আবদুল-গনি-হাজারী-৩য়-পর্ব
নওয়াগ্রাম,  নাজিরগঞ্জ,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

আবদুল গনি হাজারী (৩য় পর্ব)

আবদুল গনি হাজারী (৩য় পর্ব)

 

আবদুল গনি হাজারীর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘‘জাগ্রত প্রদীপ’’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে। এ গ্রন্থেও কবি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, বক্তব্য ও কবিভাষার উৎকৃষ্টতর উত্তরণের স্বাক্ষর রেখেছেন। মূলত এ কাব্যগ্রন্থেই তাঁর কবিপ্রতিভার পূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। এ গ্রন্থের নামকবিতা ‘জাগ্রত প্রদীপ’-এ পাওয়া যায় মুমূর্ষ পিতাকে ঘিরে অসহায় সন্তানদের করূণ প্রার্থনার বিষন্নরুপ। পুরো কবিতাটির মধ্যে একটি নাটকীয় পরিবেশ বিরাজিত। এ কবিতাটির মধ্যে একজন যথার্থ কবির স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে। এ দীর্ঘ কবিতাটির শেষের পংক্তিগুলো সহসা আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছে মৃত্যু অতীত রহস্যোলোকের প্রতি, নৈরাশ্যের অন্ধকার থেকে বিশ্বাসের আলোতে-

‘তোমাদের পিতাকে চড়িয়ে দিরাম

সংশয়ের ভ্রুভঙ্গে

প্রত্যয়ের অস্থিতে,

বন্ধা রাত্রির উন্মুখ গর্ভে

সূর্যের স্বপ্নে

মধ্যরাত্রির জাগ্রত প্রদীপে…

কবি বৃটিশ শাসিত সমাজকে দেখেছেন একজন কবি ও সাংবাদিকের দৃষ্টি দিয়ে। তাঁর দৃষ্টি বীক্ষণ সমাজের নানা দিকে প্রসারিত ছিল। তিনি বৃটিশ শাসিত ভারতে শোষণ, দরিদ্রতাকে তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায় এই ভাবে-

‘প্রত্যুষের অন্ধকারে তোমার দুটি হাত আকাশের দিকে যখন

পৃথিবীর সৌন্দর্যে যখন নিমগ্ন প্রার্থণা

বাগানের শিশির ঘাসে তখন শুভ্র শিউলিরা ঝরে পড়ে

ঈশ্বরের হয়ে মানুষের কারুকার্যের মত

হায় আমার সোনার দেশ

প্রার্থণার প্রভাতে তোমাকে সত্য মনে হয়

অথচ সূর্যের প্রাখর্যের নিচে আমার দারিদ্রকে লুকিয়ে রাখা যায় না।’

(প্রত্যুষের অন্ধকারে দুটি হাত)

শস্য ভান্ডারে পরিপূর্ণ দেশের অবস্থা বৃটিশ শোষণে শূন্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। কবি সেটাকে তুলে এনেছেন সুনিপুণভাবে কবিতার পংক্তিতে। কবি দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে, বৃটিশ সাহেবরা বিয়ার খেয়ে আর চুরুটের টানে দাবার ছকে কীভাবে বঙ্গদেশকে শোষণ করা যায় সেই কুটিল খেলায় মত্ত। অন্যদিকে, মা ফাতেমার সামনে না খাওয়া শিশুরা বসে আছে এই আশায় এখুনি নামবে ভাত হাঁড়ি থেকে। এই অবুঝ শিশুরা জানেনা ওই হাঁড়িতে শুধুই মা পানি ফুটাচ্ছেন। ওতে কোন চাল নেই। ক্ষুধার্ত মা শিশুদের বুঝ দিতে চাইছেন এই হাঁড়িতে ভাত চড়ানো হয়েছে। বাছারা আর একটু সবুর করো। কিন্তু হায় কৃষকের সোনা ধান এখন আর তাদের গোলায় নেই। খুব অল্প কথায় সেই সময়কে কবি আবদুল গনি হাজারী কবিতায় আবদ্ধ করেছেন-

“…আমাদের পশ্চাতে ষ্টীমারের প্রথম শ্রেণীর ডেকে চারজন সপ্তাহান্তিক সাহেব

বিয়ারের ফেনায় ঠোঁট ভিজিয়ে

দাবার কুটিল ছকে নিবদ্ধ এবং রাজ্যের ভাগ্য কারো তির্যক চিন্তায় ধার্য—

আমাদের সাকল্য জিম্মা চৌষট্টি ছকের ধাঁধাঁয়

চিন্তিত কামড়ে বিধৃত চুরুটের মত আগুনের অদৃশ্য অপচয় অনিবার্য

.. মা ফাতেমার ফুটন্ত হাঁড়ির সামনে

দীর্ঘ প্রতীক্ষ মাসুম শিশুর কান্না

অন্নপর্ণার অবুঝ স্মৃতির হাঁড়িতে নবান্নের স্বপ্ন কাঁজি।”

(অন্নপুর্নার দেশ)

দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কবির মন চিন্তায় এক অমোঘ সত্যকে উন্মোচন করেছেন। চিকিৎসক হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণার জন্য বলছেন। কারণ চিকিৎসক বুঝতে পারছেন, এই রোগীকে ভালো করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রত্যুষে জানালা দিয়ে শিউলী শরীরে শিশির বিন্দুকে সূর্যের ঢালু দিয়ে নেবে আসা দেখে মনে বিশ্বাস জেগে উঠেছে রুগী সুস্থ। ডাক্তারের ক্ষীয়মাণ কাশি। এই রোগ কি চিকিৎসকের দেহে থেকে গেলো পৈত্রিক হয়ে? কবির প্রশ্ন তাঁর অকাল মৃত্যুর পর রুগ্ন পৃথিবীর আশ্বাসহীন কল্যাণ কি যান্ত্রিক!

‘মনে হয় সত্যই
বিছানায় শায়িত রোগীর
দুরারোগ্য ব্যাধি-
বললেন ডাক্তার
তাঁর স্খলিত কাচের আয়নায়
স্বরচিত হতাশার ছায়া।
এখন ঈশ্বরকে ডাকুন, তিনি বললেন-
কেননা তিনিই সকলের নিদান
আমরা নিমিত্ত মাত্র।.
দেহের সর্বত্র খুঁড়ে
দেখতে হবে
কোথায় লুকিয়ে আছে ব্যাধি।

প্রত্যুষের জানালা ধরে যখন
শিউলির শরীর বেয়ে এক ফোঁটা শিশিরের
সহৃদয় সূর্যের ঢালু দিয়ে
নেবে আসা দেখছিলাম
তখন আমার মনে হয়নি
আমি অসুস্থ।

আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ?
নিষ্ক্রান্ত ডাক্তারের ক্ষীয়মাণ কাশির শব্দ
অন্য প্রশ্নে ভ্রুক্ষেপহীন।
এ রোগ কি তবে তারও দেহে রয়ে গেল
পৈত্রিক হয়ে?
[আমার অকালমৃত্যুর পর
রুগ্ন পৃথিবীর আশ্বাসহীন কল্যাণ—কি যান্ত্রিক!]

চিকিৎসক যখন বাঁচাতে পারছেন না, মৃত্যু যখন অবধারিত; ঈশ্বর একমাত্র নিমিত্ত। এ কথা ভেবে কবির মনে ভাবনার উদয় হয়েছে-

‘…প্রখ্যাত আত্মার অমরত্বের প্রতীক্ষা না রেখে..
প্রসৃত ডাক্তারের অনির্ণেয় সিদ্ধান্তকে
ঘৃণা করতে ইচ্ছা করে
প্রত্যাসন্ন মৃত্যুর ছায়াকে পদাঘাত করার সিদ্ধান্তে।”

(বিছানায় শায়িত রোগী, জাগ্রত প্রদীপ )

আব্দুল গনি হাজারীকে নিজ এলাকা সব সময় আকর্ষণ করতো। তাঁর লেখায় সেগুলো ফুটে উঠেছে। গোয়ালন্দ ও গাজনা নামে তাঁর দুইটা কবিতা রয়েছে।

‘খামারের দিগন্ত বিস্তার

চৈত্রের রাতের জ্যোৎস্না প্লাবিত করেছে

এই গাজনার সহস্র একর।

নিটোল সোনায় মোড়া চৈতালির যুবতি ফসল

ক্রমেই প্রগাঢ় হলো চাঁদের চুম্বনে।

ঘাসেরা তাঁবুর বুকে দু’একটি স্বপ্নাহত চাষী

কখনো ককিয়ে উঠে নিবিড় নিদ্রায় যায় ফিরে।

গাজনার ঘুম নেই, ঘুম নেই গাজনার চোখে

কেননা রয়েছে জানা এইখানে চাঁদ

যদিও গিয়েছে থেমে বহুরাত, অনেক প্রত্যুষ

শিশিরে ভিজেছে নিত্য ফসলের সবুজ হৃদয়।

মৃত্তিকার ধমনীতে টলমল যৌবনের ঢেউ

তবুও নিস্ফল হয় কিষাণে স্বর্ণ স্বপ্ন দেখা

চৈত্র্যের সংক্রান্তি আনে

বাৎসরিক ডাকাতির ত্রাস।’

(কবিতা: গাজনা)

কবি আবদুল গনি হাজারী একজন নিরেট আধুনিক কবি। তিনি যা দর্শন করেছেন, সেটাকে কবিতার ছন্দে বন্দী করেছেন দক্ষভাবে। যদিও যুগ উত্তরে গিয়ে তিনি যুগস্রষ্টার আসন পাননি। যাঁরা যুগ সৃষ্টি করে সাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেছেন যুগস্রষ্টা না হয়েও অনেক কবি অমরত্ব লাভ করেছেন, তাদের সাহিত্য কর্মে। কবি আবদুল গনি হাজারী তাদেরই একজন।

সম্মাননা:

  • কতিপয় আমলার স্ত্রী কাব্যের জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৪ খ্রি.)
  • কাব্যসাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭২ খ্রি.)
  • সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য একুশে পদক (১৯৯০ খ্রি.)

মৃত্যু: আবদুল গনি হাজারী  ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ  করেন।

আরও পড়ুন আবদুল গনি হাজারী-

১ম পর্ব

২য় পর্ব

৪র্থ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

আবদুল গনি হাজারী (৩য় পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!