চোখে-দেখা-নীলকণ্ঠ-১ম-পর্ব
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

চোখে দেখা নীলকণ্ঠ (১ম পর্ব)

চোখে দেখা নীলকণ্ঠ (১ম পর্ব)

শফিক নহোর

 

ক.

আজ থেকে প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর আগের ঘটনা। ফাগুনের এক সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে দেখলাম, পাঁচজন মানুষ বাঁশের সঙ্গে বেঁধে একটি মরা গরু নিয়ে যাচ্ছে। তা দেখে গফুর ভাইকে প্রশ্ন করলাম। কথা প্রসঙ্গে বিভিন্ন কথা বলল। জানতে পারলাম, ফকির বাড়ির গাভিন গাই মরে গেছে, তা বাড়ির পাশের হালটের দক্ষিণ দিকে চেয়ারম্যানর বাড়ি যাওয়ার পথে যে  জঙ্গল সেখানে ফেলে দিতে নিয়ে যাচ্ছে।

আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নেমে পড়ছে। মরা গরু নখ দিয়ে ছিঁড়ে খেতে দেখে আমি অদ্ভুত ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম। শকুন দেখার জন্য আশপাশের গ্রামের লোকজনের ঢল নেমেছিল সেদিন। একদৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে মানুষ। কাঁচা গোসত কী ভাবে খাচ্ছে। কেউ কেউ হা-হুতাস করছে; ‘আহা রে !’ 

_তাই গরুটা মরে গেছে।

_কয়দিন পরেই বাছুর হত।

_ধুর গাধা, খালি বাছুর নাকি? তার সঙ্গে যে দুই ভাঁড় করে দুধ দিত এই কালো গরুটা।

মানুষও ঠিক এভাবেই গরুর গোশত খায়। কখনো রান্না করে, কখনো রান্না ছাড়াও। এই মানুষের ভেতর মানুষ খুঁজে বের করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ফকির সাহেবের স্ত্রী, চোখের জলে ছোট্ট একটা নদী  বানিয়ে ফেলেছে। পুত্র সন্তান হারানোর মতো বিলাপ করে কান্নাকাটি করছে। পাশের বাড়ির সদ্য বিবাহিত বউ, বেটি মানুষ এসে শাড়ির আঁচল ধরে ফকির সাহেবের বউরে কইল,

_বু চুবি, বু চুবি, কাঁদিস না। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। মন খারাপ করিস না। 

দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে ফকির সাহেব এর স্ত্রী কইল,

_কত আউশ করছিলাম। গাই বিয়ান দিবার পর, গরুর দুধ দিয়ে খেজুর গাছের রস দিয়ে পায়েস রান্না করে, ছোট বেটির শুশ্বর বাড়ি পাঠাব।

_বু আফসোস করিস নি। আমা গের গাই বিয়াইছে। আমি তোর খেজুর গাছের রস দিয়ে পায়েস রান্না করে দিবো। এখন চাঁদির উপর একটু কদুরতেল নিয়ে, পুকুরে কয়ডা ডুব দিয়ে লায়া নে। তোর মাথা দিয়ে ধান সিদ্ধুর ভাপ উঠছে। 

আরও পড়ুন গল্প হাইয়া আলাল ফালাহ

_উঠ বু, বেশি কাঁদলে তোর মাথা ধরবি। কাঁদিস নি। পালের গরু মরলে তার ব্যথা আমি বুঝি। গরুডা দুই ভাঁড় করে দুধ দিত। সংসারে তোর কাছের মানুষ কম। এক ছাওয়াল বিয়ে দিচ্ছিস, সে তার শ্বশুর বাড়ির ছিড়াব্যাগ ভরছে। বাপ মা কি খাইয়া আছে, না খাইয়া আছে তার কোনো খবর নেয় লো বু?

_কালটি মাগি তো আমার কাছেই থাহে, ওর চোপা আমার দেখপির মনে কয়না।

_গোসল দিয়ে দুডি ভাত মুহি দে। সারাদিন না খেয়ে কি হয়েছিস, যা বু উঠ।

_ইলো শিউলি, বড় দেহি একখান পান বানাইয়া নিয়া আয়। সঙ্গে একটু পানের পাতা নিয়ে আয়। ত গোরে বাড়ির পর আসলাম; খালি মুহি ক্যামবা জানি লাগতেছে।

_সেলিনা বু, নে লো তোর পান। 

-ইলো মাগি তোর পেট সন্নি দেখতেছি, আবার কিছু হবি না কি?’

-তোর যে আবার কথা। মিনসির বাড়ি আসার খোঁজ নাই, ছয় মাস। ইরাকের সাথে যুদ্ধ লাগছে, মিলিটারি গরে না কি এখন ছুটি দিচ্ছে না। নিয়ে ফেলাইছে খাগড়াছড়ি, চিঠির জন্ন্যি পিয়নের বাড়ি গেলাম সে নাকি বিলে গেছে ধান লাগাতি।

_তোর মিনসি কবে আসবিলো?

_সে আসলিই কি আর না আসলিই কী। দুদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসলে, মায়ের পাছ ছাড়ে না। বাড়ির সাথেই তো তার আবার বোনের বাড়ি। আসার পথেই বোনরে নিয়ে আসবি, একপাল ছাওয়ালপল নিয়ে। মিনসি আসলে রাতে তো আর আমার কাছে থাহে না। বোনের কথা মায়ের কথা শোনে। 

আরও পড়ুন গল্প দীপ্তিদের দেবতা

চৈত্র মাসের শুকনা মাঠের মতো যৌবন শুকিয়ে গেছে। মনের ধুলোবালির মতো উড়ে গেছে মনের আবেগ। সহজতর জীবনের বলিরেখার মতো ভাঁজেভাঁজে লুকিয়ে থাকে গোপন পারমাণবিক বিমান ধ্বংসের চূর্ণ কণিকার ধোঁয়া ধরা। অভিশপ্ত অনূঢার মত একদলা অবজ্ঞা।

উপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়ে ও অবহেলার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমি। নিজের স্বামী তার পরিবারের কাছে বন্ধী। আমি তো আমার শশুড়-শাশুড়ি থেকে আলাদা করতে পারি না। 

_আজ যাই লো, বেলা চলে গেল। এ বলে সেলিনা সেদিন শিউলির কাছ থেকে বিদায় নিল।

গ্রামের অনেকই সে সময় সরকারি চাকরি করত। তবে গ্রামের নতুন বউদের মনের ভেতরে এক ধরনের কষ্ট ছিল! শশুর-শাশুড়ি তেমন একটা গুরুত্ব দিত না বউদের। ছেলেকে গরুর মতো সংসারের জন্য খাটতে হত। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব চলে আসত; সে সময় যে চাকরি করত তার উপর। আর সবচেয়ে অনাদরে থাকত বাড়ির নতুন বউ। ঠিক যেন বউ নয় নতুন কাজের বেটি। তাকে দিয়ে ইচ্ছে মতো খাটিয়ে নেওয়া হতো নতুন বলে।

‘এই নাইমেন, এই না-মেন , চান্দুরার যাত্রী নামেন।’

গাড়ির ভেতর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাসের  কন্ট্রাক্টরের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমঘুম ভাব নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে  আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম। কোথাও বসে একটু চা খাওয়া যায় কী- না। চা খেলে ঘুমঘুম ভাবটা কেটে যাবে। রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে এক কাপ রঙ চা, খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

একজন সুন্দরী বেটিরে দিকে চোখ আটকে গেল। পেছন থেকে একজন তাকে ধাক্কা দিচ্ছে, সামনে থেকে একজন টানছে, আর বেটির হাত ধরবার চেষ্টা করছে। তখন ঠিক আমার স্কুলে যাওয়ার পথে ফকির সাহেবের মরা গরু ফেলানোর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। শকুনগুলো কীভাবে গরুর দেহ থেকে নখ দিয়ে গোশত ছিঁড়ে খাচ্ছিল।

আরও পড়ুন গল্প ওরা তেরোজন

কিছুদিন আগে বাসের ভেতর রুপা নামের একটি বেটিকে গাড়ির ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর মিলে ভোগ করেছিল। অজ্ঞান অবস্থায় বেটিকে ঘাটাইল জঙ্গলের পাশে ফেলে রাখতে দেখে একটি ছেলে কৌতূহল বশত ছবি তুলেছিল। চলন্ত গাড়ি থেকে এমন একটি বেটিকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলতে দেখে, তার কিছুক্ষণ পরে কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিল। তখন বেটি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে শান্তির খোঁজে সপ্তম আসমানে চলে গেছে।

আর একজন  আমার হাতের পত্রিকার দিকে তাকিয়ে যতটুকু দেখা যায় পড়বার চেষ্টা করছে। বাঙালি সহজে পত্রিকা পড়বে না, কিনবেও না। পথেঘাটে পড়ে থাকলে শকুনের চোখ দিয়ে দেখবে। এদের দেখেই তৃপ্তি। এই কাগজে কত খবর আসে প্রতিদিন। একজন চেয়ে বসল,

_ভাই, দেখি খেলার পাতা। তামিম না কি আজ খুব ভাল করছে।

ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও দিতে হল; ভদ্রতার খাতিরে। মনের ভিতর থেকে কে যেন বলতে লাগল, এই ফকিন্নির বাচ্চা জামা কাপড় তো ভালোই গায় দিছে। হাতে দামি ফোন নিয়ে ছাতার ফেসবুক চালায়। তার না কি ডাটা না থাকায় নিউজ ফিডে যেতে পারছে না। ফ্রি কোনো বেটির সঙ্গে পিরিতের খায়খাতির মার্কা কথা বলে পটানোর চেষ্টা করছে। ছেলে জাত। মানুষ যত সহজসরল ভাবুক এত সহজ না।

‘এরা মুতে চোখ ধোয়ানো লোক।’

আমরা এখন সহজে মানুষের কাছে সাধু সেজে যাই। নিজের ভেতরে যে মনুষত্ব পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তা দেখছি না। শুধু অন্য মানুষের দিকে নজর। বিড়বিড় করে পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, 

_ভাই রাস্তা জুড়ে দাঁড়াই আছেন ক্যান? একটু সরে খাড়ান। 

এতক্ষণে হুস আসল আমার। ভেতরে ভেতরে  এতখুনে ঘুমের একটা ভাব রয়ে গেছে। 

_ভাই, আমি আর দেরি করতে পারছি না। পত্রিকাটি দিন। আমার গাড়ি চলে এসেছে।  

আরও পড়ুন চোখে দেখা নীলকণ্ঠ-
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

চোখে দেখা নীলকণ্ঠ (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!