ফাগুনের-গল্প
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

ফাগুনের গল্প

ফাগুনের গল্প

♦  শফিক নহোর

 

আজ বিকেলটা শুরু হলো ঠাণ্ডা পানির চা দিয়ে। নতুন প্রযুক্তি; প্রথমে আমি নিজেই থ মেরে গেলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই অদিতি ফোন দিয়ে বলল,
“তুমি এখনও চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছ। আমি বাসা থেকে বের হয়েছি। তুমি দ্রুত কাজি অফিসে চলে আসো।”
টুংটাং শব্দে শেষের কথাগুলো টেপরেকর্ডারে ফিতা পেঁচিয়ে গেলে যেমন শোনায় ঠিক তেমন। লাইটার হাতে নিয়ে কি যেন বলতে চেয়ে ভুলে গেলাম।
দোকানি বেনসন সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“মামা ত্রিশ টাকা হয়েছে। মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতেই একটা চকলেট ধরিয়ে দিল।”
সকালে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছে অদিতি, সে জানে আমার কোনো হাত খরচ নেই। সিগারেট জ্বালিয়ে দোকান থেকে একটা রিকসার জন্য অপেক্ষা করছি। কি অদ্ভুত! মেয়েটি আমাকে চিনতে পারেনি। অথচ তাকে আমি দু’বছর প্রাইভেট পড়িয়েছি। নয়-ছয় হিসাব কষতেই বুঝতে পারছি, কেন সে আমাকে চিনতে পারেনি। তার প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এটা সে এখনও ভুলতে পারেনি। মেয়েরা সহজে অপমান ভুলে যেতে পারে না। তবে শামুকের মতো চরিত্র ধারণ করে মানুষকে দেখায়। ভেতরে জ্বলে জোনাকি পোকার মতো।

আজ কয়েকদিন ঠিক নিজেকে বুঝতে পারছি না। কি করব। অদিতি চায় আমি সবসময় হাসিখুশি থাকি। এখানে ওর কোনো স্বার্থ নেই, আমি নিজেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই। নিজের খোলস ছেড়ে বাহিরে বের হতে পারছি না। আমি কি নিজে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছি। রিকসার যাত্রী আমার প্রতি তার যে অবহেলা ও ঘৃণা চোখেমুখে ভেসে ওঠেছিল। তাতে মেয়েটির ভেতরে একটি খুনি আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে তা স্পষ্ট দৃশ্যমান।

আমাদের গ্রামে তেমন থাকা হয়নি। দাদা সরকারি চাকুরি করত, আমরা বড়ো হয়েছি নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা শহরে। তবে চট্টগ্রাম শহরে অল্পদিন থেকেছি। বাবা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ব্যাংকে ঢুকে পড়েন। তার পরেই বিয়ে। তার পরের বছর আমার জন্ম। দাদির চেহারা ছিল দুধে আলতা।
দাদা আমাকে বলত,
“তোর চেহারা হয়েছে তোর দাদির মতো। শুধু গঠনটা ছেলেদের।”
বাবা তখন স্কুলে ছেড়ে সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে। তখন দাদি পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে তার সুখের পৃথিবীতে পাড়ি জমিয়েছে। দাদা আমার আর ছোটো বোনকে মানুষ করেছে।

আমার মা ছিল বাক প্রতিবন্ধী। তার মুখে কোনো ভাষা ছিল না। বাবা ইচ্ছে করলে খুব সুন্দরী, শহরের শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করতে পারত। কিন্তু বাবা ছিল দাদার অন্ধভক্ত। বাবা যেকোনো বিষয়ে দাদার অনুমতি বা পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করত না। এ জন্য অবশ্য বাবাকে আমার কাছে অনেক কৈফিয়ত দিতে হয়। বাবা আসলে অনেক সহজ সরল ধরনের মানুষ। মানুষের ভেতরে এক ধরনের লোভ থাকে, হিংসা থাকে; বাবার ভেতরে এগুলো নেই। কেন নেই, সে জন্য আমার হিংসা হয়। মানুষকে কি এত ভালো মানুষ হতে হবে। চাকুরিজীবনে বাবার সফলতার চেয়ে ব্যর্থতা বেশি। কারণ সে কাউকে কখনও তেল দিতে পারেনি। সত্য কথা বলেছেন। একবার চুরি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছিল। আসলে মিথ্যা তো চিরকাল মিথ্যা। বাবা জীবনে জয়ী হয়েছেন। তার চাকুরি ফিরে পেয়েছে এতেই তার সুখ, আনন্দ।
মাকে কোনো দিন দেখিনি মন খারাপ হতে। মা আমাদের সংসারে তার শ্রম-মেধা সবই দিয়েছে। শুধু কথা দিয়ে আমাদের কোনো কিছু শিখাতে পারেনি। আকার ইঙ্গিত দিয়ে শিখিয়েছে মানুষ হতে। মায়ের কথা না বলার কষ্ট কেউ অনুভব করতে পারেনি।
মা হয়তো মনে মনে চাইত, আমার সন্তান মন খুলে কথা বলুক। কথা বলেছি, কিন্তু মা সেই কথার প্রতিউত্তর করতে পারেনি। মায়ের চোখ ভিজে উঠত ভারি অভিমানে। ফাগুন মাস এলেই মা মনে মনে গান গাইতে চাইত; সেটা আমি বুঝতে পারি। আমাকে কাগজে লিখে দিত একটা বাংলা গান গাইবি, আমি শুনব। গানটা শুধু আমার জন্য গাইবি। মা সাদা শাড়ি পরত খোঁপায় পলাশ, শিমুল ফুল গুঁজে ঠোঁট বাকিয়ে কি যেন বলতে চাইত। কিছুই বলতে পারত না। মা আমাকে আদর করত খুব। ছোটো বোনের চেয়ে আমার আবদারগুলোকে প্রাধান্য দিত বেশি।
অন্ধকার গাঢ় হলে মায়ের চোখের কাজল আর চোখের জল মুছে গিয়ে মা হয়ে উঠত কালো কোকিল। শুধু তার কণ্ঠে ছিল না কথার যাদু। কথা হলো মহা ওষুধ। সাপে কাটলে এই মুখের কথাতেই বিষ নেমে যায়।
মা জন্ম থেকেই কথা বলতে পারে না। তার ভেতরে একটি বোধশক্তি ছিল। বাংলা, বাঙালি, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের মানুষ করেছেন। চেষ্টা করেছেন ভালো রাখার। মা সেদিন তার বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে আসার সময় নানাভাই মারা যান।
৮ই ফাগুন একটি মর্মান্তিক দিন, যেখানে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মরণ রাখা হয়। কোনো ইতিহাসে বা কারো লেখায় নানাভাই নেই।
দাদাভাইয়ের বন্ধুর মেয়ে হলো আমার মা। দাদাভাই নানাভাইকে কথা দিয়েছিল। তার মেয়ের সমস্ত দায়িত্ব দাদা ভাইয়ের। তারপর স্বাধীনতা যুদ্ধ; দাদাভাই তখন সারাসরি যুদ্ধে যায়নি কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে।

অদিতি দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে আমার কথা শুনছে। ওর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বোকা মেয়েরা সহজে কান্না করে দেয়। চোখের জল মানুষকে সহজ ও সতেজ করে দিলেও কখনও কখনও দুর্বল করে দেয়। জীবনের কঠিন গল্পগুলো ভালো করে না শুনলে, ভালো করে তাকিয়ে না দেখলে; সেই গল্পের ভেতর পরিপূর্ণ ঢুকা যায় না।

বাবা মাকে বিয়ে করেছিল, মূলত নানাভাই ছিল দাদাভাইয়ের বন্ধুর মেয়ে। নানাভাই ভাষা শহিদ। সত্যিকার অর্থে নানাভাইয়ের কোনো তথ্য সরকারি নথিপত্রে নেই। দাদাভাই মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু সেও নানাভাইয়ের মতো। পেছনে থেকে কাজ করেও কখনও সামনে আসেনি। মানুষের লোভ অথবা বড়ো হওয়ার স্বপ্ন না থাকলে, কেউ সামনে আসতে চায় না হয়তো। কেউ কেউ থাকে ঘরকোণো। জীবনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সবার থাকে না। মানুষ দেখতে একরকম, জানতে গেলে অন্য রকম। মানুষকে না জানা বোকামি।

অদিতি, আমার শরীর ঘেঁসে দাঁড়াল। চোখের দিকে একটু তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আজ আমাকে বিয়ে করবে। আজ ৮ই ফাগুন। ভাষা শহিদের স্মরণে আমরা আজ নিজেদের স্বপ্নকে বড়ো করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেব। যদি তুমি চাও। তোমার দাদাভাইয়ের অনেক বয়স, তাই না?”
হ্যাঁ বলতেই অদিতি বলল,
“আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে দাদাভাইকে কিছু বলেছ?”
“সেই তো আজ তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য পাঠিয়েছে আমাকে।”
মৃদু হেসে আমার হাত ধরল। আমারা দুজন সামানে এগিয়ে গিয়ে একটা টং দোকানে বসে চা দোকানিকে বললাম,
“ভাই আমাদেরকে দুটি চা দেন, চিনি ছাড়া।”

চারদিকে সুনসান পরিবেশ। পাশের গাছ থেকে কাকের ভাঙা কণ্ঠে কা কা শব্দ ভেসে আসছে। চা তৈরি করতে দোকানি ব্যস্ত। গরম পানি দিয়ে কাপ ধুয়ে নিতেই একটা কাপ তাপ সয়তে না পেরে ফেটে গেল। বেচারির লাভের লস গুনতে হবে। তাকে দেখে মনে হলো পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। দোকানে স্বাভাবিকভাবে যে ভিড় থাকার কথা তা নেই।
অদিতি চায়ের কাপে চুমুক দিতেই বলল,
“ওয়াও দারুণ হয়েছে।”
তার কথা শুনে আমার দাদুভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। তোমার মায়ের মুখের ভাষা বলো। প্রয়োজন না হলে বিদেশি শব্দ প্রয়োগ করো না। এতে ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। মনে হয় মায়ের সঙ্গে প্রতারণা করছি।
মায়ের মুখ থেকে একটা শব্দ শোনার জন্য আমি চেয়ে থাকি অপেক্ষার দেওয়াল ঘেঁসে। কান পেতে শুনতে পাই মা আমাকে বলছে, “শোন খোকা, এই ভাষার সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, দেশের সঙ্গে কখনও প্রতারণা করবি না।”
আমার সবসময় মনে হয়, মা সত্যিকার বাক-প্রতিবন্ধী না। মা কথা বলতে পারে। যেমন করে আমার মন আমাকে বলে দেয় মায়ের ভাষা।

আরও পড়ুন শফিক নহোরের গল্প-
নীলভোর
কাঠগোলাপ ও প্রেম
পরাভূত
তিল তাল

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

ফাগুনের গল্প

Facebook Comments Box

শফিক নহোর মূলত একজন গল্পকার। এছাড়া তিনি প্রতিনিয়ত অণুগল্প, ছোট গল্প ও কবিতা লিখে চলছেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: মায়াকুসুম, বিষফুল; কাব্যগ্রন্থ: মিনুফুল তিনি ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নওয়াগ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!