আনন্দ-বাগচী-১ম-পর্ব
লেখক পরিচিতি,  সাগতা,  সাহিত্য,  হাটখালি

আনন্দ বাগচী (১ম পর্ব)

আনন্দ বাগচী (১ম পর্ব)

 

আনন্দ বাগচী বিস্মৃতিতে তলিয়ে যাওয়া একজন কবির নাম। অথচ নিজের যৌবনের শুরুতে যিনি ছিলেন পঞ্চাশের দশকের উজ্জ্বলতম কবিদের একজন (জন্ম: ১৯৩২- মৃত্যু: ২০১২ খ্রি.)। তিনি ছিলেন একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক ও সম্পাদক। তিনি  উপন্যাস, কিশোরদের সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনী, গল্পগ্রন্থ, রম্যরচনা, প্রবন্ধগ্রন্থ, অনুবাদগ্রন্থ, কাব্যোপন্যাস ও নাটক রচনা করেছেন।

জন্ম:  কবি ও কথাসাহিত্যিক আনন্দ বাগচী ১৯৩২ সালের ১৫ মে, অবিভক্ত ভারতবর্ষের পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  

পারিবারিক জীবন: আনন্দ বাগচীর পিতা শ্রী চন্দ্র বাগচী এবং মাতা সজলবালা দেবী। পাঁচ ভাই-বোনের তিনি সবার বড়। ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি মীরা বাগচীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র ছেলের নাম সুনন্দ বাগচী।

শিক্ষা জীবন: আনন্দ বাগচী  কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে এমএ পাস করেন । 

আরও পড়ুন ডা. অশোক কুমার বাগচী

কর্ম জীবন: আনন্দ বাগচী ১৯৫২ সালে ভারতের বাঁকুড়া জেলায় ক্রিশ্চান কলেজে  কর্মজীবন শুরু করেন। ১৬ বছর এই কলেজে অধ্যাপনা করার পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগদান করেন। 

এই প্রথিতযশা কবি কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মধ্যে  পারাবত, বৃশ্চিক, কৃত্তিবাস প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । আনন্দ বাগচী তার সতীর্থ কবি অবন্তী নাগের সাথে “পারাবত” পত্রিকা, বিবেকজ্যোতি মৈত্রের সাথে “বৃশ্চিক” পত্রিকা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে “কৃত্তিবাস” পত্রিকা প্রকাশ করেন । আনন্দ বাগচীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “স্বগতসন্ধ্যা” ১৯৫৩ সালে “কৃত্তিবাস” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় এই শ্রদ্ধেয় কবি কৃত্তিবাস পত্রিকা ত্যাগ করেন । 

লেখালেখি: ১৯৬৪ সালের ১২ ডিসেম্বর  দেশ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘লন্ঠন জ্বালিয়ে’ প্রকাশিত হয়। তিনি নিজের সাহিত্য জীবনের সূচনাতে ‘হর্ষবর্ধন’ ও ‘ত্রিলোচন কলমচি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন । 

প্রকাশনা: আনন্দ বাগচী  রচিত প্রথম উপন্যাস “চকখড়ি” ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি “স্বকালপুরুষ” নামে একটি কাব্যোপন্যাস লিখেছিলেন। এই কাব্যোপন্যাসটি ১৯৬৩ সালে ধ্রপদী প্রকাশন থেকে গ্রন্থাকারে ছাপা হয়। তারও আগে এই কাব্যোপন্যাসটি সুশীল রায়ের “ধ্রপদী” পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মুদ্রিত হয়েছিল। মূলত সুশীল রায়ের উৎসাহেই আনন্দ বাগচী এই কাব্যোপন্যাস রচনা সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন ।

আরও পড়ুন কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক বিমল কুন্ডু

কাব্যগ্রন্থ:

  • স্বগতসন্ধ্যা (১৯৫৪ খ্রি.) 
  • তেপান্তর ( ১৯৫৯ খ্রি.)
  • উজ্জ্বল ছুরি নীচে (১৯৭৭ খ্রি.)
  • বিস্মরণ (১৯৮২ খ্রি.)
  • শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৯ খ্রি.)

কাব্যোপন্যাস:

  • স্বকাল পুরুষ (১৯৬৩ খ্রি.)
  • স্বপ্নের দৌড় (১৯৯২ খ্রি.)

গল্পগ্রন্থ:

  • রাজ যোটক (১৯৮১ খ্রি.)
  • শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৮ খ্রি.)

উপন্যাস:

  • চকখড়ি (১৯৫৮ খ্রি.)
  • বিকালের রঙ (১৯৫৯ খ্রি.)
  • রাতের বাসা (১৯৬১ খ্রি.)
  • প্রথম প্রেম (১৯৮১ খ্রি.)
  • ছায়ার পাখি (১৯৮৭ খ্রি.)
  • চাঁদ ডুবে গেলে (১৩৯০ বঙ্গাব্দ)
  • সকলেই মেয়ে নয় (১৯৮৭ খ্রি.)
  • এই জন্ম অন্য জীবন (১৯৯৩ খ্রি.)
  • ফেরা বা ফেরা (১৩৯৮ বঙ্গাব্দ)

গোয়েন্দা বা রহস্য উপন্যাস:

  • যাদুঘর (১৯৬৪ খ্রি.)
  • অদৃশ্য চোখ (১৯৮৫ খ্রি.)
  • গ্রহণের ছায়া (১৯৮৯ খ্রি.)
  • রাতের তীরন্দাজ (১৯৯১ খ্রি.)
  • অদৃশ্য মৃত্যুর ছক (১৯৯৫ খ্রি.)

কিশোর উপন্যাস:

  • কানামাছি (১৯৭১ খ্রি.)
  • বনের খাঁচায় (১৯৭৩ খ্রি.)
  • মুখোশের মুখ (১৯৮২ খ্রি.)
  • মৃত্যুর টিকিট (১৯৮৫ খ্রি.)
  • ভূত রহস্য (১৯৮৬ খ্রি.)
  • হিল হাউস রহস্য (১৯৮৬ খ্রি.)
  • ছো (১৯৮৬ খ্রি.)
  • মালয়ের জঙ্গলে (১৯৮৮ খ্রি.)
  • ছেলে ধরা (১৯৯১ খ্রি.)
  • পরমায়ু (১৩৭৯ বঙ্গাব্দ)

প্রবন্ধগ্রন্থ:

  • সাহিত্যির নানা রকম (১৯৬৭ খ্রি.)
  • সাহিত্য সূত্রে (১৯৮৫ খ্রি.)

রম্যগ্রন্থ:

  • নাচের পুতুল (ত্রিলোচন কলমচী ছদ্মনামে), ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ
  • বকলমে (ত্রিলোচন কলমচী ছদ্মনামে), ১৯৮৫ খ্রি.
  • চালচিত্র (১৯৮২ খ্রি.)

নাটক:

  • রূপান্তর (শ্রীহর্ষ ছদ্মনামে)
  • সমাধান

অনুবাদগ্রন্থ:

  • মাদাম বো ভারি-গুস্তভ ফ্লবেয়ার (১৯৭৯ খ্রি.)
  • জন্তা অ্যান্ড কোং (রাজনৈতিক উপন্যাস)

সংকলনগ্রন্থ:

  • প্রথম সাড়া জাগান গল্প (সম্পাদিত), ২১ জন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের গল্পের সংকলন
  • প্রথম সাড়া জাগান কবিতা (১৯৯৩ খ্রি.)
আরও পড়ুন কবি আদ্যনাথ ঘোষ

হয়ত আনন্দ বাগচীর বিস্মৃতপ্রায় এসব কবিতার কাছেও যোগ্য পাঠক ফিরে ফিরে আসবে একদিন নতুন অনুসন্ধান নিয়ে নতুন পূনর্মূল্যায়ন নিয়ে। হয়ত সেদিন ভুল প্রমানিত হবে কবির নিজেরই পংক্তি- “তোমার ভেজানো দরজা ঠেলে/ কেউ আসবে না,বোকা, কেউ কি নিজের কাজ ফেলে/ খেয়ালের কথা রাখে?”

মৃত্যু: কবি জীবনের শেষ দিকে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে চলশক্তিহীন অবস্থায় হালিশহরের বাড়ীতে আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিনযাপন করতেন । তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার শেষদিকে এই কবিকে আড়াই হাজার টাকা সরকারী অনুদান দেবার কথা ঘোষণা করে। তিনি ২০১২ সালে ৯ জুন কল্যানীর এক বেসরকারী নার্সিংহোমে প্রয়াত হন।

তথ্যসূত্র:
১। কালি ও কলম

আরও পড়ুন আনন্দ বাগচী
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

আনন্দ বাগচী (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশ এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন ‘আমাদের সুজানগর’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাধারণ সম্পাদক। তিনি ‘আমাদের সুজানগর’ ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। এছাড়া ‘অন্তরের কথা’ লাইভ অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালি ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!