শেষ-অপেক্ষা
আলতাব হোসেন,  গল্প,  সাহিত্য

শেষ অপেক্ষা

শেষ অপেক্ষা

  • আলতাব হোসেন

রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। নিস্তব্ধতা যেন সারা পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। বিছানায় শুয়ে থাকা তাহিরার চোখে ঘুম নেই। মনের ভেতর এক অজানা অস্থিরতা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে সে অনুভব করছে যেন কিছু একটা অপূর্ণ রয়ে গেছে, কিছু একটা বলার বাকি আছে। ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় সে। বাইরে আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন, কোথাও কোথাও চাঁদের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্যের মতোই তার মনের ভেতরেও যেন কিছুটা আলো, কিছুটা অন্ধকার মিশে আছে—অন্ধকারে ঢেকে থাকা, তবু কোথাও এক ফালি আলোর আশা।

জীবনের শেষ সময়ে এসে এসব ভাবা উচিত নয়, কিন্তু স্মৃতিরা তাকে পিছু টানছে। অনেকদিন পর আজ তার শৈশবের বন্ধু সোহানের কথা মনে পড়ছে। সোহান তার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যা সময়ের ধুলায় ঢাকা পড়েছিল, কিন্তু কখনোই মুছে যায়নি। তাদের শৈশব ছিল মধুর আর সরলতায় পরিপূর্ণ। তারা ছিল একে অপরের ছায়া; গ্রামের ছোট্ট পাড়াগাঁয়ের প্রতিটি গলিতে তাদের ছুটে চলা, নদীর ধারে বসে ঢেউ গোনা, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঝগড়া আর মান-অভিমান—সবকিছুই ছিল এক রঙিন ক্যানভাসের মতো। সোহানের সঙ্গে সেই দিনগুলো কাটানোর সময় কখন যে উড়ে যেত, সে বুঝতেই পারত না। ছোটোবেলার সেই সবুজ মাঠ, খেলার সাথি, সোহানের মায়াবী হাসি—সবকিছু এখন তার মনে স্মৃতির পাখির মতো উড়ে বেড়ায়।

আরও পড়ুন গল্প আড়ালের চোখ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনের গতিপথও বদলে গেল। তাহিরা যখন কলেজে ভর্তি হলো, তখনই সে বুঝতে পারল, তার জীবনের পরিধি বেড়ে যাচ্ছে। সোহানও তার নিজের মতো করে এগিয়ে চলল, কিন্তু তাদের বন্ধুত্বে কোথাও যেন ফাটল ধরল। সোহান তাহিরাকে ভালোবাসত, কিন্তু কখনও সাহস করে মুখ ফুটে বলার সাহস পায়নি। তাহিরা সেটা অনুভব করলেও, কখনও নিজের ভেতরের সেই ভালোবাসা প্রকাশ করেনি। বরং অন্য কারও দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই অন্য কেউ ছিল রাকিব—এক চঞ্চল যুবক, যে তার মন জয় করেছিল সহজেই। সে মনে করেছিল, সে-ই তার জীবনের পরিপূর্ণতা এনে দেবে। তাহিরার পরিবার সোহানের সাথে তার ভবিষ্যৎ দেখেছিল, কিন্তু তার পছন্দ ছিল রাকিব। একসময় সে রাকিবের হাত ধরে বাড়ি ছাড়ে, পেছনে ফেলে যায় সোহানকে, শৈশবের স্মৃতিগুলোকে আর নিজেকে।

ঢাকায় এসে তারা বিয়ে করে। এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় রাকিব একটি চাকরি পেয়ে যায়। ছোট্ট সেই সংসার ভালোবাসার আলোয় ভরে ওঠে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। রাকিবের চাকরি চলে যায়, তার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের উষ্ণতাও। তার ব্যর্থতা তাকে আরও নির্দয় আর কঠোর করে তোলে। জীবনের ক্রমবর্ধমান চাপে সে তার ভালোবাসার মানুষকে দোষারোপ করতে শুরু করে, তার নিজের ব্যর্থতার বোঝা ভালোবাসার মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেয়।

তাহিরা প্রথমে বুঝতে পারেনি, সে কখন রাকিবের ভেতরে বাসা বাঁধা অন্ধকারের শিকার হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে রাকিব স্নেহময়তার পরিবর্তে নিষ্ঠুরতা আর অর্থের প্রতি লোভী হয়ে ওঠে। তাহিরার প্রতি নিজের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। তাহিরা তখনও তাদের সুখের স্বপ্ন দেখত, কিন্তু সেই সুখের স্বপ্নটি ভেঙে যায় যখন রাকিব এক রাতে তাকে জোর করে একজন অচেনা পুরুষের হাতে তুলে দেয়। সেই রাতে তার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়।

আরও পড়ুন গল্প লালু

প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের সাথে শরীরের বিনিময়, নতুন নতুন রূপের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। প্রথম প্রথম সে মনে করত, এই দুঃস্বপ্ন একদিন শেষ হবে। সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে পারে, এই দুঃস্বপ্নই এখন তার জীবনের বাস্তবতা। রাকিব, যে একসময় প্রচণ্ড ভালোবাসত, এখন তার শরীরকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করছে। প্রতিদিন নতুন মানুষের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে হয় তাকে, আর প্রতিদিন তার ভেতরের আত্মা একটু একটু করে মরে যায়।

এই অন্ধকার জীবনের মধ্যেও একদিন তার জীবনে নতুন আলো দেখা দেয়। তার কাছে আসা পুরুষদের মধ্যে একজন ছিল তন্ময়—অন্যদের থেকে আলাদা। প্রথমে সে ভেবেছিল, তন্ময়ও অন্যদের মতোই। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে, তার মনোভাব ভিন্ন। তন্ময় তাকে সম্মান করে, ভালোবাসে—সে শুধুমাত্র শরীরের জন্য নয়, মন থেকে ভালোবাসতে চায়। যখন তাহিরার সাথে সময় কাটায়, তার চোখে কোনো লালসা থাকে না, বরং থাকে একটি মমত্ব, একটি আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি। তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। তন্ময় তাকে প্রতিদিন দেখতে আসে, অসুস্থ হলে সার্বিক সহযোগিতা করে। তার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা অনুভব করে। তাহিরা তার প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যে, তার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসে, এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

সেই স্বপ্নও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। তন্ময় একদিন তাকে জানায়, তার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে এবং সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সে বুঝতে পারে, তন্ময়ের সাথেও তার সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সে চলে যাবে, আর তাকে থেকে যেতে হবে এই অন্ধকার জীবনে, যেখানে সে প্রতিদিন নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে।

আরও পড়ুন গল্প একটি মিষ্টি স্বপ্ন

তাহিরার শরীরে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে; মাথা ঘোরে, বমি বমি ভাব হয়। সে বুঝতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু এই সন্তান কার—তন্ময়ের, রাকিবের, নাকি কোনো অচেনা পুরুষের। তার মনে শঙ্কা জাগে। সে কি এই পৃথিবীতে আরেকটি নিষ্পাপ জীবনের আগমন ঘটাবে। তার কি কোনো পরিচয় থাকবে—সে তা জানে না। সামনে আর কোনো পথও খোলা নেই।

রাত গভীর হয়, বাইরে ঝড় উঠেছে, আকাশ থেকে মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ তার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সে শেষবারের মতো জানালার বাইরে তাকায়। জানে না, কী করবে, কোথায় যাবে। মনে হয়, এটাই তার জীবনের শেষ অপেক্ষা, শেষ আশা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, হয়তো কোনো মিরাকল ঘটবে, তার জীবনে আবারও আলোর ঝলকানি আসবে।

রাত শেষ হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সে তার জায়গা থেকে সরে যায়, ঘরের ভেতর পা ফেলে। ঘুম আসে না তার, কিন্তু ক্লান্তি এসে যায়। জীবনের প্রতি এই ক্লান্তি, এই অবসাদ তাকে গ্রাস করে নেয়। হাতের মুঠোয় একটা পুরোনো চিঠি, যে চিঠি সে সোহানের জন্য লিখেছিল, কিন্তু কখনোই পাঠাতে পারেনি। সেই চিঠিতে ছিল তার সমস্ত না বলা কথা, তার ভেতরের কষ্ট, তার অপরাধবোধ, আর তার শেষ বিদায়ের ইচ্ছা।

বাইরের ঝড় থেমে গেছে, চাঁদ আবারও মেঘের আড়ালে চলে গেছে। রাতের অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে।

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

শেষ অপেক্ষা

Facebook Comments Box

আলতাব হোসেন, সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশ এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক সংগঠন ‘আমাদের সুজানগর’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তিনি ‘আমাদের সুজানগর’ ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক। এছাড়া ‘অন্তরের কথা’ লাইভ অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। তিনি ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালি ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!