অধ্যাপক-মোহাম্মদ-আব্দুল-জব্বার-৩য়-পর্ব
কৃতি ব্যক্তিবর্গ,  গবেষক,  গোপালপুর (ভায়না),  বিজ্ঞানী,  ভায়না,  লেখক পরিচিতি,  শিক্ষাবিদ,  সাহিত্য

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (৩য় পর্ব)

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (৩য় পর্ব)

~ মোহাম্মদ আব্দুল মতিন

 

রাজশাহী কলেজ থেকে অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ১৯৪৮ সালে তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমান বুয়েট) গণিত বিভাগে যোগদান করেন। তিনি কলেজ হোস্টেলের (বর্তমানে রেজিস্ট্রারের অফিস) সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে হোস্টেলের দক্ষিণ প্রান্তের দোতলার কোয়ার্টারের বরাদ্দ পেয়ে ওখানে বসবাস করতে থাকেন। কোন এক কারণে ছাত্ররা হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাঁর বাসায় হামলা চালায়। কর্তৃপক্ষ তাকে হোস্টেলের দায়িত্ব গ্রহণ করে পুলিশে রিপোর্ট করতে বলেন। তিনি অস্বীকার করলে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তিনি নিরুপায় হয়ে তাঁর মেজ ভাইয়ের ফরাশগঞ্জের বাসায় উঠলেন। এরপর তিনি আজিমপুরের একটি সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ পেয়ে ওখানে চলে যান। এখান থেকে তিনি মতিঝিলের, নটরডেম কলেজ ও শাপলা চত্বরের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত, পৈত্রিক বাড়িতে (শেল্টার) চলে আসেন। তাঁরা তিন ভাই-ই এখানে থাকা শুরু করেন এবং বহু বছর একত্রে থাকেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের পিতা মুন্সী মিয়াজান মল্লিক ১৯৫৬ সালে ১১০ বছর বয়সে এবং মা বুলু বেগম ১৯৬০ সালে ১০৪ বছর বয়সে এই বাড়িতেই ইন্তেকাল করেছিলেন।

তিনি প্রায় একটানা পনের বছর বিভাগীয় প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হলে তিনি নিযুক্ত হন প্রথম রেজিস্ট্রার পদে। ১৯৬৮ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর, বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, উপাচার্যের অনুরোধে, তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে চলে আসেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮০ সালে অবসরে যাবার পর তিনি আবার মতিঝিলে (শেল্টারে) চলে আসন। চার বছর অবসর জীবন যাপনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি বুয়েটের প্রথম ড. রশীদ অধ্যাপক হিসাবে দুই বছরের জন্য গণিত বিভাগে সম্মানিত শিক্ষক হিসাবে পুনরায় যোগদান করেন। পরিবার বড় হওয়াতে, শেল্টারে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না। তাই তিনি ১৯৮৬ সালে মালিবাগে নিজস্ব বাড়িতে চলে আসেন।

আর পড়ুন কবি ও কথাসাহিত্যিক খোন্দকার আমিনুজ্জামান

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ১৯৫০ সালের প্রথম দিক থেকে ইন্টারমিডিয়েট লেভেল-এর গণিত বিষয়ের উপর পাঠ্য বই লেখা শুরু করেন। তাঁর সব চাইতে উল্লেখযোগ্য বই হল ইন্টারমিডিয়েট স্ট্যাটিক্স এবং ইন্টারমিডিয়েট ডাইনামিক্স। সমগ্র পাকিস্তানে ইন্টারমিডিয়েট লেভেল এই বিষয়ে, সেটিই একমাত্র পাঠ্য পুস্তক হিসাবে বিবেচিত হত। পাকিস্তান আমলে সাইন্স বা অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এমন কেউ ছিল না যে কিনা আব্দুল জব্বারের বই পড়েন নাই।

মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ মনোযোগী। উনি নিজে রোজ ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়াতে বসতেন। উনার শ্যালক জনাব মোহাম্মাদ আসাদুল্লাহ লিখেছেন,

“উনি নিজে রোজ সন্ধ্যায় তাঁর ছেলেমেয়েরা যখন ছোট ছিল, তখন ওদের নিয়ে পড়াতে বসতেন। মাদুরে বসতেন। দুলাভাই একপাশে বসতেন, মনে হতো হাতে যেন একটা অদৃশ্য বেত আছে। সেই সময়ে তাঁর চেহারা হতো বেশ গম্ভীর। আমি হয়ত তাঁর বাসায় গিয়েছি ঐ সময়ে এবং দুলাভাইয়ের সঙ্গে স্বভাবসুলভ রসিকতা করতে গিয়ে দেখি তিনি গম্ভীর হয়েই আছেন। আপাকে জিজ্ঞেস করি, কি ব্যাপার দুলাভাই এত গম্ভীর, রাগান্বিত চেহারা কেন ? আপা বললেন, বাচ্চাদের পড়ানোর সময়ে ওখানে কারফিউ দেওয়া হয়। তুমি তো তুমি, পড়া্নোর সময়ে ওখানে আমারও যাওয়া নিষেধ। পরে দেখলাম এই কড়াকড়ির জন্যই তাঁর ছেলেমেয়েরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (এক বৃত্তে তিন ফুল- মুহম্মদ আসদুল্লাহ, পৃষ্ঠা-৪৩, মহাকাশ বার্তা, দ্বিতীয় বর্ষ, একাদশ সংখ্যা, নভেম্বর, ১৯৯৩)।

বীর-মুক্তিযোদ্ধা-সেলিম-ও-শফি
     বীর প্রতীক সেলিম আকবর                      বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফি (মানিক)

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বাংলাদেশের সব আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। তাঁর মেজভাই মোহাম্মদ আকবর আলীর ছোট ছেলে (সেলিম আকবর খোকন, বীর প্রতীক) বাসা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার পর তাঁর ছোট দুই ছেলে উত্তেজিত হয়ে উঠল। তিনি টের পেয়ে দুই ছেলেকে ডেকে বললেন যে তোমরা যদি যেতে চাও তবে একজন যাবে। দুইজনে গেলে তোমাদের মা সহ্য করতে পারবেন না। তারপর একদিন রাতের খাবার টেবিলে বসে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে জানিয়ে দিলেন যে মানিক (তাঁর ছোট ছেলে), খোকনের মতন কাল সকালে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এ নিয়ে তোমরা কোন হৈ চৈ বা কান্না-কাটি কর না। তাঁর স্ত্রী তো একেবারে থ।

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও সাহিত্যিক খলিফা আশরাফ
     স্ত্রী নূর জাহান বেগম                            মেঝ বৌ-মা শিরীন হোসেন মতিন

এমন একটা প্রাণান্তকর ব্যাপার, ছোট ছেলে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছে জেনেও এমন অবিচলিত রয়েছে তার পিতা। যাহোক তাঁর অবিচলিত গম্ভীর অথচ শান্ত ভাব দেখে সবাই এটা নিঃশব্দে মেনে নিল। পরদিন সকালে তিনি, তার স্ত্রী এবং তার মেজ বৌ-মা একসাথে বসে মানিককে নাস্তা খাওয়ালেন এবং মানিক তার বাবা-মা কে কদমবুছি করে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেল। স্বাধীনতার ১৬ দিন পর মানিক ঘরে ফিরল। এই ষোল দিন তাঁদের যে কিভাবে কেটেছে তা সহজেই অনুমেয়।

সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে যে ব্যক্তিটি লোকচক্ষুর অন্তরালে, নিভৃতে জোতির্বিজ্ঞান সাধনায় নিরলস পরিশ্রম করে গেলেন জাতি তাঁর মূল্যায়ন করতে পারে নাই। তিনি কি ছিলেন আজও হয়তো আমরা অনুধাবন করতে পারছি না, কিন্তু এই দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান যখন আরো প্রসার লাভ করবে তখন এই দেশের মানুষ জানতে পারবে তাঁর সম্পর্কে, তখনই হয়তো তাঁর সঠিক মূল্যায়ন হবে। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার প্রায় এক ডজনের মতন জোতির্বিজ্ঞানের উপর বই লিখেছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বাংলাদেশ থেকে ভারতে বেশি সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর বইগুলি ওপার বাংলায় অনেক সম্মানীয় হিসাবে বিবেচিত হতো। বাংলাদেশের কিছু সৌখিন জোতির্বিদ কোলকাতা বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম দেখতে গিয়ে ওখানকার পরিচালকের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওদের দেখে প্ল্যানেটোরিয়ামের পরিচালক প্রথমেই যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো “জব্বার সাহেব কেমন আছেন। তাঁর বইগুলি আমি পড়েছি। অসাধারণ লেখেন তিনি। জব্বার সাহেবের মতন একজন ব্যক্তিকে পেয়ে তোমরা ঢাকাতে আজও একটা প্ল্যানেটোরিয়াম করতে পারলে না ?” প্রবাদ আছে “গেঁয়ো যোগী ভিক্ষা পায় না”। কথাটা সত্যি। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের মতন একজন প্রতিভাধর অনন্য ব্যক্তিত্বকে পেয়ে আমরা তাঁকে মূল্যায়ন করতে পারি নাই, তাঁর প্রতিভাকে আমরা স্বীকৃতি দিতে পারি নাই। (জব্বার সাহেবকে যেমন দেখেছি – এফ আর সরকার, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ এ্যাস্ট্রানোমিকাল সোসাইটি, পৃষ্ঠা-২৬, মহাকাশ বার্তা, দ্বিতীয় বর্ষ, একাদশ সংখ্যা, নভেম্বর, ১৯৯৩)।

“অন্য কারো মনে এই আনন্দ সঞ্চারিত হলে নিজেকে ধন্য মনে করব” – তাঁর এই উক্তি, আমার জানা মতে, অন্তত দুজনার জীবনে ভীষণভাবে প্রভাব বিস্তার করে ছিল।

আরও পড়ুন কবি ও কথাসাহিত্যিক কে এম আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশ এস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক জনাব এফ আর সরকার লিখেছিলেন, “চাকুরি জীবনের প্রথম দিকে যখন খুলনায় কর্মরত ছিলাম তখন সেখানকার পাবলিক লাইব্রেরিতে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে খগোল পরিচয় বইটি পেয়ে যাই। লেখক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার। নামটা একটু অদ্ভুত মনে হচ্ছিল, খগোল মানে কি তখন আমার বোধগম্য ছিল না। যাহোক বইটি আমি পড়তে শুরু করলাম। আমি আনন্দ আর ঔৎসুক্য নিয়ে এমনভাবে পড়া শুরু করেছিলাম কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে তা আমার খেয়ালই ছিল না। বস্তুত, খগোল পরিচয় পড়ার পর থেকেই জোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহ ভীষণভাবে বাড়তে লাগলো।”

নাসার জোতির্বিজ্ঞানী ড. নূরুর রহমান, ঢাকায় এসে বাংলাদেশ এ্যাস্টনোমিকাল এসোসিয়েশনে নাসায় তাঁর কর্মকাণ্ডের উপর একটি ভাষণ দেন। ভাষণ শেষে, তিনি কি ভাবে জোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে উঠলেন প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “মোহাম্মদ “আব্দুল জব্বারের লেখা খগোল পরিচয় আমাকে জোতির্বিজ্ঞানের প্রতি ভীষণভাবে আগ্রহী করে তোলে”।

১৯৫০ সালের শেষ দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে যতটুকু জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল সেটুকুও বাদ পড়ে যায়। এককভাবে শুধু অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার সাহেব শিখাটুকু জ্বালিয়ে রেখেছিলেন পত্রিকায় প্রতিবেদন দিয়ে এবং বাংলা ভাষায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর খুবই তথ্য সমৃদ্ধ কয়েকখানি বই লিখে। পাঠ্যক্রম থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান বাদ পড়লেও, যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের মহাকাশ কার্যক্রমের ফলশ্রুতিতে, দেশে জোতির্বিজ্ঞানে উৎসাহী তরুণদের সংখ্যা কিন্তু দিন দিন বাড়ছিল। এর মধ্যে দুটি সাড়া জাগানো ঘটনা ঘটে গেল। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়ন কর্তৃক মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রতিস্থাপন করা এবং ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিনের চন্দ্র পৃষ্ঠে অবতরণ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বেশ কিছু জোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে উঠে। এদের ভেতর বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিকাল এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটি, অনুসন্ধিৎসু চক্র, অনুসন্ধানী বিজ্ঞান খেলাঘর উল্লেখযোগ্য।

আরও পড়ুন অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (৩য় পর্ব)

Facebook Comments Box

মোহাম্মদ আব্দুল মতিন, অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) একজন সদস্য এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।তিনি ১৯৪৫ সালের ১১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!