আমার-বাবা
আত্মজীবনী,  আহম্মদপুর,  দ্বারিয়াপুর,  সাহিত্য

আমার বাবা

আমার বাবা

তাহমিনা খাতুন

 

আমার বাবা মরহুম খন্দকার আবুল কাসেম। আমার বাবার শিশুকালটি শুরু হয়েছিল নিতান্তই দুঃখের মধ্য দিয়ে! অত্যন্ত অল্প বয়সে আমার আব্বা তাঁর ছোট দুই ভাই বোনসহ পিতৃ-মাতৃহীন হন। এতিম তিন শিশু তাঁদের নানী এবং খালাদের স্নেহ-মমতায় লালিত পালিত হন। আমার বাবার কাছে শুনেছি ওনার নানী খালারা আরবী এবং ফারসী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। আব্বা তাঁর নানী খালাদের নিকট আরবী এবং ফারসী ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, তবে আব্বার বাংলা ভাষাতেও চমৎকার দখল ছিল। তাঁর বাংলা হাতের লেখা এবং ভাষাশৈলী ছিল অত্যন্ত গোছালো এবং পরিপক্ক। আব্বার সুনিপুণ হস্তাক্ষর এবং ভাষাশৈলী ছিল যে কোন উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে চমৎকৃত করার মতো। আব্বার স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ! আমার মনে আছে আমরা খুব শৈশব থেকেই আব্বার মুখে বিভিন্ন ছড়া, কবিতা গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি এবং সেগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি। আব্বার মুখে শুনে শুনে মুখস্ত করা সেসব ছড়ার দু-একটি সবাইকে শোনানোর লোভ সংবরণ করতে পারছি না। যেমন-

“এক যে ছিল হালুম বুড়ো নাক ছিল তার খাঁদা,
সেই নাকেতে ছিল একটা মস্ত বড় ছ্যাঁদা,
সেই ছ্যাঁদাতে ছিল একটা বালতি এত বড়
বাল্তির ভিতর ছিল তিনটি কাঁকড়া করা জড়ো!
কাঁকড়াগুলোর বাইরের দাঁড়া, করে আছে হাঁ!
ঘুমাও ঘুমাও দুষ্টু ছেলে হাতটি নেড়ো না!
নাড়লে পড়ে হালুম বুড়ো দেখতে যদি পায়
হালুম বলে বালতি করে ধরে নিয়ে যায়,
বালতি থেকে কাঁকড়া তখন কামড় লাগায় কট,
ঘুমা ঘুমাও দস্যি ছেলে!ঘুমাও গো চটপট,
না না না, দুষ্টু তো নয়, লক্ষ্মী ছেলে যে,
পালা হালুম, এই তো সোনা ঘুমিয়ে পড়েছে!!”

আরও পড়ুন দুলাইয়ের জমিদার আজিম চৌধুরী

আবার
“তুবরো মুখে গুবরে পোকা সাধ হলো তার করবে বিয়ে,
ঠিক হলো সব ঠেকলো শুধু মনের মতো পাত্রী নিয়ে,
এ্যাঙের মেয়ে, ব্যাঙের মেয়ে নিজের চোখেই দেখলো কত,
বোঁচকা বোঁচা হাড়গিলে সব, কেউ হলো না মনের মতো!
ঘটক এলো গঙ্গা ফড়িং তিড়িং বিড়িং লম্ফ দিয়ে,
ঘটকালিতে চলল সে যে কনের খোঁজে গ্রাম পেড়িয়ে,
অনেক ঘুরে,আদুড় পুড়ের বাদুর পাড়ার বনেদ ঘরে,
সুন্দরী বউ জুটলো এবার গুবরে পোকার বরাত জুড়ে!
বিয়ের রাতে আসর উজল, জোনাক পোকা জ্বালায় বাতি
ধরলো ছুঁচো বরের মাথায় মস্ত বড়
ব্যাঙের ছাতি
ঝিঁঝিঁর দলে ঝাঁঝড় বাজায় ওস্তাদি গায় ভোমরা গুলো,
নাচ জুড়েছে ড্যাঙ ড্যাঙা ড্যাঙ, ঠ্যাঙ তুলে ব্যাঙ গালটি ফুলো!
ছাঁদনা তলায় বর বসেছে , টিক টিকিতে মন্ত্র পড়ে,
হঠাৎ একি কাণ্ড হলো! উড়ল কনে ফুড়ুৎ করে!
ধর্ ধর্ ধর্ একি হলো! ছুটলো সবাই কনের পিছে,
দেখল গিয়ে ঝুলছে কনে, কেওড়া তলার শেওড়া গাছে!”

অথবা
‘কুড়াল’ বলে ‘কুড়ালী’ এবার বড় বান,
উঁচু করে বাঁধ ভিটা, খুঁটে খাব ধান।
ধান খাবো না, পান খাবো না, খাব সরের নাড়ু,
দু’হাতে গড়িয়ে দিব সুবর্নের খাড়ু।
সুবর্নের খাড়ু নারে, ওই যে দেখি রাঙ,
হোথায় গেলে পাব আমি পদ্মাবতীর গাঙ,
পদ্মাবতীর গাঙ দিয়ে সাধুর নাও চলে,
আড়াই কুড়ি ডিম নিয়ে কুড়াল ডাক ছাড়ে।

এমনি আরও অসংখ্য অপ্রচলিত ছড়া! দুঃখজনক হলো বেশীর ভাগ ছড়াই এখন স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

আমার মা নিজেও আব্বার মুখে শুনে এসব ছড়া মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে মায়ের মুখে এসব ছড়া আমাদের ভাই বোনদের ঘুম পাড়ানিয়া ছড়া হিসাবে ঘুম কাতর করে দিত। আবার পরদিন ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙার পর বিছানায় শুয়ে আব্বার মুখে এসব ছড়া ঘুম ভাঙানিয়া ছড়ার রুপ নিত! রকমারী এসব ছড়া ছাড়াও আব্বার মুখে শুনতাম রুপকথার আকর্ষণীয় সব গল্প। আলিবাবা আর চল্লিশ চোর,আলাদীনের যাদুর চেরাগ সহ আরও কত অসংখ্য ধরনের সব গল্প। কেবল আমরা ভাই-বোনেরাই নয়, আব্বার এসব গল্পের শ্রোতা ছিলেন গ্রামের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। পরিবারের ব্যয় নির্বাহের জন্য কৃষিই ছিল আমাদের পরিবারের প্রধানতম আয়ের উৎস।

আমার মনে আছে আমার খুব ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামে বড় বড় অনেক তেঁতুল গাছ ছিল এবং ওই সব তেঁতুল গাছে প্রচুর তেঁতুল ধরত। নিজেদের গাছ ছাড়াও গাছে নতুন তেঁতুল ধরলেই কাঁচা অবস্থায় আব্বা এরকম কয়েকটা তেঁতুল গাছ অল্প দামে কিনে রাখতেন। এসব গাছের তেঁতুল যখন পাকতো তখন কয়েক জন কৃষি শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হত পাকা তেঁতুল সংগ্রহের জন্য এবং অনেক রাত জেগে কৃষি শ্রমিকরা তেঁতুলের খোসা ছাড়াতেন। আব্বা তাদেরকে বিভিন্ন রুপকথার গল্প শোনাতেন। আব্বার গল্প বলার ধরন এত আকর্ষণীয় ছিল যে সে গল্প শোনার জন্য দূর দূরান্তের পাড়ার নারী-পুরুষরা হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে আব্বাকে তাঁদের গ্রামের কোন বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। গল্প শোনা শেষে আবার গভীর রাতে আব্বাকে বাড়ী পৌঁছে দিতেন!

আবার কখনো কখনো আমাদের বাড়ীতে হাজির হতেন। আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। আব্বার মুখে গল্প শোনার মুগ্ধতা সবাইকে গভীর রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতো এবং সবাই তেঁতুলের খোসা ছাড়ানোর কাজে যোগ দিতেন। কোন কোন দিন মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি শুক্লা পক্ষের চাঁদ পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। আব্বার গল্প বলা বিরামহীন ভাবে চলছে আর সেই সাথে সবার ব্যস্ত হাতে চলছে তেঁতুলের খোসা ছাড়ানো।আরব্য উপন্যাস এবং পারস্য উপন্যাসের হাতেম তাঈ, সিন্দাবাদ, আলিফ লায়লা আর ও কত গল্প গাথা যে আব্বার মনে থাকতো! একেকটা গল্প শেষ করতে কয়েক রাত পর্যন্ত লেগে যেত!

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

পিঠা,পায়েস, ক্ষীর, দই ইত্যাদি মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি আব্বার ছিল অসম্ভব দুর্বলতা। আমাদের নিজেদের বাড়ির উঠানে, বাড়ীর আসে পাশে অনেকগুলি খেজুর গাছ ছিল। গ্রামের কয়েক জন খেজুর গাছ কেটে অর্থাৎ বিশেষ পদ্ধতিতে খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহের কাজ করতেন। খেজুরের রস রোজ ভোরে খেজুর গাছ থেকে নামানো হত শুধু নিজেরা নয় আশেপাশের প্রতিবেশীদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হত কাঁচা রস খাওয়ার জন্য। বাকী রস জ্বাল দিয়ে বানানো হত খেজুরের পাটালী বা গুড়। আব্বার নিকট থেকে আমিও খেজুরের পাটালি বানাতে শিখে গিয়েছিলাম। মা কখনও বা কাঁচা খেজুরের রসের পায়েস রান্না করতেন

আব্বার ছিল অসম্ভব রকমের মিষ্টি প্রীতি। এজন্য সারা শীত কাল জুড়েই চলত ভাপা, দুধ চিতই, পাকান,পুলি, আন্দেশা আরও কত নাম না জানা পিঠার আয়োজন। যেদিনই পিঠার আয়োজন থাকত বাড়িতে, খুব ভোরে,অন্ধকার থাকতেই ঘুম থেকে উঠতাম আমরা। পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়িতেও পৌঁছে দেওয়া হত সে সব পিঠা,পুলি। আবার কোন প্রতিবেশী বাড়ি এলে তাকেও আপ্যায়ন করা হত পিঠা পায়েস দিয়ে। শুধু পিঠা, পায়েস নয়, পিঠা,পায়েসের পর তাদের জন্য ঝাল খাবারের ব্যবস্থাও থাকত। শুধু শীতকাল নয়-সারা বছর জুড়েই চলত এসব আয়োজন। আমাদের ছেলেবেলার গ্রামীণ জীবনে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না কিন্তু হৃদয়ের উত্তাপের প্রাচুর্যের কোন কমতি ছিল না।

আমাদের ছেলেবেলায় বড় বাজার, যাকে বলা হত হাট, বসত কাশীনাথপুরে, সপ্তাহে দুদিন। কাশিনাথপুর ছিল এবং এখনও আছে পাবনা জেলার বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থল বন্দর। আমাদের উৎপাদিত কৃষি পণয় কাশিনাথপুর হাটে বিক্রি করা হত। আবার সংসারের প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদি কাশিনাথ পুরের হাট থেকেই কেনা হতো।

আরও পড়ুন গল্প  তৃতীয় স্বাক্ষী

এছাড়া গ্রামের কাছেই ছোট একটি হাট বসতো, যে হাটটিকে বলা হত ফকির হাট। আব্বার খুব পছন্দের ছিল হাটটি। কারণ এই হাটটিতে বিশেষত শীতের শুরুতে- আমাদের ছোট বেলায় ভাদ্র, আশ্বিন মাসেই হালকা শীত অনুভব করা যেত-পাওয়া যেত চর্বিযুক্ত টেংরা, পুঁটি, মেনি, কই, মাগুর, শিং মাছ। প্রাকৃতিক জলাশয়ের সে সুস্বাদু মাছের সাথে বর্তমান কালের চাষের মাছর কোন তুলনাই হয় না। ফকির হাট থেকে আব্বা আমাদের জন্য আনতেন আমাদের প্রিয় ‘তিলের খাজা’। আমরা অধীর আগ্রহে ‘তিলের খাজার’ আশায় আব্বার ঘরে ফেরার অপেক্ষা করতাম।

আব্বার একটি প্রিয় অভ্যাস ছিল গাছ লাগানো এবং সেগুলির যত্ন নেওয়া। নিজেদের বাড়ির আশে-পাশে যেখানেই খালি জায়গা ছিল, আব্বা সেখানেই বিভিন্ন ফলের গাছ লাগাতেন। এছাড়া আমাদের নানার বাড়িতেও আব্বা আম-কাঁঠাল, লিচু, কাল জাম, বেল প্রভৃতি ফলের গাছ লাগিয়ে সবুজে সবুজে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু মাত্র ফল-ফলাদি নয় বিভিন্ন শাক, সবজীর চাষেও আব্বার ছিল দারুণ উৎসাহ। আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি গতানুগতিক সবজী যেমন বেগুন, পটল, লাউ,কুমড়া,করলা ইত্যাদি ছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি,ওলকপি, গাজর,বিট শালগম,পালং শাক এগুলোর চাষ হতো না।আব্বা আমার বড় ভাই মরহুম খন্দকার আবু তাহেরকে চিঠি লিখে পাঠাতেন ঢাকা থেকে এসব অপ্রচলিত সবজীর বীজ পাঠাতে এবং পরম যত্নে সবজীর চাষ করতেন। আব্বার যত্নে এসব অপ্রচলিত সবজীর ফলনও হতো চমৎকার!  নিজেরা খাওয়া ছাড়াও এসব সবজী প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিলানো হত।

আরও পড়ুন গল্প পরাজিত নাবিক

গাছ লাগানো, ফল-ফুল, সবজীর চাষ করা ছাড়াও আব্বার একটি প্রিয় শখ ছিল পাখীদের জন্যও আবাস স্থল তৈরী করে দেওয়া।গরু-বাছুরের থাকার জন্য গোয়াল ঘর সব কৃষিজীবীর বাড়িতেই থাকে। আমাদের বাড়িতেও ছিল। তবে আব্বা আমাদের গোয়াল ঘরে বেশ অনেকগুলি টুকরি বা ডালা ঝুলিয়ে দিতেন। এই সব ডালায় খড়-কুটো দিয়ে বাসা তৈরী করতো ‘জালালী কবুতর’ নামের এক জাতের পায়রা। এসব পায়রা বাসায় ডিম দিতো, বাচ্চা ফুটাতো। আমরা নিজেরা বা আমাদের পাড়ার কেউ কখনো কবুতরগুলিকে বিরক্ত করতো না বা খাওয়ার জন্য ডিম বা ছানা সংগ্রহ করতো না। অনেক বছর যাবত কবুতরগুলি নিশ্চিন্তে ছানা-পোনা নিয়ে জীবন যাপন করছিলো। একবার আমাদের এক আত্মীয় পাখি শিকারের বন্দুক দিয়ে কয়েকটা কবুতর শিকার করল! ভয় পেয়ে কবুতরগুলো  নিজেদের দীর্ঘ দিনের আবাস ছেড়ে চলে গেল। আর কখনো ফিরে আসেনি। আব্বার আরো একটি হৃদয়বান কাজ ছিল বন্য পশু-পাখিদের জন্য মাটির ভাঙ্গা হাঁড়ি বাসনে করে বন-জঙ্গলে পানি রেখে আসা।

সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করা ছিল আব্বার আরেকটি সখ। কুয়া বা টিউবয়েল থেকে পানি তুলে দেওয়া, সারা বছরের রান্নার জ্বালানি জোগার করা ছিল আব্বার অন্যতম প্রিয় কাজ। এ ছাড়া ঘর ঝাঁট দেওয়ার জন্য শন দিয়ে তৈরী করতেন ঝাড়ু আঞ্চলিক ভাবে যাকে বলা হত ‘বারুন’ আর নারকেলের কাঠি থেকে তৈরী করতেন ঝাঁটা যাকে বলা হত ‘শলা’। গাছ থেকে নারকেল গাছের ডাল কেটে তা থেকে কাঠি সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরী করতেন বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করার ঝাঁটা।

আমার স্নেহশীল পিতার আর্থিক সংগতি কম ছিল, কিন্তু সন্তানদের প্রতি ছিল অপত্য স্নেহ। দশটি সন্তানের বড় পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে। কিন্তু কোনদিনও ছেলে-মেয়েদের সাথে রেগে কথা বলা বা বিরক্ত হয়ে তাদেরকে প্রহার করা বা কটু কথা বলা-আব্বার কাছে অচিন্তনীয় ব্যাপার ছিল। এই ধৈর্যশীলতা এ যুগে বিরল!আব্বা ধার্মিক ছিলেন। প্রতিদিন ভোরে আজান দিয়ে নামাজ আদায় করতেন, পবিত্র কোআন তেলাওয়াত করতেন।শুক্রবারে মসজিদে জুম্মার নামাজে ইমামতি করতেন। কিন্ত ধর্মান্ধ ছিলেন না। কখনো নিজের বিশ্বাস বা ভাবনা অন্যের উপরে এমনকি নিজের সন্তানদের উপরেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন নি।

আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

একটি ঘটনার কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। সম্ভবত ষাটের দশকের প্রথম দিকের কথা। পাকিস্তানি আমলে প্রায়ই হিন্দু -মুসলিম বিভেদের উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা চলতো। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বৃটিশের তৈরী করা ‘’ভাগ কর এবং শাসন কর’’ (Divide and Rule) নীতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে স্বার্থান্বেষী মহল মুসলিমদের উপর আক্রমণ চালাতো। হত্যা, লুটপাট, বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া সহ বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন করে তাদের বাড়িঘর, সহায়-সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালাতো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও এধরনের অপচেষ্টা চলতো।  একদিন আমাদের গ্রামের কয়েকজন যুবক লাঠি সোটা, ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাম কাবারিখোলার হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ খবর শোনার সাথে সাথেই আব্বা ওই যুবকদের বোঝালেন এই বলে যে, হিন্দু বা অন্য যে ধর্মেরই হোক না কেন তারাও আল্লাহর সৃষ্টি।

মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা, ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। আমি তোমাদেরকে এমন ভয়ঙ্কর কাজ করতে দিতে পারি না। তোমাদের হাতের অস্ত্র আমাকে দিয়ে তারপর এখান থেকে যাও। আর যেন কখন ও এমন নিষ্ঠুর চিন্তা ভাবনা তোমাদের মাথায় না আসে।” এরপর ওই যুবকেরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আব্বার কাছে মাফ চেয়ে চলে যায়। আমাদের এলাকায় আর কখনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কথা শোনা যায়নি।জ্ঞানচর্চায় আব্বার আগ্রহ ছিল অপরিসীম এবং আশ্চর্যজনক স্মৃতি শক্তির জোড়ে অনেক কিছু মনে রাখতে পারতেন।অবসর সময়ে বই বা দৈনিক সংবাদ পত্র পড়ে সময় কাটাতেন।

আরও পড়ুন যাপিত জীবনের কথকতা-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব
৯ম পর্ব
১০ম পর্ব
১১তম পর্ব
১২তম পর্ব
১৩তম পর্ব
১৪তম পর্ব
১৫তম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

আমার বাবা

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!