা রেখে বলবে না—আমি ভুলে গেছি আগের সব! আমার স্বামী, সংসার, নিয়ামূল বাশার সব ভুলে গেছি আমি। এবার তোমাকে পেয়েছি! তুমি যা বলবে তাই হবে।

আসলে আমি রিহানাকেই জিতিয়ে দিতে চাই। সে জানুক, যে মোহে সে আছে সেটা নিছকই মোহ। কিন্তু আমি জানতাম না ওকে নিয়ে পালাতে চাইলে কী প্রতিক্রিয়া সে দেখাবে! ওর পাঠানো এসএমএস শারমিন দেখে ফেলেছে। জানলে ও আমাকে অসাবধানী বলে বকবে কি না! তখন রানা আমার ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিল। আমি একটা ঘোর-গহ্বরে নিপতিত হলাম। বেনসন এন্ড হেজেস খুব পাতলা সিগারেট। এখন আমাকে ব্র্যান্ড পাল্টাতে হবে। যে আমি কোনদিন ফার্স্ট হতে চাই নি, এ কেমন হল আমার! ‘পৃথিবীতে কে কাহার’ বলে যে আমি সামনে দিয়ে সব অনায়াসে চলে যেতে দিয়েছি, সেই আমাকে রিহানা বদলে দিল। নিয়ামুল বাশারকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না।

আরও পড়ুন ও রিহানা-
১ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

ও রিহানা (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

সৈকত আরেফিন একজন গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: পাতা ও পতত্রি, মৃদু ব্যথা হতে পারে; প্রবন্ধগ্রন্থ: সমাপ্তি-শাস্তি-অতিথি, সাহিত্য পাঠ ও পর্যেষণ।তিনি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহাম্মদপুর ইউনিয়নের আহম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!