বাক্স-বন্দী-প্রেম
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

বাক্স বন্দি প্রেম

বাক্স বন্দি প্রেম

এ কে আজাদ দুলাল

সকাল হতে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। থামার কোন লক্ষণ নেই। ঢাকা শহর  বৃষ্টির পানিতে সারা রাস্তা ডুবে গেছে, ফলে জ্যামেজটে পড়ছে যানবাহন। নয়টার ভেতরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোঁছাতেই হবে।অনেক কষ্ট করে কাক ভেজা শরীর নিয়ে মার সঙ্গে করে হাসপাতালে এসে হাজির হলো ফারুক। ভাল নাম মোঃ ফারুক। বয়স বাইশ-তেইশ বছর। মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল, মুখখানা মলিন। দুঃচিন্তা সারা চেহারায় আচ্ছন্ন। বিনানিদ্রায় চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল। সাথে তার মা। বয়স চল্লিশের ওপর হতে পারে। তার চেহারার মধ্যেও দুঃচিন্তার ছাপ। তবে এতটা নয়। হাসপাতালের করিডোরে দেয়াল ঘেঁষে  বসে পরলো দু’জন। গত তিন-চার দিন ধরে ফারুক এই হাসপাতালে আসা-যাওয়া করছে।

আজ তার মাকে সাথে করে এনেছে। একমাত্র ছেলেকে তো আর একা ছেড়ে দেয়া যায় না। সাত বছর বয়সে ফারুক পিতাকে হারিয়েছিল। কিশোরগঞ্জ হাওর পাড়ে ওদের বসত বাড়ী ছিল। গরীব বাবা-মার একমাত্র ছেলে। সেই বছর বড় বর্ষা হয়েছিল। ঝড়ের মধ্যে পাড়ার গরীব মানুষের সাথে নৌকা নিয়ে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসে নি ফারুকের বাবা। মাছ ধরা আর বিক্রি করাই ছিল তাদের পেশা। ফারুকের বাবা মারা যাওয়ায় সীমাহীন দুঃখ-কষ্টে ভাসতে থাকে দুটো প্রাণী।

সাত বছরের বাচ্চাকে  নিয়ে কি করবে। থাকার মধ্যে ছোট একটা ঘর এবং এই ঘরটার পরিধি তাদের জায়গা। বেচে দিলে থাকবে কোথায়? কি খাবে? রোজগারের কোন রাস্তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ঘরসহ জমিটুকু ফারুকের এক চাচার কাছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি করে একই গ্রামের বিধবা মোমেনার সাথে ঢাকায় চলে এসেছিল। ঢাকা হতে  নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় ছোট একটা টিনসেড রুম ভাড়া নিয়েছিল। মোমেনা তাকে বাসা বাড়ীতে ঝি এর কাজ ঠিক করে দিয়েছিল। বাসার মালিক একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। মালিকের স্ত্রী মিসেস সুরাইয়া একজন দয়ালু মহিলা। মাসখানেকের মধ্যে বাড়ীওয়ালীর মন জয় করে নিয়ে ছিলো। মাঝে-মধ্যে ফারুক তার মার সাথে মালিকের বাসায় আসা-যাওয়া করতো। মিসেস সুরাইয়া ছোট ফারুককে কাছে ডেকে আদর করে বলেছিল,

  • তোমার ছেলের চেহারাটা বেশ মিষ্টি, মোমেনা।

আরও পড়ুন গল্প হাইয়া আলাল ফালাহ

ফারুকের গায়ের রং শ্যামলা চোখদুটো মায়া ভরা এবং বুদ্ধিদ্বীপ্তি চেহারা। আর দশটা ছেলের চেয়ে আলাদা।মিসেস সুরাইয়ার উৎসাহে ছেলেকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছিল। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ফারুকের মার। বুক ভরা স্বপ্ন ছেলে মেট্রিক পাস করলে গার্মেন্টসে ভাল বেতনের চাকরি করতে পারবে। মিসেস সুরাইয়ার স্বামী কথা দিয়েছিলেন তার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকরি দিবে। দীর্ঘদিন ধরে  একই বাসায় কাজ করে আসছে ফারুকের মা। সবার কাছে সে একজন বিশ্বস্থ মানুষ। তার আশা পূরণ হয়েছিল। ছেলে এসএসসি পাস করার পর মালিক চাকরি দিয়েছিল। মা-ছেলের আয়ে বেশ ভাল চলছিল তাদের সংসার। ছেলেকে বিয়ে দিবে। ঘরে বৌ আসবে। কত স্বপ্ন ফারুকের মার। ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পরে।

    • বাজান, আর কত দিন অপেক্ষা করবা। কেউ তো কোন হদ্দিস দিতে পারছে না।

    • মা, একটু ধর্য্য ধর।

    • বাজান, তোর মুখের দিকে চাইয়া তো আমার মন মানে না।

ফারুক তার মার কথার কোন জবাব দিতে পারে নাই। শুধুই চোখের সামনে ভেসে উঠছে শেফালীর মায়া ভরা মুখখানী।ফারুক আর শেফালী একই স্কুলে পড়তো। শেফালী ৮ম শ্রেণি পাস করার পর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু দুজনের মনের টান বন্ধ হয়নি। সুযোগ পেলেই দুজনে বড় রাস্তার পাশে বসে গল্প করতো। কি গল্প করতো তার কোন মাথামুন্ডু ছিল না। অকারণে হেসে ফারুকের কাঁধে মাথা রেখে বলতো,

  • আমি যদি কোন দিন হারিয়ে ঔ দুর আকাশের তারা হয়ে যাই তখন তুমি কি করবা?

সঙ্গে সঙ্গে ফারুক শেফালীর মুখ চেপে ধরে বলতো,

  • কখনো এমন কথা বলবি না। তুমি না থাকলে আমার জীবন অন্ধকার।

আরও পড়ুন গল্প নীল সমুদ্রের ঢেউ

শেফালী দু’হাতে নিজের দুটো কান ধরে প্রতিজ্ঞা করে বলতো আর কোনদিন কূলক্ষণে কথা বলবে না। ভাবতে ভাবতে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরে ফারুক।ফারুকের মার কত আশা শেফালীকে বৌ করে ঘরে আনবে। শেফালী বড্ড লক্ষ্মী মেয়ে। গায়ের রং হালকা ফর্সা। আদর ভরা মুখখানি। দু’জনে মানাবে ভাল। মালিকের বৌ বলেছেন বছর খানেক চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়ে তারপর বিয়ে করতে। তার কথা মত অপেক্ষা করে আসছে প্রায় দুবছর। ফারুক নিজের নামে ব্যাংকে সঞ্চয় হিসাব খুলে মাসে মাসে টাকা জমা রাখে। বেশ চলছে তাদের দুজনের প্রেম। শেফালীর বয়স এখন আঠার পেরিয়ে ঊনিশে পা দিয়েছে। আইনুযায়ী বিয়ের বয়স হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী শীতে তাদের বিয়ে হবে।

করোনাভাইরাসে মানুষের আয় রোজগার সীমিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ থাকে আবার খোলে।বাড়ী হতে আধা মাইল দূরে একটা ফুড কারখানায় চাকরি নিয়েছিল শেফালী। যাওয়া পথে শেফালীকে কারখানায় দিয়ে যেত ফারুক। শেফালী ছুটির পর অন্যদের সাথে বাড়ী ফেরতো। এ নিয়ে শেফালীর বান্ধবীরা খুব তামাসা করতো আর শেফালী মুচকি হেসে কারখানার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেতো। কতই না আনন্দের দিন ছিল। কারখানায় বিভিন্ন ধরনের জুস তেরী হয়। বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা কাজ করে এই কারখানায়।

আষাঢ় মাস। সকাল হতে একটু একটু বৃষ্টি পরছে। আজ শেফালীর সকালে অন্য সাথীদের সাথে কারখানায় গিয়েছিল। কথা ছিল ফেরার পথে ফারুক তাকে সঙ্গে করে বাসায় ফিরবে। ফারুক তাকে একটা লেডিস ছাতা কিনে দিয়েছিলো। কারখানায় যাওয়ার পথে শেফালীদের বাসা।শেফালী তাদের ঘরের ছোট বারান্দায় বসে আছে।ফারুককে দেখে কাছে এসে বলে,

  • আজ আমার ভাল লাগছে না। মনের ভেতর অশান্তি লাগছে।

  • কেন, শরীর খারাপ লাগছে নাকি। চারিদিকে করোনা হচ্ছে মানুষের। আজ বাসায় বিশ্রাম নিতে পারো।

  • এখনো মাসের বেতন দেয়নি। কামাই দিলে বেতন কাটবে।কারখানার লোকজন বজ্জাত আছে। গরীবের টাকা মেরে খাওয়ার ফন্দি করে সব সময়।

 ফারুক তার ডান হাত শেফালীর কপালে রাখে।

আরও পড়ুন গল্প  সময়ের পাঁচফোড়ন
  • এই তুমি কি ডাক্তার।

  • মা বলে, গায়ে জ্বর হলে কপালে হাত দিলে বুঝা যায়।তোমার গায়ে জ্বর-টর আছে কি-না তাই পরীক্ষা করে দেখলাম।

  • তা ডাক্তার সাহেব কি দেখলেন।

  • না, ঠিক আছে। শোন, রাত আটটার পর তোদের ফ্যাক্টরীর গেটে অপেক্ষা করব।

সত্যি তো আজ মুখখানা কেমন যেন মলিন দেখাচ্ছিল।করুণ মায়া ভরা দুটো চোখ মিলে ফারুকের দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়েছিল। আবেগ ভরা ছিল দুটো চোখে। এই কি শেষ দেখা। তখন আষাঢ়ে আকাশ ঝকমক আলোয় ভরা সকাল বেলা। সেই আলো এসে পরেছে শেফালীর মুখে। ফারুক মনটা খারাপ করে পথ চলা শুরু করে।

সকাল ৮টার  আগেই শেফালী কারখানার অন্যান্য মহিলা কর্মজীবীদের সাথে একে একে গেট দিয়ে ভেতরে যায়।কারখানাটি ছয়তলা বিশিষ্ট। সাত শতের বেশি পুরুষ-মহিলা কর্মরত এখানে। কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা আছে। ভেতরে প্রবেশ করা মানেই ১২ ঘণ্টা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। শেফালী কি জানতো আজ বাইরে  জগৎ হতে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল  তার মত অভাগা মানুষেরা। জানতো এদের অনেকেই অঙ্গার হয়ে যাবে চিরদিনের জন্য।

ফারুক তার কর্মস্থলে এ মন দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে আর ভাবছে শেফালীর কথা। আজ ওর মনটা খারাপ ছিল। বাসায়, কি কোন অসুবিধা হয়েছিল। ওর একমাত্র বড় ভাই আজ প্রায় চার-পাঁচ বছর হলো বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। ছেলেটা বদরাগী। শেফালীদের কোন খোঁজ-খবর নেয় না বরং মাঝে মাঝে জোরপূর্বক টাকা নিয়ে যেতো। হয়ত এবারও তাই ঘটেছে। বাসায় গিয়ে বিষয়টি জানতে হবে। ফারুকের মনটা খারাপ তাই দুপুরের খাবারটা ঠিক মত খেতে পারলো না। কারখানায় ফারুকের একটু বেশি দায়িত্ব। মালিক তার চাকরি দিয়েছে এবং তাকে ছোট বেলা থেকে ভাল জেনে আসছে। মনযোগ দিয়ে কাজ করে এবং অনেক কাজ ইতোমধ্যেই শিখে নিয়েছে।

আরও পড়ুন গল্প বিপরীত

বিকেল সাড়ে ছয়টার বেশি বাজে। আজ সাতটার পর বের হবে। কাজে মন দিয়েছে, এমন সময় কে যেন চিৎকার বলে উঠলো একটি ফুড কারখানায় আগুন লেগেছে। ফারুক শোনা মাত্র ছটফট করছে। আশেপাশে একটাই ফুড কারখানা। শেফালী ওখানেই কাজ করে। কিন্তু কি বলে বের হবে। ইনচার্জকে বিষয়টি খুলে বললো। ইতোমধ্যে প্রত্যেকটি শিল্প কারখানা  সতর্কতা  অবলম্বন করে যাচ্ছে যাতে কোন শ্রমিক বাইরে গিয়ে গন্ডগোল পাকাতে না পারে। প্রায় আধা ঘন্টার পথ। কিন্তু  ফারুককে তো বের হতেই হবে। ইনচার্জকে বুঝিয়ে বের হয়ে এলো ফারুক। প্রাণপণে দোঁড়াতে থাকে ফারুক। পনের মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যায় ফুডস কারখানায়। চারিদিক মানুষ আর মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের অনেকগুলো গাড়ী, তাছাড়া রয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীরা ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের কর্মীগন।

ফারুক কি করবে, কাকে জিজ্ঞাসা করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কে যেন বলছে প্রায় এক ঘন্টা হলো আগুন ধরেছে  আবার কেউ বলছে বিকেল ছয়টার পর পরই আগুন ধরছে। ছয় তলা ভবনে কে কোথায় কাজ করে বাইরে থেকে কারো পক্ষে বলা সম্ভবপর নয়। এমন কি কারখানার অনেক শ্রমিকরা জানে না বা জানার কথা নয়। ছয় তলা পর্যন্ত আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আগুনের লেলিহান জানালা দিয়ে বের হচ্ছে। হাজার মানুষের আর্তনাদে কারখানা এলাকা বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে। কারো মেয়ে, কার বোনের খোঁজে চিৎকার করে দিগ্বিদিক দোঁড়া- দোঁড়ি করছে। ফায়ার সার্ভিসের মোট এগারটি ইউনিট কাজ করে যাচ্ছে। এ যেন এক জ্বলন্তপূরী।

দমকল বাহিনীর সদস্যরা জীবনবাজী রেখে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আহতদের সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সরকারী হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

ফারুক কাকে জিজ্ঞাসা করবে। পরিচিত কাউকে চোখে পরছে না। হঠাৎ তার মা আর শেফালীর মাকে দেখতে পেলো। শেফালীর মা পাগলের মত প্রলাপ করে যাচ্ছে। যতই রাত বাড়ছে আগুনের লেলিহান তীব্র হচ্ছে।কঠিন পরিশ্রম করে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেক মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছে।তাদের সাদা কাপড়ে জড়িয়ে স্ট্রাচে রাখা হচ্ছে আর দগ্ধ জ্ঞানহীন মানুষদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু শেফালী কোথায়। সকাল ছাড়া তো আর উপায় নেই। ভোর অব্দি শেফালীর মা-সহ ফারুকের মা আর ফারুক  অপেক্ষা করছে। কখন ভোর হবে। একজন পুলিশ সদস্যের সাথে কথা বললো ফারুক। শেফালীর কোন ফটো আছে কি না। যদি না থাকে জলদি ব্যবস্থা করতে বলে গেল। তা না হলে খোঁজ করা অসম্ভব হবে।

ফারুকের মানিব্যাগে সদ্য তোলা এক কপি  পাসপোর্ট ছবি আছে। কিন্তু এটা দিয়ে দিলে তো আর কোন স্মৃতি অবশিষ্ট থাকবে না। সকাল না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সকাল নয়টার আগে কোন দোকান খুলবে না। ভোর হতে বাকী নেই। হঠাৎ মালিকের ড্রাইভার খোরশেদ হাজির।

  • ফারুক, অনেক খোঁজাখুঁজি পর তোমাদের পাওয়া গেল।এখনই ম্যাডাম তোমাদের সাথে করে নিতে পাঠিয়েছেন। দেরী করা চলবে না। জলদি গাড়ীতে উঠো।

  • কিন্তু

  •  দেরী করা যাবে না।

ফারুক ভাবছে ম্যাডাম নিশ্চিত একটা ব্যবস্থা করবেন।সবাই গাড়ীতে গিয়ে বসলো।

মিসেস সুরাইয়া জানতেন এই তিনজন মানুষ অনাহারে আছে। তাদের আগে শান্তনা দিতে হবে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ অফিসে তার আপন ফুফাতো ভাই পুলিশের বড় পদে কর্মরত আছেন। বিষয়টি তাকে জানানো হয়েছে। এক কপি ফটো দিয়ে তার সঙ্গে যেন দেখা করে।

ফারুককে শান্তনা দিয়ে সকালের নাস্তা খাওয়ানো হলো। হাত খরচ বাবদ কিছু টাকা দিয়ে পুলিশ অফিসারের নাম- ঠিকানা একটা কাগজে লেখে ফারুককে নারায়ণগঞ্জে পাঠিয়ে দিলো।

আরও পড়ুন গল্প স্বর্ণলতা

ফারুক বেশ ক’কপি ছবি কম্পিউটার দোকান হতে প্রিন্ট করে নারায়ণগঞ্জে রওয়ানা হয়ে গেলো। নারায়ণগঞ্জ আগেই চেনা ছিল। সোজা ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশ অফিসারের সাথে করে পরিচয় দিতেই অফিসার বিস্তারিত জেনে নিলেন এবং শেফলীর তিন কপি ফটোর বিপরীতে নাম লেখে দিতে বললেন। ফারুকের মুখের দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসার কি যেন ভাবলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন।

  • মেয়েটি তোমার কি হয়।

প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে মাটির দিকে চেয়ে রইল। দুটো চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে থাকে। বুদ্ধিমান অফিসার সহজে অনুমান করে নেন। ফারুকের চেহারা দেখে পুলিশ অফিসারের মনে মমতাবোধ জেগে উঠে।

  • বেশ বলতে হবে না।তুমি বাড়ী চলে যাও। এখানে  থেকে তোমার  কোন লাভ হবে না। সমস্ত খোঁজ-খবর নিয়ে বড় আপাকে জানিয়ে দেব। ঠিক আছে। সাথে টাকা আছে? দু-একদিন সময় লাগবে।

ফারুক ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিলো টাকা আছে। তিনটার ভেতরে বাসায় ফিরে সব কিছু খুলে বললো।

অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। সমস্ত দগ্ধ রোগীদের ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং কম আহত রোগীদের নারায়ণগঞ্জ সরকারী হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কিন্তু যারা মারা গেছে তাদের কোথায় রাখা হয়েছে কেউ ঠিকঠাক খবর দিতে পারছে না।দুদিন পরে পুলিশ অফিসার মোবাইলে জানিয়ে দিলেন ফারুকের দেয়া ছবিটির মেয়ে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে খোঁজ করে পাওয়া যায়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ করতে হবে। সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।পুলিশ অফিসারের এক বন্ধু ওখানে ডিউটিতে আছেন। তার কাছে মেয়েটির ছবি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফারুক নাম বলে পরিচয় দিলেই কোন অসুবিধা হবে না। আগামী কাল সকাল দশটার ভেতর দেখা করতে হবে।

আরও পড়ুন গল্প রঙিন ঘুড়ি

সেই থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে যাওয়া আসা করছে ফারুক। এটা নিশ্চিত হয়েছে শেফালী বেঁচে নেই। অঙ্গার হয়ে এই হাসপাতালে হিমাগারে আছে।ইতোমধ্যে জেনেছে ৪৯ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। কিন্তু কারো চেহারা সনাক্ত করার কোন সুযোগ নেই। ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। শেফালীর মাকে নিয়ে সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফারুকের একমাত্র ইচ্ছে শেফালীর পোড়া ছাই তার চাই। কবর দিবে নিজ হাতে আর প্রতিদিন শেফালীর পছন্দের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে কবর ভরে রাখবে। তাই আজ শেষবারের মত তার মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে অন্যদের মত অপেক্ষা করছে। বিকেল পাঁচটা বাজে। এমন সময় এ্যাপ্রোন পরিহিত এবং মুখে মাস্ক পরা একজন মহিলা ডাক্তার এসে  দাঁড়ালেন। টিভি-সংবাদ পত্রের লোক ছাড়া নিখোঁজ লোকদের আত্মীয়স্বজন ডাক্তার ম্যাডামকে দুরত্ব রেখে দাঁড়ালেন।

  • দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে। মানুষ পুড়ে ম্যাচের কাঠির মত হয়ে গিয়েছে।যেন এক একটা পোড়া মানুষ একটা ম্যাচবাক্সের মধ্যে বন্দি হয়ে আছে।ডিএনএ পরীক্ষা মত অবস্থা নেই। যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবো এবং আপনাদের ঠিকানানুযায়ী জানা হবে।

বলেই আর দেরি না করে ডাক্তার ম্যাডাম ভেতরে চলে গেলেন।

মেঘলা আকাশ। সন্ধ্যা হতে আর দেরী নেই। আকাশে মেঘ ভরা বৃষ্টি। যে কোন সময় ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পরবে। রূপগঞ্জে যেতে হবে। শেফালীর মা অপেক্ষা করছে। ফারুকের চোখে জল ছাড়া আর কিছু নেই। শেফালীর শুন্যতায় তার হৃদয় আজ অন্ধকারে ঢেকে গেছে। তার আর ভবিষ্যতের বলতে কিছই রইলো না।

  • মা চলো বাড়ী ফিরে যাই। আমার ভালবাসা ম্যাচের কাঠির মত পোড়া ম্যাচ বাক্সের মধ্যে বন্দি করে এই হাসপাতালের হিমাগারে রেখে গেলাম।

করিডোরে তখন চলছে বিলাপ। স্বজন হারানো মানুষের আহাজারী। এদের কে শান্তনা দিবে। সবাই নীরব দর্শক। ফারুকের মা ছেলের ধরে উঠে দাঁড়ালো। ছেলের বাম কাঁধ চেপে ধরে ডান হাত আকাশের দিকে তুলে কান্না জড়িত কন্ঠে চিৎকার বলতে শুরু করলো,

  • হায়  আল্লাহ। এডা তোমার কি রকমের বিচার?

আরও পড়ুন গল্প অশরীরী আত্মা

এই বর্ষার মাসে ঝড়তুফানের সময় আমার সোয়ামী ভরা বর্ষায় হাওরে মাছ ধরতে যাইয়া আর ফিরে আহে নাই। তার মরা লাশটা দেখতে পাইনি। বানের পানিতে কই ভাইসা গ্যাছিলো কে জানে। স্বামী হারা আর বাপ মরা ছাওয়ালডাকে নিয়ে পনের বছর আগে ভিটে -মাটী বেইচা আইলাম শহরে। এখানেও আমাদের শান্তি নেই। ফুলের মত মেয়ে শেফালীকে ভালবাসতো আমার পোলা। তারেও তুমি এই বর্ষায় পোড়াইয়া ছাই কইরা দিলে। আমার ছেলের বাঁইচা থাকার কোন অবলম্বন থাকলো না। হায় আল্লাহ, যাদের অবহেলায় এতগুলো মানুষ পুড়েছাই হইয়া গ্যালো, তারা খালাস পাইয়া সমাজে বুক ফুইলা বেড়াইতেছে। তাদের কে কোন দিন তোমার দুনিয়ায় বিচার হবে নাহে মাবুদ, এ তোমার ক্যামন বিচার?

ঢাকা শহরে এখন সন্ধ্যা। রাস্তায় নিয়ন বাতির আলোতে আলোকিত। বৃষ্টির পানিতে ঢাকার রাস্তায় পানি জমেছে।একটা রিক্সায় উঠে বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিলো মা-ছেলে। পিছে রেখে গেলো শেফালীর অঙ্গার শরীর ম্যাচ বক্সের বন্দি করে চিরদিনের জন্য।

ঢাকা

১৭ শ্রাবণ, ১৪২৮।

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!