পেতনি
পেতনি
বউরে আমি কালটি বলে ডাকতাম, এ ডাকটি ছিল তার কাছে বিষের মতো। নাম ধরে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে মুখটা এমন কালো হয়ে যেত, মনে হতো অমাবস্যার অন্ধকার রাত নেমে এসেছে আকাশ থেকে। তার মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে যেত সহজে। সাত সকালে ভূতের মুখ দেখে ঘুম ভাঙলে কী সেদিন ভাল যায়? কপাল পোড়া হলে যা হয়, ঠিক আমারও তাই। তবে ও হাসলে দাঁতগুলো খুব চকচক করত। ওকে কখনো আদর করতে ইচ্ছে হয়নি, ভালবাসতে ইচ্ছে হয়নি, কখনো আপন করে কাছে পেতে ইচ্ছে হয়নি, ভাত খাবার কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি, ভালো কাপড় কিনে দিতেও কখনো ইচ্ছে হয়নি।
কেন ইচ্ছে হয়নি- তা আমি নিজেই জানি না। পৃথিবীর সমস্ত ইচ্ছে মরে গিয়েছিল। কপালে এমন পেতনি মার্কা একটা বউ পেলে কারো ইচ্ছা কি বেঁচে থাকে? ফোন করলে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগত। আমি খুব রাগ করে মাঝেমাঝে লাইন কেটে দিতাম। আনকালচারড একটা মেয়ে অসহ্য! অফিস থেকে ফিরে বাসায় এসে খুব রাগ করতাম। আজেবাজে বলে বকাঝকা এমনকি গালাগালিও করতাম। প্রতিদিন পেতনি দেখতে দেখতে পৃথিবীটা পেতনিময় মনে হতো আমার কাছে। চারিদিকে সুডৌল উন্নতবক্ষা সুন্দরী মেয়ে ঘুরে বেড়াত, শালা আমার কপালে জুটেছে পেতনি!
আরও পড়ুন গল্প রোদেলা দুপুর কাঁদে
আমি ওকে বলেছিলাম, ‘খবরদার আমার জন্য কখনো না খেয়ে থাকবি না। ফালতু কোথাকার? যখন রান্না হবে ঠিক তখনই খেয়ে নিবি।’ আমার দিকে বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকত, বলদাটা সুন্দর করে হাসতেও পারত না, সুন্দর করে কথা বলতে পারত না। এমন কী কোনো সাহিত্য আড্ডা, কবিতা পড়তেও তার অপছন্দ! কিছু লিখতে জানে না আজকাল মেয়েরা কত সুন্দর স্ট্যাটাস দেয় ফেসবুকে। সুন্দর করে কথাও বলতে পারে না। কোনো কিছুই পাওে না, গেঁয়ো ভূত কোথাকার। জীবনটা তেজপাতা বানাইয়া ফেলছে। পেতনি জুটছে আমার কপালে। প্রতিদিন একবার করে ফাঁসি দিলেও আমার দুঃখ মিটবে না। ওকে কয়বার ফাঁসি দেওয়া উচিত তা ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে যেত, অফিসের সময় হয়ে যাবার আগেই বাসা থেকে বের হয়ে যেতাম ।
কখন কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কী কথা বলতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে কিছুই বুঝতে পারে না। বিভিন্ন সময় দেখতাম উদাসী হয়ে থাকত। রুমের এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকত একাকী, অপলক দৃষ্টিতে এক দিকে তাকিয়ে থাকত, মনে হতো প্রতিবন্ধী। দেখলে এত রাগ হতো যে কখনো আমার কাছে আসতে দিতাম না। আমার জামাকাপড় পরিষ্কার করে দিয়েছিল; সেসব আমি একদিন ফেলে দিয়েছি। জামাকাপড়গুলো আর কখনোই পরা হয়নি। মা মাঝেমধ্যে রাগ করে বলত, ‘মেয়েটির উপরের এমন করিস কেন? কিছুদিন যেতে দে। আমাদের বাড়ির পরিবেশ যখন বুঝে উঠবে তখন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
আমার জীবনটা একেবারে বিষিয়ে উঠেছিল। মাঝে মাঝে মনে হতো আমি এখনই আত্মহত্যা করি। বাবার বন্ধুর মেয়ে বলে জোর করে কিছু বলতেও পারছি না। মা বাবাকে বিশ্বাস করা আমার ঠিক হয়নি। তাঁরা এমন একটা মেয়ে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো!
এমন মেয়ে কি এখন চলে? আমার ফ্রেন্ড সার্কেল অনেক হাই কোয়ালিটি দেশের বাহির থেকে পিএইচডি করছে; দেশের বাইরে নামি-দামি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে অনেক বড় পোস্টে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে?
আরও পড়ুন গল্প পথভোলা এক পথিক
হঠাৎ একদিন আমার শরীর খারাপ করেছে, হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমার হাসপাতালে ভর্তির কথা শুনে এমন চিৎকার করে ছুটে এসেছিল যে, চিৎকারের শব্দটা আমার বুকের ভিতর টুংটাং টুংটাং এখনো বাজে। আমি একা বাথরুমে যেতে পারতাম না। ও আমাকে সাহায্য করত, সারারাত আমার পাশে জেগে থাকত। আমি খুব বিরক্ত হতাম; দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, যাতে আমি কখনো বুঝতে না পারি। একদিন অনেক রাতে হঠাৎ দেখি ও আমার পাশে নেই। বুকের ভেতরে ধড়ফড় করতে লাগল। আমি ওর নাম ধরে ডাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজার আড়াল থেকে ছুটে আসলো। ওকে জড়িয়ে ধরে আমি সেদিন কেঁদে ছিলাম। আহারে! কালো মানুষটা, আনস্মার্ট মেয়েটা আমাকে এতো ভালোবাসে, আমার এত যত্ন নেয় অথচ আমি তাকে অবহেলা করি।
মিনু এত খুশি হয়েছিল যে আমার কপালে চুমু খাওয়ার অনুমতি চাইলো, স্বামীর কপালে চুমু খেতে অনুমতি লাগে!
শিশুর মতন আমার বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়ল ও।
তারপর একে একে অনেক কিছুই স্বাভাবিক হতে লাগল। আমরা সেদিন থেকে রাতে একসঙ্গে থাকা শুরু করি। মিনুকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম, বউ যে আমার ফেসবুক ব্যবহার করত, আমি কখনোই জানতে চাইতাম না। মানুষের এত সহজ সরল হওয়া ঠিক না যেমনটি মিনু, আমার পেতনি বউটি। খুব ভালো মানুষ আমাকে এত ভালবাসে নিজেই বুঝতে পারতাম না। আমার পছন্দ অপছন্দ আমি কী খাই, না খাই আমার ভালো বন্ধু-বান্ধবী সব লিস্ট করে রাখতো। তাদের জন্মদিনে উইশ করতো। আমি জানতামই না যে, আমার বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল আমার চেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন গল্প স্বপ্ন জল
একদিন আমার বান্ধবী আমাকে ফোন দিয়ে বলছে, তুই একটা আনস্মার্ট ছেলে তোর সঙ্গে কথা বলাই যায় না। তোর বউ এত স্মার্ট, কত সুন্দর করে কথা বলে। তুই এতো একটা লক্ষ্মী বউ পেয়েছিস। সত্যিই ভাবাই যায় না তোর বউ এতো গোছালো, এতো রোমান্টিক, এতো ধর্মভীরু! মানুষ এতো সুন্দর হয় তোর বউয়ের সঙ্গে না মিশলে বুঝতে পারতাম না।
মাঝেমধ্যে ও আমার পছন্দের খাবার রান্না করত, আমার জন্য শপিং করত, আমার বাবা মাকে খুব কেয়ার করত, বাবা মায়ের কাছেও প্রিয় ছিল ও। আমার আপুরা ওকে সহ্য করতে পারতো না। মিনুকে নিয়ে এখন খুব গর্ব করতে ইচ্ছে করে। আমার একটা পেতনি বউ আছে। এই পেতনি বউটা আমার অহংকার। পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের একটা পেতনি বউ থাকা দরকার।
কোম্পানি থেকে আমাদের দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য দুইটা এয়ার টিকেট দিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই অফিসের কর্মকর্তা চাইছেন, আমি কোথাও থেকে ঘুরে আসি। স্যার আমার কাজে খুশি হয়ে সুইজারল্যান্ডের দুটি আপ-ডাউন টিকিট সহ ভিসা রেডি করে দিয়েছেন। বউকে রাতে খুশির সংবাদটা দিলাম। কিছুদিন অনেক আনন্দময় দিন কাটল। যেদিন আমরা ফিরে আসব এয়ারপোর্টে আসার সময় আমাদের গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট হলো। তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই!
আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা
কয়েক বছর পর!
লীনা, আমার কন্যা। গায়ের রং ঠিক ওর মায়ের মতো কালো। সবাই ওকে দেখে হাসাহাসি করে আড়ালে আবডালে। লীনা সব কিছু আমার সঙ্গে শেয়ার করে, ওর ভালো লাগা মন্দ লাগা সব আমার সঙ্গে শেয়ার করে। মেয়েরা ঠিক মায়ের মতো হয়।
আমাকে খুব যত্ন করে লীনা। আমি কখন অফিস থেকে বাসায় আসি, কী খাই, কখন ঘুমাতে যাই। লীনার মা বেঁচে থাকলে আমাকে হয়তো এত কিছু ভাবতে হতো না। ক্ষণে-ক্ষণে মিনুকে খুব মনে পড়ে। বিয়ের প্রথম বছরে বিচ্ছিরি খারাপ ব্যবহার করেছিলাম।
লীনা বড় হচ্ছে লেখাপড়া, চাকরি সংসার সবকিছুই একদিন ও করতে পারবে একা কিন্তু ওর মা বেঁচে থাকলে এ ভাবনাগুলো আমাকে ভাবতে হতো না। এ সমাজে একটা কালো মেয়ের কোনো মূল্য নেই, আমাদের মতো পুরুষ শাসিত সমাজে। মানুষের শিক্ষা বাড়ছে, আধুনিকতা বাড়ছে, মনের বিশুদ্ধতা বাড়ছে না একদম। কালো মেয়েগুলো কি মানুষ না? কালো হলো জগতের আলো। কিছু তরুণ অবুঝ ছেলেরা বর্ণ ভেদাভেদ সমাজে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাদের মানসিক সমস্যা আছে। গায়ের রঙ দিয়ে কিছুই হয় না। মনের সাদা রঙ দিয়ে পৃথিবী পরিবর্তন করে দেওয়া যায়।
আমি আজ কালো মেয়ের বাবা! আমার মানসিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল আমার স্ত্রী মিনু।
পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে সৃষ্টিকর্তাকে বলব, হে সৃষ্টিকর্তা, আমার পেতনি বউটাকে আমার আমার সঙ্গী করে দিও!
ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেইজে
পেতনি



