হাইয়া-আলাল-ফালাহ্-১ম-পর্
গল্প,  বিমল কুণ্ডু (গল্প),  সাহিত্য

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (১ম পর্ব)

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (১ম পর্ব)
বিমল কুণ্ডু

 

কমলাপুর স্টেশন থেকে রেল লাইন চলে গেছে দেওয়ানগঞ্জ ঘাট। এখান হতে নৌকায় একরাত-একদিনের পথ সানন্দবাড়ী। এটি প্রমত্তা যমুনা নদীর একটি চর। কোন অতীতে যমুনার বুকে এই চরটি জেগে উঠেছিল, কবেই বা এখানে জনবসতি গড়ে উঠলো, তার কোন সঠিক ইতিহাস নেই। সানন্দবাড়ী নামটি কিভাবে হলো তাও কেউ বলতে পারে না।

তবে জনশ্রুতি আছে, বহু আগে সদানন্দ মালো নামে এক পাগল ছিল এই গ্রামে। তার নাম থেকেই সানন্দবাড়ী নামের উৎপত্তি। সদানন্দ কোন কাজ করতো না। কাউকে কোন বিরক্তও করতো না। কাশবনে তার একটি আস্তানা ছিল। সেখানেই সারাদিন ঘুমিয়ে কাটাতো। রাতভর পায়চারী করে বেড়াতো চরময়। তখন তার কণ্ঠ থেকে গানের কলি ভেসে আসতো। বসতির পুরনো লোকদের এখনো সেই গানের কথাগুলি মনে আছে।

ও যমুনা সর্বনাশী কোন কিসিমের লগড়রে
কাইড়া লইয়া মনের মানুষ পাগল করলি আমারে।

এখনো নাকি গভীর রাতে সদা পাগলার গান চরের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কান পাতলে তা শোনা যায়, কিন্তু সবাই শুনতে পায় না। তার জন্য তুক্তাক কিছু করতে হয়। সে যাই হোক গাছ-গাছালির উচ্চতা ও অবস্থান দেখে আন্দাজ করা যায় মোটামুটি শ’দেড়েক বছর আগে নদী ভাঙনের শিকার কিছু ছিন্নমূল মানুষ প্রথমে এখানে এসে বসতি গড়ে। অনেক বছর পরে ১২ বর্গমাইল আয়তনের এই বসতির জনসংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক চার-পাঁচ হাজার। প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। অধিবাসীদের অধিকাংশ মুসলমান। পনের-কুড়ি ঘর জেলে আছে। ধর্মে হিন্দু। যে এলাকায় তারা বাস করে, সেটি মালোপাড়া নামে পরিচিত। মাছ ধরা তাদের প্রধান পেশা।

আরও পড়ুন গল্প একজন অনন্যা

মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই গ্রামের উৎপাদিত কোন পণ্য বাইরে যায় না। দূর নদীতে যে সমস্ত জেলে মাছ ধরতে যায় দেওয়ানগঞ্জ থেকে এক ধরনের ফড়িয়া বড় নৌকায় এসে খুব সস্তা দামে সে মাছ কিনে নিয়ে যায়। শীতের মৌসুমে শান্ত নদী দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গঞ্জ থেকে পণ্য সম্ভার নিয়ে রংপুরের দিকে ব্যবসা করতে যায়। তারই দু-একটি নৌকা ভিড়ে সানন্দবাড়ী ঘাটে। সস্তা দামের জামা-কাপড়, মেয়েদের কাঁচের চুড়ি, চুলবাধার ফিতা কিনে নেয় দরিদ্র অধিবাসীরা। তাও আবার কোন কোন বছর কিনতে পারে না।

এদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলেরা, ম্যালেরিয়া ছাড়াও নানা রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দারিদ্র্য তাদের নিত্য সাথী। শিক্ষার জন্য এ গ্রামে কোন স্কুল নেই। চিকিৎসার জন্য নেই কোন ডাক্তার, ধর্ম পালনের জন্য কোন মসজিদ-মন্দির। অসুখ-বিসুখ, বন্যা আর মহামারীতে মৃত্যু এদের নিত্য সাথী। তবু এর মধ্যে একটু পরিবর্তন এল। সেও পঞ্চাশ বছর আগের কথা।

একদিন ভরা বর্ষার মৌসুমে উঠলো প্রচণ্ড ঝড়ের মাতম। সন্ধ্যা থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ালো একটানা। সানন্দবাড়ীর সবগুলি মাটির ঘরের ছাউনি উড়ে গেল। অসহায় মানুষগুলো মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে রইল সারারাত। একসময় ঝড় থেমে গেলেও তারা কিন্তু জেগে রইল কোন কিছুর প্রত্যাশায়। এমন প্রত্যাশা প্রতি বছরই দু’একবার আসে তাদের জীবনে। ঝড়ের সময় যমুনায় অনেক নৌকাডুবি হয়। মানুষও মরে বেশ কিছু। ঢেউ-এর তোড়ে যে সব নৌকা পাড়ে এসে ঠেকে তার মালিক বনে যায় কেউ। মরা লাশের জামা-কাপড়সহ অনেক সময় কিছু নগদও মেলে। কোন মৃত নারীর লাশ পাওয়া গেলে, হাতের চুড়ি, নাকফুল, কানের দুল মেলে কারো ভাগ্যে। সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি মৃতার নাকফুল নিজের স্ত্রীর নাকে পরিয়ে দিয়ে ভালবাসার হাসি হাসে।

তবে এসব নিয়ে যে কখনো বিবাদ হয়না তা নয়। বিশেষ করে নৌকার মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রায়ই খুনোখুনি হয়। যে খুন করে লুটের মাল বাগিয়ে নেয় সে বিজয়ের হাসি হাসে। যে খুন হয় তার বউ ছেলে-মেয়ে কাঁদে। এখানে কেউ কারো বিচার করে না। সময়ের সাথে সবই তাল মিলিয়ে চলে আরণ্যক জীবনের মতো।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

আজও ভোর হবার সাথে সাথে নদীর পাড়ে একযোগে হুমড়ি খেয়ে পড়লো সবাই। শরতের মেঘমুক্ত আকাশ ততক্ষণে যমুনার শান্ত জলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও কিছু কিন্তু চোখে পড়ে না।

একদৃষ্টে অনেকদূর তাকিয়ে হতাশ গলায় কদম আলী বলে উঠলো, হালার এতবড় ঝড়ে একখানা নাও-ও কি ডোবে নাই-মরে নাই কেউ?

তার কথা শুনে লস্কর মাঝি ফিস ফিস করে বললো, চাচা ঐ খাড়ির কোণে মানুষের মতন কি যেন দেহা যায়!

বলেই চিলের মতো দৌড়াতে লাগলো। তার পিছনে ছুটলো কদম আলী। দু’জন মিলে টেনে তুলল একটি যুবকের দেহ। মুখে একগাল দাড়ি। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। পরনে সাদা পাজামা। তার দেহটি বালির উপর রেখে দুজনে লেগে গেল প্রাপ্তির সন্ধানে। পকেট হাতড়ে পাওয়া গেল একটি টুপি আর একখানি তসবি।

প্রবীণ কদম আলী টুপি আর তসবি দেখে মন্তব্য করলো, লোকটা হুজুর হইবো। চল, লইয়া কবর দিয়া দেই। তা নইলে গোনাহ হইতি পারে।

এমন সময় অস্ফুটস্বরে আওয়াজ হলো, আল্লাহ্ মাবুদ।

দু’জন চমকে ওঠে, তাকিয়ে দেখলো হুজুরের মুখ নড়ছে।

লস্কর মাঝি প্রায় চিৎকার করে উঠলো, মরে নাই-মরে নাই।

তারপর কদম আলীকে উদ্দেশ্য করে বললো, চাচা চলেন হুজুররে লইয়া খেদমত কইরা বাঁচাইয়া তুলি। আমাগো তো কিছু নাই। যদি হুজুরের দোয়ার বরকতে কিছু হয়!

আরও পড়ুন গল্পটির-
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
শেষ পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

হাইয়া আলাল ফালাহ্ (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!