লেখক পরিচিতি,  শিশুতোষ

নুরুল ইসলাম বাবুল:অন্ধকারে আলোকবর্তিকার কবি

কবির আন্তরিক আর স্বতঃস্ফুর্ত উচ্চারণই যথার্থ কবিতা। কবি মাত্রই সত্য আর সুন্দরের পূজারী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘কবিতায় আমি কখনো মিথ্যে বলি না।’ আর কবি ও কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সরকার বিশ্বকবির কথার রেশ টেনে বলেছেন, ‘কবিতায় মিথ্যে বলা যায় না, কেননা কবিকে যে উঁচুতে উঠে উচ্চারণ করতে হয়, সেখানে আর সত্য মিথ্যে বলেই কিছু থাকে না।’ কবি নুরুল ইসলাম বাবুল সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দেওয়ার আগে জানাতে চাই কবিতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির কথা। নুরুল ইসলাম বাবুল কবিতা ভাবনা লিখতে গিয়ে ‘কবিতার প্রতিটি শব্দ সত্য আর সুন্দর’ শিরোনামে লিখেছেন, ‘সেই কবে যেন কবিতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। হতে পারে কিশোর বেলায়। তখন বুঝে অথবা না বুঝেই বারবার কবিতা পড়েছি। তারপর মুগ্ধ হতে হতে কবিতার ভেতরে পেয়েছি জীবনের পরম আস্বাদ। কবিতা আমাকে ঋদ্ধ করেছে, শুদ্ধ করেছে; করেছে খানিকটা অহংকারী। বোধের গভীর থেকে উচ্চারিত হয় যে কবিতার প্রতিটি শব্দ, ইচ্ছে করলেই সেই কবিতা ধরা যায় না, নির্মাণ করা যায় না। আমি যখন কবিতা লিখতে চেয়েছি, পারি নাই। যখন ঠিক লিখে ফেলেছি, অনায়সে তা পেরেছি। কেমন করে পঙ্ক্তিগুলো এসেছে আমি তা জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার মনে হয় কে যেন আমাকে দিয়ে কথাগুলো লিখে দিয়ে যায়। আর যখন লেখা হয়ে যায় তার পরের মূহুর্তগুলো কেটে যায় মায়াবী ঘোরের ভেতর। এ এক অন্য রকম অনুভূতি। কেমন- কেমন তা বলতে পারব না। শুধু আমি যেন আনন্দ আর উত্তেজনায় বিভোর হয়ে থাকি। আর বারবার আওড়াতে ইচ্ছে করে সদ্য প্রসূত বাক্যগুলো। যদি একটা চরম সত্য কথা বলা যায় তবে অনায়সে বলতে পারি, কবিতা যাকে স্পর্শ করেছে আলিঙ্গনে-আলিঙ্গনে মধুর করে তুলেছে তার জীবন। কবিতার ভেতরে যে ডুব দিয়েছে কোন মিথ্যাই তাকে আসক্ত করতে পারে নাই। কেননা, কবিতার প্রতিটি শব্দ অমোঘ সত্য আর সুন্দর।’

বাবার লিখে রাখা নোটবুক অনুযায়ী কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের জন্ম ২৯ শ্রাবণ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ (১৪ আগস্ট ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ) পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার পাথার অঞ্চলের বিলচান্দক গ্রামে। পিতা আব্দুল করিম সরকার ও মাতা সুফিয়া খাতুনের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি বড় সন্তান। লেখাপড়া শেষ করেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে বগুড়ার সরকারি আযিযুল হক কলেজ থেকে। বর্তমানে বিলচান্দক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি লেখালেখি শুরু করেন কবিতা দিয়েই। শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত হয়ে কোমলমতি শিশুদের চঞ্চলতা, হাসি-কান্নাসহ দৈনন্দিন কিছু ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করে, আন্দোলিত করে। তখন তিনি মনে-প্রাণে হয়ে ওঠেন শিশুসাহিত্যক। ছোটোদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখেছেন বিভিন্ন শিশুতোষ সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার ছোটোদের পাতায়। এ পর্যন্ত প্রকাশিত শিশুতোষগ্রন্থ বারোটি। এছাড়াও ছোটোদের পত্রিকা ‘হইচই’ এবং লেখালেখির কাগজ ‘পাথার’ সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী ‘দক্ষিণ বাংলার পথে পথে’ যা দৈনিক জনকন্ঠের ভ্রমণ পাতায় এগারোটি পর্বে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কবিতা যার আরাধ্য সাধনার বিষয়, কবিতার সাথে যার অন্তরের গভীর যোগাযোগ তিনি তো বারবার কবিতার কাছেই ফিরে আসবেন, নির্মাণ করবেন নতুন নতুন কবিতা। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি কবিতার বই। কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘আমার প্রথম’ (২০০৩) এবং ‘হেঁটে যায় আদিমাতা’ (২০২০) পাঠে কবির চিন্তা ও চেতনার দিকটি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। হতে হয় মুগ্ধ। যোগায় নতুন চিন্তার খোরাক। এখানে আমরা কবির দুটি গ্রন্থ সম্পর্কে আলোকপাত করে তাঁর স্বরুপ অনুসন্ধান করব।

কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের প্রথম কবিতার বই ‘আমার প্রথম’ এ রয়েছে বত্রিশটি কবিতা। প্রতিটি কবিতাই তাঁর জীবন ও জগৎ নিয়ে অভিজ্ঞতার ফসল। আমরা জানি, কবির দৃষ্টি থাকে সবসময় তীব্র আর তীক্ষ্ণ। সেই দৃষ্টিতেই নুরুল ইসলাম বাবুল জীবনের অলি-গলিতে দেখতে পেয়েছেন এক জটিল-কঠিন অন্ধকার। যাকে তিনি বলেছেন ‘অপাঙক্তেয় আঁধার’। যে আঁধার ছেঁয়ে আছে প্রতিটি মানুষের জীবনে। আর সময়ে-অসময়ে তা বিপন্ন করে তুলেছে জীবনের স্বাভাবিক গতি। স্বপ্নচারী মানুষ তাই স্বপ্নভঙ্গের মুখোমুখি হচ্ছে। কবির উচ্চারণ,

‘তবুও বিপ্রতীপ স্বপ্নের বৃত্তে বারবার

পরিবৃত হয় জীবনের গতি,

চারপাশে ফোঁস-ফোঁস ফণি নিশ্বাস;

আহা! জীবনে কে চায় ধ্বংস প্লাবন

স্বপ্ন যেখানে বহতা নদীর মতো।’

(শিল্পী মানস অথবা স্বাপ্নিক জীবনের বৃত্তান্ত/ আমার প্রথম)

কিন্তু কেন বহতা নদীর মতো জীবনে বারবার পরাজিত হবে স্বপ্ন। হোঁচট খাবে অনেক দূরের দৃষ্টি। রক্তাক্ত হয়ে পড়বে একেকটি পবিত্র হৃদয়। যা কবিকে শুধু নয় আমাদেরও আহত করে, ব্যথিত করে তোলে। এ বিষয়ে কবির চিন্তার সাথে আমাদের সহমত ঘটে যায়। কেননা, জগতের সব অন্ধকার শুধু জাগতিক নিয়মেই ঘটে না, ভুল মানুষের ইতরপনায়ও নষ্ট হয় আলোকিত সুন্দর। শুদ্ধ বিবেক বিসর্জিত হয় বলেই কুলষিত হচ্ছে সমাজ, দেশ, পৃথিবী। কবির কবিতায়,

‘বোধের চৌকাঠে ফাঁদ পেতে আছে

শ্বাপদ সময়;

নীলকণ্ঠী মানবতা দ্যাখে

চারপাশে বিবেকের নষ্ট ভাঙন।’

(শ্বাপদ সময়/ আমার প্রথম)

এই যে নষ্ট ভাঙন। এই যে অসুন্দরের কাছে আত্মসমর্পন। এ থেকে কি মুক্তি নাই? বের হওয়ার পথ নাই? আছে। কিন্তু তা সহজ নয়। অনন্তকাল ধরে ক্ষয়ে যাওয়া বোধ, অশুদ্ধ আত্মার সাথে বসবাস; হঠাৎ করেই তা ঘুচানো যায় না। এজন্য তৈরি হতে হয়, তৈরি করতে হয়। নুরুল ইসলাম বাবুল সেই অনভিঙ্গ কর্মীদের একজন। কবি বলেছেন,

‘আবারও গর্জে ওঠে প্রোথিত বিশ্বাসগুলো। এবং প্রতিবাদী হয়ে যাই আমরা। আমাদের পায়ের নীচে ছুঁইছুঁই দূর্বাঘাস অথবা ঘাসফুল। আমরা কজন আনাড়ি জোয়ান শান দেই  বোধে-প্রত্যয়ে।’

(পুনশ্চ মহড়া/আমার প্রথম)

এভাবে কবি তুলে এনেছেন জীবনের নানা ভাবনা। কবি জীবনের প্রথম দিকের কবিতাগুলো নিয়েই প্রথম কবিতার বই। বেশকিছু কবিতায় রয়েছে সাদামাটা বর্ণনা। তবে তা জীবন ঘনিষ্ঠ। তবে তা মুগ্ধ করে আলাদাভাবে। কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের নিবেদিত কবিপ্রাণ, কবিতার পথে নিরন্তর হেঁটে চলা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে। তিনি নিজেও জীবনের পরম আস্বাদ খুঁজে পান এ পথেই। তাঁর কবিতার ভাষায়-

‘বৈষয়িক বৃত্তের খুঁটিনাটি ব্যতীত

আকণ্ঠ মেনে যাই শিল্পের নিয়ম;

ভাঙি এবং নির্মাণ করি

অমর্ত্যরে সুখ ছুঁই নির্মাণে।’

(বোধ ও প্রত্যয়/ আমার প্রথম)

এই গ্রন্থের অন্যান্য কবিতার মধ্যে প্রত্যয় প্রতীতি, শৈল্পিক বৃষ্টি, নদীত্রয়ের কথকতা, অনুরোক্ত বোধের বৈপরীত্য, রেলগাড়ি জীবন, নদীটির বুকের ভেতর, ক্রমাগত ভাঙনের পালা, শিকড়তত্ব, তোমার নক্ষত্রচোখে, ধর্মান্ধ যুবকেরা এবং একটি ছেলে, বোধ ও প্রত্যয়, নাড়া শিরোনামের কবিতাগুলো বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। সেইসাথে কবির গভীরতর জীবনবোধ লক্ষ্য করা যায়। যা শানিত করে আমাদের বোধ ও প্রত্যয়।

কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমার প্রথম’ (২০০৩) প্রকাশের দীর্ঘকাল পরে প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় কবিতার বই ‘হেঁটে যায় আদিমাতা’ (২০২০)। আগের গ্রন্থের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত চল্লিশটি কবিতায় সমৃদ্ধ গ্রন্থটি নতুন চিন্তার খোরাক। কবি মানুষের মন ও মননে, চিন্তা ও চেতনার জগতে যেমন ঢুকতে চেয়েছেন, তেমনি আবিস্কার করতে চেয়েছেন মানব হৃদয়ের বিকশিত হয়ে ওঠার আকুতি। পরিশুদ্ধ হৃদয় মাত্রই হয়ে উঠতে চায় ফলবতী বৃক্ষ, যা জীবনকে সার্থক আর সুন্দর করে। কবির ভাষায়, ‘কিছু প্রার্থনা নিবিড়তা খোঁজে; জলের নিয়মে চায় মাটির সখ্যতা। আমরা তো জানি কতটা আদ্রতায় অঙ্কুরোদগম হয় রোপিত বীজ।… তবু প্রতীক্ষা কতক্ষণ দীর্ঘ হলে প্রার্থনার সময় সঠিক হবে জল ও মাটির গুণন। কেননা আমাদের হৃদয় আজ বৃক্ষ হতে চায় অঙ্কুরোদগমের চিরায়ত কানুনে।’

(বৃক্ষ জার্নাল/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবন গেঁথে আছে নিবিড়ভাবে। প্রকৃতির ঋতু বদলে যেমন পাল্টে যায় পরিবেশ-পরিস্থিতি, মানুষের জীবনেও রয়েছে নানারকম উত্থান-পতন। রয়েছে ভাঙা-গড়া। বসন্তবাতাসে যেমন মানুষের মনে জাগতে পারে নব প্রেমের দোলা, বৈশাখী তান্ডবে তেমনি এলোমেলো হয়ে যেতে পারে সাজানো জীবন । কবির ভাষায়,

‘অত:পর টিকে যাওয়া জীবনের এই প্রেম

ঋতুচক্রে আবর্তিত এই খেলাঘর

বৈশাখ করে দেয় কিছু এলোমেলো

মৃদু হয় কোকিলের স্বর।’

(বৈশাখের পদাবলি/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

নুরুল ইসলাম বাবুল তাঁর কোনো-কোনো কবিতায় মহাজীবন প্রবাহের সাথে বিশ্ব-ব্রম্মান্ডের বাস্তব আর পরাবাস্তব রস সংযোগ ঘটিয়ে চমৎকার এক চিত্রকল্প তৈরি করেছেন। তেমনি একটি কবিতা,

‘ঘুমের গন্ধ পেয়ে রাতের শয্যায় শোয় ক্লান্ত বিকেল

বংশপরম্পরায় এই রাত এই বিকেল এই ঘুম

চষে বেড়ায় নক্ষত্রের আলো,

              নিরবতা… শুন্যতা…স্তব্ধতার আস্বাদ;

তবু কিছু স্বপ্ন জমে থাকে অতিক্রান্ত সময়ের কাছে

কিছু প্রেম বিকশিত হতে হতে কিশোরীর চুরি ভাঙে

এবং ভাঙার শব্দে হেসে লুটোপুটি খায় লতাপাতাঘাস।’

(অলিখিত কলঙ্কের দাগ/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

এই গ্রন্থের শিরোনাম কবিতায় কবি তুলে ধরেছেন মানুষের সবচেয়ে আদিমতম ইতিহাস। আর তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন বংশ পরম্পরায় আমরা একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছি। কবি নিজেও এই পথের ভিন্ন পথিক নয়। তাঁর ভাষায়-

‘বাতাসে উড়িয়ে চুল হেঁটে যায় আদিমাতা

আমি তাঁর চুলের গন্ধ শুঁকে-শুঁকে

খেয়ে ফেলি নিষিদ্ধ গন্ধম…’

(হেঁটে যায় আদিমাতা/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

আমরা তো নয়-ই কবি নিজেও যখন এ কথা বলেন কবিতার শেষ পংক্তিতে তখন আর উপায় কী আমাদের-

‘এ মনে লাগে উদাসী হাওয়া

তবু পেরুতে পারি না সংসারের চৌকাঠ

ডিঙানো হয় না সামাজিক প্রথা;’

আমরা তো সাধারণ। আমরা তো সহজেই পাঠ করতে পারি না কবির অন্তরের গভীরতর বেদনা। কবিকে আবিস্কার করা যে সহজ নয়। তা করতে হলে ডুবতে হয়, ডুবে যেতে হয় কবির সৃষ্টিকর্মের অতল সমুদ্রে। ডুবতে-ডুবতে একটু হলেও চেনা যেতে পারে কবির অন্তহীন দুঃখের কিছু অংশ। নুরুল ইসলাম বাবুল মনে করেন প্রতিটি মানুষ ভেতরে-ভেতরে বড় বেশি নিঃসঙ্গ, খুব বেশি একা। নিজের ভেতরের নিরন্তর দহন নিজেকেই পোড়ায়, অন্য কেউ তার অংশীদার হতে পারে না। কেননা এ আগুন তার একান্তই নিজস্ব। কবিও এই অন্তর্জালা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই তিনি  উচ্চারণ করেন,

‘এইভাবে কেটে যাচ্ছে দিন 

নিজের আগুনে পুড়ে-পুড়ে।’

(নিজের আগুনে/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

হৃদয় দগ্ধ করা এ আগুন থাকবেই। কেননা, মানবজীবন টিকে থাকে মহাসংগ্রামের ভেতর দিয়ে। এ জীবনে সুখ আছে। দুঃখ আছে। ঝড় আছে। সুবাতাসও আছে। বিপদ যতই আসুক না কেন নিজেকে শক্ত করে দাঁড়াতে হবে। নত হয়ে পড়ার নাম জীবন-সংগ্রাম নয়। বাবুল সে কথা বলেছেন তাঁর ‘প্রতিদিন’ শিরোনামের কবিতায়। পাঠ করা যাক কবিতাটির কিছু অংশ- 

জীবনে আসে বারবার মহাঝড়

থাকতেই পারে বুকে ভাঙনের ক্ষত

ভেঙেছে ভাঙুক ক্ষুদ্র মাটির ঘর

তা বলে হয়ো না বেদনার কাছে নত।

আমরা দেখেছি কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের বেশ কিছ কবিতায় সত্য ও মিথ্যা, সুন্দর ও অসুন্দর, আগুন ও আঁধার, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নানাভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। কবিতাগুলো গভীর মনোযোগসহ পাঠ করলে জানা যায় আসলে কী বলতে চান কবি। কী বলতে চান সে কথা জানার আগে আমরা পড়ব কবির আরও একটি চমৎকার কবিতা,     ‘চেনা মুখগুলো কী সুন্দর বদলে যায়

আঁধারের আড়ালে…

এক অলিখিত লিয়াঁজোর চক্রান্তে

লুট হয় আমাদের প্রিয় নদী

ক্ষত ও খুনের স্বাক্ষী থাকে অগণন মরা মাছ;

বিশ্বাসী চোখগুলো কেবল সূর্যের সমর্থন চায়।’

(বিশ্বাসী চোখগুলো/ হেঁটে যায় আদিমাতা)

নুরুল ইসলাম বাবুলের একটি উল্লেখযোগ্য কবিতার শিরোনাম ‘সবকিছু মিথ্যা হয়ে যায়’। আসলে কী মিথ্যা হয়ে যায়। কেন মিথ্যা হয়ে যায়। কবি নুরুল ইসলাম বাবুল সে কথা জানাতে চায় তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। নিরাশার ভেতর দিয়ে কবি খোঁজেন আশার আলো। হিংসা-দ্বেষ, লোভ ও লাভের হিসেব চিরকাল ধরে রাখা যায় না। জীবনের প্রচন্ড প্রতাপও একদিন ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এই যে বেঁচে থাকা, এই যে মহাজীবন প্রবাহ- এর ভেতরের অপাঙক্তেয় আঁধার থেকে কবি মুিক্ত চান, সবাইকে মুক্ত দেখতে চান। অন্ধকারে জ্বালাতে চান আলো। তাই  তিনি তাবৎ অন্ধকারেও আলোকবর্তিকার কবি। ‘হেঁটে যায় আদিমাতা’ কাব্যগ্রন্থ সেই বার্তা বহন করছে। প্রতিটি কবিতায় ছড়িয়ে আছে মুগ্ধতা। পাঠককে টেনে রাখে দারুণ এক মোহের ভেতর।

‘আমার প্রথম’ এবং ‘হেঁটে যায় আদিমাতা’ একজন একনিষ্ঠ কবি নুরুল ইসলাম বাবুলের অন্তর নিংড়ানো চিন্তার ফসল। সেখানে কবি ব্যক্ত করেছেন তাঁর নিবিড় ভাবনাগুলো। এ ভাবনা বুদবুদের মতো ছড়িয়ে যায় হৃদয়ে-হৃদয়ে। যা ভরিয়ে তোলে অন্যরকম ভালোলাগায়, ভালোবাসায়। অন্ধকার নয়, আলোকিত সুন্দরের কবি নুরুল ইসলাম বাবুলকে আবারও বলতে চাই- তিনি আলোকবর্তিকার কবি। 

Facebook Comments Box

কবি-গীতিকার, সাংবাদিক ও শিক্ষক। পাবনার কাশিনাথপুরে ৩ জুলাই ১৯৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং HarvardX থেকে 'Early Childhood Development'-এ ডিপ্লোমাধারী। ১৯৯৫ সাল থেকে সাহিত্যপত্র ও লিটলম্যাগ (ঋত্বিক, প্রয়াস, চাতক, মুক্তচিন্তা ইত্যাদি) সম্পাদনা এবং 'প্রয়াস সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী' ও 'কাশিনাথপুর সাহিত্য চক্র'-সহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় সাহিত্যভিত্তিক পুনর্জাগরণে ভূমিকা রাখেন। ​তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে কাব্যগ্রন্থ জলতৃষ্ণ জীবনের নোঙর, করতলে ধূলোমেঘ, কবিতার আত্মহনন এবং গবেষণা/সম্পাদিত গ্রন্থ পাবনার কবি ও কবিতা, শিশুশিক্ষা, জীবযাপনের বিজ্ঞান অন্যতম। এছাড়া তাঁর লেখা অর্ধশতাধিক গান দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের কণ্ঠে সুরারোপিত ও প্রকাশিত হয়েছে। কর্মজীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ আলাউল হোসেন বর্তমানে মাশুন্দিয়া ভবানীপুর খন্দকার জোবেদা বেগম ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি 'দৈনিক আমাদের সময়' ও 'বিডিনিউজ২৪'-এ সাংবাদিকতা ও নিয়মিত কলাম লিখছেন।

error: Content is protected !!