ইমরুল কায়েস,  ভ্রমণ কাহিনী,  সাহিত্য

আমি ভিআইপি?

আমি ভিআইপি?

ইমরুল কায়েস

 

১৩ জুন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। এমন সময় আমাদের বহনকারী চায়নাগামী বিমানটি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আকাশে উড়লো। চায়না ইস্টার্নের বোয়িং বিমান। যাত্রী প্রায় আড়াইশ’র মত, ২৪২ জন। মজার ব্যাপার হল পুরো ফ্লাইটে বিদেশি আমি একাই। বাকী সবাই চীনা। এদের মধ্যে একজন আমার চেনা জানা। আর কাউকে চিনি না। ও কাজ করে ঢাকার চায়না দূতাবাসে। নাম শি শাওহুয়া। ইংরেজি নাম রুবি। চাইনিজ নাম উচ্চারণ করা কষ্টসাধ্য। এজন্য দেশের বাইরে কাজ করা চীনাদের সবার একটা করে ইংরেজি অথবা সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষায় নাম থাকে। কাজের সুবিধার জন্যই এই ব্যবস্থা তাদের। বাকী যাত্রীরা কাজ করে বাংলাদেশের মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন চাইনিজ প্রকল্পে। বিমানের সব আসন ভর্তি। মাঝখানের দিকের একেবারে সামনের সারির মধ্যখানে আমি। আর এক কোনায় রুবি। এই সারির বাকী আসনগুলো খালি। পুরো বিমানের অন্য কোথাও কোন আসন খালি নাই। অথচ আমাদের পাশের আসনগুলো খালি কেন?

ইয়ানছি-হোটেল-কুনমিং-চীন
লেখক (ইয়ানছি হোটেল, কুনমিং, চীন)

প্রথমে ভেবেছি হয়তো যাত্রী না থাকায় এগুলো খালি পড়ে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল তা কেন হবে? কারণ বাংলাদেশে কাজ করা চীনারা দেশে ফেরার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে আছে। অনেকেই করোনার কারণে গত তিন বছর ধরে দেশে ফিরতে পারে না। এই রুবিও যেমন নিজ দেশে ফিরছে দুই বছর সাত মাস পর। করোনার কারণে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ-চীন ফ্লাইট বন্ধ ছিল। সম্প্রতি ফ্লাইট যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে চীনা নাগরিক ছাড়া কেউ যেতে পারে না। চীনে কাজ করতো বা পড়াশোনা করতো এমন বাংলাদেশিরাও ফিরতে পারছে ন। বিধিনিষেধ পুরোটা উঠে গেলে হয়তো তারা ফেরার সুযোগ পাবে। তারপরও তো চাহিদার তুলনায় ফ্লাইট কম। তাই এতগুলো আসন খালির ব্যাপারটা তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য হল না। তবে পরে বুঝতে পেরেছি কেন আসনগুলো খালি ছিল। সে কথায় পরে আসছি।

আরও পড়ুন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দেশে

ঢাকা থেকে কুনমিংয়ে দুই ঘণ্টার ফ্লাইট। কিন্তু চীনের সাথে বাংলাদেশের দুই ঘণ্টা সময়ের ব্যবধান থাকায় ছয়টায় রওনা হলেও কুনমিংয়ে আমরা পৌঁছালাম স্থানীয় সময় রাত ১০ টায়। সময়ের ব্যবধানে চীন দু’ঘণ্টা এগিয়ে। এ কারণে বাংলাদেশে আটটা বাজলেও কুনমিংয়ে ১০টা। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে বিমানের জানালায়। বিমানের গা বেয়ে জানালা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি। সেদিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি যাত্রীরা বের হচ্ছে না কেন? বিমান ল্যান্ড করার পর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু কেউ বের হচ্ছে না। মিনিট দশেক পর হঠাৎ রুবি আমাকে ইশারা করলো একজন বিমান বালাকে অনুসরণ করতে। বিমান বালা আগে, আমি মাঝে, পেছনে রুবি। বিমানবালা অনেকটা পথ পরিস্কার করে যাওয়ার মত যাচ্ছে, আর আমরা তাকে অনুসরণ করে চলেছি। ব্যাপারটা হল বিমানের সকল যাত্রীকে আটকে রাখা হয়েছে। কাউকে নামতে দেয়া হয়নি। আগে আমাকে নামানো হবে, তারপর অন্যরা নামবে। বিমানের বাকী যাত্রীরা সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমি

রুবির দিকে প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে তাকাতেই সে বিষয়টা পরিস্কার করে দিল। ও বলল, তুমি আমাদের সরকারি অতিথি। এই ফ্লাইটে তুমি ভিআইপি। সে কারণে তোমাকে আগে নামানো হচ্ছে। তার কথা শুনে এখন বুঝতে পারলাম পাশের আসনগুলো খালি রাখার কারণ কি। সরকারি অতিথির করোনা সংক্রান্ত নিরাপত্তার কারণেই আসনগুলো খালি রাখা ছিল। এবার খোলাসা করছি সরকারি অতিথি কেন? চীন সরকারের দেয়া একটি ফেলোশিপ প্রোগামে অংশ নিতেই এবারের চীন যাত্রা। চাইনিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চায়না পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি এসোসিয়েশন-সিপিডিএ এই ফেলোশিপ করার সুযোগ দিয়েছে। ফেলোশিপ প্রোগ্রামের নাম চায়না এশিয়া প্যাসিফিক প্রেস সেন্টার (সিএপিপিসি)-২০২২। জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি।

আরও পড়ুন ঘুরে এলাম পর্তুগাল

বিমান থেকে বের হতেই দেখি আপাদমস্তক পিপিইতে ঢাকা তিন/চারজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে। আমাকে স্বাগত জানালো তারা। সঙ্গে করে নিয়ে গেল ইমিগ্রেশন ডেস্কে। সেখানে পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে দেখি বিমানের বাকী যাত্রীরা আসছে। তবে তাদের আবারও আমাদের থেকে বেশ খানিকটা দুরে আটকে দেয়া হল। লাল ফিতা টাঙিয়ে গতিরোধ করা হল তাদের। সবাই দাঁড়িয়ে রইলো। লাল ফিতার দৌরাত্ম বেচারাদের পিছু ছাড়ছে না। আমার ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়ে বের হয়ে আসার পর তাদের ছাড়া হল। নিজেকে খুব সম্মানিত বোধ করতে লাগলাম। বিদেশে এরকম সম্মান পাওয়া সত্যিই খুব আনন্দের। অথচ নিজ দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার কথা মনে পড়তেই মনটা দু:খে ভরে গেল।

এই যেমন আসার সময় শাহজালাল বিমানবন্দরে যে ব্যক্তি আমার ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেছে তার কথাই ধরুন। বেচারা ফেলোশিপ কি তাই জানে না। আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে চললেন কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কতদিন থাকব? কি করি, সর্বশেষ কোন দেশে গেছি, কবে দেশে ফিরেছি, ইত্যকার নানা প্রশ্নে জর্জরিত করতে লাগলেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাসপোর্টেই আছে। তবু কেন সেগুলো জিজ্ঞাসা করলেন বুঝে আসে না। প্রশ্ন তিনি করতেই পারেন, কিন্তু সেগুলো তো যৌক্তিক হতে হবে। যেমন-কোথায় যাচ্ছি, সবশেষ কোন দেশ থেকে কবে আসছি সেগুলোর সিল তো পাসপোর্টেই আছে। পেছনে বহিরাগমন প্রত্যাশী মানুষের বিশাল লাইন সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি পাসপোর্ট উল্টেপাল্টে দেখছেন আর প্রশ্ন করছেন। ইচ্ছা করেই যে দেরি করাচ্ছেন বুঝতে কষ্ট হল না। দশ থেকে পনের মিনিট সময় নিলেন। এবার আমি একটু রাগতস্বরে তাকে বললাম আপনি এত সময় নিচ্ছেন কেন? শান্ত গলায় তার উত্তর, আমাদের তো সবকিছু দেখে যাচাই বাছাই করতে হয়।

আরও পড়ুন দুলাইয়ের জমিদার আজিম চৌধুরী

শেষে আরেক অফিসারের কাছে পাঠিয়ে নিজের আসন ছেড়ে উঠে গেলেন। যার কাছে পাঠালেন তিনি অবশ্য বেশি সময় নিলেন না, এক মিনিটের মধ্যে কাজ সেরে বিদায় দিলেন। এতক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষারত রুবি জিজ্ঞেস করলো কোন সমস্যা কি না? আমি না সূচক জবাব দিলাম। শুধু মনে মনে ভাবতে লাগলাম এজন্যই বিদেশগামী সাধারণ মানুষ এত ভোগান্তিতে পড়ে। বিশেষ করে প্রবাসীদের হয়রানির যেন শেষ নেই। নানা অজুহাতে তাদের হয়রানি করা হয়।

ইমিগ্রেশন সম্পন্নের পর আমাদেরকে লাগেজ সংগ্রহস্থলে নিয়ে যাওয়া হল। লাগেজ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি আমার লাগেজের একটা ফিতা ছিঁড়ে গেছে। এটাকে মামুলি একটা ব্যাপার মনে করে লাগেজ নিচ্ছি। এমনসময় উপস্থিত এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তার ব্যাপারটা চোখে পড়ে। তিনি সাথে সাথে ছেঁড়া ফিতার ছবি তুলে নিলেন। রুবির মাধ্যমে আমাকে জানালেন আমি ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা নেব নাকি লাগেজ নেব? আমি তো হতবাক। কি উত্তর দেব বুঝতে পারছি না। পুরো লাগেজ ঠিক আছে। শুধু একপাশ থেকে একটা ফিতা ছিঁড়ে গেছে। তাছাড়া আমি নিজে তো কোন ক্লেইম করি নাই। আমি কোন কথা না বলে রুবির দিকে তাকিয়ে ভাবছি কি বলা উচিৎ। আমি কিছু বলছি না দেখে রুবি লোকটিকে বললো আমরা হোটেলে গিয়ে জানাব। এরপর লাগেজ নিয়ে বহিরাগমণের দিকে হাঁটা দিলাম। তখনো সামনে পেছনে চীনা কর্মকর্তারা। বাইরে বেরিয়ে দেখি একটা পাজেরো টাইপ গাড়ি দাঁড় করানো। তাতে উঠেই হোটেল অভিমুখে রওনা হলাম।

আরও পড়ুন চীনের ডায়েরি-
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

আমি ভিআইপি?

Facebook Comments Box

সাংবাদিক ও লেখক ইমরুল কায়েসের পুরো নাম আবু হেনা ইমরুল কায়েস। মিডিয়া ও লেখালেখিতে ইমরুল কায়েস নামেই পরিচিত। প্রকাশনা: আনলাকি থারটিন অত:পর প্যারিস, রোহিঙ্গা গণহত্যা: কাঠগড়ায় সুচি, চায়না দর্শন, বিখ্যাতদের অজানা কথা; অনুবাদ গ্রন্থ: দ্য রুলস অফ লাইফ, দ্য লজ অফ হিউম্যান নেচার, দ্যা আইজ অফ ডার্কনেস।তিনি ১৯৮০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত তাঁতীবন্দ ইউনিয়নের পারঘোড়াদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!