কাকভোর
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

কাকভোর

কাকভোর

♦ শফিক নহোর

সকালে ঘুম থেকে উঠেই বউয়ের সঙ্গে একদফা ঝগড়া হয়ে গেল। বউ হাজারটা অভিযোগ তুলেছে; আমি খারাপ, আমি তাকে কিছুই দেইনি কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলছে। রান্না ঘরে এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছে। কাজের মেয়েটি আজ আসেনি। সকালের নাস্তা বানানোর দায়িত্ব তার। নাশতার টেবিলে বসে যেই মুখে খাবার দিয়েছি, বুঝলাম এখন বমি করলে কান্নার আওয়াজ বেড়ে যাবে।
প্রতিদিন একই খাবার বার বার খেতে ভালো লাগে না। আমি মধুমাখা কণ্ঠে জানতে চাইলাম,
“রাতের খাবার কিছু নেই? ওভেন থেকে আমাকে গরম করে দাও। তুমিও আমার সঙ্গে বসে যেতে পারতে দুজন এক সঙ্গে নাশতা করতাম। শোভাকে নিয়ে একসঙ্গে যেতাম।”
“এতো দরদ দেখাতে হবে না। আমি একাই শোভাকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারব। সংসারে এত কাজ তার চোখে কিছুই পরে না। পুরুষ মানুষ কী তাই এত স্বার্থপর হয়!”
আরও কিছু বলতে চেয়ে তার মুখ আটকে গেল; আমার চোখে চোখ পড়াতে।

মানুষ সব বলতে পারে শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে অকপটে মিথ্যা বলতে পারে না।

অভিমান করেই বউ সঙ্গে যেতে চাইল না।

নিজের প্রতি হাঙ্গামার স্ট্রাইক কিছু-কিছু অভিমান থাকা ভালো। খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে যেমন অলংকার হয় না; ঠিক তেমনি শুধু ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা অনুভব করা যায় না। সংসারে একটু খুনসুটি থাকা ভালো। তাতে ভালোবাসা হয়তো আরও রোমান্টিক হয়।

আমি মানুষ হিসাবে রোমান্টিক না হলেও আমার স্ত্রী বড্ড রোমান্টিক। সংসার করতে গেলে অভিযোগ থাকবেই। একা কখনও সংসার করা যায় না। সংসার করতে হয় দুজন মিলেমিশে, সুখে-দুখে একে অপরের পরিপূরক হয়ে। তার স্বপ্নগুলোকে সম্মান দেখানো, এক সঙ্গে বিশ্বস্ততার সঙ্গে জীবনকে উপভোগ করার নামই হয়তো সংসার।
দুজন সুখে আছি; কখনও-কখনও মনে হয় হয়তো এ চলন্ত রেলগাড়িতে উঠে বড্ড ভুল হয়েছে, পরেরটা হয়তো এর চেয়ে অতি উত্তম। এখন ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়; ছেলে-মেয়ে সংসারে। কতদিন হয়ে গেল, এখানেই বেশ আছি। এমন হয়তো জেসমিনের কখনও মনে হয়নি। কারণ আমি ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু; তেমনি ও আমার ভালো বন্ধু। আমাদের সম্পর্ক দেখে অনেক বন্ধু বিরূপ ধারণা করেছিল কোনো এক সময়। কিন্তু আজ একুশ বছর বেশ ভালোই কেটে গেল; সুখে-দুখে। অপ্রাপ্তির কোনো অভিযোগ জেসমিনের প্রতি আমার নেই। তবে স্বামী হিসেবে হয়তো চাওয়াটা একটু বেশি হয়ে যায়। পুরুষ শাষিত সমাজে নারী এটা মেনে নেয়। পুরুষও দুর্বল পেয়ে চাপিয়ে দেয়। এখানেই পুরুষ হেরে যায় রোজ।

অনেক বছর ধরে ঢাকা শহরে আছি। নিজেদের একখন্ড জমি হয়নি। বউ প্রথম-প্রথম খুব বলত; আমাদের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই। আমি বলতাম, আমাদের নিজস্ব বাড়ি আছে গ্রামে। আমার কথা শেষ না-হতেই জেসমিন অন্য রুমে চলে যেত তখন। আজ জেসমিনই বলে, আমরা খুব ভালো আছি তাই না। উপর তলার ভাবিদের ঢাকাতে তিনটা বাড়ি। একমাত্র কন্যা; তারপরেও সংসারে একের পর এক অশান্তি। এক মেয়ের জন্য এত কিছুর দরকার হয়তো ছিল না। মায়ের মন বলে কথা। শুনেছি গ্রামে তার ভাই থাকে; অত্যন্ত দরিদ্র। তাকে সাহায্য করতে পারে। আত্মীয়স্বজন তাদের আছে কিন্তু কোনো দিন চোখে দেখলাম না। শুধু নিজেদের চিন্তা।

মেয়েরও বিয়ে হয়েছিল। তবুও বাবার বাসায় থাকতে হচ্ছে। মেয়ের কত অভিযোগ, ছেলে নেশা করে। গভীর রাত করে বাসায় ফেরে। মেয়েদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করে, ফোনে বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে কথা বলে; বাজে সম্পর্ক। এই কথা সোনিয়া ভাবি প্রথম থেকেই গোপন করেছিল। সত্য আসলে বেশিদিন গোপন থাকে না। গ্রামের একটা সহজসরল ছেলে দেখেই বিয়ে দিতে পারত। আরও বড়োলোক হওয়ার সাধ হয়েছিল।
হায়রে মানুষ! মরে যাওয়ার চিন্তা করে না কখনও। এগুলো জেসমিনের মনের কথা হলেও কখনও বলেনি, ভেতরে ভেতরে সে পলিমাটির মতো নরম। রাগ নেই, অভিযোগ নেই নিজের জীবনের প্রতি। নিজেকে সে ভালোবাসে। তার দেখে আমিও শিখেছি, হ্যাঁ সত্যিই নিজেকে সবার থেকে বেশি ভালোবাসতে হবে। ভালো রাখতে হবে। জীবন তো একটাই।
সেদিন কুড়িল বিশ্বরোড পার হয়ে পায়ে হেঁটে ৩২/ক বাসায় চলে আসলাম। ভাবিকে দেখলাম গাড়িতে বসে পত্রিকা পড়ছে।

শত খবরের মাঝে নিজেদের অসহায়ত্ব ঢাকা পরে থাকে এই নগরে। কেউ কাউকে কখনও মন থেকে ভালোবেসে আপন করে নিতে পারে না, এই অট্টালিকার শহরে। শুধু কংক্রিটের দেয়াল দেখছি; ভালোবাসা অনুভব করার মতো মানুষ দেখিনি। যা দেখেছি অতি নগণ্য।

অর্থের পেছনে এত ছুটে কী আর হবে। অনেক হয়েছে তবুও মন ভরছে না। আর একটা যদি বাড়ি করতে পারতাম! দুনিয়ার মোহ মায়ায় পড়ে জীবন, জীবনের চাওয়াগুলোকে কমার্শিয়াল করে ফেলেছি আমরা। কারও কারও অঢেল সম্পত্তি থাকার পরেও কাউকে কিছুই দেয় না। যার দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার হৃদয়টা অনেক বড়ো। এ ধরনের জীবনবোধ থাকে শুধু হয়তো জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া কিছু মানুষের, সুখের সমীকরণ তাদের কাছে বড়োই জটিল। ভাবনার সমীকরণ সবাই মেলাতে পারে না।

কলিং বেল বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই সোনিয়া ভাবি,
“আপনি? আপনার কথাই মনে মনে ভাবছি। আপনি অনেক দিন বাঁচবেন।”
“তা আমাকে নিয়ে কী ভাবছেন?”
“তেমন কিছু না, ভাবি। অনেকদিন হলো আসেন না, তাই। মনে হচ্ছে কিছু বলতে চাচ্ছেন।”
“হ্যাঁ, ভাবি। আপনার কাছে লাখ পাঁচেক টাকা হবে? গাজীপুরে একটা জমি দেখেছি। খুব পছন্দ হয়েছে। ভাবছি আপনার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে জমির বায়নাটা দিয়ে রাখতাম। অরণীর বাবা আসলে টাকা দিয়ে দেব আপনাকে।”
“ভাবি কি যে বলেন, আপনার ভাইয়ের যে বেতন, তা দিয়ে এই ঢাকা শহরে আমরা কোনো মতো বেঁচে আছি। অভাবের কথা কারও কাছে প্রকাশ করিনি তাই। কিছু মনে করবেন না ভাবি। আপনার এক মেয়ে, ঢাকাতে আপনার তিনটা বাড়ি, তাও আবার জমি কিনতে চাইছেন। সুখি হতে কী খুব বেশি জমি, নগদ টাকা এসব লাগে?
“ভাবি তা হয়তো লাগে না। এখন এসবে আমার এক ধরনের লোভ কাজ করে। লোভ যাদের একবার পেয়ে বসে তারা আর কখনও তা থেকে ফিরে আসতে পারে না। মেয়েটার জন্য বড্ড অনুশোচনা হয়। একমাত্র মেয়েকে সুখি করতে পারলাম না।”

“এই শুনছো, ঘুমের ভেতর একা একা এমন বকবক করছ কেন?”
“বড্ড বাজে স্বপ্ন দেখছিলাম।”
জেসমিনকে আজ অন্যমনস্ক দেখলাম।
“কী ব্যাপার, তোমার কি মন খারাপ?”
“না, মন খারাপ হবে কেন?”
“আচ্ছা সুখি হতে কী ঢাকাতে বাড়ি, গাড়ি, জমি, অনেক নগদ টাকা লাগে?”
“এমন করে বলছ কেন?”
“না, আজ একটা স্বপ্ন দেখলাম। সোনিয়া ভাবির কথা ভাবছি, এত কিছু তবুও টাকার প্রতি, বাড়ি-গাড়ির প্রতি কত লোভ! তবুও তারা সুখি না।”
“জেসমিন, একটা প্রশ্ন করি?”
“তুমি কী সুখি?”
“হুম, আমি সুখি। জাগতিক কোনো জিনিসের প্রতি আমার বিশেষ কোনো মোহ নেই। শুধু তোমার সঙ্গে শত বছর বেঁচে থাকার লোভটা ভীষণ কাজ করে।”
মানুষরে ভেতরে লোভ থাকবেই; কারও কম কারও বেশি। তবে সত্যিকার অর্থে লোভটা কী সেটা বুঝতে পারলে ভালো। নিজেকে সংশোধন করা যায়। জমি, গহনা টাকা-পয়সা জমানো একধরনের লোভ বলতে পারো। নেশা, সখ দুটি ভিন্ন জিনিসি। আমারা অনেক সময় নেশা আর শখকে এক করে ফেলি। এই জন্যই ভালো মানুষ আর মন্দ মানুষ চিনতে আমাদের সময় লেগে যায়। সোনিয়া ভাবি মূলত লোভী। তার বাড়ি করা, গাড়ি করা, জমি কেনা এগুলো লোভ। শখ বলে তার কিছু নেই। অতি লোভ মানুষের ভেতরের মানুষত্ববোধকে মেরে ফেলে।

আরও পড়ুন শফিক নহোরের গল্প-
নীলভোর
কাঠগোলাপ ও প্রেম
পরাভূত
তিল তাল

 

ঘুরে আসুন আমাদের সুজানগর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক ও  ইউটিউব চ্যানেলে

কাকভোর

Facebook Comments Box

শফিক নহোর মূলত একজন গল্পকার। এছাড়া তিনি প্রতিনিয়ত অণুগল্প, ছোট গল্প ও কবিতা লিখে চলছেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: মায়াকুসুম, বিষফুল; কাব্যগ্রন্থ: মিনুফুল তিনি ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নওয়াগ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!