নীরুর-মা
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

নীরুর মা

নীরুর মা
শফিক নহোর

মহা ধুমধামে বিয়ে হলো আমার। বউ দেখে সবার পছন্দ। কিন্তু আমার নিজের মনের মাঝে প্রায় সময় যোগ-বিয়োগ হতো। আমার বউ তমা, নতুন অতিথির জন্য ব্যাকুল! বিয়ের তিন মাসের মাথায় সে সুখবর দিল। এমন একটা খবরে বাড়ির সবার ভিতর এক ধরনের স্বস্তি দেখতে পেলাম। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই।

আমার শাশুড়ি চাইতো আমি তার মতো করে চলি। আমার তা কখনো হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে তমার সঙ্গে মাঝে মধ্যে দু-চার কথা হতো। অনেক কিছুর কৈফিয়ত সে আমার কাছে চাইতো! আমি প্রচণ্ড অস্বস্তিবোধ করতাম। আমার ব্যক্তিগত জীবনে অন্য মানুষের প্রভাব পড়ুক, সেটা আমার কাম্য ছিল না কখনো। তমা বাবার বাড়ি থেকে ফিরে আসার পরেই যথেষ্ট পরিবর্তন হয়ে যেত। এসে সে রাতেই বলবে, আমার স্বর্ণের এটা নাই, সেটা নাই। মানুষের বিয়ে হলে স্বামী কত কিছু দেয়। আজ পর্যন্ত আমার মা-বাবাকে কিছুই দিতে পারলাম না। আমার একমাত্র ছোট ভাই তার-ই বা কি দিয়েছি আমরা!

এমন হাজারটা অভিযোগ ছিল, আমার প্রতি তমার। আমাদের পরিবারের আড়ালে তমাকে অনেক কিছুই দিয়েছি। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট ছিলো না কখনো; কুয়ার ব্যাঙ সাগরে পড়লে যা হয়। তমার চেয়ে আরও বেশি অভিযোগ ছিলো আমার শাশুড়ির; তার মেয়েকে আমি কাজের মেয়ের মতো করে রেখেছি! এমন ডাহা মিথ্যা বলতে তিনি কখনো দ্বিধাবোধ করেননি। সারাদিন ব্যবসায়িক কাজকর্ম করে, ঘরে ফিরে আসতাম একটু সুখের আশায়। কিন্তু ঘরে ফিরে আসার পর যা ঘটত তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তমা আমার তিন বছরের কন্যা নীরুকে নিয়ে অঝোর বৃষ্টির ভিতর কাকভেজা হয়ে মায়ের বাড়িতে রওনা দিলো, শত বাধাকে উপেক্ষা করে। আমার বুকটা কেমন যেন শূন্যতায় ভরে উঠল,আমার চোখ ভিজে গেল। নীরু বারবার পিছু ফিরে দেখছে।
পরদিন ঐ কথা বার্তা নিয়ে আমার শাশুড়ি আমাকে ফোন দিয়েছিল। তিনি আমাকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। ছিঃ! ছিঃ! মানুষ নিজের মেয়ের সঙ্গে এমন ছলচাতুরী করে?

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

এক বছর অতিক্রম হতে চলছে নীরুর মা আমাকে ছেড়ে নীরুর নানী বাড়িতে অবস্থান করছে। অনেকবার নীরুকে আনতে গিয়েছি, সেই একই পুরাতন কেচ্ছা। তমাকে অনেক বুঝিয়েছি। এরপরও আমার সঙ্গে দিনকে দিন প্রচণ্ড খারাপ ব্যবহার করেছে। আমি শুধু নীরুর নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে ভুলে গিয়েছি তমার অত্যাচার। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল তমা। কিন্তু তা ছিল অতি নগণ্য, ভুলে গিয়েছিল সে সব কিছু অতি সহজে। তমার বিরুদ্ধে আমার কাছে হাজারটা অভিযোগ আসতো; সে অন্য একটা ছেলের সঙ্গে গভীর প্রণয় গড়ে তুলছে। স্বচক্ষে দেখা না পর্যন্ত তমার বিরুদ্ধে আমার বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। আমি কোনোদিন অভিযোগ করিও নাই। এ সব কথা নিয়েও আমার শাশুড়ির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়েছে অনেক। আমার শাশুড়ি চাইত আমার ব্যবসার মোটা একটা অঙ্ক আমি তাকে দেই এবং আমি আমার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে শ্বশুর বাড়ি এসে ঘরজামাই হয়ে থাকি। সেটা বুঝতে আমার বেশি দেরি হয়নি।

আমার শাশুড়ি ছিল প্রচণ্ড লোভী।তমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। আমার আদরের মেয়ের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ নেই। যদিও কোনো সময় নীরুকে দেখতে গেলে, অনেক কিছু নিয়ে যেতাম। সে সব দামি জিনিসগুলো আমার চোখের আড়ালে চলে যেত অন্য বাড়ি। নীরুর প্রতি করা হত অমানবিক অত্যাচার। আমি সহ্য করতে পারতাম না। তাই বেহায়ার মত নীরুর মাকে ডাকতাম, আমি চলে যাচ্ছি নীরুকে আর কষ্ট দিয়ো না আর প্লিজ! আমি আর কখনো নীরুর বাবার অধিকার নিয়ে আসব না, তমা। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিয়ো। আমি ফিরে আসার ন’দিন পরে হাতে পেলাম ডিভোর্স লেটার। এখন আর তমার প্রতি আমার কোনো অধিকার নেই। শুধু নীরুর জন্য সময়ে-অসময়ে চোখ ভিজে যায় বড্ড মায়া হয় নিষ্পাপ নীরুর জন্য।

আরও পড়ুন গল্প সময়ের পাঁচফোড়ন

বাড়ি থেকে বাড়তি একটা চাপ ছিল আবার বিয়ের জন্য। আমি কাউকে কিছু না বলে নিজের ব্যবসার টাকা দিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসি। আর কখনো বিয়ে করা হয়নি। অনেকেই চেয়েছিল। আমার মন তা সায় দেয়নি কখনো। তবে খুব জানতে ইচ্ছে করে, নীরু কেমন আছে? অস্ট্রেলিয়াতে আসার পরে একাকী জীবন পার করছি ঊনত্রিশ বছর! আজ ডাক্তার নীরু ইয়াসমিনকে দেখানোর পর, কেন জানি মনে হলো আমার নীরুও হয়তো আজ অনেক বড় হয়েছে, আমাকে ভুলে গেছে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে চলে আসলাম বাসায়।

রাতে অপরিচিত নম্বর থেকে কল। অবাক কাণ্ড! ঊনত্রিশ বছরে আমাকে কোনো মেয়ে কল করেনি। কে মেয়েটি, যে আমাকে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নেয়? আমার সাথে কি তার বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে? সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখি আমার জন্য ফুল। আমার কাছে উপন্যাসের পৃষ্ঠার মতো মনে হচ্ছে সবকিছু। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয় সময়ে-অসময়ে। রক্তের সম্পর্কের সঙ্গে কখনো সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে কখনো-কখনো অভিমান হতে পারে; ঠিক যেমন করে প্রমাণ করেছে আমার নীরু।

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

নীরুর মা

Facebook Comments Box

শফিক নহোর মূলত একজন গল্পকার। এছাড়া তিনি প্রতিনিয়ত অণুগল্প, ছোট গল্প ও কবিতা লিখে চলছেন। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: মায়াকুসুম (২০২১ খ্রি.); বিষফুল (২০২২ খ্রি.)।তিনি ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ নভেম্বর পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নওয়াগ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!