অন্ধকারে-জ্বলে-দীপশিখা-১ম-পর্ব
খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (১ম পর্ব)

অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (১ম পর্ব)

খলিফা আশরাফ

 

তার নাম শুকুর আলি। দশাসই শরীর। ছয় ফুটের মতো লম্বা। মেধহীন পেটা শরীর। প্রচণ্ড শক্তি গায়ে। ২৭/২৮ বছর বয়স। নিতান্তই গরীব। নাজিরগঞ্জ বাজারে পাটের কুটিতে কুলির কাজ করে সে। তাদের কাজ হচ্ছে পাটের বেল কুটি থেকে নৌকায় তুলে দেয়া। এক একটা বেলের ওজন তিন মণ সাড়ে তিন মণ। বহনকৃত বেল গুনে মজুরী। এ সব ভারী বেল অনায়াসে বহন করে সে। অন্য কুলিদের মাঝেমধ্যেই জিরিয়ে নিতে হয়, কিন্তু শুকুর আলি একটানা কাজ করে। কোন কুলি তাৎক্ষণিক কোন সমস্যায় পড়লে তার কাজটাও করে দেয় সে। সবাই ভালোবাসে তাকে। তার সহমর্মিতা আর শারীরিক শক্তির কারণেই সব কুলিরা তাকে সর্দার মানে।
শুকুর আলি স্বল্পভাষী। অন্তর্মুখী। কোন হৈহুল্লোড়ে তেমন থাকে না। একটা বেদনার ছায়া সব সময় তার মুখের উপর ঘুরে বেড়ায়। সে ভীষণ রকমের জেদী আর গোঁয়ার টাইপের মানুষ। তবে সাধারণত শুকুর আলি কোন ঝগড়া বিবাদে যেতে চায় না, কিন্তু কোথাও একবার লেগে গেলে তাকে থামানো মুশকিল। একেবারে লঙ্কাকাণ্ড করে ছাড়ে। উত্তেজিত শুকুরের সামনে সহজে কেউ পড়তে চায় না। শুকুর আলির সবচেয়ে বড়গুণ, সর্বদাই সে ন্যায়ের পক্ষে। তার সামনে কোন অন্যায় হলেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সে। যে কোন সত্য দাবীর পেছনে নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যায়, সে চেনা হোক বা অচেনা।

একবার স্থানীয় আড়তদার বিদেশী এক মহাজনের টাকা মেরে দিয়েছিলো, সেই বিদেশি ব্যবসায়ীর পক্ষে দাঁড়িয়ে টাকা আদায় করে দিয়েছিলো সে। যে কোন হক আদায়ের পক্ষেই সোচ্চার শুকুর আলি। সে জন্যে সুবিধাবাদী ছাড়া সবাই তাকে ভালোবাসে।

আরও পড়ুন গল্প নীরুর মা

এ বিশ্ব সংসারে অতি বৃদ্ধা মায়ের নানী ছাড়া আর কেউ নেই তার। সে জানে, অবিবাহিত মায়ের অবৈধ সন্তান সে। বিয়ের শপথ করে ভালোবেসে মায়ের সাথে সম্পর্ক করেছিলো এক সম্পন্ন গেরস্তের ছেলে। কিন্তু পেটে বাচ্চা আসার পর সব বেমালুম আস্বীকার করে প্রেমিক। তার মা তখন দশ শ্রেণির ছাত্রী। নানা মারা গেছে আগেই। কিছু জমিজমা আছে, তা দিয়েই নানী নাতনীর চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবা মাকে পাকি হানাদার বাহিনী মেরে ফেলে। তার মা তখন ছোট। সেই থেকে তার মা নানীর কাছেই মানুষ।

তার নানী এটা নিয়ে শালিস দরবার করতে চাইলেও তার অন্তঃসত্ত্বা অণূঢ়া মা সায় দেননি। এ নিয়ে গন্ধ ছড়াক, তাঁর ভালোবাসার মানুষটা অপমান অপদস্ত হোক, তা তিনি চাননি। তাঁর পবিত্র বিশ্বাসের নিখাদ ভালোবাসা মানুষের মুখের তামাশা হয়ে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ুক, মায়ের সেটা পছন্দ হয়নি। তাই সবার অগোচরে কিছু জমি বিক্রি রাতের আঁধারে তাঁর নানীকে নিয়ে মা চলে গিয়েছিলেন শহরে। সেখানেই মানুষের বাড়িতে কাজ করতে করতেই শুকুর আলির জন্ম। তার জন্মের পরের দিনই মা আত্মহত্যা করেন। তিনি এতোদিন বেঁচে ছিলেন শুধু সন্তানের টানে, তাকে জন্ম দেবার জন্যেই। মরবার আগে মা তার নানীকে অনুরোধ করেছিলেন, শুকুর আলিকে নিজের এলাকায় নিয়ে মানুষ করতে, আর ছেলে সাবালক হলে তাকে সব খুলে বলতে।

আরও পড়ুন গল্প জারজ

মায়ের শেষ ইচ্ছে মতো ছোট্ট শুকুর আলিকে নিয়ে মায়ের নানী চলে এসেছিলেন এলাকায়। কিন্তু সে যে অবৈধ সন্তান তা চাউর হতে বেশি সময় লাগেনি। ফলে নিরন্তর খোঁটা গুঁতো খেয়েই বড় হতে থাকে সে। মানুষের অবহেলা, বিদ্রুপ বাক্যবাণ বর্ষণ সমাজের উপরে তাকে বীতশ্রদ্ধ এবং আক্রোশী করে তোলে। ভেতরে ভেতরে শুকুর আলি বিদ্রোহী, বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কেউ তাকে খেলায় না নিতে চাইলেই মারপিট লাগিয়ে দিতো সে। তার অদম্য শারীরিক শক্তিই ছিল প্রধান হাতিয়ার। বাধ্য হয়েই খেলায় নিতে হতো তাকে। ফলে ছোটবেলা থেকেই বৈরী সমাজে টিকে থাকতেই শক্তি প্রয়োগে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে সে। তার একগুঁয়ে মারমুখী স্বভাবটা গড়ে ওঠে অস্তিত্ত্ব রক্ষাতেই। সে শিখেছে, অসহায়রা পদে পদে তার মায়ের মতোই নিগৃহীত হয়। এ পৃথিবীতে নিজের যোগ্যতা দিয়েই টিকে থাকতে হয়। অধিকার কেউ দেয় না, আদায় করে নিতে হয়।

তার মায়ের নানী তাকে সব ঘটনাই খুলে বলেছে। বলেছে, মাজেদ মণ্ডলের ছেলে মতিন মেম্বার তার বাবা। তার নানীর মতো আরও অনেকেই সেটা জানে। এ জন্যেও কারো কারো কাছে একটা প্রচ্ছন্ন সহানুভুতি পায় সে । কিন্তু তার পিতৃত্ব দাবীর প্রমাণ কোথায়? কে বিশ্বাস করবে তার কথা, তার মায়ের নানীর কথা? এ কথা বললে সমাজ তাকে আরও উপহাস করবে। যে দাবী তার মা করেনি, এতো বছর পড়ে সেই দাবী উত্থাপন হাস্যকর হয়ে যাবে। কিন্তু কতদিন অবৈধ সন্তানের তকমা ঘাড়ে নিয়ে বেড়াবে সে? এই অন্তর্দহন সব সময় কুরে কুরে খায় তাকে। মাঝেমাঝে ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে সে। মাথার পাশের রগ দু’টো ছিঁড়ে যেতে যায়। রাতে ঘুম হয় না তার। শপথ নেয় সে, মাকে কলঙ্কমুক্ত করে নিজের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করবেই সে। পরিত্রাণের রাস্তা খোঁজে শুকুর আলি।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

স্থানীয় হাই স্কুলের হেড স্যার তাকে খুব স্নেহ করেন। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত তাঁর কাছে পড়েছিলো সে। তারপর অর্থাভাবে রোজগারের পথে যেতে হয়েছিলো তাকে। শুকুর আলির মাও স্যারের ছাত্রী। সব ঘটনা তিনি জানেন। আরও অনেকেই এটা জানলেও প্রভাবশালী মতিন মেম্বারের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলে না। আর এতোদিন পরে এই তামাদি বিষয় নিয়ে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেতেও চাইবে না। তবুও হাল ছাড়ে না সে। সত্য প্রতিষ্ঠার গোপন আশাটা বুকের মধ্যে লালন করে শুকুর আলি।

এক রাতে শুকুর আলি হেড স্যারের বাসায় যায়। তখন রাত প্রায় এগারটা। গ্রামে এটা অনেক রাত। এ সময় তাকে দেখে খুব অবাক হন স্যার।
── কি শুকুর আলি, এতো রাতে কেন আসছো?
স্যারের পা জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেলে সে। হেড স্যার তাকে তুলে ধরে ভেতরে নিয়ে যান। কাঁদতে কাঁদতেই শুকুর আলি বলে,
── স্যার, আমার মা আপনের ছাত্রী ছিল। সব কিচুই আপনে জানেন। সগলেই জানে। আমি আমার মা’র অদিকার চাই। আমি আপনের পায় ধরি। আমারে ইটু সাহায্যি করেন স্যার।
আবার স্যারের পায়ে পড়ে কাঁদতে থাকে শুকুর আলি। স্যার সস্নেহে বুকে টেনে নেন তাকে। সান্তনা দিয়ে ধাতস্ত করেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেকটা উদাস কণ্ঠে বলেন,
── তুমি ঠিকই বলেছো, ঘটনাটা আমার মতো আরও অনেকে জানে। কিন্তু সেটা এখন অতীত। এতোদিন পরে কেউই তোমার পক্ষে দাঁড়াবে না। মতিন মিয়া এখন মেম্বার, অনেক শক্তিশালী সে। আর তোমার হাতে তো কোন প্রমাণ নাই শুকুর আলি।

আরও পড়ুন প্রতীক্ষিত বৃষ্টি

── তালি কি আমি ন্যায় বিচার পাবো না? মতিন মেম্বররে আমি খুন কর‍্যা ফ্যালাবো স্যার। তাতি আমার ফাঁসি অয় হবি।
রাগে ফুটতে থাকে শুকুর আলি। হেড স্যার সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলায়। মনটা তাঁর সিক্ত হয়ে যায়। খুব ভালো ছাত্রী ছিলো শুকুরের মা। আচার আচরণও ছিলো মার্জিত। অথচ সমাজ ব্যবস্থার কাছে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে তাকে। ফুটফুটে একটা মেয়ে। বিশ্বাস করে জীবন দিতে হলো। অজান্তেই চোখ দুটো আদ্র হয়ে উঠলো স্যারের। খানিকক্ষণ চুপ করে ভেবে তিনি বললেন,
── একটা উপায় হয়তো আছে। কিন্তু সেটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। তোমাকে কোর্ট কাচারী করতে হবে। তোমাকে DNA টেস্টের জন্য কোর্টে আবেদন করতে হবে। তোমার এবং মতিন মেম্বারের DNA যদি মিলে যায়, তবে হয়তো কোর্ট তোমার পক্ষে রায় দিতে পারে।
অবাক হয়ে শুকুর আলি জিজ্ঞাস করলো,
── ডিএন কি স্যার?
── সেটা তুমি বুঝবে না, উকিল বুঝবে। জেলা জজ কোর্টে আমার এক বন্ধু আছে, খুব নামকরা উকিল। আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। সে তোমাকে সাহায্য করবে। তবে আমার সহযোগিতার কথা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে।
অন্ধকারে আশার আলো দেখতে পেলো শুকুর আলি। রাজি হয়ে গেলো সে। চিঠি হাতে স্যারের পা ধরে সালাম করে বেড়িয়ে এলো শুকুর আলি। তার চোখে এখন সম্ভাব্য নতুন সকালের আলো।

আরও পড়ুন অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা-
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর এর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

অন্ধকারে জ্বলে দ্বীপশিখা (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

খলিফা আশরাফ জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিপরীত করতলে, কালানলে অহর্নিশ, অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ; গল্পগ্রন্থ: বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি, অগ্নিঝড়া একাত্তুর, একাত্তরের মোমেনা, পাথরে শৈবাল খেলে; ছড়াগ্ৰন্থ: ভুতুড়ে হাওয়া, কাটুশ-কুটুশ। তিনি  ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

error: Content is protected !!