প্রমথ চৌধুরী
পাবনার কবি ও কবিতা,  লেখক পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী ও বীরবলী ধারা

বাংলা সাহিত্যাকাশের এক অনন্য ও উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রমথ চৌধুরী। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক এবং বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক হিসেবে সাহিত্য ইতিহাসে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী। সাহিত্যচর্চায় তিনি ‘বীরবল’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। সম্রাট আকবরের দরবারের নবরত্নের অন্যতম সদস্য বীরবলের মতোই প্রমথ চৌধুরী ছিলেন বাংলা সাহিত্যজগতের এক অমূল্য রত্ন। ‘বীরবল’ ছদ্মনামে সাময়িকপত্রে ব্যঙ্গরসাত্মক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লেখালেখি করে তিনি যে স্বতন্ত্র ধারার জন্ম দেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘বীরবলী ধারা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

​১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন প্রমথ চৌধুরী। তাঁর পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন জমিদার।

কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে বিএ এবং ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বিলেত গমন করে ব্যারিস্টারি (বার-অ্যাট-ল) ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করলেও তাতে দীর্ঘকাল স্থায়ী হননি। কর্মজীবনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেন। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে বিবাহ করেন। সাহিত্য রচনার প্রতি গভীর অনুরাগ ও আত্মনিবেদনের কারণে তিনি পরবর্তীকালে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ত্যাগ করে সাহিত্যচর্চায় পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

​বাংলা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনা। এই পত্রিকার মধ্য দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে সাধু ভাষার পরিবর্তে মার্জিত চলিত গদ্যরীতির সার্থক প্রবর্তন করেন। প্রমথ চৌধুরী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়। তিনি প্রমাণ করেন যে, সাধারণ মানুষের কথ্য রীতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত চলিত ভাষার মাধ্যমেও লঘু-গুরু সব ধরনের জটিল ও গভীর ভাবধারা প্রকাশ করা সম্ভব। তাঁর এই ভাষান্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ণ সমর্থন জানান এবং স্বয়ং চলিত রীতিতে লেখা শুরু করেন। সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে তখন একদল তরুণ ও শক্তিশালী লেখকের সংঘ গড়ে ওঠে, যা তরুণ প্রজন্ম ও পাঠকদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে।

​রবীন্দ্রযুগে আবির্ভূত হয়েও প্রমথ চৌধুরী নিজের স্বকীয়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বতন্ত্র ধারা বজায় রাখেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রাবন্ধিক, সমালোচক, কবি ও গল্পকার। তাঁর রচনার মূল ভিত্তি ছিল নাগরিক বৈদগ্ধ্য, মননের তীক্ষ্ণতা, সুগভীর যুক্তিনিষ্ঠা, শাণিত ভাষা এবং আবেগ ও রোমান্টিক ভাবালুতার পরিবর্তে বুদ্বির প্রয়োগ। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও তির্যক ভঙ্গির সুনিপুণ ব্যবহারে তাঁর লেখাগুলো হয়ে উঠত আকর্ষণীয়। তিনি উইট ও এপিগ্রামের ব্যবহারে বাংলা গদ্যকে এক নতুন মাত্রা দান করেন। অনেকে তাঁর লেখাকে ‘প্যারাডক্সে আক্রান্ত’ বললেও মূলত সত্য অন্বেষণ ও সামাজিক মিথ্যার মুখোশ উন্মোচনই ছিল তাঁর রচনার লক্ষ্য। সাহিত্যের গঠনমূলক সমালোচক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি সর্বজনবিদিত; ব্যক্তি আক্রমণ এড়িয়ে তিনি সাহিত্যের রস ও রূপের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করতেন। ইউরোপীয় ও ফরাসি সাহিত্যের সুপণ্ডিত হওয়ায় তাঁর লেখায় পাশ্চাত্য ভাবধারার ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

​প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যের আঙ্গিক ও রূপকল্পেও রূপান্তর আনেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে ফারসি ছোটোগল্পের আঙ্গিক রীতির পরিচয় ঘটান এবং ইতালিয় ও ফরাসি সনেটের অনুকরণে সনেট রচনা করেন। এ ছাড়া ট্রিয়লেট ও তের্জারিমা ইত্যাদি বিদেশি কাব্যবন্ধও তিনি বাংলা কবিতায় সফলভাবে প্রবর্তন করেন। সাহিত্যের প্রসার ও বিনোদনে ‘চুটকি’ সাহিত্যের প্রচার ও সুনিপুণ উপস্থাপনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি মনে করতেন, সাহিত্যের মূল উপাদান মানবজীবন ও প্রকৃতি। তবে সাহিত্য প্রকৃতির হুবহু অনুকরণ নয়; বরং বাস্তব জীবন ও প্রকৃতির উপাদানের সাথে শিল্পীমনের রস ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টি হয়। তিনি বৃহদাকৃতির রচনার চেয়ে ছোটো পরিসরে সারসংক্ষেপ উপস্থাপনে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই তিনি কোনো উপন্যাস রচনা করেননি।

​স্বদেশপ্রেম, শিক্ষা ও মানবমন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রমথ চৌধুরীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও যৌক্তিক ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মনোজগতে আলো জ্বালানো এবং জ্ঞানের পরিধি বিস্তারের জন্য সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। তিনি জোরপূর্বক আবেগ বা ধার করা ভাষার মাধ্যমে কাব্যসাধনার বিরোধিতা করতেন এবং সমাজে মানসিক যৌবন ও প্রাণের প্রতিষ্ঠার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, স্বদেশে যেন মানুষ বিদেশি হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর ভাষাদর্শ ছিল চরম বিপ্লবী ও অগ্রগামী, যদিও সাহিত্যের সৌন্দর্যের বিচারে তিনি ছিলেন অতীতচারী ও ধ্রুপদী ভাবধারার অনুসারী।

​প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যকর্মের পরিধি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

  • কাব্যগ্রন্থ: সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৩), পদচারণ (১৯১৯)।
  • গল্পগ্রন্থ: চার-ইয়ারি কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), নীললোহিত (১৯৩২/১৯৩৯), ঘোষালের ত্রিকথা (১৯৩৭), অনুকথা সপ্তক (১৯৩৯), সেকালের গল্প (১৯৩৯), ট্র্যাজেডির সূত্রপাত (১৯৪০), দুই বা এক (১৯৪০), গল্পসংগ্রহ (১৯৪১), নীল লোহিতের আদি প্রেম (১৯৪৪)।
  • প্রবন্ধগ্রন্থ: তেল-নুন-লাকড়ি (১৯০৬), নানাকথা (১৯১১), বীরবলের হালখাতা (১৯১৬/১৯১৭), The Story of Bengali Literature (১৯১৭), আমাদের শিক্ষা (১৯২০), দুই ইয়ারির কথা (১৯২১), বীরবলের টিপ্পনী (১৯২৪), রায়তের কথা (১৯২৬), নানাচর্চা (১৯৩২), ঘরে বাইরে (১৯৩৬), প্রাচীন হিন্দুস্থান (১৯৪০), বঙ্গ সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (১৯৪০), আত্মকথা (১৯৪৬) এবং প্রবন্ধ সংগ্রহ (১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৫২-১৯৫৩)।

​মননশীল সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রমথ চৌধুরী নানা মর্যাদাপূর্ণ সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত একবিংশ বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’-এ ভূষিত করে এবং ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গিরিশচন্দ্র ঘোষ-বক্তা’ হিসেবে বঙ্গ সাহিত্যের পরিচয় তুলে ধরেন।

​জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি শান্তিনিকেতনে অতিবাহিত করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আধুনিক, যৌক্তিক ও সর্বজনীন গতিপথ প্রদানকারী এই দিকপাল ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ২রআ সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা গদ্যে কথ্যরীতির প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা এবং তীক্ষ্ণ বিদ্রূপাত্মক প্রবন্ধের প্রবর্তক হিসেবে প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন।

Facebook Comments Box

‘আমাদের সুজানগর’ সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশ এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত একটি অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। সংগঠনটি সুজানগর উপজেলার কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিয়মিত ম্যাগাজিন প্রকাশ, বইমেলা ও সৃজনশীল মেধা বিকাশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন করে আসছে। এছাড়া গুণিজনদের জীবন ও কর্ম নিয়ে ধারাবাহিক লাইভ অনুষ্ঠান ‘অন্তরের কথা’ আয়োজন করে থাকে। ‘আমাদের সুজানগর’ সংগঠনের মুখপত্র হলো ‘আমাদের সুজানগর’ ওয়েব ম্যাগাজিন, যা সুজানগরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, গুণিজনদের জীবন সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচার করে থাকে। এছাড়া সুজানগর উপজেলার কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি প্রকাশ করে থাকে। ওয়েব অ্যাড্রেস: www.amadersujanagar.com মেইল অ্যাড্রেস: editor.amadersujanagar@gmail.com

error: Content is protected !!